বাংলা ছন্দের শ্রেণিবিভাগ

বাংলা কবিতার সুষমা ও শ্রুতিমাধুর্য গড়ে ওঠে তার শৈল্পিক ছন্দের গাঁথুনিতে। “ভাষা ও শিক্ষা” সিরিজের “ছন্দ ও অলঙ্কার” বিভাগের আজকের আলোচনায় আমরা ছন্দের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে বিস্তারিত জানব।

বাংলা ছন্দের শ্রেণিবিভাগ: বিবর্তন ও আধুনিক রূপ

বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগে ছন্দের এই আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বিভাজন ছিল না। তখনকার কবিরা ছন্দের আকৃতিগত পার্থক্য (যেমন: চরণে অক্ষরের সংখ্যা) দেখে নামকরণ করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে প্রথম ছন্দের প্রকৃতি নিয়ে সচেতনতা তৈরি হলেও, অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র সেন প্রথম বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা ছন্দের শ্রেণিবিভাগ করেন।

১. ছন্দের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

প্রাচীন ও মধ্যযুগের কবিরা মূলত ‘চোখের দেখা’ বা দৃষ্টিগ্রাহ্য অক্ষরের ওপর ভিত্তি করে ছন্দের নাম দিতেন। তখন প্রধানত ‘তদ্ভব’ বা ‘তানপ্রধান’ ছন্দের আধিপত্য ছিল। যেমন:

  • চতুর্দশাক্ষর পয়ার: ১৪ অক্ষরের চরণ।
  • লঘু ত্রিপদী: ৬+৬+৮ মাত্রার বিন্যাস।
  • দীর্ঘ ত্রিপদী: ৮+৮+১০ মাত্রার বিন্যাস।
  • দিগক্ষরা ও একাবলী: যথাক্রমে ১০ ও ১১ অক্ষরের চরণ।

২. আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণিবিভাগ

ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ছন্দের অনেক কাব্যিক নাম দিয়েছিলেন, তবে প্রবোধচন্দ্র সেনের করা শ্রেণিবিভাগটিই বর্তমানে সর্বজনগৃহীত। বাংলা ছন্দকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:

ক. স্বরবৃত্ত ছন্দ (দলবৃত্ত / বলপ্রধান / শাসাঘাতপ্রধান)

এটি মূলত বাংলার আদি ও অকৃত্রিম ছন্দ। একে ‘ছড়ার ছন্দ’ বা ‘লৌকিক ছন্দ’ও বলা হয়।

  • বৈশিষ্ট্য: এর লয় খুব দ্রুত। প্রতি পর্বের আদিতে একটি জোর বা শাসাঘাত (Stress) পড়ে।
  • মাত্রাগণনা: রুদ্ধদল ও মুক্তদল—উভয়ই সব সময় ১ মাত্রা হিসেবে গণ্য হয়।

 

খ. মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (কলাবৃত্ত / ধ্বনিপ্রধান)

সংস্কৃত ও প্রাকৃত ছন্দের প্রভাবে এই ছন্দের সৃষ্টি। এর চলন মধ্যম গতির।

  • বৈশিষ্ট্য: এই ছন্দে ধ্বনি-ঝংকার বা শব্দের সুস্পষ্ট উচ্চারণ প্রাধান্য পায়।
  • মাত্রাগণনা: মুক্তদল ১ মাত্রা, কিন্তু রুদ্ধদল সব সময় ২ মাত্রা হিসেবে গণ্য হয়।

 

গ. অক্ষরবৃত্ত ছন্দ (তানপ্রধান / মিশ্রকলাবৃত্ত)

এটি বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গম্ভীর ও ধীর লয়ের ছন্দ। মহাকাব্য ও গুরুগম্ভীর কবিতায় এর ব্যবহার বেশি।

  • বৈশিষ্ট্য: এতে শব্দের শেষে অতিরিক্ত একটি তান বা সুরের রেশ থাকে।
  • মাত্রাগণনা: মুক্তদল ১ মাত্রা। রুদ্ধদল শব্দের আদিতে বা মধ্যে থাকলে ১ মাত্রা, কিন্তু শব্দের শেষে থাকলে ২ মাত্রা হয়।

৩. ছন্দের নামকরণের ভিন্নতা (ছক)

বিভিন্ন ছান্দসিক ও পণ্ডিতগণ এই তিন জাতীয় ছন্দের ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ করেছেন। নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:

প্রবোধচন্দ্র সেনরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঅমূল্যধন মুখোপাধ্যায়সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
স্বরবৃত্তদলবৃত্ত / ছড়ার ছন্দলৌকিক ছন্দচিত্রা
মাত্রাবৃত্তকলাবৃত্তধ্বনিপ্রধান ছন্দঝুমুর
অক্ষরবৃত্ততানপ্রধানতদ্ভব ছন্দপয়ার

ছন্দের এই ত্রিমাত্রিক রূপই বাংলা কবিতাকে দান করেছে এক অনন্য বৈচিত্র্য। স্বরবৃত্তের চপলতা, মাত্রাবৃত্তের ধ্বনি-ঝংকার আর অক্ষরবৃত্তের গাম্ভীর্য—এই তিনে মিলেই বাংলা কাব্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। ছন্দের প্রকৃতি বুঝতে পারা মানেই কবিতার অন্তর্নিহিত সুরকে ধরতে পারা।

আরও দেখুন:

Leave a Comment