“ভাষা ও শিক্ষা” সিরিজের “ছন্দ ও অলঙ্কার” বিভাগের আজকের আলোচ্য বিষয় হলো স্বরবৃত্ত ছন্দ। বাংলা কবিতার আদি এবং অকৃত্রিম এই ছন্দটি তার চপল গতি এবং সহজবোধ্যতার জন্য বাঙালির অতি আপন। নিচে এর স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
Table of Contents
স্বরবৃত্ত ছন্দ: স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ
বাংলা ছন্দের ভুবনে স্বরবৃত্ত হলো মাটির কাছাকাছি থাকা ছন্দ। একে লোকজ বা লৌকিক ছন্দ হিসেবে গণ্য করা হয়। নিচে এই ছন্দের বিভিন্ন নাম, সংজ্ঞা এবং কারিগরি বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরা হলো:
১. স্বরবৃত্ত ছন্দের নানাবিধ নামকরণ
স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রকৃতি ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ছান্দসিক একে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করেছেন:
- ছড়ার ছন্দ / লৌকিক ছন্দ: প্রাচীন কাল থেকে গ্রাম-বাংলার ছড়াগুলো এই ছন্দে রচিত। লোকজীবনে নিত্যব্যবহৃত কথ্যভাষার আশ্রয়ে এর সৃষ্টি বলে রবীন্দ্রনাথ একে ‘ছড়ার ছন্দ’ বা ‘লোকছন্দ’ বলেছেন।
- মেয়েলি ছন্দ: একসময় বাংলার অন্দরমহলে মেয়েরাই ছড়া কাটায় বেশি পারদর্শী ছিলেন, তাই একে ‘মেয়েলি ছন্দ’ও বলা হয়।
- দলবৃত্ত / শাসাঘাতপ্রধান ছন্দ: প্রবোধচন্দ্র সেন একে ‘দলবৃত্ত’ এবং এতে শব্দের শুরুতে জোর বা শ্বাসাঘাত পড়ে বলে ‘শাশাঘাতপ্রধান’ ছন্দ বলেছেন।
- নিরক্ষরের ছন্দ: সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতে, এটি ‘নিরক্ষরের ছন্দ’, যাতে সংস্কৃতের প্রভাব নেই বরং ভাষার নিজস্ব রূপটি বজায় আছে।
২. স্বরবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা
যে ছন্দে মুক্তদল (মুক্তাক্ষর) এবং রুদ্ধদল (বদ্ধদল) উভয়ই সব সময় এক মাত্রা হিসেবে গণ্য হয় এবং প্রতিটি পর্বের শুরুতে একটি প্রবল শ্বাসাঘাত (Stress) পড়ে, তাকে স্বরবৃত্ত ছন্দ বলা হয়। এর লয় অত্যন্ত দ্রুত এবং ভাব লঘু-চপল।
৩. স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১. মাত্রাগণনার রীতি: স্বরবৃত্ত ছন্দে অক্ষরের বা দলের কোনো ভেদাভেদ নেই। স্বরান্ত (মুক্ত) বা হলন্ত (রুদ্ধ)—যেকোনো অক্ষরই এখানে ১ মাত্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।
২. যুগ্মধ্বনির মান: এতে যুগ্মধ্বনি বা রুদ্ধদলকে অত্যন্ত দ্রুত বা ‘ঠেসে’ উচ্চারণ করে একমাত্রা ধরা হয়। এই ছন্দে প্রতিটি পর্বে সাধারণত কমপক্ষে একটি যুগ্মধ্বনি থাকে।
৩. শ্বাসাঘাত (Stress): এই ছন্দের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিটি পর্বের প্রথম অক্ষরের ওপর একটি বাড়তি জোর বা শ্বাসাঘাত পড়ে। এই শ্বাসাঘাতের কারণেই ছড়া পড়ার সময় একটি তালি বা ছন্দের দোলা অনুভূত হয়।
৪. পর্বের বিন্যাস: স্বরবৃত্ত ছন্দের মূল পর্ব সাধারণত চার মাত্রার হয়ে থাকে। এটি চার মাত্রায় কদম ফেলে এগিয়ে চলে। তবে চরণের শেষ পর্বটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপূর্ণ থাকে।
৫. দ্রুত লয়: এই ছন্দের গতি বা লয় অত্যন্ত দ্রুত। এটি বীরদর্পণে বা চপল ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়।
৬. যুক্তব্যঞ্জনের প্রকৃতি: এতে যুক্তব্যঞ্জনের পূর্ববর্তী স্বর সংশ্লিষ্ট উচ্চারণে মাত্র ১ মাত্রা হিসেবে গণ্য হয়। এমনকি যৌগিক স্বরধ্বনিও এখানে দীর্ঘ হয় না।
৭. কথ্য ভাষার প্রাধান্য: এই ছন্দ সাধু ভাষার চেয়ে চলিত বা কথ্য ক্রিয়া ও শব্দ ব্যবহারের জন্য বেশি উপযোগী।
৪. মাত্রা ও পর্ব বিশ্লেষণ (উদাহরণ)
স্বরবৃত্ত ছন্দের মাত্রাবিন্যাস বোঝার জন্য নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করুন:
বাঁশ বাগানের / মাথার ওপর / চাঁদ উঠেছে / ঐ, (৪ + ৪ + ৪ + ১)
মাগো আমার / শোলক-বলা / কাজলা দিদি / কই? (৪ + ৪ + ৪ + ১)
বিশ্লেষণ:
এখানে প্রতিটি পূর্ণ পর্বে ৪টি করে মাত্রা রয়েছে।
‘চাঁদ’ একটি রুদ্ধদল বা যুগ্মধ্বনি হওয়া সত্ত্বেও এটি মাত্র ১ মাত্রা হিসেবে গণ্য হয়েছে।
প্রতিটি পর্বের শুরুতে (যেমন: বাঁশ, মাথার, চাঁদ, ঐ) একটি শ্বাসাঘাত পড়ছে।
শেষের ‘ঐ’ এবং ‘কই’ হলো অপূর্ণ পর্ব।
৫. দলের বিন্যাস রীতি
স্বরবৃত্ত ছন্দের ৪ মাত্রার পর্বগুলো বিভিন্নভাবে গঠিত হতে পারে:
৪টিই মুক্তদল (যেমন: নদী চলি)
৩টি মুক্ত + ১টি রুদ্ধ (যেমন: খোকা ঘুমোলো)
২টি মুক্ত + ২টিরুদ্ধ
১টি মুক্ত + ৩টি রুদ্ধ
৪টিই রুদ্ধদল (যেমন: ঝপ ঝপ ঝপ ঝপ)
আব্দুল কাদিরের মতে, শিক্ষিত সমাজে একসময় অক্ষরবৃত্তের কদর বাড়লে স্বরবৃত্ত পল্লীর রাখালের কণ্ঠে, বাউলের গানে ও মাঝির ভাটিয়ালিতে আশ্রয় নিয়েছিল। তবে আধুনিক যুগে কবিরা পুনরায় এই ছন্দের চপলতা ও শক্তিকে কবিতার মূলধারায় ফিরিয়ে এনেছেন। এটি বাঙালির হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিশে থাকা এক প্রাণবন্ত ছন্দ।
সূত্র: স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য | ছন্দ ও অলঙ্কার | ভাষা ও শিক্ষা।
আরও দেখুন: