মাত্রাবৃত্ত ছন্দ (স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য)

বাংলা কবিতার ছন্দশৈলীতে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ তার অনন্য ধ্বনি-ঝংকার ও গীতিময়তার জন্য সুপরিচিত। একে ‘ধ্বনিপ্রধান’ ছন্দও বলা হয়, যেখানে রুদ্ধদল সর্বদাই দ্বিমাত্রিক। শব্দের সুস্পষ্ট উচ্চারণ ও গাণিতিক মাত্রাবিন্যাসের মাধ্যমে এই ছন্দে এক ধরণের ললিত-মধুর আবহ তৈরি হয়। আজ আমরা মাত্রাবৃত্ত ছন্দের স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও এর শৈল্পিক প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ: স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও শৈল্পিক বিশ্লেষণ

বাংলা সাহিত্যের রসাস্বাদনে ছন্দের জ্ঞান অপরিহার্য। কবিতার চরণে যে ধ্বনি-তরঙ্গ আমাদের কানে দোলা দেয়, তার মূলে রয়েছে ছন্দের জাদুকরী বিন্যাস। এই পাঠটি “ভাষা ও শিক্ষা” বিষয়ের “ছন্দ ও অলঙ্কার” বিভাগের একটি বিশেষ আয়োজন। এখানে আমরা মাত্রাবৃত্ত ছন্দের গভীরে প্রবেশ করব এবং এর কারিগরি দিকগুলো উন্মোচন করব।

১. মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা ও উৎপত্তি

উৎপত্তির বিচারে মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে বলা হয় ‘তৎসম’ বা ‘অর্ধতৎসম ছন্দ’। এর কারণ হলো, এই ছন্দে প্রাচীন সংস্কৃত ও প্রাকৃত ছন্দের অনেক লক্ষণ অথবা অন্তত কিছুটা লক্ষণও বর্তমান আছে। সহজ ভাষায় এর সংজ্ঞা নির্ণয় করা যায় এভাবে— যে জাতীয় ছন্দে যেকোনো রুদ্ধদলের মাত্রাসংখ্যাই দুই এবং যার চলন নাতিচপল কিংবা নাতিধীর, অর্থাৎ এক কথায় যার চলন মধ্যগতি, তাকেই বলা যায় ‘মাত্রাবৃত্ত ছন্দ’।

বাংলা ছন্দের ভুবনে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে প্রতি পর্বে অক্ষরসমতা রক্ষা করা হয়, কিন্তু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে প্রতি পর্বে শুধু মাত্রা-সমতাই বর্তমান থাকে। এই কারণেই এ জাতীয় ছন্দের ‘মাত্রাবৃত্ত’ নামকরণ যথোচিত এবং সার্থক। সংক্ষেপে বললে— যে ছন্দে যুগ্মধ্বনি বা রুদ্ধদলকে সব সময় দুই মাত্রা গণনা করা হয় এবং যা বিশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারিত হয়, তাকে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বলে।

২. মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মূল পরিচয় ও স্বরূপ

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ মূলত ধ্বনির সূক্ষ্ম পরিমাপের ওপর নির্ভরশীল। একে অনেকেই ‘কলাবৃত্ত’ ছন্দ নামেও ডাকেন। এই ছন্দে ধ্বনিকে স্বরবৃত্তের মতো সংকুচিত করা হয় না, বরং প্রতিটি ধ্বনি তার পূর্ণ মাত্রায় প্রস্ফুটিত হয়। এই ছন্দে চরণের পর্বগুলোতে প্রত্যেক অক্ষর ধ্বনি বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে এবং প্রত্যেক পর্বের মাত্রার সংখ্যা সুনির্দিষ্ট থাকে।

বিলম্বিত বা মধ্যম লয়ের এই ছন্দে চরণের শেষ পর্বটি সাধারণত অপূর্ণ থাকে। অন্ত্য পর্ব ছাড়া অন্য সব পর্বের মাত্রা সংখ্যা সমান হয়। প্রবোধচন্দ্র সেনের মতে, মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বিশেষত্ব এর সুরবৈচিত্র্য। এটি গীতি-কবিতার জন্য বিশেষ উপযোগী হলেও অতি গম্ভীর বা মহাকাব্যিক রচনার জন্য কিছুটা সীমাবদ্ধ।

৩. মাত্রাবৃত্ত ছন্দের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে অন্য ছন্দ থেকে আলাদা করতে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:

  • রুদ্ধদলের (বদ্ধদল) দ্বিমাত্রিকতা: মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সবচেয়ে শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য হলো রুদ্ধদলের মান। রুদ্ধদল বা বদ্ধদল শব্দের যেখানেই বসুক না কেন (আদি, মধ্য কিংবা অন্ত), তা সর্বদাই ২ মাত্রা হিসেবে গণ্য হবে। যেমন: ‘আনন্দ’ (আ-নন্-দ) শব্দটিতে ‘নন্’ রুদ্ধদলটি শব্দের মাঝখানে থাকলেও এটি ২ মাত্রার মর্যাদা পাবে।

  • মুক্তদলের (স্বরান্ত দল) মান: এই ছন্দে সকল মুক্তদল বা স্বরান্ত অক্ষর সর্বদাই ১ মাত্রা হিসেবে গণ্য হয়।

  • ধ্বনি-বিস্তারের নীতি: এই ছন্দে ধ্বনি-সংকোচন ঘটে না; বরং প্রতিটি অক্ষরকে তার সুস্পষ্ট উচ্চারিত ধ্বনি থেকেই পরিমাপ করা হয়। অনুস্বার (ং), বিসর্গ (ঃ) এবং হসন্ত যুক্ত বর্ণগুলো পূর্ববর্তী স্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশ্লিষ্ট উচ্চারণে দ্বিমাত্রিক হয়।

  • যৌগিক স্বরের গুরুত্ব: যৌগিক স্বরধ্বনি যেমন— (ও+ই) এবং (ও+উ) মাত্রাবৃত্ত ছন্দে সর্বদাই ২ মাত্রা হিসেবে পরিমাপ করা হয়।

  • মধ্যগতি ও ললিত ভাব: এই ছন্দের লয় সাধারণত বিলম্বিত বা ধীরস্থির। এর গতিবেগ কোনো আকস্মিক ধাক্কা বা তানের ওপর নির্ভর না করে একটি ঢালা সুরে একটানা প্রবাহিত হয়। এর ভাব অত্যন্ত ললিত ও মধুর।

৪. পর্ব বিন্যাস ও লয়

মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মূল পর্ব সাধারণত ৪, ৫, ৬, ৭ বা ৮ মাত্রার হয়ে থাকে।

  • ছয় মাত্রার চাল: বাংলা মাত্রাবৃত্ত কবিতায় ৬ মাত্রার পর্বই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। একে মাত্রাবৃত্তের আদর্শ চাল ধরা হয়।

  • গীতিপ্রবণতা: এই ছন্দে এক ধরনের সুরনিষ্ঠতা বা সঙ্গীতময়তা থাকে। এতে কোনো কৃত্রিম তালের চেয়ে শব্দ-ধ্বনির স্বাভাবিক ঝংকারই প্রধান হয়ে ওঠে।

৫. উদাহরণ ও মাত্রা বিশ্লেষণ

মাত্রাবৃত্তের গাণিতিক নির্ভুলতা বুঝতে নিচের উদাহরণটি লক্ষ্য করি:

“আমরা চাহি না, । তরল স্বপন, । হালকা সুখ”

(৬ + ৬ + ৪)

এখানে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

  • আম-রা (২+১=৩), চা-হি (১+১=২), না (১) = ৬ মাত্রা।

  • ত-রল (১+২=৩), স্ব-পন (১+২=৩) = ৬ মাত্রা।

  • হাল-কা (২+১=৩), সুখ (২) = ৫ মাত্রা (অপূর্ণ পর্ব)।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরেকটি বিখ্যাত পঙক্তি দেখা যাক:

“মহা-। মানব। আসে—। দিকে দিকে। রোমাঞ্চ। লাগে”

(৬ + ৬ + ৬ + ৩)

এখানে ‘মানব’ (মা-নব = ১+২) এবং ‘রোমাঞ্চ’ (রো-মান্-চ = ১+২+১) শব্দগুলোতে রুদ্ধদল ২ মাত্রা পাওয়ায় প্রতিটি পূর্ণ পর্ব ৬ মাত্রার হয়েছে। শব্দের উচ্চারণ কোথাও টেনে ধরা হয়নি, প্রতিটি ধ্বনি তার পূর্ণ মাত্রায় প্রস্ফুটিত হয়েছে।

৬. মাত্রাবৃত্ত ছন্দের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা

মাত্রাবৃত্ত ছন্দের একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো— এতে সুরবৈচিত্র্য যথেষ্ট প্রকাশ করা গেলেও গাম্ভীর্য আনা কঠিন। এ বিষয়ে প্রবোধচন্দ্র সেন বলেছেন:

“ধ্বনির গাম্ভীর্য এবং বাক্যের সম্প্রসারণ ক্ষমতা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বিশেষত্ব; সুতরাং সে গুরুগম্ভীর ভাবের উপযুক্ত বাহন। কিন্তু সুরবৈচিত্র্যেই মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বিশেষত্ব। এজন্য এ ছন্দ গীতিকবিতার পক্ষে বিশেষ উপযোগী। কিন্তু এ ছন্দ গভীর ভাবের কবিতার পক্ষে একেবারেই অযোগ্য, তাই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অমিত্রাক্ষর কবিতা রচনা অসম্ভব।”

তা সত্ত্বেও, আধুনিক অনেক কবি মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কাঠামোতে নতুন নতুন ভাব ও রস সৃষ্টি করেছেন। গীতিধর্মী কবিতা, গান এবং উচ্চমার্গের কাব্যিক বর্ণনায় এই ছন্দের ব্যবহার অতুলনীয়।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বাংলা কবিতার ভাণ্ডারকে দান করেছে এক অনন্য গীতলতা। এর গাণিতিক নির্ভুলতা এবং ললিত সুরের আবেদন কবিদের কাছে যেমন প্রিয়, পাঠকদের কাছেও তেমনি শ্রুতিমধুর। ছন্দটি শিখতে হলে রুদ্ধদলের দ্বিমাত্রিকতা এবং সুস্পষ্ট উচ্চারণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সূত্র: মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য | অক্ষরবৃত্ত ছন্দ | ছন্দ ও অলঙ্কার | ভাষা ও শিক্ষা

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment