বাংলা কবিতার ছন্দশৈলীর ইতিহাসে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ এক বিশাল ও গাম্ভীর্যপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এটি কেবল একটি ছন্দ রীতি নয়, বরং বাংলা ভাষার নিজস্ব ধ্বনিপ্রকৃতি ও বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। “ভাষা ও শিক্ষা” বিষয়ের “ছন্দ ও অলঙ্কার” বিভাগের আজকের এই সুদীর্ঘ আলোচনায় আমরা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করব।
Table of Contents
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ: স্বরূপ, বিবর্তন ও শৈল্পিক বিশ্লেষণ
১. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের সংজ্ঞা ও মৌলিক পরিচয়
উৎপত্তির বিচারে যে ছন্দটিকে আমরা খাঁটি বাংলা অর্থাৎ ‘তদ্ভব ছন্দ’ নামে আখ্যায়িত করেছি, তাকেই প্রচলিত ভাষায় বলা হয় অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। এর বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হলো: যে ছন্দে শব্দের আদিতে ও মধ্যে যুগ্মধ্বনি (বদ্ধদল) থাকলে তা সংশ্লিষ্ট উচ্চারণে একমাত্রা এবং শব্দের শেষে যুগ্মধ্বনি থাকলে বিশ্লিষ্ট উচ্চারণে দুই মাত্রা ধরা হয়, তাকেই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বলে।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো এর মন্থর বা ধীর লয়। এই ছন্দে অক্ষর উচ্চারণের স্বাভাবিক ধ্বনিকে আচ্ছন্ন করে একটি অতিরিক্ত তান বা সুরের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। ফলে যুক্তাক্ষরবিহীন ও যুক্তাক্ষরবহুল সব ধরনের চরণই এই ছন্দে সমান ভারসাম্য বজায় রেখে অবস্থান করতে পারে।
উদাহরণ:
“তিনি মরিতে চাহিনা আমি। সুন্দর ভুবনে,। মানবের মাঝে আমি।
বাঁচিবারে চাই এই সূর্যকরে এই। পুষ্পিত কাননে। জীবন্ত হৃদয় মাঝে। যদি স্থান পাই।”
উপরিউক্ত চরণগুলোর মাত্রাসংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি ৮ + ৬ = ১৪ মাত্রার পয়ার চালে রচিত। এখানে প্রতিটি চরণে দুটি করে পর্ব রয়েছে।
২. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের নামকরণ ও ‘তানপ্রধান’ বিতর্ক
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের একটি বহুল প্রচলিত নাম হলো ‘তানপ্রধান ছন্দ’। এই নামকরণটি করেছেন প্রখ্যাত ছান্দসিক অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, এই জাতীয় ছন্দে ধ্বনিপ্রবাহের মধ্যে একটি বিশেষ সুরের টান বা তান (Vocal drawl) থাকে, যা অনেক সময় অক্ষরধ্বনিকেও অতিক্রম করে যায়।
অমূল্যধন বনাম প্রবোধচন্দ্র:
অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় মনে করেন, পয়ারের একটানা সুরের মধ্যে মৌলিক স্বরান্ত বা যৌগিক স্বরান্ত অক্ষর সহজেই স্থান করে নিতে পারে। তবে ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেন এই যুক্তির বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, আমরা যাকে অক্ষরবৃত্ত বলি, তার চেয়ে অনেক বেশি টেনে আবৃত্তি করা হয় কলাবৃত্ত (মাত্রাবৃত্ত) ছন্দকে। তিনি যুক্তি দেন যে, তানের আধিক্য যদি নামকরণের ভিত্তি হয়, তবে মাত্রাবৃত্তকেই তানপ্রধান বলা উচিত।
তবে প্রবোধবাবুর ভিন্নমত সত্ত্বেও অক্ষরবৃত্তে তানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এই তানের কারণেই এই ছন্দের একটি বিশেষ স্থিতিস্থাপকতা (Elasticity) গুণ রয়েছে। এর ফলে চরণের যেকোনো স্থানে ছেদ চিহ্ন ব্যবহার করলেও মূল ধ্বনিপ্রবাহের মাপে কোনো হেরফের হয় না।
৩. পয়ারের শোষণশক্তি ও স্থিতিস্থাপকতা
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের সবচেয়ে জাদুকরী বৈশিষ্ট্য হলো এর শোষণশক্তি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গুণের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। একে অক্ষরবৃত্তের স্থিতিস্থাপকতা গুণও বলা যায়।
যেহেতু এই ছন্দে একটি বিশেষ তান বা সুরের প্রবাহ থাকে, তাই এর বুনট খুব ঘনসংবদ্ধ নয়। এই ফাঁকগুলোর মধ্যে অনায়েসে অতিরিক্ত ধ্বনি বা যুক্তাক্ষর ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে চরণের মাত্রাসংখ্যা বা ওজনে কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
- যুগ্মধ্বনির পরিধি সংকুচিত হয়ে একমাত্রা হিসেবে পরিগণিত হওয়াকেই রবীন্দ্রনাথ ‘পয়ারের শোষণশক্তি’ বলেছেন।
- এই শক্তির বলে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে একই সঙ্গে ‘জয়জয়ন্তীর’ গম্ভীর ধ্বনি এবং ‘পুরবি শাহানার’ মৃদু করুণ সুর ঝঙ্কৃত হতে পারে।
৪. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের রূপকল্প বৈচিত্র্য
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বাংলা ছন্দের মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। এর বিভিন্ন রূপ নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. পয়ার (Poyar)
অক্ষরবৃত্তের সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ হলো পয়ার। এর চরণের মাত্রা বিন্যাস ৮ + ৬ = ১৪। দুই চরণে স্তবক গঠিত হয় এবং চরণের শেষে অন্ত্যমিল থাকে।
পাখী সব করে রব / রাতি পোহাইল, (৮+৬)
কাননে কুসুম কলি / সকলি ফুটিল। (৮+৬)
খ. একাবলী (Ekavali)
যে ছন্দে প্রতি চরণে দুটি পর্ব থাকে এবং মাত্রা বিন্যাস ৬ + ৫ হয়, তাকে একাবলী বলে। একে একপদী ছন্দও বলা হয়।
বড়র পিরীতি / বালির বাঁধ, (৬+৫)
ক্ষণে হাতে দড়ি / ক্ষণেকে চাঁদ। (৬+৫)
গ. ত্রিপদী (Tripadi)
প্রতি চরণে তিনটি পর্ব থাকে। প্রথম দুই পর্বে অন্ত্যমিল থাকে এবং দুই চরণের মধ্যে মিল থাকে। এর সাধারণ রূপ ৮ + ৮ + ১০ বা ৬ + ৬ + ৮।
যে জন দিবসে জ্বালায় মোমের বাতি। (৬+৬+৮)
ঘ. চৌপদী (Choupadi)
প্রতি চরণে চারটি পদ থাকে। প্রথম তিন পর্বে অন্ত্যমিল ছাড়াও চরণের শেষে মিল থাকে।
চিরসুখী জন / ভ্রমে কি কখন / ব্যথিত বেদন / বুঝিতে পারে। (৬+৬+৬+৫)
ঙ. অমিত্রাক্ষর ছন্দ (Blank Verse)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রবর্তিত এই ছন্দ পয়ার ভিত্তিক হলেও এতে অন্ত্যমিল থাকে না। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রবহমানতা—অর্থাৎ বক্তব্য এক পঙক্তিতে শেষ না হয়ে পরবর্তী পঙক্তিতে গড়িয়ে যায়।
চ. গৈরিশ ছন্দ (Gairish Chhanda)
গিরীশচন্দ্র ঘোষ প্রবর্তিত এই ছন্দে পর্ব সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য সুনির্দিষ্ট নয়। এটি অনেকটা প্রবহমান ও ছেদনির্ভর।
এস নাথ, কত ক্লেশ পেয়েছ কুটীরে…
ছ. সনেট (Sonnet)
চৌদ্দ অক্ষর ও চৌদ্দ পঙক্তির অখণ্ড ভাবকল্পনা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলায় সনেটের জনক।
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;…
৫. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের কারিগরি বৈশিষ্ট্যসমূহ
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যাকরণগত ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে একনজরে দেওয়া হলো:
১. যুগ্মধ্বনির দ্বৈত নীতি: শব্দের আদিতে ও মধ্যের রুদ্ধদল একমাত্রা এবং শেষে থাকলে দুই মাত্রা।
২. ভাষার ধরন: এই ছন্দে সাধুভাষা বা সংস্কৃতমুলক শব্দের প্রয়োগ বেশি মানানসই।
৩. লয়: এর গতি ধীর ও মন্থর।
৪. অক্ষর গণনা: এটি যেহেতু অক্ষর-সর্বস্ব, তাই অনেক সময় শুধু অক্ষর গুনেই মাত্রা ঠিক রাখা যায়।
৫. ব্যতিক্রমী দ্বিমাত্রিকতা: চার জায়গায় আদি ও মধ্যের যুগ্মধ্বনি দ্বিমাত্রিক হতে পারে:
- কথ্য ক্রিয়াপদে।
- নির্দেশক প্রত্যয়যুক্ত শব্দে (যেমন: টি, টা)।
- সমাসবদ্ধ পদে।
- কিছু নির্দিষ্ট তৎসম ও তদ্ভব শব্দে।
৬. যুক্তব্যঞ্জনের ভার: তানের প্রবাহে যুক্ত-ব্যঞ্জনের মাত্রা সংকুচিত হয়ে একমাত্রা হয়ে যায়, যা এই ছন্দকে গাম্ভীর্য দান করে।
৬. অক্ষরবৃত্ত নামকরণ: বিজ্ঞান ও বিতর্ক
অনেকে মনে করেন ‘অক্ষরবৃত্ত’ নামটি বিজ্ঞানসম্মত নয়। তবে এই ধারণাটি বিভ্রান্তিকর। ভারতীয় ভাষাবিজ্ঞানে ‘অক্ষর’ বলতে যুক্ত বা অযুক্ত বর্ণসমষ্টিকেই বোঝায়। সংস্কৃত ছন্দঃশাস্ত্রেও বলা হয়েছে— ‘বৃত্তম্ অক্ষরসংখ্যাতম্’। অর্থাৎ অক্ষরের সংখ্যা দ্বারা ছন্দ নিরূপিত হয়।
বাংলা তদ্ভব ছন্দের ঐতিহ্যবাহী এই নামটির সার্থকতা এখানেই যে, এটি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের অক্ষর গণনার রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রবোধচন্দ্র সেন পরবর্তীতে এর বিভিন্ন নাম দিয়েছেন:
- যৌগিক ছন্দ
- বিশিষ্ট কলামাত্রিক
- অর্ধকলাবৃত্ত
- মিশ্রকলাবৃত্ত
- মিশ্রবৃত্ত (সর্বশেষ নাম)
৭. গদ্যছন্দ ও আধুনিক প্রয়োগ
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে অক্ষরবৃত্তের কাঠামো থেকেই গদ্যছন্দ (Prose Verse) ও মুক্তক ছন্দের উদ্ভব হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ বা ‘পুনশ্চ’-এর কবিতাগুলো এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গদ্যছন্দে পর্বের বাঁধন আলগা থাকে এবং চরণের দৈর্ঘ্য অর্থানুযায়ী স্বাধীন হয়।
৮. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মাত্রাগণনার গাণিতিক সূত্র
অক্ষরবৃত্তের মাত্রাগণনা বা ‘দল’ বিন্যাস অনেক সময় জটিল মনে হতে পারে। তবে এর একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক বিন্যাস রয়েছে। এই ছন্দে মুক্তদল (Open Syllable) সর্বদাই একমাত্রা। জটিলতা তৈরি হয় রুদ্ধদল বা বদ্ধদল (Closed Syllable) নিয়ে।
রুদ্ধদলের অবস্থানভিত্তিক মান:
১. শব্দের শুরুতে (Initial): ১ মাত্রা। (যেমন: **বন্-**ধনা — এখানে ‘বন্’ ১ মাত্রা)
২. শব্দের মধ্যে (Medial): ১ মাত্রা। (যেমন: আ-**নন্-**দ — এখানে ‘নন্’ ১ মাত্রা)
৩. শব্দের শেষে (Final): ২ মাত্রা। (যেমন: স-জান- — এখানে ‘জান’ ২ মাত্রা)
৪. একাক্ষরী শব্দ (Monosyllabic): ২ মাত্রা। (যেমন: গান, প্রাণ, দিন — এগুলো সরাসরি ২ মাত্রা)
এই গাণিতিক নিয়মটিই অক্ষরবৃত্তকে একটি বিশেষ নমনীয়তা দান করে, যা স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে পাওয়া যায় না।
৯. পয়ারের প্রকারভেদ ও বিবর্তন
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মেরুদণ্ড হলো ‘পয়ার’। এই পয়ার সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে:
মহাপয়ার: যখন পয়ারের ১৪ মাত্রার সীমা ছাড়িয়ে ১৮ মাত্রায় (৮+১০ অথবা ১০+৮) উন্নীত হয়, তখন তাকে মহাপয়ার বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক কবিতায় এই ১৮ মাত্রার মহাপয়ারের সার্থক প্রয়োগ দেখা যায়।
ছন্দোবদ্ধ পয়ার: এটি মূলত প্রাচীন রীতির পয়ার যেখানে পঙক্তির শেষে মিল রক্ষা করা আবশ্যিক।
মুক্তক পয়ার: যেখানে মাত্রার সমতা থাকলেও চরণের দৈর্ঘ্য সমান থাকে না, বরং ভাবের প্রয়োজনে চরণ ছোট-বড় হয়।
১০. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের গাম্ভীর্য ও অলঙ্কার
অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে কেন ‘গম্ভীর’ ভাবের বাহন বলা হয়? এর মূল কারণ হলো এর মন্থর গতি। ধীর লয়ে আবৃত্তি করার ফলে শব্দের অন্ত্যলীন ধ্বনিগুলো শ্রোতার মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করে।
অলঙ্কারের সাথে সম্পর্ক:
অক্ষরবৃত্ত ছন্দে অনুপ্রাস এবং যমক অলঙ্কারের প্রয়োগ সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিনন্দন হয়। যুক্তাক্ষরের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও এই ছন্দ সেই ভার অনায়াসেই বহন করতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, এটি যেন “পাহাড়ি নদীর মতো নয়, বরং প্রশান্ত মহাসাগরের মতো বিশাল ও ধীর।”
১১. আধুনিক সাহিত্যে অক্ষরবৃত্তের রূপান্তর
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ কীভাবে আধুনিক মুক্তক বা গদ্যছন্দে রূপান্তরিত হলো, তা অত্যন্ত কৌতূহলপ্রদ।
- মুক্তক ছন্দ (Free Verse): এতে অক্ষরবৃত্তের মাত্রাগণনারীতি মানা হলেও পর্বের দৈর্ঘ্য ও চরণের বিন্যাস থাকে স্বাধীন। রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
- অমিল মুক্তক বা অতিমুক্তক: যেখানে অন্ত্যমিল থাকে না এবং ভাব এক পঙক্তি থেকে অন্য পঙক্তিতে অবাধে প্রবাহিত হয়।
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? / ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো / চার কোটি পরিবার খাঁড়া রয়েছি তূণ…
এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কবির আবেগ আর ছন্দের মাত্রা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।
১২. অক্ষরবৃত্ত ও গদ্যছন্দের সম্পর্ক
গদ্যছন্দ (Prose Rhythm) হলো অক্ষরবৃত্তের একটি বিবর্তিত রূপ। প্রবোধচন্দ্র সেন একে ‘ছন্দোহীন ছন্দ’ না বলে ‘অনিয়মিত অক্ষরবৃত্ত’ বলতে চেয়েছেন।
এটি মূলত ছেদ-বিচ্ছিন্ন চরণ দ্বারা গঠিত।
এতে পর্বের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট থাকে না।
চরণের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হয় অর্থের গাম্ভীর্য ও ভাবের গতি অনুযায়ী।
রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’ কাব্যের কবিতাগুলো অক্ষরবৃত্তের এই আধ্যাত্মিক ও আধুনিক বিবর্তনের ফসল।
১৩. অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ১০টি অনন্য বৈশিষ্ট্য (একনজরে)
পূর্বের আলোচনার ভিত্তিতে অক্ষরবৃত্তের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে পুনরায় সংকলিত করা হলো:
যুগ্মধ্বনির দ্বৈত নিয়ম: আদি ও মধ্যের বদ্ধদল ১ মাত্রা, শেষেরটি ২ মাত্রা।
তানের প্রবাহ: অক্ষরধ্বনিকে ছাড়িয়ে একটি সুরের তরঙ্গ বা ‘তান’ অনুভূত হয়।
শোষণশক্তি: যুক্তাক্ষরের আধিক্য থাকলেও মাত্রার ওজন ঠিক থাকে।
মন্থর লয়: এর আবৃত্তি হয় ধীর ও গাম্ভীর্যপূর্ণ।
সাধু ভাষার আধিক্য: তৎসম ও গম্ভীর শব্দের ভার বহনে এটিই শ্রেষ্ঠ ছন্দ।
অক্ষর গণনা: প্রাচীন রীতিতে অক্ষর সংখ্যা গুনেই এর মাত্রা ঠিক করা হতো।
দুই পর্বের বিন্যাস: সাধারণত ৮ ও ৬ মাত্রার দুটি পর্বে একটি পূর্ণ চরণ গঠিত হয়।
অমিত্রাক্ষর হওয়ার ক্ষমতা: অন্ত্যমিল ত্যাগ করে এটি প্রবহমান হতে পারে।
যৌগিক স্বরের মান: অক্ষরবৃত্তে যৌগিক স্বর (ঐ, ঔ) শব্দের শেষে থাকলে ২ মাত্রা ধরা হয়।
বিশালত্বের বাহন: মহাকাব্য, সনেট ও দীর্ঘ বর্ণনামূলক কবিতার জন্য এটিই আদর্শ ছন্দ।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ কেবল গণিত নয়, এটি বাংলা ভাষার আত্মার ধ্বনি। মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ হয়ে আধুনিক কবিদের জীবনবোধ পর্যন্ত এই ছন্দ নিজেকে বারবার ভেঙে গড়েছে। এর নামকরণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, এর উপযোগিতা ও শক্তির কাছে সকল বিতর্ক গৌণ হয়ে যায়।
শিক্ষার্থী ও কাব্য-অনুরাগীদের জন্য অক্ষরবৃত্তের এই বিশদ জ্ঞান কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং কবিতার গভীরে প্রবেশ করার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করবে।
এই দীর্ঘ ও গবেষণাধর্মী আর্টিকেলটিতে ব্যবহৃত তথ্য, তত্ত্ব এবং সংজ্ঞাসমূহ বাংলা ছন্দশাস্ত্রের প্রথিতযশা ছান্দসিক ও পণ্ডিতদের গবেষণালব্ধ কাজ থেকে সংগৃহীত। নিচে আর্টিকেলে ব্যবহৃত প্রধান রেফারেন্স বা তথ্যসূত্রসমূহ প্রদান করা হলো:
তথ্যসূত্র:
১. প্রবোধচন্দ্র সেন (আধুনিক বাংলা ছন্দের জনক):
- ছন্দ পরিক্রমা: এই আর্টিকেলে উল্লিখিত ছন্দের তিন জাতীয় নাম (স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত) এবং ‘মিশ্রবৃত্ত’ বা ‘যৌগিক’ নামের প্রস্তাবনা তাঁর এই গবেষণা থেকেই নেওয়া।
- বাংলার ছন্দ: অক্ষরবৃত্ত নামকরণের সার্থকতা এবং ‘তানপ্রধান’ নামের বিরোধিতা সংক্রান্ত যুক্তিগুলো তাঁর এই মৌলিক কাজের অন্তর্ভুক্ত।
২. অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়:
বাংলা ছন্দের মূলসূত্র: অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে কেন ‘তানপ্রধান ছন্দ’ বলা হয় এবং ‘ভোকাল ড্রল’ (Vocal Drawal) সংক্রান্ত তত্ত্বটি এই আকর গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:
ছন্দ (প্রবন্ধ সংকলন): আর্টিকেলে আলোচিত ‘পয়ারের শোষণশক্তি’ এবং অক্ষরবৃত্তের স্থিতিস্থাপকতা গুণ সংক্রান্ত আলোচনাটি রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া। তাঁর ‘বলাকা’ ও ‘পুনশ্চ’ কাব্যের পরীক্ষামূলক ছন্দও এখানে রেফারেন্স হিসেবে কাজ করেছে।
৪. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়:
ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ: ব্যাকরণের সংজ্ঞা (বি+আ+কৃ+অন) এবং তদ্ভব শব্দের ছন্দপ্রকৃতি বিষয়ে তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই আর্টিকেলের রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
৫. সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (ছন্দের জাদুকর):
ছন্দ-সরস্বতী: বিভিন্ন ছন্দের কাব্যিক নামকরণ (যেমন: চিত্রা, ঝুমুর, পয়ার) এবং স্বরবৃত্ত ছন্দের ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে তাঁর মতামত রেফারেন্স হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবহৃত পারিভাষিক ও তাত্ত্বিক রেফারেন্স:
- সিদ্ধান্তকৌমুদী (সংস্কৃত ব্যাকরণ): ছন্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ (√চন্দ্ + অস্) এবং “চন্দয়তি হলাদয়তি-ইতি ছন্দঃ” উদ্ধৃতিটি এই প্রাচীন রেফারেন্স থেকে গৃহীত।
- আব্দুল কাদির (ছান্দসিক): মধ্যযুগীয় স্বরবৃত্তের বিবর্তন এবং পয়ারের রূপান্তর সংক্রান্ত ঐতিহাসিক পটভূমি তাঁর গবেষণা থেকে নেওয়া।
অন্যান্য তথ্যসূত্র:
- ভাষা ও শিক্ষা সিরিজ: মূলত এই আর্টিকেলের মূল কাঠামো এবং ধারাবাহিক বিন্যাস “ভাষা ও শিক্ষা” শিক্ষা-সিরিজের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে।
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত: অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও সনেট (চতুর্দশপদী কবিতাবলী) এর গঠনশৈলী সংক্রান্ত রেফারেন্স তাঁর কাব্যচর্চা থেকে গৃহীত।
- গিরীশচন্দ্র ঘোষ: গৈরিশ ছন্দের গঠন ও প্রবহমানতা সংক্রান্ত তথ্য তাঁর নাট্য-কাব্য থেকে নেওয়া।
আরও দেখুন:
