ছন্দ ও অলঙ্কার | ভাষা ও শিক্ষা

“ভাষা ও শিক্ষা” সিরিজের “ছন্দ ও অলঙ্কার” বিভাগের আজকের পাঠে আপনাদের স্বাগতম। সাহিত্যচর্চার জগতে ছন্দ ও অলঙ্কার কেবল ব্যাকরণের অংশ নয়, বরং এটি কাব্যের প্রাণশক্তি।

ছন্দ ও অলঙ্কার: সাহিত্যের শৈল্পিক রসায়ন

সাহিত্যের রূপ ও রসকে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন সুশৃঙ্খল বিন্যাস। এই বিন্যাসের প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো ছন্দ এবং অলঙ্কার

১. ছন্দ (Prosody)

ক. ব্যুৎপত্তি ও অর্থ

‘ছন্দ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত √চন্দ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ আহ্লাদন বা আনন্দ প্রদান করা। এর সাথে ‘অস্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘ছন্দঃ’ বা ‘ছন্দ’ শব্দটি গঠিত হয়েছে।

সিদ্ধান্তকৌমুদী-তে বলা হয়েছে: “চন্দয়তি হলাদয়তি-ইতি ছন্দঃ” অর্থাৎ, যা পাঠ করলে বা শুনলে মনের মাঝে আনন্দ সঞ্চারিত হয়, তাই ছন্দ।

খ. ছন্দের স্বরূপ: রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, ছন্দ হলো কথার শৃঙ্খল নয়, বরং মুক্তির উপায়। তিনি বলেছেন:

“কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দেবার জন্যই ছন্দ। সেতারের তার বাঁধা থাকে বটে, কিন্তু তার থেকে সুর পায় ছাড়া। ছন্দ হচ্ছে সেই তার-বাঁধা সেতার। কথার অন্তরের সুরকে সে ছাড়া দিতে থাকে।”

গ. উদাহরণ বিশ্লেষণ

একটি সাধারণ গদ্য বাক্য যখন ছন্দের বন্ধনে ধরা দেয়, তখন তার আবেদন বহুগুণ বেড়ে যায়।

  • গদ্য রূপ: ‘সমস্ত দিনটা যেমন করেই হোক একভাবে কেটে গেল; কিন্তু, বিকেল বেলাটা আর কিছুতেই কাটতে চাচ্ছে না।’

  • ছন্দোবদ্ধ রূপ: “সকাল বেলা কাটিয়া গেল বিকাল নাহি যায়” (রবীন্দ্রনাথ, ‘আক্ষেপ’, মানসী)।

এখানে ছন্দের বাঁধন কথাগুলোর ভেতরে এক মোক্ষম বেদনার গতি সঞ্চার করেছে। গদ্যের চেয়ে পদ্যের এই রূপটি অনেক বেশি মর্মস্পর্শী এবং ব্যঞ্জনাময়। ছন্দ কেবল বেদনা নয়, ফুর্তির কথাকেও চঞ্চল ও গতিশীল করে তুলতে পারে।

২. ব্যাকরণ ও বিশ্লেষণ

সাহিত্যের এই ছন্দ ও অলঙ্কারকে বুঝতে হলে ভাষার ব্যাকরণ সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন।

ক. ব্যুৎপত্তি

‘ব্যাকরণ’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি হলো (বি + আ + √কৃ + অন)। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো— “বিশেষ এবং সম্যকরূপে বিশ্লেষণ”।

খ. সংজ্ঞা ও প্রয়োজনীয়তা

ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ব্যাকরণের অত্যন্ত নিখুঁত একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন:

“যে শাস্ত্রে কোনো ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ, আকৃতি ও প্রয়োগের নীতি বুঝিয়ে দেওয়া হয়, সেই শাস্ত্রকে বলে সেই ভাষার ব্যাকরণ।”

অক্ষর, শব্দ এবং বাক্যের এই বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞানই আমাদের শেখায় কীভাবে একটি সার্থক সাহিত্যকর্ম সৃজিত হয়।

ছন্দ হলো কাব্যের শরীরী গতি, আর ব্যাকরণ হলো তার কাঠামোগত ভিত্তি। এই দুইয়ের সমন্বয়েই ভাষা তার পূর্ণতা পায়। পরবর্তী পাঠগুলোতে আমরা ছন্দের প্রকারভেদ (স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত) এবং বিভিন্ন অলঙ্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

তথ্যসূত্র: ছন্দ ও অলঙ্কার | ভাষা ও শিক্ষা সিরিজ।

আরও দেখুন:

Leave a Comment