সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনায় অলঙ্কার একটি অপরিহার্য বিষয়। “ভাষা ও শিক্ষা” সিরিজের “ছন্দ ও অলঙ্কার” বিভাগের আজকের পাঠে আমরা অলঙ্কারের স্বরূপ ও এর বিচিত্র দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
Table of Contents
অলঙ্কার, অলঙ্কারের প্রয়োজনীয়তা ও অলঙ্কারের প্রকারভেদ
১. অলঙ্কার: ব্যুৎপত্তি ও সংজ্ঞার্থ
ব্যুৎপত্তিগত অর্থ:
‘অলঙ্কার’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি হলো— অলম্ – √ কৃ + অ (ঘঞ)। এর আক্ষরিক অর্থ হলো— যা দ্বারা অলঙ্কৃত বা ভূষিত করা হয়।
সাধারণ সংজ্ঞা:
সংসারী মানুষ যেমন অলঙ্কার বা গহনা দিয়ে নিজেকে সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলে, সাহিত্যিকগণও তেমনি শব্দ ও অর্থের কারুকাজ দিয়ে সাহিত্যের কায়া বা শরীরকে সুসজ্জিত করেন। কাব্যের এই শোভাকর ধর্মকেই বলা হয় অলঙ্কার। কাব্য বা সাহিত্যের শব্দ ও অর্থের যে বিশেষ গুণ বা চারুত্ব পাঠককে আনন্দ দেয় এবং ভাবের গভীরতা বাড়িয়ে দেয়, তা-ই অলঙ্কার।
মনীষীদের অভিমত:
আচার্য বামন: অলঙ্কারবাদী এই পণ্ডিতের মতে, “কাব্যং গ্রাহ্যম অলঙ্কারাৎ” অর্থাৎ অলঙ্কারের জন্যই কাব্য গ্রহণযোগ্য হয়। তিনি আরও সংক্ষেপে বলেছেন— “সৌন্দর্যম অলঙ্কারঃ” (সৌন্দর্যই অলঙ্কার)।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: তাঁর ভাষায়, “যে গুণ দ্বারা ভাষার শক্তি বর্ধন ও সৌন্দর্য সম্পাদন হয়, তাকে অলঙ্কার বলে।”
অগ্নিপুরাণ: প্রাচীন এই গ্রন্থে অলঙ্কারকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে— “অলঙ্ক্রিয়তে অনেন ইতি অলঙ্কারঃ” (যার দ্বারা অলঙ্কৃত করা হয়, তা-ই অলঙ্কার)।
২. অলঙ্কারের প্রয়োজনীয়তা
সাহিত্য সৃষ্টিতে অলঙ্কার কেবল বহিরাভরণ নয়, এটি সাহিত্যের অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রকাশ করার এক শৈল্পিক মাধ্যম। এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য:
সৌন্দর্য বৃদ্ধি: অলঙ্কারহীন বাক্য লৌকিক ও সাধারণ হতে পারে, কিন্তু অলঙ্কারের উপযুক্ত প্রয়োগে সেই বাক্যই লোকোত্তর চমৎকারিত্ব লাভ করে।
ভাবের স্পষ্টতা: অনেক সময় কঠিন বা বিমূর্ত ভাবকে সহজ ও মূর্ত করে তোলার জন্য উপমা বা রূপকের মতো অলঙ্কার প্রয়োজন হয়। যেমন— “তিনি খুব জ্ঞানী” বলার চেয়ে “তিনি জ্ঞানের সমুদ্র” বললে ভাবের গভীরতা ও স্পষ্টতা বেশি ফুটে ওঠে।
আকর্ষণ সৃষ্টি: রসহীন বা নিরস বক্তব্যকে অলঙ্কার দিয়ে সাজালে তা পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় ও শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে।
স্মরণযোগ্যতা: অলঙ্কারযুক্ত বাক্য বা পঙক্তি পাঠকের স্মৃতিতে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়। অনুপ্রাস বা যমক অলঙ্কারের ধ্বনি-মাধুর্য কাব্যকে সঙ্গীতময় করে তোলে।
শক্তির বর্ধন: ড. সুনীতিকুমারের মতে, অলঙ্কার ভাষার প্রকাশ ক্ষমতা বা শক্তির বিস্তার ঘটায়। এটি সাধারণ ভাষাকে ‘কাব্যভাষা’য় রূপান্তর করে।
৩. অলঙ্কারের প্রকারভেদ
ভাষার অলঙ্কার মূলত শব্দের ওপর নির্ভরশীল। একটি শব্দের প্রধানত দুটি রূপ থাকে— একটি তার বাইরের শরীর বা ধ্বনি, অন্যটি তার ভেতরের আত্মা বা অর্থ। শব্দের এই দ্বিমাত্রিক সত্তার ওপর ভিত্তি করে অলঙ্কারকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
ক. শব্দালঙ্কার (Figures of Sound):
যে অলঙ্কার শব্দের ধ্বনিগত মাধুর্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তাকে শব্দালঙ্কার বলে। এখানে শব্দের অর্থ প্রধান নয়, বরং ধ্বনি-ঝংকার বা শ্রুতিমাধুর্যই মুখ্য। শব্দালঙ্কারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শব্দটি পরিবর্তন করে সমার্থক অন্য শব্দ বসিয়ে দিলে অলঙ্কার নষ্ট হয়ে যায়।
উদাহরণ: অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, বক্রোক্তি ইত্যাদি।
নিদর্শন: “কুটিল কুন্তল কুসুম কুবলয়” (এখানে ‘ক’ ধ্বনির বারবার ব্যবহারে অনুপ্রাস অলঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে)।
খ. অর্থালঙ্কার (Figures of Sense):
যে অলঙ্কার শব্দের অর্থের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে এবং যা বুদ্ধিবৃত্তিক চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করে, তাকে অর্থালঙ্কার বলে। এখানে শব্দের ধ্বনি মুখ্য নয়, বরং অর্থের গভীরতা প্রধান। এক্ষেত্রে কোনো শব্দের পরিবর্তে সমার্থক শব্দ ব্যবহার করলেও অলঙ্কারের হানি ঘটে না।
- উদাহরণ: উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, অতিশয়োক্তি, ব্যতিরেক ইত্যাদি।
- নিদর্শন: “চাঁদের মতো মুখখানি তার” (এখানে চাঁদ ও মুখের সাদৃশ্য অর্থগতভাবে চমৎকারিত্ব সৃষ্টি করেছে)।
অলঙ্কারহীন কাব্য প্রাণহীন শরীরের মতো। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, অলঙ্কারের যথেচ্ছ প্রয়োগ সাহিত্যের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে। মহাকবি কালিদাস বা রবীন্দ্রনাথের রচনায় অলঙ্কার এসেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, যা সাহিত্যের উৎকর্ষকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাই সাহিত্যের বিচারে অলঙ্কার কেবল সজ্জা নয়, বরং রস সৃষ্টির এক অমোঘ হাতিয়ার।
তথ্যসূত্র:
১. অলঙ্কার চন্দ্রিকা — শ্যামাপদ চক্রবর্তী।
২. ভাষা ও শিক্ষা সিরিজ — ছন্দ ও অলঙ্কার বিভাগ।
৩. কাব্যালোেক — সুধীরকুমার দাশগুপ্ত।
আরও দেখুন: