‘ভরত মণ্ডলের মা’ জয় গোস্বামীর এক অনন্য রাজনৈতিক ও মানবিক দলিল, যেখানে ব্যক্তি-মানুষের যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে মাটির প্রতি এক চিরকালীন অধিকারবোধ। কবিতাটি কেবল এক বৃদ্ধার আর্তনাদ নয়, বরং রাষ্ট্রশক্তি ও দলীয় ক্যাডারদের পেশ পেশী-শক্তির বিরুদ্ধে এক সাধারণ ভূমিপুত্র-জননীর অসম লড়াইয়ের ঘোষণাপত্র।
যখন তথাকথিত উন্নয়নের নামে বা রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েমের লক্ষে সাধারণ কৃষকের জমি কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সেই লড়াইয়ে সামনে এসে দাঁড়ান এক মা। যাঁর এক ছেলে ইতিপূর্বেই রাজনীতির বলি হয়েছে, অন্য ছেলেকে হারিয়ে ফেলার ভয় থাকলেও যাঁর কাছে মাটির অধিকার আপসহীন। জয় গোস্বামী এখানে অসাধারণ মুন্সিয়ানায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক মারণাস্ত্র, সশস্ত্র পুলিশ কিংবা প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হলো সেই পরিশ্রমী হাত দুটি, যা যুগ যুগ ধরে মাটির বুক চিরে ফসল ফলিয়ে এসেছে।
কবিতার শেষভাগে কবি সেই সাধারণ মাসীমার মাঝেই খুঁজে পান দিব্যশক্তির রূপ। কোনো অতিপ্রাকৃত অলৌকিকতা নয়, বরং শোষণের মুখে এক হার-না-মানা গ্রামীণ মায়ের এই জেদই কবিকে মনে করিয়ে দেয় দেবী দুর্গার কথা। এই কবিতাটি আমাদের সমকালীন বাংলার ভূমি-আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদার এক অবিনশ্বর প্রতীক।
ভরত মণ্ডলের মা – জয় গোস্বামী
বৃদ্ধা বললেন:
‘আমার এক ছেলে গেছে,
আরেক ছেলে কে নিয়ে যাক
জমি আমি দেব না ওদের |
এই যে হাত দু’টো দেখছো বাবা…’
ব’লে তাঁর কাঁপা কাঁপা
শিরা ওঠা হাত দু’টি উঠিয়ে
দেখালেন: ‘এ দু’টো হাতে
ক্ষেতের সমস্ত কাজ
এতদিন করেছি, এবার
এই হাত দু’টো দিয়েই
জমি কেড়ে নেওয়া আটকাবো|’
মাসীমা, আপনার নেই
ইটভাটার অস্ত্রভাণ্ডার
মাসীমা, আপনার নেই
সশস্ত্র পুলিশ
মাসীমা, আপনার নেই
পুলিশ-পোষাক পরা
চটি পায়ে হাজার ক্যাডার
তা সত্বেও এত শক্তি
কোথা থেকে পান?
তা আমরা জানি না—
শুধু এইটুকু জানি
কৃষকজননী হ’য়ে মাঝে মাঝে দেবী দুর্গা
আমাদের দেখা দিয়ে যান।