শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা

শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা , বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের শ্রেণিবিভাগ করতে গেলে তিন দিক থেকে এর শ্রেণি নির্ণয় করা যায়। যেমন: উৎস বা উৎপত্তি অনুসারে বাংলা শব্দভাণ্ডারকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।

শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা

গঠন অনুসারে শব্দকে দুই ভাগে এবং অর্থানুসারে শব্দকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এসব শ্রেণিবিভাগ নিচে ছকের মাধ্যমে দেখান হল :

Capture408 শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা

 

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বাংলা সাধু ভাষায় শতকরা প্রায় ৪৪টি শব্দ তৎসম শ্রেণির।

সাধিত শব্দ প্রকৃতি ও প্রত্যয়যোগে গঠিত হতে পারে, আবার সমাসের সাহায্যেও গঠিত হয়। এই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিবেচনা করে সাধিত শব্দকে দু ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন :

১. প্রত্যয়-নিষ্পন্ন শব্দ : যেসব শব্দ ভেঙে দুটি অংশ পাওয়া যায়- একটি অংশ ধাতু বা নাম শব্দ এবং অপর অংশটি প্রত্যয়- তাকে প্রত্যয় নিষ্পন্ন শব্দ বলে। যেমন: ঢাকা + আই ঢাকাই, পড়ু + উয়া – পড়ুয়া ইত্যাদি।

২. সমাসবদ্ধ শব্দ : সমাসের সাহায্যে যেসব শব্দ গঠিত হয় সেগুলোকে সমাসবদ্ধ শব্দ বলে। এধরনের শব্দ বিশ্লেষণ করলে তার মধ্যে একাধিক মৌলিক বা সাধিত শব্দ পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই বা তার বেশি মৌলিক বা সাধিত শব্দযোগে এসব শব্দ গঠিত হয়। যেমন : সিংহ চিহ্নিত আসন। সিংহাসন- এখানে ‘সিংহ’ এবং ‘আসন’ এই শব্দ দুটো একত্র মিলে সিংহাসন শব্দটি গঠিত হয়েছে। এভাবে গায়েহলুদ, দম্পতি, চাঁদমুখ ইত্যাদি হল সমাসবদ্ধ শব্দ।

 বিদেশি শব্দ : উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা জেনেছি যে, বিদেশি শব্দগুলো এসেছে বিভিন্ন বিদেশি ভাষা থেকে। নিচে কতকগুলো বিদেশি শব্দের উদাহরণ দেওয়া হল :

 

শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা

 

ফারসি শব্দ

বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দ প্রবেশের কারণ বাংলাদেশে মুসলমান শাসন। তেরো শতক থেকে আঠারো শতকের শেষভাগ পর্যন্ত মুসলমানেরা শাসন করে বাংলাদেশ। তাদের ধর্মীয় ভাষা আরবি, রাজভাষা ফারসি এবং ঘরোয়া ভাষা তুর্কি। ভাই এ তিন জাতের শব্দ ফারসি পরিচয়ে বাংলা ভাষায় বিদ্যমান। ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, প্রায় ২৫০০ ফারসি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকের প্রথমে তুর্কি বিজয়ের পর থেকে ফারসি শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হতে থাকে। যোগো শতক থেকে বাড়তে থাকে বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দের প্রতাপ। আঠারো শতকে তা চরমরূপ লাভ করে।

ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘কলিকাতা কমলালয় (১২৩০) গ্রন্থে খুব দুঃখ করেছিলেন বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দের আধিপত্যে। তিনি একটি তালিকা করে দেখিয়েছিলেন যে ফারসি ও আরবি) শব্দ কীভাবে সরিয়ে দিয়েছে তৎসম ও তদ্ভব বাংলা শব্দকে। তাঁর তালিকায় দেখা যায় “কল”, “কলম”, “কম”, “খরচ’, ‘খারাব”, “খুব”-এর মতো বহু শব্দ (এগুলোর বাংলা “যন্ত্র’, ‘লেখনী’, ‘অল্প’ ‘ব্যয়’, ‘মন্দ’, ‘উত্তম”) অধিকার করেছে বাংলা শব্দের স্থান।

‘কিনারা’, ‘গ্রেফতার’, ‘দেয়াল’, ‘আয়না’, এসেছে ফারসি থেকে। “কিনারা ফারসিতে ছিল কিনারাহ”, “গ্রেফতার’ কারসিতে ছিল ‘গিরিফতার’, ‘দেয়াল’ ফারসিতে ছিল ‘দিওয়াল” – “আয়না’ ফারসিতে ছিল আইনাহ্’। এরকম আরও অনেক শব্দ একটু রূপ বদলিয়ে বাংলা হয়ে গেছে।

ফারসি শব্দের উদাহরণ : আইন, আওয়াজ, আঙ্গুর, আচার, আজাদ, আতশবাজি, আন্দাজ, আফগান, আফসোস, আমেজ, আয়না, আরাম, আশকারা, আশমান, আস্তানা, আস্তে, ইয়ারকি, ইরানি, ওস্তাদ, কম, কামান, কারখানা, কারচুপি, কারবার, কারিগর, কুস্তি, কিনারা, কোমর, খরগোশ, খরিদ, খসখস, খানদানি, খাম, খুন, খুশি, খোরাক, খোশ, খোশামোদ, গরম, গর্নান, গোয়েন্দা, গোরস্থান, গোলাপ, চশমা, চাকর, চাদর, চাঁদা, জাল, জমি, জমা, জায়গা, তরমুজ, ভাজা, ভির দরকার, দরখাস্ত, দরজা, দরবার, দরুন, দোকান, নমুনা, নাম, নাগিশ, নাশতা, পছল, পর্দা, পলক, পশম, পাইকারি, পেশা, পোশাক, ফরমান, বনাম, বালিশ, বন্দ, বন্দর, বন্দি,, বস্তা, বাগান, বাচ্চা, বাজার, বাদশাহি, বাসিন্দা, মজুর, ময়দা, মোরগ, রসিদ, রোজগার, শাবাশ, শিকার, শিরোনাম শুমারি, সওদা, সবুজ, সরকার, সরাসরি, সেরা, হাঙ্গামা, হাজার ইত্যাদি।

আরবি থেকে আগত শব্দ : ‘কবুল’, ‘কলম’, ‘জৌলুস’, ‘তুফান’, ‘মরসিয়া’ শব্দগুলো এসেছে আরবি থেকে। বাংলায় এদের উচ্চারণ বদলে গেছে। বাংলা অক্ষরে শব্দগুলোর মূল আরবি রূপ দেখানো একটু কঠিন। ‘কবুল’ এসেছে আরবি ‘কুল’ থেকে। ‘কলম’ এসেছে আরবি ‘কলম’ থেকে। ‘জৌলুশ এসেছে আরবি ‘জুলুস’ থেকে। ‘তুফান’ এসেছে আরবি ‘ভূ ‘ফান’ থেকে। ‘মরসিয়া’ শব্দটি আরবি থেকে ফারসি হয়ে বাংলায় এসেছে। আরবিতে শব্দটি ছিল ‘মরসিয়ঃ”, ফারসিতে ও বাংলার ‘মরসিয়া’। ‘কলম’ শব্দটি মূলে ছিল গ্রিক। তখন তার রূপ ছিল ‘কসমোস’। আরবিতে। হয় ‘কলম’। ‘টুকুন’ আসলে চীনা শব্দ। চীনা “তাইফা জাপানিতে হয় “তাইফুন’। আরবিতে হয় ‘ফান’ ফারসিতে। হয় ‘তুফান’, বাংলায় ‘তুফান’।

আরবি শব্দের উদাহরণ : অজুহাত, আরেল, আজব, আতর, আদব-কায়দা, আদালত, আমল, আমানত, আলবত আলাদা, আসল, আসামি, ইজ্জত, ইমারত, ইশতেহার, ইশারা, ইসলাম, উকিল, উজির, এজাহার, এলাকা, ওজন, ওয়ারিশ, কবর, কেবলা, কবুল, কামাল, কায়দা, কিস্তি, কুসরত, কেতাব, কৈফিয়ত, খবর, খাজনা, খারাপ, গজল, গরিব, ছবি, জবাব, জমজমাট, জরিপ, জেহাদ, তওবা, তকদির, তলব, তাগিদ, তামাম, তারিখ, তালিকা, দলিল, পাখি, নগদ, নজর, নবাব, কর্ণ, ফায়দা, ফাকা, বাকি, বাদ, মজবুত, মজলিশ, মানা, মাফ, মামলা, মাল, মালিক, মেজাজ, মেরামত, মেহনত, রদবদল রায়ত, রিপু, লায়েক, লেপ, লোকসান, শরবত, শহীদ, সিন্দুক, হাজত, হামলা, হারাম, হাল, হুকুম ইত্যাদি।

শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা

 

তুর্কি শব্দ : ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, তুর্কি শব্দ চল্লিশটির বেশি হবে না। “কুলি”, “কোর্মা’, ‘খাতুন’, ‘তোপ’, ‘বেগম’, ‘লাশ’ তুর্কি শব্দ। ‘কুলি’ তুর্কিতে ছিল ‘কুলী’, তখন তার অর্থ ছিল ‘ক্রীতদাস’। ‘কোর্মা’ তুর্কিতে ছিল “কওউমা’। ‘খাতুন’ তুর্কিতে ছিল ‘খতুন’। ‘বেগম’ তুর্কিতে ছিল ‘বেগুন’। ‘লাশ’ তুর্কিতে ছিল ‘লাস”।

পর্তুগিজ শব্দ : বাংলা ভাষায় একশো থেকে একশো দশটির মতো আছে পর্তুগিজ শব্দ। ‘আনারস’, ‘পিস্তল’, ‘সায়া’, ‘কামরা’, ‘বালতি’, বারান্দা, ‘পেঁপে’ পর্তুগিজ শব্দ। ‘আনারস’ পর্তুগিজে ছিল ‘অননস’। ‘পিস্তল’ পর্তুগিজে ‘পিস্টোল’, ‘সারা’ (মেয়েদের পোশাক। পর্তুগিজে ছিল ‘সই”। “কামরা” ছিল ‘কমর’। ‘বালতি’ ছিল ‘বলদে’। ‘বারান্দা’ পর্তুগিজে ছিল ‘ভেরানডা’। ‘পেঁপে’ পর্তুগিজে ছিল ‘পপইজ’। এরকম আরও অনেক পর্তুগিজ শব্দের উদাহরণ আচার, আয়া, আলমারি, আলকাতরা, ইস্পাত, কেরানি, গির্জা, তোয়ালে, নিলাম, পাউরুটি, পাদ্রি, ফিতা, সাবান, ইত্যাদি। ওলন্দাজ শব্দ : ইস্কাপন, টেক্‌কা, তুরুপ, রুইতন, হরতন ইত্যাদি।

ইংরেজি থেকে আগত

অফিস, আর্ট, এজেন্ট, এনামেল, কফি, কমা, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ইউনিয়ন, কোম্পানি, ক্যামেরা, ক্লাব, ক্লাস, গেট, গেঞ্জি, চেক, চেয়ার, টিকিট, টিন, টিফিন, টেবিল, টেলিগ্রাফ, ভজন, ডবল, ডাক্তার, ড্রাম, নবেল, নোট, পকেট, পাউন্ডার, পিয়ন, পুলিশ, পেন্সিল, প্যাকেট, ফটো, ফুটবল, ফোন, ব্যাগ, ম্যানেজার, মাস্টার, লাইব্রেরি,  সিনেমা, সার্জন, স্কুল, স্টেশন, শার্ট, হাইকোর্ট ইত্যাদি।

প্রধানত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আগত অন্যান্য ভাষার শব্দ

অস্ট্রেলিয়া- ক্যাঙ্গারু, ইতানি- ম্যাজেন্টা, জাপানি ক্যারাটে, জুডো, রিকশা, হাসনাহেনা ইত্যাদি। জার্মানি— ফ্যুরার; তিব্বত- লামা, দক্ষিণ আফ্রিকা— জেব্রা; পেরু — কুইনাইন: মালয়- রুশ— বলশেভিক; সিংহল — বেরিবেরি; গ্রিক কেন্দ্র, দাম, মায়ানমার (বর্মা) — ফুঙ্গি, লুঙ্গি, চীনা চা চিনি, লিচু, সাম্পান ইত্যাদি। কাকাতুয়া, কিরিচ,

অন্যান্য ভারতীয় ভাষা থেকে আগত শব্দ

গুজরাটি—- খন্দর, তকলি, হরতাল, তামিল— চেট্টি, পাঞ্জাবি— চাহিদা, শিখ, তরকা, মারাঠি —— বরগি (বগি); সাঁওতালি— বোঙ্গা, হাঁড়িয়া, হিন্দি- ইস্তক, ওয়ালা, কাহিনি, খাট্টা, খানা, চামেলি, চালু, চাহিদা, টহল, পানি, ফালতু, তাগড়া ইত্যাদি।

আরবি-ফারসির মিশ্রণ

ওয়াকিবহাল, ওরফে, কেতাদুরস্ত, খয়রাতি, খয়ের খাঁ, খাতা, জমাদার, তাজমহল, তাঁবেদার, তৈরি, ফেরারি, ফৌজদারি, লেফাফাদুরস্ত, শরবর্তি, হারামজাদা ইত্যাদি।

ফারসি আরবির মিশ্রণ

আবহাওয়া, আজগুবি, কুচকাওয়াজ, খুন-খারাপ, খুবসুরত খোদাতালা, খোশমেজাজ, গরম মশলা, জরদখল, না- দাবি, দস্তখত, দহরম-মহরম, নিমকহারাম, নেক নজর, পছন্দসই, বজ্জাত ইত্যাদি।

তুর্কি-ফারসির মিশ্রণ : চুগলিখোর, তুরকি, মোগলাই ইত্যাদি।

আরবি-তুর্কির মিশ্রণ : খাজাঞ্চি।

আরবি-চীনার মিশ্রণ : কাবাব- চিনি।

 

শব্দের শ্রেণিবিভাগ | ভাষা ও শিক্ষা

 

আরও দেখুন :

মন্তব্য করুন