শব্দালঙ্কার ছন্দ ও অলঙ্কার

সাহিত্যের দেহ নির্মিত হয় শব্দ দিয়ে। এই শব্দের প্রধানত দুটি রূপ—একটি তার অন্তরের অর্থ, অন্যটি তার বাইরের ধ্বনি। কাব্যের চরণে যখন শব্দের অর্থ অপেক্ষা ধ্বনির ঝংকার, উচ্চারণ-মাধুর্য এবং শ্রুতিসুখকর বিন্যাস প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তাকে বলা হয় শব্দালঙ্কার। শব্দালঙ্কার মূলত কানকে তৃপ্তি দেয় এবং হৃদয়ে একপ্রকার অনুরণন সৃষ্টি করে।

শব্দালঙ্কার ছন্দ ও অলঙ্কার

১. শব্দালঙ্কার: সংজ্ঞা ও স্বরূপ

অর্থবহ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে বলা হয় ‘শব্দ’। যে অলঙ্কার ধ্বনির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং যা শ্রুতিসৌকর্য বিধায়ক, তাকেই বলা হয় শব্দালঙ্কার। এই অলঙ্কারটি একান্তভাবেই শব্দের ধ্বনিসুষমার ওপর নির্ভরশীল। শব্দালঙ্কারের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে শব্দের সামান্য পরিবর্তন বা প্রতিশব্দ ব্যবহার করলে অলঙ্কারটি পুরোপুরি বিনষ্ট হয়।

উদাহরণ বিশ্লেষণ:

‘বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী’ — এই বাক্যে ‘বাঘের’ এবং ‘মাঘের’ শব্দের ধ্বনিগত মিল এবং ‘ব’ ও ‘ম’ ধ্বনির বিশেষ বিন্যাস একটি শ্রুতিসুখকর ঝংকার তৈরি করেছে। এখানে যদি ‘বাঘের’ শব্দের বদলে সমার্থক শব্দ ‘ব্যাঘ্রের’ বলা হয়, তবে চরণের অর্থ ঠিক থাকলেও শব্দালঙ্কারের সেই বিশেষ মাধুর্য আর থাকে না। এই সূক্ষ্ম ধ্বনি-নির্ভরতাই শব্দালঙ্কারের পরিচয়।

২. শব্দালঙ্কারের প্রধান শ্রেণিবিভাগ

শব্দের বহিরঙ্গের সৌন্দর্য অনুযায়ী শব্দালঙ্কারকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়:

১. অনুপ্রাস

২. যমক

৩. শ্লেষ

৪. বক্রোক্তি

৩. অনুপ্রাস (Alliteration): ধ্বনির নিরন্তর বিন্যাস

একই বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ যখন চরণের মধ্যে বারবার বিন্যস্ত হয়ে একটি ধ্বনি-তরঙ্গ সৃষ্টি করে, তখন তাকে অনুপ্রাস অলঙ্কার বলে। অনুপ্রাসের সার্থকতা এর পুনরাবৃত্তির ছন্দে।

উদাহরণ:

“ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে

জল সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ রভসে

ঘন গৌরবে নব যৌবনা বরষা।”

এখানে ‘র’, ‘ভ’, ‘স’ এবং ‘গ’ ধ্বনির বারবার ব্যবহারে বর্ষার গম্ভীর ও আনন্দময় রূপটি ধ্বনিগতভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

অনুপ্রাসের প্রকারভেদ:

  • সরল অনুপ্রাস: একটি বা দুটি বর্ণ একাধিকবার ধ্বনিত হলে।

    উদা: “কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল।” (এখানে ‘ক’ ও ‘ল’ ধ্বনির সহজ পুনরাবৃত্তি)।

  • গুচ্ছানুপ্রাস: ব্যঞ্জনবর্ণের গুচ্ছ বা একাধিক ব্যঞ্জনবর্ণ একই ক্রমে অনেকবার ধ্বনিত হলে।

    উদা: “না মানে শাসন ব্যসন অশন আসন যত।” (এখানে ‘সন’ ব্যঞ্জনগুচ্ছের আবৃত্তি)।

  • অন্ত্যানুপ্রাস: কবিতার এক চরণের শেষের ধ্বনির সাথে অন্য চরণের শেষের ধ্বনির মিল। একে সাধারণ ভাষায় ‘মিল’ বা ‘Rhyme’ বলা হয়।

    উদা: “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, / সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি।”

  • ছেকানুপ্রাস: ‘ছেক’ শব্দের অর্থ পণ্ডিত বা বিদগ্ধ। দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি ক্রমানুসারে ঠিক দুবার আবৃত্ত হলে তাকে ছেকানুপ্রাস বলে।

    উদা: “ওরে বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর।”

  • বৃত্ত্যনুপ্রাস: একটি ব্যঞ্জনধ্বনি বহুবার ধ্বনিত হলে কিংবা বর্ণগুচ্ছ যথার্থ ক্রমানুসারে বহুবার ধ্বনিত হলে তাকে বৃত্ত্যনুপ্রাস বলে।

    উদা: “কেতকী কেশরে কেশপাশ করো সুরভি।”

  • মালানুপ্রাস: যখন অনুপ্রাসের মালা গাঁথা হয়, অর্থাৎ চরণে একের পর এক অনুপ্রাস সাজানো থাকে।

    উদা: “আজন্ম সাধন-বন সাধন-ধন সুন্দরী আমার / কবিতা কল্পনালতা।”

৪. যমক (Pun on Words): শব্দের যুগ্ম রূপ

একই শব্দ একই স্বরধ্বনি সমেত একই ক্রমানুসারে যখন ভিন্ন ভিন্ন অর্থে একাধিকবার ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে যমক অলঙ্কার বলে। যমক মানে ‘যুগ্ম’ বা জোড়া। এখানে শব্দটির উচ্চারণ এক হলেও অর্থ হয় সম্পূর্ণ আলাদা।

উদাহরণ বিশ্লেষণ:

১. “মাটির ভয়ে রাজ্য হবে মাটি / দিবস রাতি রহিলে আমি বন্ধ।”

এখানে প্রথম ‘মাটি’ অর্থ মৃত্তিকা বা ধুলো, আর দ্বিতীয় ‘মাটি’ অর্থ নষ্ট বা পণ্ড হওয়া।

২. “ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে।”

এখানে প্রথম ‘ভারত’ হলেন কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এবং দ্বিতীয় ‘ভারত’ হলো সামগ্রিক ভারতবর্ষ।

৫. শ্লেষ (Equivoke): এক শব্দে বহু অর্থ

একটি শব্দ চরণে মাত্র একবার ব্যবহৃত হয়ে যখন একাধিক অর্থ প্রকাশ করে, তখন তাকে শ্লেষ অলঙ্কার বলে। এটি বুদ্ধিবৃত্তিক চমৎকারিত্বের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

উদাহরণ বিশ্লেষণ:

“কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত ব্যাপ্ত চরাচর, / যাহার প্রভায় প্রভা পায় প্রভাকর।”

এখানে ‘ঈশ্বর গুপ্ত’ শব্দটির দুটি অর্থ:

১. স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর (যিনি চরাচরে ব্যাপ্ত)।

২. বিখ্যাত কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (যাঁর প্রতিভায় ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা উজ্জ্বল হয়েছিল)।

একইভাবে ‘প্রভাকর’ শব্দের অর্থ একদিকে ‘সূর্য’, অন্যদিকে ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা।

৬. বক্রোক্তি (Oblique Speech): বাঁকা পথের উক্তি

সোজাসুজি কোনো কথা না বলে যখন বিশেষ ভঙ্গিমায় বা বাঁকা ভাবে কোনো বক্তব্য পেশ করা হয়, তখন তাকে বক্রোক্তি বলে। এর মূল ভিত্তি হলো বক্তার বলার ধরন এবং শ্রোতার শোনার ভঙ্গি।

বক্রোক্তির প্রকারভেদ:

  • শ্লেষ বক্রোক্তি: বক্তা যে অর্থে কথাটি বলেন, শ্রোতা যদি শ্লেষের আশ্রয় নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য অর্থে তা গ্রহণ করেন।

    উদা: সভাকবি বললেন— “মহারাজ অর্থের টানাটানি বড় নটরাজ।” (এখানে অর্থ = তাৎপর্য)। কিন্তু মহারাজ উত্তর দিলেন অন্য অর্থে (টাকাকড়ি)।

  • কাকু বক্রোক্তি: কণ্ঠস্বরের বিশেষ ভঙ্গির (কাকু) কারণে যখন নেতিবাচক বাক্য ইতিবাচক অর্থ এবং ইতিবাচক বাক্য নেতিবাচক অর্থ প্রকাশ করে।

    উদা: “আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে?”

    এখানে বাক্যটি প্রশ্নবোধক হলেও এর প্রকৃত অর্থ হলো— “আমি ভিখারী রাঘবকে বিন্দুমাত্র ভয় পাই না।” অর্থাৎ কণ্ঠস্বরের জেরে ‘না’ সূচক অর্থ ‘হ্যাঁ’ সূচক বাক্যে প্রকাশিত হয়েছে।

শব্দালঙ্কার কাব্যের বহিরাবরণকে করে তোলে উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয়। এটি পাঠের গতি বাড়ায় এবং কানে সঙ্গীতময়তা সৃষ্টি করে। অনুপ্রাসের ঝংকার, যমকের দ্ব্যর্থবোধকতা এবং শ্লেষের বুদ্ধিবৃত্তি—সব মিলিয়ে শব্দালঙ্কার কবিদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, অলঙ্কারের যান্ত্রিক প্রয়োগ যেন কাব্যের মূল রসকে ছাপিয়ে না যায়; রসের সাথে অলঙ্কারের সামঞ্জস্যই হলো সার্থক সাহিত্যের মূল মন্ত্র।

তথ্যসূত্র:

১. অলঙ্কার চন্দ্রিকা — শ্যামাপদ চক্রবর্তী।

২. কাব্যালোেক — সুধীরকুমার দাশগুপ্ত।

৩. ভাষা ও শিক্ষা সিরিজ — ছন্দ ও অলঙ্কার বিভাগ।

৪. বাংলা অলঙ্কার শাস্ত্র — প্রবোধচন্দ্র সেন।

আরও দেখুন:

Leave a Comment