অর্থালঙ্কার ছন্দ ও অলঙ্কার

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো নিজেকে এবং নিজের সৃষ্টিকে সুন্দর করে সাজানো। নারী যেমন গহনা দিয়ে নিজেকে সাজায়, কবি বা সাহিত্যিক তেমনি শব্দ ও অর্থের কারুকাজ দিয়ে তাঁর সৃষ্টিকে অলঙ্কৃত করেন। অলঙ্কার শাস্ত্রে এই সাজসজ্জার দুটি প্রধান দিক রয়েছে— শব্দালঙ্কারঅর্থালঙ্কার

শব্দালঙ্কার কেবল শ্রুতিমাধুর্য সৃষ্টি করে, কিন্তু কাব্যের প্রকৃত গভীরতা, ব্যঞ্জনা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সৌন্দর্য বিকশিত হয় অর্থালঙ্কারের মাধ্যমে। শব্দালঙ্কারের আবেদন যেখানে প্রধানত কানের কাছে, অর্থালঙ্কারের আবেদন সেখানে আমাদের মন এবং প্রজ্ঞার কাছে। শব্দের আভিধানিক অর্থ যখন অলৌকিক চমৎকারিত্বে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় অর্থালঙ্কার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দিয়ে হৃদয়ের মর্মস্থলে পৌঁছে দেওয়ার এক শৈল্পিক মাধ্যম হলো এই অলঙ্কার।

১. অর্থালঙ্কার: স্বরূপ ও প্রকৃতি

অর্থালঙ্কার মূলত শব্দের ‘অর্থ’ বা ‘ভাব’ কেন্দ্রিক। এই অলঙ্কারের সার্থকতা কেবল একটি চমৎকার শব্দের ওপর নির্ভর করে না, বরং সেই শব্দটি যে বিশেষ অর্থ বা ব্যঞ্জনা তৈরি করছে তার ওপর নির্ভর করে। অর্থালঙ্কারের ক্ষেত্রে শব্দের প্রতিশব্দ ব্যবহার করলেও অলঙ্কার নষ্ট হয় না (শব্দালঙ্কারের ক্ষেত্রে যা অসম্ভব)।

উদাহরণ: “চাঁদের মতো মুখখানি তার।” এখানে ‘চাঁদ’ শব্দের বদলে ‘শশী’ বা ‘চন্দ্র’ ব্যবহার করলেও অলঙ্কারের মূল আবেদন (মুখের সৌন্দর্য) অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু “বনলতা সেন” এর সেই বিখ্যাত “পাখির নীড়ের মতো চোখ” উপমাটি যদি আমরা “পাখির বাসার মতো চোখ” বলি, তবে তার শৈল্পিক রস ক্ষুণ্ণ হয় না ঠিকই, কিন্তু ভাবগত গাম্ভীর্য অর্থালঙ্কারের মাধ্যমেই রক্ষিত হয়।

২. অর্থালঙ্কারের প্রধান শ্রেণিবিন্যাস

তাত্ত্বিক বিচারে অর্থালঙ্কারকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  1. সাদৃশ্যমূলক: যেখানে দুটি ভিন্নধর্মী বস্তুর মধ্যে গুণ বা ক্রিয়ার মিল দেখানো হয় (যেমন: উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা)।

  2. বিরোধমূলক: যেখানে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধ থাকলেও মূলে গভীর সামঞ্জস্য থাকে (যেমন: বিরোধাভাস)।

  3. শৃঙ্খলামূলক: যেখানে বর্ণনার মধ্যে একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে (যেমন: কারণমালা)।

  4. ন্যায়মূলক: যেখানে কোনো বিশেষ যুক্তি বা ন্যায়ের ভিত্তিতে বর্ণনা দেওয়া হয় (যেমন: অর্থান্তরন্যাস)।

  5. গূঢ়ার্থমূলক: যেখানে মূল ভাবটি সরাসরি না বলে আড়ালে বা ইঙ্গিতে প্রকাশ পায় (যেমন: ব্যাজস্তুতি)।

নিচে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত সাদৃশ্যমূলক অলঙ্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

৩. উপমা (Simile): অলঙ্কারের সম্রাট

অর্থালঙ্কারের জগতে ‘উপমা’ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রাচীন অলঙ্কার। কবি কালিদাসকে বলা হয় ‘উপমার রাজা’। একই বাক্যে দুটি ভিন্ন জাতীয় বস্তুর মধ্যে কোনো সাধারণ ধর্মের ভিত্তিতে সাদৃশ্য কল্পনা করা হলে তাকে উপমা বলে।

উপমার চারটি অপরিহার্য অঙ্গ:

১. উপমেয় (Subject): যাকে তুলনা করা হচ্ছে। (যেমন: মুখ)

২. উপমান (Object): যার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। (যেমন: চাঁদ)

৩. সাধারণ ধর্ম (Common Attribute): যে গুণের কারণে তুলনা। (যেমন: সৌন্দর্য বা উজ্জ্বলতা)

৪. সাদৃশ্যবাচক শব্দ (Link word): মত, সম, হেন, সদৃশ, যথা, পাছে ইত্যাদি।

উপমার শ্রেণিবিভাগ ও বিশ্লেষণ:
  • পূর্ণোপমা: যেখানে চারটি অঙ্গই সশরীরে উপস্থিত থাকে।

    • উদাহরণ: “রাজ্য তব স্বপ্নসম গেছে ছুটে।” (রাজ্য-উপমেয়, স্বপ্ন-উপমান, সম-সাদৃশ্যবাচক শব্দ, ছুটে যাওয়া-সাধারণ ধর্ম)।

  • লুপ্তোপমা: যখন একটি বা দুটি অঙ্গ উহ্য থাকে।

    • উদাহরণ: “পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” এখানে চোখকে পাখির নীড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, কিন্তু কোন গুণের কারণে (শীতলতা নাকি আশ্রয়?) সেই সাধারণ ধর্মটি কবি উহ্য রেখেছেন। এটিই কবির সার্থকতা।

  • মালোপমা: যেখানে একটি উপমেয়ের জন্য একাধিক উপমান আনা হয়।

    • উদাহরণ: “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।” এখানে নায়িকার রূপ বোঝাতে একের পর এক উপমানের মালা গাঁথা হয়েছে।

 

৪. রূপক (Metaphor): অভেদ কল্পনা

উপমেয় ও উপমানের মধ্যে যখন আর কোনো ব্যবধান থাকে না, অর্থাৎ দুজনকে যখন অভেদ কল্পনা করা হয়, তখন তাকে রূপক বলে। উপমায় বলা হয় “মুখটি চাঁদের মতো”, কিন্তু রূপকে বলা হয় “মুখ-চন্দ্র”।

রূপকের বিশেষ বিভাগসমূহ:

  • সাঙ্গ রূপক: যেখানে উপমেয় ও উপমানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যেও অভেদ দেখানো হয়।

    • উদাহরণ: “মানবসাগর” বা “ভবনদী”। এখানে পৃথিবীকে নদী এবং মানুষকে সাগরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে কল্পনা করা হয়েছে।

  • পরম্পরিত রূপক: যেখানে একটি অভেদ কল্পনা অন্য একটি অভেদ কল্পনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

    • উদাহরণ: “মরণের ফুল বড় হয়ে ফোটে জীবনের উদ্যানে।” এখানে জীবনকে উদ্যান কল্পনা করা হয়েছে বলেই মৃত্যুকে ফুল হিসেবে কল্পনা করা সম্ভব হয়েছে।

 

৫. উৎপ্রেক্ষা (Utpreksha): সংশয় ও সম্ভাবনা

যখন উপমেয়কে উপমান বলে মনে হয় এবং মনে একটি প্রবল সংশয় বা সম্ভাবনা জাগে, তখন তাকে উৎপ্রেক্ষা বলে। এতে ‘যেন’, ‘বুঝি’, ‘পাছে’, ‘মনে হয়’—এই জাতীয় শব্দ বেশি থাকে।

  • উদাহরণ: “হীরা মুক্তা মাণিক্যের ঘটা / যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল।”

    • বিশ্লেষণ: এখানে ধন-রত্নের চাকচিক্য দেখে কবির মনে হচ্ছে যেন এটি আকাশের রামধনু বা ইন্দ্রজাল। এটি নিশ্চিত সত্য নয়, বরং কবির হৃদয়ের একটি জোরালো অনুমান।

৬. অতিশয়োক্তি (Hyperbole): বর্ণনার চরম সীমা

যখন কোনো কিছু বর্ণনা করতে গিয়ে কবি উপমেয়কে সম্পূর্ণ আড়ালে রেখে কেবল উপমানকেই উপমেয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, তখন তাকে অতিশয়োক্তি বলে। অর্থাৎ এখানে বাস্তব অপেক্ষা কল্পনা অনেক বেশি বড় হয়ে ওঠে।

  • উদাহরণ: “আমি নইলে মিথ্যা হতো সন্ধ্যাতারা ওঠা, / মিথ্যা হতো কাননে ফুল ফোটা।”

    • বিশ্লেষণ: এখানে কবি নিজের অস্তিত্বকে এতটাই মহিমান্বিত করেছেন যে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকেও তাঁর ওপর নির্ভরশীল বলে দাবি করছেন। এটি অলঙ্কারের একটি চমৎকার অতিরঞ্জন।

৭. সমাসোক্তি (Personification): জড়ের ওপর চেতনার আরোপ

এটি আধুনিক কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার। যখন কোনো জড় বস্তু বা অচেতন পদার্থের ওপর মানুষের ন্যায় চেতনা বা আবেগ আরোপ করা হয়, তখন তাকে সমাসোক্তি বলে।

  • উদাহরণ: “শুনিতেছি আজো আমি প্রাতে উঠিয়াই / আয় আয় কাঁদিতেছে তেমনি সানাই।”

    • বিশ্লেষণ: সানাই একটি জড় যন্ত্র, তার কাঁদার ক্ষমতা নেই। কিন্তু কবির বিরহী মন সানাইয়ের সুরের মধ্যে মানুষের কান্নার সুর খুঁজে পাচ্ছেন। এটিই সমাসোক্তির সার্থকতা।

 

৮. ব্যতিরেক: উপমেয়ের শ্রেষ্ঠত্ব

সাধারণত উপমানকে উপমেয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ধরা হয়। কিন্তু যদি কোনো বর্ণনায় উপমান অপেক্ষা উপমেয়কে অধিক শ্রেষ্ঠ বা নিকৃষ্ট দেখানো হয়, তবে তাকে ব্যতিরেক বলে।

  • উদাহরণ: “কি ছার ইহার হে দানবপতি মর্ত্য, স্বহস্তে গড়িলে তুমি তুষিতে কৌরবে।”

    • বিশ্লেষণ: এখানে স্বর্গের বা মহ মহিমার চেয়ে মর্ত্যের তৈরি একটি সাধারণ সভাকে বেশি মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে।

৯. অন্যান্য বিশেষ অর্থালঙ্কার

ক. অপহ্নুতি:

উপমেয়কে অস্বীকার করে উপমানকে স্থাপন করা।

  • উদাহরণ: “নারী নহ, কাব্য তুমি।” এখানে নারীকে সরাসরি অস্বীকার করে তাকে কাব্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

খ. ভ্রান্তিমান:

সাদৃশ্যের কারণে ভুল করে একটি বস্তুকে অন্য বস্তু মনে করা।

  • উদাহরণ: “তোমার সুখে গুনগুনিয়ে ভ্রমর এলো, / কমল বলে ভুল করে সে স্পর্শ ছড়ালো।” এখানে ভ্রমর সুন্দরীর মুখকে পদ্মফুল ভেবে ভুল করে বসছে।

গ. নিশ্চয়:

উপমানকে নিষিদ্ধ করে উপমেয়কে প্রতিষ্ঠা করা।

  • উদাহরণ: “এ নহে মুখর বনমর্মর… এ যে অজাগর গরজে সাগর।” বনমর্মর নয়, এটি সাগরের গর্জন—এমন নিশ্চয়তা দান করা হচ্ছে।

১০. কাব্যে অর্থালঙ্কারের প্রভাব ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন

অর্থালঙ্কার কেবল ভাষাকে সুন্দর করে না, এটি কবির দর্শনের গভীরতা প্রকাশ করে। উপমা ও রূপকের মাধ্যমেই একজন কবি পৃথিবীকে নতুন নজরে দেখতে শেখান। জীবনানন্দের কবিতায় যখন আমরা ‘বিদিশার নিশা’র মতো উপমা দেখি, তখন আমরা কেবল অন্ধকারের কথা ভাবি না, বরং একটি সুদূর অতীত ও রোমান্টিকতার আস্বাদ পাই।

অর্থালঙ্কার ছন্দ ও অলঙ্কার

পরিশেষে বলা যায়, অর্থালঙ্কার হলো কাব্যের সেই কারুকাজ যা সাধারণ গদ্যকে অমর পদ্যে রূপান্তরিত করে। এটি শব্দের আভিধানিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে তাকে এক অনির্বচনীয় ও অতীন্দ্রিয় জগতে নিয়ে যায়। উপমা, রূপক, সমাসোক্তি আর উৎপ্রেক্ষার জটিল বুননেই রচিত হয় বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সব সৃষ্টি। অলঙ্কারহীন কাব্য যেমন লাবণ্যহীন, অর্থালঙ্কারহীন বর্ণনা তেমনি প্রাণহীন। তাই সার্থক সাহিত্য নির্মাণের জন্য অর্থালঙ্কারের প্রয়োগ ও অনুধাবন অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র ও সহায়িকা:

১. অলঙ্কার চন্দ্রিকা — শ্যামাপদ চক্রবর্তী।

২. কাব্যালোেক — সুধীরকুমার দাশগুপ্ত।

৩. ভাষা ও শিক্ষা সিরিজ — ছন্দ ও অলঙ্কার বিভাগ।

৪. বাংলা অলঙ্কার শাস্ত্র — প্রবোধচন্দ্র সেনের তত্ত্বীয় আলোচনা।

আরও দেখুন:

Leave a Comment