পঞ্চাশের দশকের আধুনিক বাংলা কবিতার রূপকার, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর ‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম নিবিড় সৃষ্টি ‘শ্রাবণরাত’। বর্ষণক্লান্ত এক নিস্তব্ধ মধ্যরাতে যখন প্রকৃতির কোলাহল থেমে যায়, তখন কবির একাকী চেতনা জেগে ওঠে এক ভিন্ন জগতে। এই কবিতাটি কেবল বর্ষার বর্ণনা নয়, বরং এটি জীবনের ক্লান্তি, মৃত্যুচেতনা এবং স্মৃতির ধূসর জগত থেকে ফিরে আসা কিছু ছায়ার এক অদ্ভুত আখ্যান।
শ্রাবণের গভীর অন্ধকারের মাঝে কবি শুনতে পান দূর বঙ্গোপসাগরের গর্জন। বর্ষণ থেমে যাওয়ার পর যে থমথমে নিস্তব্ধতা মাটির ওপর বিছিয়ে থাকে, কবি তাকে অনুভব করেন এক বিশাল ‘কালো আকাশ’ হিসেবে, যা মাটির তরঙ্গকে আগলে বসে আছে। কবিতার গভীরে এক অপার্থিব বাতাবরণ তৈরি হয় যখন কবি অনুভব করেন—দূর আকাশরেখার সীমানায় কে যেন বিশাল কপাট খুলছে আবার বন্ধ করছে।
এখানে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের বিপরীতে জেগে ওঠে অতীতের ধূসর হাসি, বিষণ্ণ গল্প আর হারিয়ে যাওয়া প্রেম। পৃথিবীর কঠিন ‘পাথুরে কঙ্কাল’ থেকে বিচ্যুত হয়ে সেই সব ছায়া-স্মৃতিরা কবিকে খুঁজে বের করে। অন্ধকারের দুই স্তরের ভেতর দিয়ে কবি যখন প্রবেশ করেন এক রহস্যময় ধূসর মেঘের মতো সত্তায়, তখন প্রকৃতি আর মানব-হৃদয় একাকার হয়ে যায় এক গভীর নৈঃশব্দ্যে।
শ্রাবণরাত কবিতা – জীবনানন্দ দাশ | মহাপৃথিবী কাব্যগ্রন্থ (১৯৪৪)
শ্রাবণের গভীর অন্ধকার রাতে
ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙে যায়
কোথায় দূরে বঙ্গোপসাগরের শব্দ শুনে?
বর্ষণ অনেকক্ষণ হয় থেমে গেছে;
যত দূর চোখ যায় কালো আকাশ
মাটির শেষ তরঙ্গকে কোলে ক’রে চুপ ক’রে রয়েছে যেন;
নিস্তব্ধ হ’ইয়ে দূর উপসাগরের ধ্বনি শুনছে।
মনে হয়
কারা যেন বড়ো-বড়ো কপাট খুলছে,
বন্দ ক’রে ফেলেছে আবার;
কোন্ দূর- নীরব- আকাশরেখার সীমানায়।
বালিশের মাথা রেখে যারা ঘুমিয়ে আছে
তারা ঘুমিয়ে থাকে;
কাল ভোরে জাগাবার জন্য।
যে-সব ধূসর হাসি, গল্প, প্রেম, মধুরেখা
পৃথিবীর পাথরে কঙ্কালে অন্ধকারে মিশেছিলো
ধীরে-ধীরে জেগে ওঠে তারা;
পৃথিবীর অবিচলিত পঞ্জর থেকে খশিয়ে আমাকে খুঁজে বা’র ক’রে।
সমস্ত বঙ্গোপসাগরের উচ্ছ্বাস থেমে যায় যেন;
মাইলের পর মাইল মৃত্তিকা নীরব হ’য়ে থাকে।
কে যেন বলেঃ
আমি যদি সেই সব কপাট স্পর্শ করতে পারতাম
তাহ’লে এই রকম গভীর নিস্তব্ধ রাতে স্পর্শ করতাম গিয়ে।–
আমার কাঁধের উপর ঝাপসা হাত রেখে ধীরে-ধীরে আমাকে জাগিয়ে দিয়ে।
চোখ তুলে আমি
দুই স্তর অন্ধকারের ভিতর ধূসর মেঘের মতো প্রবেশ করলামঃ
সেই মুখের ভিতরে প্রবেশ করলাম।
আরও দেখুন: