বাচ্য ও বাচ্য পরিবর্তন — আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি আমাদের “ভাষা ও শিক্ষা” বিষয়ের “বাক্যতত্ত্ব” বিভাগের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে আমরা জানব বাচ্যের প্রকৃতি, তার বিভিন্ন ধরন, এবং বাচ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে বাক্যের গঠন ও ভাবের রূপান্তর।
Table of Contents
বাচ্য কী?
বাক্যের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশভঙ্গিকে বলা হয় বাচ্য। বাচ্য নির্দেশ করে বাক্যে কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কে কাজটি করছে, কার ওপর কাজটি হচ্ছে— তা বোঝায়।
যেমন:
সুমি এদের দেখতে পাবে না।
এখানে কর্তা = সুমি, কর্ম = এদের, এবং ক্রিয়া = দেখতে পাবে না।
বাক্যের তিনটি উপাদান — কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া — পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রেখে বাক্যের কাঠামো নির্মাণ করে।
একই বক্তব্য ভিন্নভাবে প্রকাশ করা যায় —
ক. সুমি এদের দেখতে পাবে না।
খ. সুমি কর্তৃক এরা দৃষ্ট হবে না।
দুইটি বাক্যের অর্থ একই, কিন্তু বাচনভঙ্গি ভিন্ন। প্রথম বাক্যে ‘সুমি’ কর্তার সঙ্গে ক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এটি কর্তৃবাচ্য। দ্বিতীয় বাক্যে ‘কর্তৃক’ যোগে কর্তা অনুক্ত হয়ে গেছে এবং কর্ম ‘এরা’ ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত — এটি কর্মবাচ্য।
বাক্য কর্মহীনও হতে পারে, যেমন —
ক. সুমিতা নাচল।
খ. সুমিতার নাচা হল।
প্রথম বাক্যে কর্তা সক্রিয় — “সুমিতা” নিজেই কাজটি করছে।
দ্বিতীয় বাক্যে কর্তার প্রাধান্য হারিয়েছে, কাজের ঘটনাটি প্রধান — এটি ভাববাচ্য।
সুতরাং, বাচ্যের মাধ্যমে বোঝা যায় বাক্যে কার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে — কর্তা, কর্ম, না ক্রিয়া। বাচনভঙ্গির পরিবর্তনে বাক্যের রূপ বদলায়, কিন্তু অর্থ অপরিবর্তিত থাকে।
বাচ্যের প্রকারভেদ
বাক্যের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশভঙ্গিকে বলে বাচ্য। যেমন সুমি এদের দেখতে পাবে না। যায়, পাবে না” (যৌগিক) বাক্যটিতে মূল উপাদান তিনটি—কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া (সমাপিকা)। পরস্পরের সম্পর্ক অনুযায়ী এই তিনটি উপাদান বক্তব্যের সংগতি রক্ষা করে বাক্য-কাঠামো গড়েছে। ‘সুমি’ কর্তা, ‘এদের’ কর্ম, ‘দেখতে পাবে না সমাপিকা ক্রিয়া।
বাক্যের মধ্যে যেমন বক্তব্য বিষয় আছে, তেমনি আছে একটি বিশেষ বাচনভঙ্গি। ব্যক্তিভেদে এই বাচনভঙ্গির পরিবর্তন ঘটতে পারে। যেমন— ক. সুমি এদের দেখতে পাবে না। খ. সুমি কর্তৃক এরা দৃষ্ট হবে না। ওপরের দুটো বাক্যের বক্তব্য একই।
কিন্তু বলার ভঙ্গি পৃথক। সেজন্য বাক্যের কাঠামোগত রূপও পৃথক। প্রথম বাক্যে ‘সুমি’ কর্তার সঙ্গে ‘দেখতে পাবে না’ ক্রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে। ‘এদের’ কর্ম। দ্বিতীয় বাক্যে ‘কর্তৃক’ অনুসর্গযোগে ‘সুমি’ হয়েছে অনুক্ত কর্তা। ‘এরা’ কর্ম হয়েও কর্তার মতো। সেজন্য ‘দৃষ্ট হবে না’ ক্রিয়ার সঙ্গে ‘এদের’-এর সরাসরি সম্পর্ক হয়েছে। আবার বাক্য কর্মহীন হতে পারে।
সে-ক্ষেত্রেও ব্যক্তিভেদে বাচনভঙ্গির পরিবর্তন সম্ভব। যেমন- ক. সুমিতা নাচল । খ. সুমিতার নাচা হল । চল’ ক্রিয়া কর্তার অনুসারী। এ দুটি বাক্যের বক্তব্যও এক। কিন্তু বাচনভঙ্গি পৃথক। প্রথম বাক্যে ‘সুমিতা’ কর্তা, ‘নাচল’ কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যে ‘সুমিতা’ ‘সুমিতার’ হওয়ায় কর্তার প্রাধান্য লোপ পেয়েছে এবং ‘নাচা হল’ ক্রিয়া হয়েছে প্রধান। সুতরাং বাচনভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাক্য-কাঠামোর যেমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, তেমনি কখনও কর্তা, 18 কখনও কর্ম, কখনও ক্রিয়া প্রাধান্য পায়। তবে সব ক্ষেত্রেই ক্রিয়ার রূপের পরিবর্তন ঘটে। বাক্যের বাচনভঙ্গি অনুযায়ী কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়াপদের প্রাধান্য নির্দেশ করে ক্রিয়াপদের রূপের যে পরিবর্তন তাকে বলা হয় বাচ্য।
বাংলা ভাষায় বাচ্য প্রধানত তিন প্রকার —
১️. কর্তৃবাচ্য — যেখানে কর্তা কাজটি করে।
যেমন: রাহিম বই পড়ছে।
(রাহিম নিজেই কাজটি করছে।)
২️. কর্মবাচ্য — যেখানে কাজটি কর্তার দ্বারা সম্পন্ন হয় এবং কর্মের ওপর জোর দেওয়া হয়।
যেমন: রাহিম কর্তৃক বইটি পড়া হচ্ছে।
৩️. ভাববাচ্য — যেখানে কর্তা ও কর্ম অনুল্লিখিত থেকে কাজের বা ঘটনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যেমন: বই পড়া হচ্ছে।
কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে পরিবর্তনের নিয়ম
কর্তৃবাচ্য বাক্যকে কর্মবাচ্যে রূপান্তর করার সময় নিচের সূত্রগুলি অনুসরণ করতে হয় —
সূত্রসমূহ:
ক. বাচ্যের পরিবর্তন হলেও অর্থ অপরিবর্তিত থাকে।
খ. শুধুমাত্র সকর্মক ক্রিয়া থাকলেই কর্মবাচ্য গঠন করা যায়।
গ. কর্তা ও কর্মের অবস্থান অদলবদল হয় — কর্তা হয় করণকারক, কর্ম হয় নতুন কর্তা।
ঘ. কর্তার আগে দ্বারা, দিয়া, দিয়ে, কর্তৃক ইত্যাদি অনুসর্গ ব্যবহৃত হয়।
ঙ. ক্রিয়া কর্মের অনুসারী হয় — কর্মের প্রাধান্য থাকে।
চ. ক্রিয়াপদে সাধারণত ‘আ’, ‘আনো’, ‘ত’, ‘ইত’ প্রভৃতি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে “হ” ধাতুজাত ক্রিয়া যোগ হয়।
উদাহরণ:
- তারা খেলা দেখছে → তাদের দ্বারা খেলা দেখা হচ্ছে।
- আমি ভাত খেয়েছি → আমার কর্তৃক ভাত খাওয়া হয়েছে।
- রহিম বই কিনবে → রহিম কর্তৃক বই কেনা হবে।
- পুলিশ চোরটিকে ধরেছে → পুলিশ কর্তৃক চোরটি ধৃত হয়েছে।
- বিভূতিভূষণ পথের পাঁচালী রচনা করেছেন → বিভূতিভূষণ কর্তৃক পথের পাঁচালী রচিত হয়েছে।
কর্মবাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্যে পরিবর্তনের নিয়ম
কর্মবাচ্য বাক্যকে কর্তৃবাচ্যে রূপান্তর করলে বাক্য হয় সংক্ষিপ্ত, প্রাণবন্ত এবং সরল।
সূত্রসমূহ:
ক. অর্থ অপরিবর্তিত থাকে, শুধু বাক্যের কাঠামো বদলে যায়।
খ. কর্মবাচ্যে ব্যবহৃত দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক ইত্যাদি অনুসর্গ বিলুপ্ত হয় এবং কর্তা শূন্য বিভক্তি রূপ নেয়।
গ. ক্রিয়া কর্তার অনুসারী হয়।
ঘ. বাক্য হয় সরাসরি, স্পষ্ট ও কার্যকর।
উদাহরণ:
- নজরুল কর্তৃক অগ্নিবীণা লিখিত হয়েছে → নজরুল অগ্নিবীণা লিখেছেন।
- শিক্ষক কর্তৃক সে প্রহৃত হয়েছে → শিক্ষক তাকে প্রহার করেছেন।
- আমাকে অনেক বই কিনতে হবে → আমি অনেক বই কিনব।
- মহাজনকে সুদ দিতে হয় → মহাজন সুদ নেয়।
- জিনিসটা ঠিকঠাক পাওয়া যাবে? → জিনিসটা ঠিকঠাক পাব?
বাচ্য পরিবর্তনের তাৎপর্য ও প্রয়োগ
বাচ্য পরিবর্তন কেবল একটি ব্যাকরণিক অনুশীলন নয়, এটি ভাষার গঠন ও ভাব প্রকাশের এক শৈল্পিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে লেখক বা বক্তা বাক্যের গঠন, জোর ও মনোভাব পরিবর্তন করতে পারেন অর্থ অপরিবর্তিত রেখে।
বাচ্য পরিবর্তনের গুরুত্ব:
ভাষাকে করে তোলে বহুমাত্রিক ও নমনীয়।
বাক্যের ভাব, গতি ও জোর পরিবর্তন করা যায়।
লেখালেখি, সাংবাদিকতা ও প্রশাসনিক ভাষায় প্রাসঙ্গিক শৈলী বজায় রাখতে সহায়তা করে।
ভাষা শিক্ষার্থীর ব্যাকরণ ও রূপতত্ত্ব বোঝার দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
সাহিত্যিক রচনায় অভিব্যক্তির বৈচিত্র্য আনতে সহায়তা করে।
বাচ্য ও বাচ্য পরিবর্তন বাংলা ব্যাকরণের অন্যতম মৌলিক অধ্যায়, যা ভাষার প্রকাশ, কাঠামো ও ভাবের গভীর সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে। কর্তৃবাচ্য বাক্যে কর্তার সক্রিয়তা, কর্মবাচ্যে কর্মের গুরুত্ব, এবং ভাববাচ্যে ঘটনার সারমর্ম ফুটে ওঠে। সঠিকভাবে বাচ্য পরিবর্তনের অনুশীলন করলে ভাষা হয় স্পষ্ট, সুশৃঙ্খল ও প্রাঞ্জল — আর সেটিই ভাষাশিক্ষার আসল উদ্দেশ্য।