সারাংশ ও সারমর্ম | গদ্য অংশ | Sharangsho Sharmormo Bangla | বিরচন

সারাংশ ও সারমর্ম [ গদ্য অংশ ] Sharangsho Sharmormo Bangla : সার শব্দের অর্থ মূল এবং অংশ শব্দের অর্থ ভাগ। সুতরাং সারাংশ শব্দের অর্থ ভাগ মূল বক্তব্য। কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বা বিবৃতিমূলক বর্ণনা থেকে ব্যাখ্যামূলক কথাগুলো বাদ দিয়ে শুধু সার বা মূল কথাগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করাকে সারাংশ বলে। সারাংশকে সারমর্ম বা সংক্ষিপ্ত সারও বলা হয়ে থাকে:

সারাংশ লেখার নিয়ম :

সারাংশ লেখার সময় নিম্নলিখিত নিয়মগুল্মের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে :

  • উদ্ধৃত অংশটি তিন-চার বার ভালভাবে পড়ে তার মূল কথাটা বুঝতে হবে।
  • উদ্ধৃত অংশের মূল ভাবটুকু অল্প কথায় প্রকাশ করাই সারাংশ লেখার মূল উদ্দেশ্য।
  • সারকথা লেখার সময় মূল অংশের বিশেষণ, উপমা, দৃষ্টান্ত প্রভৃতি বাদ দিতে হবে।
  • লেখার ভিতর একটি বিষয়ের যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
  • মূল বিষয়টার সাথে পরস্পর সম্পর্ক রেখে সহজ-সরল করে নিজের ভাষায় সারাংশ লেখা উচিত।
  • মোটামুটি সারাংশটা মূল অংশের তিন ভাগের একভাগ হওয়া উচিত।
  • পুরো লেখাটাই হবে পরোক্ষ পদ্ধতিতে।
  • সারাংশ লেখার সময় উপরোক্ত নিয়মগুলো লক্ষ করে বিষয়বস্তু ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে লিখলে সারাংশ সহজ, সরল ও সুন্দর হয়।
সারাংশ ও সারমর্ম
সারাংশ ও সারমর্ম

সারাংশের কয়েকটি উদাহরণ [ গদ্য অংশ ]:

১।

বাল্যকাল হতেই আমাদের শিক্ষার সাথে আনন্দ নেই। কেবল যা কিছু নির্ঘাত আবশাক, তাই কণ্ঠস্থ করছি। তেমনি করে কোন মতে কাজ চলে যায়; কিন্তু মনের বিকাশ ঘটে না। হাওয়া গেলে পেট ভরে না, আহার করলে পেট ভরে। কিন্তু আহারটি রীতিমত হজম করবার জন্য হাওয়ার দরকার। তেমনি একটি পাঠ্য পুস্তককে রীতিমত হজম করতে অনেকগুলো অপাঠ্য পুস্তকের সাহায্যের দরকার।

সারাংশ : আমাদের দেশে শিক্ষা গতানুগতিক। আমাদের শিক্ষার সাথে আনন্দের সংযোগ নেই বলে এটি আমাদের মানসিক বিকাশে সহায়ক নয়। পাঠ্য পুস্তকের বিষয়বস্তু আয়ত্ব করার জন্য অপাঠ্য পুস্তকও পড়া দরকার।

২।

সততা শ্রেষ্ঠ পন্থা। সৎ ব্যক্তি সবার শ্রদ্ধেয়। প্রত্যেকে তাকে বিশ্বাস করে। সৎ না হলে জীবনে কেউ উন্নতি করতে পারে না। সং দোকানিকে ক্রেতারা পছন্দ করে। সবাই তার দোকানে যায় এবং জিনিসপত্র কেনে। তাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাঁর প্রশংসা বৃদ্ধি পায় এবং ব্যবসায় উন্নতি হয়।

সারাংশ : সততা শ্রেষ্ঠ পন্থা। সৎ ব্যক্তিকে সবাই বিশ্বাস করে। সং দোকানদারের কাছ থেকে বেশি লোকে জিনিস কিনে। এতে তাঁর ব্যবসায়ের উন্নতি হয়।

৩।

পরার্থে কাজ করতে পারলেই মনুষ্যত্ব অর্জন করা যায়। আপন স্বার্থে কাজ করলে বা ভোগে মত্ত হওয়াতে কোন আনন্দ। নেই। ভোগ মানুষকে ক্লান্ত করে, ক্ষুদ্র গভীতে আবদ্ধ করে। ত্যাগের মধ্য দিয়েই মহিমা লাভ করে তার চিত্র প্রশস্ত হয়, প্রসন্ন হয়, সুন্দর হয়। এই সুন্দর হওয়াই মানুষের সাধনা। এতেই প্রকৃত মনুষ্যত্ব প্রকাশিত হয়। আপন স্বার্থ পরিহার

সারাংশ : মানুষের সাধনা নিজেকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। সুন্দর হতে হলে ভোগ ও করে প্রশস্ত চিত্তের অধিকারী হতে হবে। একমাত্র ত্যাগের মধ্য দিয়েই তা হওয়া সম্ভব।

৪।

ফুল ফুটেছে এটাই ফুলের চরম কথা। যার ভাল লাগলো সে জিতল, ফুলের জিত তার আপন আবির্ভাবেই। সুন্দরের অন্তরে আছে একটি রসময়, রহস্যময়, অতীত সত্য, আমাদের অন্তরের সঙ্গে তার অনির্বচনীয় সম্বন্ধ। তার সম্পর্কে আমাদের আত্মচেতনা হয় মধুর, গভীর ও উজ্জ্বল। আমাদের ভিতরের মানুষ বেড়ে ওঠে, রাঙিয়ে ওঠে, রসিয়ে ওঠে। আমাদের সত্তা যেন তার সঙ্গে সঙ্গে রসে মিলে যায়—একেই বলে অনুরাগী।

সারাংশ : সৌন্দর্যের একটা আপন সত্তা আছে। এই সত্তা পূর্ণরূপে বিকাশের মাধ্যমে তার সফলতা। মানুষের অস্তঃপ্রকৃতিতেও একটি গোপন সৌন্দর্য সত্তা আছে। তাই মানুষ তাতে মুগ্ধ হয়। সত্য ও সুন্দরের প্রতি মানুষের এই একাত্মতার নামই অনুরাগ।

৫।

বিদ্যা মানুষের মূল্যবান সম্পদ, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু চরিত্র তদপেক্ষা ও মূল্যবান। অতএব, কেবল বিদ্বান বলিয়াই কোন লোক সমাদর লাভের যোগা বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না। চরিত্রহীন ব্যক্তি যদি নানা বিদ্যায় আপনার জ্ঞানভাণ্ডারকে পূর্ণ করিয়াও থাকে, তথাপি তাহার সঙ্গ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। প্রবাদ আছে যে, কোন কোন বিষধর সর্পের মস্তকে মণি থাকে। মণি মহামূল্যবান পদার্থ বটে, কিন্তু তাই বলিয়া মণি লাভের নিমিত্তে বিষধর সর্পের কাছে কেহ যায় না। সেরূপ বিদ্বান দুর্জনের নিকট গমন করা বিধেয় নহে।

সারাংশ : চরিত্র বিদ্যার চেয়েও মূল্যবান। মহা বিদ্বান অথচ চরিত্রহীন ব্যক্তিকে কেউ শ্রদ্ধা করে না। সাপের মাথায় মহামূল্যবান মণি থাকে। কিন্তু সে মণি লাভের আশায় কেউ সাপের কাছে যায় না। সেরূপ বিদ্বান ব্যক্তি দুর্জন হলে তার কাছে যাওয়া উচিত নয়।

সারাংশ ও সারমর্ম
সারাংশ ও সারমর্ম

৬।

অভ্যাস ভয়ানক জিনিস। একে হঠাৎ স্বভাব থেকে তুলে ফেলা কঠিন। মানুষ হবার সাধনাতে তোমাকে ধীর ও সহিষ্ণু হতে হবে। সত্যবাদী হতে চাও? তাহলে ঠিক কর, সপ্তাহে একদিন মিথ্যা কথা বলবে না। ছয় মাস ধরে এমনি করে নিজে সত্য কথা বলতে অভ্যাস কর। তারপর এক শুভ দিনে আর একবার প্রতিজ্ঞা কর, সপ্তাহে দুই দিন তুমি মিথ্যা কথা বলবে না।

একবছর পরে দেখবে, সত্য কথা বলা তোমার কাছে অনেক সহজ হয়ে পড়েছে। সাধনা করতে করতে এমন এক দিন আসবে তখন ইচ্ছা করেও মিথ্যা বলতে পারবে না। নিজেকে মানুষ করার চেষ্টায় পাপ ও প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রামে তুমি হঠাৎ জয়ী হতে কখনও ইচ্ছা করো না। তাহলে সব পণ্ড হবে।

সারাংশ : অভ্যাস সহজে গড়ে উঠে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টা ও সহিষ্ণুতা। সত্যবাদী হতে হলে ধীরে ধীরে সত্য কখনের অভ্যাস করতে হবে। দীর্ঘদিন অভ্যাসে সত্য যখন সহজ হয়ে পড়ে তখন ইচ্ছা করেও মিথ্যা বলা যায় না। পাপ ও প্রবৃত্তির সাথে সংগ্রাম করে মানুষ হতে হলেও এরূপ ধীর ও সহিষ্ণু অভ্যাসের প্রয়োজন।

৭।

যে ব্যক্তি শ্রমবিমুখ হইয়া আলস্যে কালক্ষেপ করে, তাহার চিরকাল দুঃখ ও চিরকাল অপ্রতুল। যে ব্যক্তি শ্রম করে সে কখনও কষ্ট পায় না, প্রত্যুত স্বাচ্ছন্দে কাল যাপন করে। ফলত যে যেমন পরিশ্রম করে, তাহার তদ্রূপ সুখ সমৃদ্ধি লাভ হয়। সংসারে যাবতীয় উত্তম বস্তু শ্রমলভ্য; সুতরাং শ্রম ব্যতিরেকে সে সকল বস্তু লাভ করিবার উপায়ান্তর নাই। পরিশ্রম না করিলে স্বাস্থ্য রক্ষা ও সুখলাত হয় না; কিন্তু অতিশয় পরিশ্রম করাও অবিধেয়, যেহেতু তদ্বারা শরীর অত্যন্ত দুর্বল হইয়া যায় ও রোগ জন্মে। প্রতিদিন দশ ঘন্টা পরিশ্রম করিলে স্বাস্থ্য ভঙ্গের সম্ভাবনা নাই।

সারাংশ : পরিশ্রমী ব্যক্তি সুখ ও সমৃদ্ধি লাভ করে। আর শ্রমবিমুখ ব্যক্তি দুঃখে কালাতিপাত করে। পরিশ্রম ব্যতিরেকে উত্তম বস্তু লাভ করা যায় না। পরিশ্রম করলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। তবে প্রতিদিন দশ ঘন্টার বেশি পরিশ্রম করা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।

৮।

যারা স্বয়ং চেষ্টা করেন, আল্লাহ তাঁদের সহায় হন। পৃথিবীতে যারা বড় হয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের জীবনী পাঠ করলে আমরা এ শিক্ষা পেয়ে থাকি। বিদ্যাই হোক, ধনই হোক, স্বয়ং পরিশ্রম না করলে কেউ তা লাভ করতে পারে না। এক রাজপুত্র একবার এক পণ্ডিতকে বলেছিলেন, “মহাশয়, সাধারণ মানুষ পরিশ্রম করে বিদ্যালাভ করে থাকে। আমি তো রাজপুত্র, পরিশ্রমে আমি অভ্যস্ত নই, আমার জন্য বিদ্যার্জনের সহজ উপায় করতে পারেন না”? পণ্ডিত বললেন, “রাজার বিদ্যা শিক্ষার স্বতন্ত্র উপায় নেই।”

অনেক বালক আছে যারা কেবল শিক্ষক মহোদয়ের সাহায্যের আশায় বসে থাকে। অভিধান খুলবার কষ্ট স্বীকার না করে। অর্থ পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করে। এরূপ লোক কখনও জগতে উন্নতি লাভ করতে পারে না।

সারাংশঃ নিজের চেষ্টা ছাড়া কেউ কিছু লাভ করতে পারে না। নিজে চেষ্টা করলে, আল্লাহ্ও তাকে সাহায্য করেন। যারা পরের সাহায্যের আশায় বসে থাকে, তারা জীবনে সফল্য লাভ করতে পারে না।

৯।

গানের সহিত বাজনার মিল না থাকিলে গান-বাজনা শুনিতে ভাল লাগে না। কবিতা আবৃত্তি করিবার সময় ছন্দের তাল রক্ষিত না হইলে আবৃত্তি শ্রুতিমধুর হয় না। তাল বা হল একটি বড় জিনিস, আমরা স্বভাবতঃই চলিতে ফিরিতে, গান বাজনা করিতে, কবিতা পড়িতে তাহা মানিয়া চলি। সিঁড়ির ধাপ যদি এলোমেলো বা অসমান হয় তাহা হইলে চলার গতি ব্যাহত হয়, উপরে আরোহণ করিতে কষ্ট হয়। শুধু চলার নহে, বলারও তাল আছে। প্রতি কাজেই এই তাল যাহাতে ঠিক থাকে, তাহার দিকে লক্ষ রাখা উচিত। তাহাতে জীবন স্বছন্দ হইয়া উঠিবে।

সারাংশ : গান বা আবৃত্তিকে যেমন তাল বা ছন্দ শ্রুতিমধুর করে তোলে, তেমনি মানব জীবনেও তাল বা ছন্দ প্রয়োজন। মানব জীবনের দৈনন্দিন কার্যাবলি একমাত্র সঠিক তালই গতিময় করে তুলতে পারে।

১০।

তুমি জীবনকে সার্থক সুন্দর করিতে চাও? ভাল কথা, কিন্তু সেজন্য তোমাকে প্রাণান্ত পরিশ্রম করিতে হইবে। এইসব তুচ্ছ করিয়া যদি তুমি লক্ষ্যের দিকে ক্রমাগত অগ্রসর হইতে পার, তবে তোমার জীবন সুন্দর হইবে। আরও আছে। তোমার ভিতর এক ‘আমি’ আছে সে বড় দূরন্ত। তাহার স্বভাব পশুর মতো বর্বর ও উচ্ছৃঙ্খল। সে কেবল ভোগ বিলাস চায়। সে বড় লোভী। এই ‘আমি’কে জয় করিতে হইবে। তবেই তোমার জীবন সুন্দর হইয়া উঠিবে।

সারাংশ : পরিশ্রমের ভেতর দিয়েই জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করা যায়। আমিত্বরূপ অহঙ্কার ত্যাগ করতে হবে, ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকতে হবে, স্বভাবে সুন্দর হতে হবে। তবেই জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে।

সারাংশ ও সারমর্ম
সারাংশ ও সারমর্ম

১১।

অপরের জন্য তুমি তোমার প্রাণ দাও, আমি বলতে চাই না। অপরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুঃখ ভূমি দূর কর। অপরকে একটুখানি সুখ দাও। অপরের সঙ্গে একটুখানি মিষ্টি কথা বল। পথের অসহায় মানুষটির দিকে একটা করুণ কটাক্ষ দৃষ্টি নিক্ষেপ কর তাহলেই অনেক হবে। চরিত্রবান মনুষ্যত্ব সম্পন্ন মানুষ নিজের চেয়ে পরের অভাবে বেশি অধীর হন। পরের দুঃখকে ঢেকে রাখতে গৌরববোধ করেন।

সারাংশ : যারা প্রাণ দিয়ে অপরকে ভালবাসতে পারেন, অপরের দুঃখে সহানুভূতিশীল এবং পরোপকারে গৌরববোধ করেন, তারাই চরিত্রবান এবং প্রকৃত মনুষ্যত্ব সম্পন্ন লোক।

১২।

মুখে অনেকেই টাকা অতি তুচ্ছ, অর্থ অনর্থের মূল বলিয়া থাকেন। কিন্তু জগৎ এমনি এক ভয়ানক স্থান যে, টাকা না থাকলে তার স্থান কোথাও নাই। সমাজে নাই, স্বজাতির নিকট নাই, ভ্রাতা-ভগিনীর নিকট নাই, স্ত্রীর নিকট নাই । স্ত্রীর মত ভালবাসে জগতে এরকম কে আর আছে। টাকা না থাকলে এমন অকৃত্রিম ভালবাসারও আশা নাই, কাহারও নিট সম্মান নাই। টাকা না থাকলে রাজায় চিনে না, সাধারণে মানা করে না, বিপদে জ্ঞান থাকে না। জন্মমাত্র টাকা, জীবনে টাকা, জীবনান্তেও টাকা, জগতে টাকারই খেলা।

সারাংশ : টাকাকে অনেকে তুচ্ছ মনে করলেও জগতে টাকার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। টাকা না থাকলে সমাজে কোথাও স্থান পাওয়া যায় না, সম্মান পাওয়া যায় না, এমনকি প্রিয়জনের ভালবাসা পর্যন্ত না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জগতে শুধু টাকারই প্রয়োজন।

১৩।

আমরা স্কুল কলেজে ছেলে পাঠাইয়া ভাবি যে, ছেলেকে শিক্ষা দিবার সমস্ত কর্তব্যই প্রতিপালন করিলাম। বৎসরের পর বৎসর পাস করিয়া গেলেই অভিভাবকেরা ছেলের যথেষ্ট তারিফ করেন। কিন্তু তলাইয়া দেখেন না যে, কেবল পাস করিলেই বিদ্যার্জন হয় না। বাস্তবিক পক্ষে ছাত্রের বা সন্তানের মনে জ্ঞানের অনুরাগ এবং জ্ঞানের প্রতি আনন্দজনক শ্রদ্ধার উদ্রেক হইতেছে কিনা তাহাই দেখিবার জিনিস। জ্ঞান চর্চার মধ্যে যে এক পরম রস ও আত্মপ্রসাদ আছে, তাহার স্বাদ কোন কোন শিক্ষার্থী এক বিন্দুও পায় না। এই রসের স্বাদ গ্রহণেচ্ছা জন্মাইয়া দেওয়াই হইতেছে স্কুল কলেজের শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য।

সারাংশ : স্কুল কলেজ হতে কেবল পাস করে গেলেই প্রকৃত জ্ঞানার্জন হয় না। এতে খুব কম সংখ্যক ছাত্র ছাত্রীর মনেই প্রকৃত জ্ঞান স্পৃহা জন্মে। কাজেই জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ জন্মিয়ে বিদ্যার্থীর মধ্যে জ্ঞান গ্রহণেচ্ছা সৃষ্টি করাই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য।

১৪।

পরীক্ষায় পাস করিবার এইরূপ হাস্যোদ্দীপক উন্মত্ততা পৃথিবীর আর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না। পাস করিয়া সরস্বতীর নিকট চিরবিদায় গ্রহণ, শিক্ষিতের এইরূপ জঘন্য প্রকৃতিও আর কোন দেশে নাই। এ দেশে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করিয়া জ্ঞানী ও গুণী হইয়াছে বলিয়া অহঙ্কারে স্ফীত হই, অপরাপর দেশে সেই সময়ে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কাল আরও হয়। কারণ, সে সকল দেশের লোকের জ্ঞানের প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ আছে। তাহারা একথা উপলব্ধি করিয়াছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার হইতে বাহির হওয়ার পরই জ্ঞান-সমুদ্র মন্থনের প্রশস্ত সময় উপস্থিত হয়। আমরা দ্বারকে গৃহ মনে করিয়াছি। সুতরাং জ্ঞান-মন্দিরের দ্বারেই অবস্থান করি, অভ্যন্তরস্থ রত্নরাজি না দেখিয়াই ক্ষুণ্ন মনে প্রত্যাবর্তন করি।

সারাংশ : শিক্ষা বলতে আমরা কেবল পরীক্ষা পাসই বুঝি। তাই পরীক্ষা পাসের পর শিক্ষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকে না। অথচ অন্যান্য দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরই শুরু হয় আসল শিক্ষা। তারা যেখানে শুরু বলে মনে করে, আমরা সেখানে শেষ ভাবি। তাই আমরা শিক্ষার দ্বার প্রান্তেই থেকে যাই প্রকৃত শিক্ষার স্পর্শ পাই না।

১৫।

মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি। যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাহাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়। আর যে ছেলে তাহার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায় সেই বা কম কি করিল। সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব যাহারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তাহারা অসভ্য রকমে চুরি করে।

সারাংশ : মুখস্থ করে পাস করা এবং বই দেখে নকল করে পাস করা এ দু’য়ের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। মানুষ আগে যা স্মৃতিতে ধারণ করত তা এখন ছাপাখানা অধিকার করেছে। বই মুখস্থ করে পাস করা চৌর্যবৃত্তিরই নামান্তর।

১৬।

সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই। এমনকি এ ক্ষেত্রে দাতা কর্ণেরও অভাব নেই, এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করেই নিশ্চিত থাকি, এই বিশ্বাসে যে, সেখানে থেকে তারা একটি বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসবে যার সুবাদে তার বাকি জীবন আরামে কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক। মনোরাজ্যেও দান গ্রহণ সাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চেয়ে গ্রহীতার কথাটা একেবারে ভুলে যাই।

সারাংশ : শিক্ষা কখনও ধার করে অর্জন করা যায় না। কঠোর সাধনা দ্বারা তা অর্জন করতে হয়। তবে শুধু মুখস্ত করা বিদ্যা আত্মমুক্তি ঘটাতে সক্ষম নয়। আর শুধু বৈষরিক প্রয়োজন মেটাবার জন্য বিদ্যা অর্জনে বিদ্যার্থীদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকায় কোন সার্থকতা নেই।

১৭।

মাতৃস্নেহের তুলনা নাই, কিন্তু অভিস্নেহ অনেক সময় অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃহৃদয়ের মমতার প্রাবল্যে মানুষ আপনাকে হারাইয়া আপন শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মশুক্তির সন্ধান সে পায় না–দুর্বল, অসহায় পক্ষিশাবকের মত চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বুঝে না।

সারাংশ : মায়ের স্নেহ নিঃসন্দেহে অমূল্য জিনিস। কিন্তু অতিরিক্ত স্নেহ কখনও কাম্য নয়। যে স্নেহ মানুষকে মনুষ্যত্ব দেয় না সে স্নেহ কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। অতিরিক্ত স্নেহ পেলে মানুষ দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে মনুষ্যত্ব বিকশিত হয় না।

১৮।

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই হলো জ্ঞানীর কাজ। পিঁপড়ে মৌমাছি পর্যন্ত যখন ভবিষ্যতের জন্য ব্যতিব্যস্ত তখন মানুষের কথা বলাই বাহুল্য। ফকির সন্নাসী যে ঘর-বাড়ি ছেড়ে আহার-নিদ্রা ভুলে পাহাড়-জঙ্গলে চোখ বুজে বসে থাকে সেটা যদি নিতান্ত গঞ্জিকার কৃপায় না হয় তবে বলতে হবে ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে। সমস্ত জীব-জন্তুর দু’টো চোখ সামনে থাকবার মানে হল। ভবিষ্যতের দিকে যেন নজর থাকে। অতীতের ভাবনা ভেবে লাভ নেই। পণ্ডিতেরা বলে গেছেন “গতস্য শোচনা নাস্তি”। আর বর্তমান সে-ত নেই বললেই চলে।

এই যেটা বর্তমান সেই-কথা বলতে বলতে অতীত হয়ে গেল। জলের তরঙ্গ গোনা আর বর্তমানের চিন্তা করা সমানই অনর্থক। ভবিষ্যতটা হলো আসল জিনিস। সেটা কখনো শেষ হয় না। তাই ভবিষ্যতের মানব কেমন হবে, সেটা একবার ভেবে দেখা উচিত।

সারাংশ: বর্তমান অত্যন্ত সংকীর্ণ সময়ে আবর্তিত। ভবিষ্যতের জগৎ বিস্তৃত ও কল্পনা বিস্তারী। তাই বর্তমানের কথা না ভেবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করাই জ্ঞানীর কাজ। সংসারী ও সংসার ত্যাগী সকলেই ভবিষ্যতের চিন্তায় বিভোর। অতীতের চিন্তায় কোন ফল হয় না। যা চলে যায় তা আর ফিরে আসে না। বর্তমান ক্ষণ মুহুর্তেই অতীত হয়ে যায়। ভবিষ্যতই হলো আসল।

১৯।

মানুষের সুন্দর মুখ দেখে আনন্দিত হয়ো না। স্বভাবে যে সুন্দর নয়, দেখতে সুন্দর হলেও তার স্বভাব, তার স্পর্শ, তার রীতিনীতিকে মানুষ ঘৃণা করে। দুঃস্বভাবের মানুষ মানুষের হৃদয়ে জ্বালা ও বেদনা দেয়। তার সুন্দর মুখ দেখে মানুষ তৃপ্তি পায় না। অবোধ লোকেরাই মানুষের রূপ দেখে মুগ্ধ হয় এবং তার ফলভোগ করে।

সারাংশ : মানুষের সুন্দর চেহারা দেখেই মুগ্ধ হওয়া উচিত নয়। চরিত্রই আসল। চরিত্রবান লোক অন্য মানুষকে জ্বালা-যন্ত্রণা বা পুঃখ-কষ্ট দেয় না, নির্বোধ লোকেরাই কেবল মানুষের বাহ্যিক রূপ দেখে মুগ্ধ হয়।

২০।

কিসে হয় মর্যাদা? দামি কাপড়, গাড়ি-ঘোড়া, না ঠাকুর দাদার উপাধিতে? না, মর্যাদা এমন জিনিসে নেই। আমি দেখতে চাই তোমার ভিতর, তোমার বাহির, তোমার অন্তর। আমি জানতে চাই তুমি চরিত্রবান কিনা। তোমায় দেখলে দাস-দাসী উড়ে আসে, প্রজারা তোমায় দেখে সন্ত্রস্ত হয়। তুমি মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাওয়া খাও, মানুষকে দিয়ে জুতো খোলাও, তুমি দিনের আলোতে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করো, বাপ-মা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী তোমায় আদর করেন, আমি তোমায় অবজ্ঞায় বলবো- যাও।

সারাংশ : মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি তার বাহ্যিক পোশাক বা বংশ গৌরবে নয়, মানুষ তার চরিত্রগুণেই মর্যাদার আসনে আসীন হন। নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণে সিদ্ধ মানুষ প্রচুর ধন সম্পদ ও প্রভাব প্রতিপত্তির মালিক হলেও মনুষ্যত্বের অধিকারী নয় যার গুণ আছে সেই সকলের আদর ও সম্মান লাভ করে থাকে।

সারাংশ ও সারমর্ম , গদ্য অংশ
সারাংশ ও সারমর্ম , গদ্য অংশ

২১।

ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্ব নাশ করে। যে লোমহর্ষক কাজগুলো পৃথিবীকে ত্রাসের রাজ্যে পরিণত করেছে তার মূলে ক্রোধই। ক্রোধ যে মানুষকে পশু ভাবাপন্ন করে তা একবার ক্রুদ্ধ ব্যক্তির মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যে ব্যক্তির মুখখানি সর্বদা হাসিমাখা, উদারভাবে পরিপূর্ণ মনে কর, দেখলেই তোমার মনে আনন্দ ধরে; একেবারে ক্রোধের সময় সেই মুখখানির দিকে তাকাও দেখবে স্বর্গের সেই সুষমা আর নেই- নরকাগ্নিতে বিকট রূপ ধারণ করেছে। সমস্ত মুখ কি এক কালিমায় ঢেকে গেছে, তখন তাকে আলিঙ্গন করা দূরে থাকুক নিকট যেতেও ইচ্ছা হয় না। সুন্দরকে মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিত করতে অন্য কোন রিপু ক্রোধের ন্যায় কৃতকার্য হয় না।

সারাংশ : ক্রোধ মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়। এতে মানুষের মনুষ্যত্ব নষ্ট হয়। সুন্দর মুখাকৃতি সকলকে মুগ্ধ করে কিন্তু ক্রোধ হলে সে মুখখানাও নরকীয় কালিমায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। অতএব ধৈর্য ধারণ করে ক্রোধকে দমন করা প্রত্যেকেরই উচিত।

ট্যাগ : sarangsho, sarmormo bangla, sharangsho sharmormo bangla

আরও পড়ুন:

বিরচন, ভাব সম্প্রসারণ

কবি কাহিনী (১৮৭৮) | কাব্যগ্রন্থ | কবিতা সূচি | পর্যায় : সূচনা (১৮৭৮ – ১৮৮১) | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

“সারাংশ ও সারমর্ম | গদ্য অংশ | Sharangsho Sharmormo Bangla | বিরচন”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন