লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]

লন্ডনে শলাপরামর্শ

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

লন্ডনে শলাপরামর্শ

পুলিশ-মহলে বিলিবোন্স্ নামে খ্যাত স্যার উইলিয়াম ওসিংটন বন্ধুর দিকে কতকটা হতভম্বের মতো তাকিয়ে বলেন–মেয়াং-এ অপরাধীদের শায়েস্তা করেও তোমার সাধ মেটেনি। দেশে ফিরেও আমাদের কাজে বাগড়া দিয়ে বেড়াচ্ছো?

মেয়াং-এ অপরাধীরা এমন পাইকারী হারে খুন করে না। এক্ষেত্রে আমার মাথাব্যথার কারণ এই যে একটা লোক প্রায় আধডজন খুন করেও দিব্যি খোলা হাওয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে–এমনকি কেউ তাকে সন্দেহ পর্যন্ত করছে না।

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন স্যার উইলিয়াম–কখনো কখনো এমনটা ঘটে। এক্ষেত্রে খুন করার বিশেষত্ব কী? স্ত্রী খুন করা?

না না, এ লোকটা তা নয়; তা নিজেকে এখনও ভগবান বলে মনে করেনি, তবে অচিরেই করবে।

পাগল নাকি?

নিঃসন্দেহে।

ওহো, কিন্তু আইনের চোখে পাগল নয় এবং সেটাই আসল কথা।

তবে আমার ধারণা, ও জানে যে ওর কাজের কী পরিণাম। বললো লিউক।

সে কথাই তো বলছি।

আমি তাই তোমার কাছ থেকে দুএকটা ঘটনা জানতে চাই। ডারবি খেলার দিন বিকেল পাঁচটা থেকে ছটার মধ্যে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিলো। মিস পিঙ্কারটন নামে এক বৃদ্ধা মহিলাকে হোয়াইট হলের সামনে একটা গাড়ি চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। আমি চাই যে, এই ব্যাপারটার একটু বিশদ তদন্ত হোক।

স্যার উইলিয়াম বললেন–ঐটুকু সহজেই তোমার জন্য করতে পারি–বিশ মিনিটের বেশি লাগবে না।

কথামতই কাজ হলো।

আজ্ঞে হ্যাঁ, এই ঘটনার একেবারেই পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আমার মনে আছে। তাছাড়া এই ফাইলে লেখাও আছে।–লিউককে ফাইলটা দিয়ে বললো-তদন্ত-সাপেক্ষ একটা বিচার হয়েছিলো–মিঃ স্যাচের ভেরেল বিচারক। গাড়ির চালক নিরুদ্দেশ।

ওকে পরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো?

আজ্ঞে না।

গাড়িটা কী গাড়ি ছিলো?

যতদূর মনে হয় ওটা রোলস্ ছিলো। বড় গাড়ি এবং গাড়ির চালক ছিলো পেশাদার চালক।

নম্বর যোগাড় করতে পেরেছিলেন?

ওখানেই ভুল হয়ে গেছে। একটা নম্বর পাওয়া গিয়েছিলো-এফ. জেড. এক্স ৪৪৯৮। এক ভদ্রমহিলার এই নম্বরটা মনে ছিলো, কিন্তু পরে দেখা গেল সেই নম্বরটা ভুল।

কী করে জানলেন যে সেই নম্বরটা ভুল?–লিউকের কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ।

অফিসারটি হেসে ফেলেন–এফ. জেড, এক্স. ৪৪৯৮ হচ্ছে লর্ড হুইটফিল্ডের গাড়ি। যখন এই ঘটনাটা ঘটে সেই সময়ে এই গাড়িটা বুসিংটন হাউসের ঠিক বাইরে দাঁড়িয়েছিলো আর গাড়ির ড্রাইভার তখন চা খাচ্ছিলো। এই ঘটনার সঙ্গে কোনোরকমেই ওকে জড়ানো সম্ভব নয়, তা ছাড়া সাড়ে ছটা নাগাদ লর্ড হুইটফিল্ড বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত গাড়িটাও তখন থেকে নড়েনি।

ও, আচ্ছা।-মন্তব্য করে লিউক।

হাঁফ ছেড়ে লোকটি বলেন–এই রকমই হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে সব বিবরণটুকু নেবার আগেই অর্ধেক এর ওপর সাক্ষী হাওয়া হয়ে যায়। স্যার উইলিয়ামও একথা স্বীকার করেন।

আবার অফিসারটি বলেন–আমরা নানাভাবে আরও খোঁজাখুঁজি করেছি। এমন পর্যন্ত ধরে নিয়েছিলাম যে হয়তো নম্বরটা এফ. জেড. এক্স ৪৪৯৮-এর কাছাকাছি কোনো নম্বর হতে পারে। হয়তো এমনও হতে পারে যে, ভদ্রমহিলা যে নম্বরটা দেখেছিলেন তার প্রথম দুটো সংখ্যা হয়তো ৪৪ দিয়ে আরম্ভ। আমরা এই জাতীয় নম্বরের সম্ভাব্য সব গাড়ীরই খোঁজ করেছি। কিন্তু সবকটি গাড়িরই খতিয়ান সন্তোষজনক।

লিউকের দিকে স্যার উইলিয়াম্ স-প্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকান, লিউকও মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

ঠিক আছে মশায়, আপনি এবার আসুন।-স্যার উইলিয়াম্ বলেন।

স্যার উইলিয়াম্ লোকটি চলে যেতে লিউকের দিকে তাকিয়ে বলেন–কিছু বুঝতে পারলে ফিৎস্?

লিউক বললো–সবই হুবহু ছকের মত মিলে যাচ্ছে। স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের ধুরন্ধরদের এই জঘন্য খুনের কাহিনী শোনাবার উদ্দেশ্যে পিঙ্কারটন এখানে আসছিলেন। যদিও আমি জানি না তোমরা ওঁর কথায় কর্ণপাত করতে কিনা–হয়তো করতে না

সম্ভবতঃ করতাম। উড়ো খবর, গল্প–কিছুই আমরা উপেক্ষা করি না এই আশ্বাস তোমায় দিতে পারি।

খুনীও হয়তো এমনটাই আশঙ্কা করেছিলো, তাই সে আর ঝুঁকি নেয়নি। পিঙ্কারটনকে চিরতরে সরিয়ে দিলো; আর যদিও বা জনৈক ভদ্রমহিলা তার গাড়ির নম্বরটা দেখে ফেলেছিলো। কিন্তু কেউ তাকে বিশ্বাস পর্যন্ত করলো না।

বিলিবোনস লাফিয়ে উঠলো–তুমি কী বলছো?

হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। আমি বাজি রেখে বলতে পারি যে, হুইটফিল্ড ওঁকে গাড়ি চাপা দিয়েছিলেন। ড্রাইভার চা খেতে গিয়েছিলো–হয়তো সেই সময়ে বা অন্য কোনো পথে ও ড্রাইভারের কোট গায়ে চাপিয়ে টুপিটা মাথায় দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলো। আমি বলছি বিলি, ওই-ই একাজ করেছে।

অসম্ভব।

মোটেই না। হুইটফিল্ড আমার জানার মধ্যে অন্ততঃ সাতটা খুন করেছে–হয়তো আসলে তার চেয়েও বেশি।

এ…অসম্ভব।

আরে ভাই, ও নিজে কাল রাতে কবুল করেছে।

তাহলে তো বলতে হবে লোকটা ঘোর উন্মাদ?

পাগল ঠিকই, তবে অত্যন্ত ধূর্ত ও শয়তান। ওকে বুঝতে দিলে চলবে না যে, আমরা ওকে সন্দেহ করি।

বিলিবোনস বলে–কিন্তু এ যে একেবারে অবিশ্বাস্য..

লিউক বলে,–কিন্তু সত্যি। বিলি, তুমি আমার বহুকালের বন্ধু। আমরা দুজনেই এ ঘটনার একেবারে মূলসুদ্ধ টেনে বার করবো। শোনো, সব ব্যাপারটা তোমায় গুছিয়ে বলি।

ওরা দুজনে দীর্ঘসময় ধরে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে।

***

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

লিউক পরদিন সকালে গাড়ি নিয়ে উইচউডে ফিরে আসে।

উইচউডে পৌঁছে প্রথমেই মিস ওয়েনফ্লিটের বাড়িতে গাড়ি থামালো। মিস ওয়েনফ্লিট লিউককে দেখে খানিকটা বিস্মিত হয়ে সাদরে ওকে ডেকে বসালেন।

এমন সাত সকালে আপনাকে বিরক্তি করছি বলে দুঃখিত।

লিউক সময় নষ্ট না করে সরাসরি প্রশ্ন করলো-আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে এসেছি মিস ওয়েনফ্লিট, আমি জানি, ব্যাপারটা নিতান্তই ব্যক্তিগত; তার জন্য আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

আপনার যা ইচ্ছে জিজ্ঞেস করতে পারেন, কারণ আমি জানি যে একান্ত প্রয়োজন না হলে আপনি জিজ্ঞেস করতেন না।

লিউক বলে–ধন্যবাদ। লর্ড হুইটফিল্ডের সঙ্গে আপনার বিয়েটা কেন ভেঙ্গে গিয়েছিলো?

এর সঠিক উত্তর আমার জানা দরকার।

মিস ওয়েনফ্লিট আঁৎকে উঠে বলেও আপনাকে কিছু বলেছে?

একটা পাখি নিয়ে কী যেন বলছিলেন–পাখিটার ঘাড় মটকে দেওয়া হয়েছিলো বা ঐ জাতীয় কিছু উত্তর দেয় লিউক।

এই কথা বলেছে? শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলো তাহলে? অদ্ভুত ব্যাপার তো!

আপনি আমাকে সব কথা খুলে বলুন।

হ্যাঁ, আপনাকে সবই বলবো; গর্ডনকে কিন্তু দয়া করে কিছু বলবেন না। এসব ঘটনা বহুকাল আগের–আর সবই তো শেষ হয়ে গেছে। আমি সেই মরা অতীতকে আর খুঁচিয়ে তুলতে চাই না।–মিস ওয়েনফ্লিট বলেন।

সম্মতি জানায় লিউক–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, একথা আমি কখনো উচ্চারণ করবো না–একেবারে ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির জন্য আমি জানতে চাইছি।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন,ধন্যবাদ, শুনুন তাহলে। আমার একটা ছোটো ক্যানারী পাখি ছিলো; পাখিটাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। যদিও আমি একথা বুঝি যে, একজন পূর্ণবয়স্ক দায়িত্বশীল লোকের পক্ষে এটা সহ্য করা কঠিন।

লিউক বললো–আমি জানি।

গর্ডন পাখিটাকে খুব হিংসে করতো। একদিন ভীষণ রেগে গিয়ে ও বললো–তুমি আমার চেয়ে পাখিটাকে বেশি ভালোবাসো।–এবং আমিও তরুণী মেয়েদের স্বভাবসুলভ চপল ভঙ্গীতে পাখিটাকে আঙুলের ওপর তুলে নিয়ে বলেছিলাম–একটা বুড়ো খোকার চেয়ে আমি তোকে নিশ্চয়ই বেশি ভালোবাসি ডিকি!–আর তার ফল হলো অত্যন্ত বীভৎস। গর্ডন পাখিটাকে আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে একেবারে ঘাড় মটকে মেরে ফেললো। সে কি প্রচণ্ড আঘাত! আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারবো না!

প্রশ্ন করে লিউক–এইজন্যই আপনি বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?

হ্যাঁ, এই ঘটনার পর আমার মনটা সত্যিই ওর ওপর একেবারে বিরূপ হয়ে উঠলো। দেখুন, মিস ফিৎ, ওয়েনফ্লিট একটু ইতস্ততঃ করে বলেন–কেবলমাত্র হিংসা বা রাগ থেকে যদি এ কাজ ও করতো, তাহলে হয়তো আমি এতটা ভয় পেতাম না; কিন্তু আমি যেন দেখলাম, ঘাড় মটকাবার সময়ে ওর চোখে এক বিজাতীয় আনন্দ এবং এই কারণেই আমি এত ভয় পেয়েছিলাম।

লিউকের কথা প্রায় অনুচ্চারিত।–অতদিন আগেও, সেই তরুণ বয়সেও…

আপনি আগাগোড়াই জানতেন যে লর্ড হুইটফিল্ড একের পর এক এতগুলো খুন করেছে, তাই না?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন, সঠিক জানতাম না। যদি জানতাম, তাহলে নিশ্চয় আমি আপনাকে বলতাম। কিন্তু সবসময়েই আমার মনে একটা ভয় ছিলো।

তা সত্ত্বেও একটা ছোটো ইঙ্গিত পর্যন্ত আমাকে দিলেন না?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–কী করে বলবো বলুন? বলা কি যায়? আমি যে একদিন ওকে ভালোবাসতাম।

লিউক শান্ত গলায় বললো-বুঝতে পারছি।

তারপর মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–ব্রিজেট যে এ বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে, তার জন্য আমি সত্যিই খুশী। ও তো আপনাকেই বিয়ে করছে?

হা।

মিস ওয়েনফ্লিট পরমুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে যান। ওঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে দুশ্চিন্তার ছাপ।–কিন্তু খুব সাবধানে থাকবেন। আপনারা দুজনেই অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন।

আপনি কি হুইটফিল্ডের কথা বলছেন?

হা। এখনই ওকে কিছু বলার দরকার নেই।

কপাল কোঁচকায় লিউক।-আপনার একথাটা আমাদের দুজনের মনঃপূত হবে বলে মনে হয় না।

ওঃ, কিন্তু না বললে ক্ষতি কী? আপনি বুঝতে পারছেন না যে, ও কত বড় উন্মাদ! একেবারে উন্মত্ত! এক মুহূর্তের জন্যও ও এসব সহ্য করবে না। ব্রিজেটের যদি কিছু হয়।

ওর কিছুই আমি হতে দেবো না।

তা জানি, কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, ওর সঙ্গে আপনি পাল্লা দিয়ে পারবেন না। ও যে অত্যন্ত মারাত্মক রকমের ধূর্ত। ব্রিজেটকে এখনই এখান থেকে সরিয়ে নিন–সেই একমাত্র পথ। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি আপনারা দুজনেই বিদেশে চলে যান।

লিউক বলে–যদি যেতে হয়, ব্রিজেটকে পাঠিয়ে দেবো, কিন্তু আমি এর হেস্তনেস্ত না করে নড়বো না।

আমিও ভেবেছিলাম, আপনি এমনটাই বলবেন। কিন্তু আর দেরি করবেন না। ওকে এই মুহূর্তে সরিয়ে আনুন।

লিউক বলে–হয়তো ঠিকই বলেছেন।

হয়তো নয়, আমি জানি আমি ঠিক বলছি। এক্ষুনি পাঠিয়ে দিন, না হলে হয়তো বড্ড দেরি হয়ে যাবে।

***

ভগ্ন প্রতিশ্রুতি

ব্রিজেট লিউকের গাড়ির আওয়াজ পেয়েই বাইরের সিঁড়িতে ছুটে এসে বললো–আমি ওকে সব বলে দিয়েছি।

কী বলছো–লিউক হতচকিত, ব্রিজেটের নজর এড়ালো না।

লিউক তোমার কী হয়েছে? তোমাকে দেখে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে?

লিউক বলে–আমার ধারণা ছিলো যে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা করবে এবং এমন কথাই তুমি দিয়েছিলে।

জানি, কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম যে সব কথা স্পষ্ট করে বলে দেওয়াই ভালো। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে ও সমস্ত রকম ব্যবস্থাপত্র একেবারে পাকা করে ফেলেছিলো, এমনকি, হনিমুন কোথায় হবে সে জায়গা পর্যন্ত ঠিক করতে যাচ্ছিলো, কাজেই আমার না বলে আর উপায় ছিলো না।

একটু থেমে ব্রিজেট বললো–ভদ্রতার দিক থেকেও ওকে সব কথা বলা দরকার ছিলো।

লিউক বললো বুঝতে পারছি যে তোমার দিক থেকে তুমি ঠিকই করেছে।

আমার মনে হয় সাধারণ ভদ্রতাবোধের দিক থেকেও ঠিক করেছি।

লিউক বললো–কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন ভদ্রতাবোধের অনুশাসন মেনে চলা যায় না।

তুমি কী বলছো লিউক?

লিউক বলে–আমি তোমাকে এক্ষুনি সব কথা বুঝিয়ে বলতে পারছি না। যাকগে, হুইটফিল্ড তোমার বক্তব্য কী ভাবে নিলো?

ব্রিজেট বললো–অত্যন্ত ভালোভাবে নিয়েছে। সত্যি, এত শান্তভাবে নেবে বুঝতে পারিনি। জানো লিউক, কেবলমাত্র ওর বাইরেটা দেখে আমি হয়তো ওকে অহেতুক ছোটো করছি। এখন মনে হচ্ছে, ওর অন্তঃকরণটা সত্যিই উদার, মহান।

লিউক বললো–আমরা যেটা আদৌ সন্দেহ করিনি সেদিকে ও হয়তো খুবই মহৎ। শোনো ব্রিজেট, যত শীঘ্র সম্ভব তোমাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।

সে তো হবেই। আমি আজই আমার জিনিষপত্র বেঁধে নেবো। তুমি আমাকে শহর পর্যন্ত পৌঁছে দিও। এলসওয়ার্দি যদি দলবল নিয়ে বিদায় হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো আমরা দুজনেই বেস্-মোটলি হোটেলে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারবো।

লিউক বলে–না, তা হবে না। তুমি লন্ডনে চলে যাও। তোমাকে আমি একটু পরেই সব বুঝিয়ে বলছি–ততক্ষণ আমি হুইটফিল্ডের সঙ্গে একটু দেখা করে আসি।

সেই ভালো। এখানে সব কিছুই যেন কেমন জান্তব, তাই না? এই জায়গাটায় আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিলো।

লিউক বললো–সে যাই হোক, ওর সঙ্গে দর কষাকষিটা তোমার ভালোই হয়েছে। যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে আর হা-হুঁতাশ করে লাভ নেই।

লিউক ঘরে ঢুকতেই দেখলো যে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত হুইটফিল্ড পায়চারী করছেন।

এই যে ফিৎস উইলিয়াম্ এসে গেছেন?

দেখুন, আমি যে দুঃখিত বা অনুতপ্ত–এমন কোনো কিছুই আমি বলতে আসিনি, কারণ সেটা নেহাৎই ভণ্ডামী বলে মনে হতে পারে। তবে একথা বুঝতে পারছি যে, আপনার দিক থেকে দেখলে বলতে হবে, আমি অত্যন্ত অন্যায় করেছি। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, এমনটাও কখনো কখনো ঘটে থাকে।

লর্ড বলেন-বুঝেছি, বুঝেছি।

থামে না লিউক–ব্রিজেট আর আমি দুজনেই আপনার সঙ্গে প্রতারণা করেছি; কিন্তু ঘটনাকে অস্বীকার করে লাভ নেই–আমরা দুজনে দুজনকে পছন্দ করি, সুতরাং এ ব্যাপারে আর কিছু করবার ছিলো না। সবচেয়ে ভালো হবে ঘটনার বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এখান থেকে আমাদের চলে যাওয়া।

লর্ড বললেন–ঠিকই বলেছেন। এ ব্যাপারে আপনাদের কিছু করার নেই।

লর্ড হুইটফিল্ডের কথাটা সুরটা যেন অনেকটা বেসুরো মনে হলো। তিনি কিছুক্ষণ ধরে যাচাই করার ভঙ্গীতে লিউকের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

তীব্রস্বরে লিউক বলে ওঠে–আপনি কী বলতে চান?

বলতে চাই যে আপনাদের কিছু করার নেই; অর্থাৎ অনেক দেরি হয়ে গেছে।–লর্ড হুইটফিল্ড বলেন।

এক পা এগিয়ে গিয়ে আবার একই প্রশ্ন করে লিউক–বলুন আপনি কী বলতে চান?

লর্ড বললেন–হনরিয়া ওয়েনফ্লিটকে জিজ্ঞেস করুন, ও বুঝতে পারবে। তাছাড়া ওর সব জানাও আছে, আমার সঙ্গে ও এ নিয়ে একবার কথা বলেছিলো।

উনি কী বুঝতে পারবেন?

বুঝতে পারবে যে পাপের শাস্তি অনিবার্য! ন্যায়ের দণ্ড অমোঘ! ব্রিজেটকে আমি ভালোবাসতাম; আজ আমি সেজন্য দুঃখিত। অপর পক্ষে, আমি আপনাদের দুজনের জন্যও দুঃখবোধ করছি।

আপনি আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন?–প্রশ্ন করে লিউক।

লর্ড হুইটফিল্ড কথাটা শুনে যথার্থ আঘাত পেয়েছেন বলে মনে হলো।

না না, ভাই, ভয় দেখাচ্ছি না। ব্রিজেটকে আমি যখন স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চেয়েছিলাম, ও পূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে তা গ্রহণ করেছিলো। বিধান অমান্য করলে তার শাস্তি অবধারিত…

লিউক বলে–অর্থাৎ আপনি বলতে চাইছেন যে, ব্রিজেটের একটা কিছু ঘটবে? আপনি যদি তেমন কিছু পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে এখানেই আপনার খেল খতম। নিজের ভালো যদি চান, তাহলে সাবধান। আপনার জারিজুরি সবই আমি ধরে ফেলেছি।

হুইটফিল্ড বলেন–আমাকে নিজে কিছুই করতে হবে না–আমি এক সুবিশাল শক্তির যন্ত্র মাত্র। সেই শক্তি যে শাস্তির বিধান দেবেন, তাই-ই ঘটবে।

আপনি সেই বুজরুকীকে বিশ্বাস করেন?

করি, কারণ তাই-ই সত্যি। সে আমার বিরুদ্ধাচরণ করবে তাকেই শাস্তি পেতে হবে–আপনি বা ব্রিজেট তার ব্যতিক্রম হতে পারেন না।

এখানেই তো ভুল করলেন। ভাগ্য চিরকাল কারো সুপ্রসন্ন থাকে না। এক সময় ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যায়। আপনার সেই সময় উপস্থিত হয়েছে।

লর্ড বললেন–ওহে যুবক, আপনি জানেন না, কার সম্পর্কে আপনি কথা বলছেন। এ বিশ্বচরাচরে কিছুই আমাকে ছুঁতে পারে না।

পারে না বুঝি? এবার সব টের পাবেন। এখন থেকে একটু হিসেব করে পা ফেলবেন হুইটফিল্ড।

এবার লর্ড হুইটফিল্ডের আর আগেকার সেই শান্ত, স্থির ভঙ্গীটা আর নেই।

এতক্ষণ আমি অসীম ধৈর্য নিয়ে সব শুনে গেছি; কিন্তু আমারও সহ্যের একটা সীমা আছে। বেরিয়ে যান এখান থেকে।

তা যাচ্ছি এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাচ্ছি। কিন্তু পরে যেন বলবেন না যে, আমি আপনাকে সতর্ক করে দিইনি।

লিউক বেরিয়ে একছুটে ওপরে উঠে গেল। সেখানে একজন ঝি ব্রিজেটের জামাকাপড় গুছিয়ে দিচ্ছিলো আর ব্রিজেট তার তদারকী করছিলো।

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

এত জলদি হয়ে গেল?

এই, আর দশ মিনিট।

মিনিট দশেক বাদে ফিরে এসে দেখে ব্রিজেট প্রস্তুত।

আমরা কি এখন যাবো।

চলো, আমি তৈরি।

সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময়ে দেখলো পাঁচক ওপরে উঠছে।

মেমসাহেব, মিস ওয়েনফ্লিট। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।

মিস ওয়েনফ্লিট? কোথায়?

বসবার ঘরে-সাহেবের সঙ্গে কথা বলছেন।

ওরা বসবার ঘরে সোজা চলে যায়; লিউক একেবারে গা ঘেঁষে ব্রিজেটের পেছনে থাকে।

জানালার কাছে দাঁড়িয়ে লর্ড হুইটফিল্ড মিস ওয়েনফ্লিটের সঙ্গে কথা বলছিলো, হাতে একখানা ছুরি-ফলাটা লম্বা আর কিঞ্চিৎ বাঁকানো।

নিখুঁত হাতের কাজ। আমার কাগজের একজন সাংবাদিক মরক্কো থেকে এটা আমাকে এনে দিয়েছিলো। মরক্কোয় রিফ জেলায় তৈরি। কিন্তু আরবী জিনিষ হলেও কী দারুণ ধার!–লর্ড হুইটফিল্ড ছুরিটার ধার পরীক্ষা করছিলেন–মুখে তৃপ্তির দ্যুতি।

মিস ওয়েনফ্লিট বললো-দোহাই গর্ডন, ওটা সরিয়ে রাখো।

তারপর লর্ড বললেন–এই ছুরিটাকে স্পর্শ করেও আমি আনন্দ পাই।

মিস ওয়েনফ্লিটকে অত্যন্ত ফ্যাকাসে আর উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিলো।

বাঃ, এই যে ব্রিজেট, এসে গেছো? লক্ষ্মী মেয়ে।

লর্ড বললেন–হ্যাঁ, এই তো ব্রিজেট এসে গেছে; মনের সাধ মিটিয়ে ওর সঙ্গে গালগল্প করে নাও হনরিয়া, ও আর আমাদের মধ্যে বেশিক্ষণ নেই।

মিস ওয়েনফ্লিট ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন–তার মানে কী?

মানে? মানে হচ্ছে যে, ও লন্ডনে চলে যাচ্ছে, কী? ঠিক বলেছি?–এই হলো আসল মানে।

লর্ড আবার বলেন–তোমাকে একটা সুসংবাদ দিচ্ছি হনরিয়া, ব্রিজেট শেষ পর্যন্ত আর আমাকে বিয়ে করছে না; ফিৎস উইলিয়ামকেই বেছে নিয়েছে। জীবনের গতি বড়ই বিচিত্র! আচ্ছা তাহলে তোমরা গল্প-গুজব করো, আমি চলি।

লর্ড হুইটফিল্ড বাইরে চলে যান।

কী সর্বনাশ! কী দারুণ সর্বনাশ!–মিস ওয়েনফ্লিটের কথার মধ্যে হতাশা, আতঙ্ক এতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ব্রিজেট বেশ বিস্মিত হয়ে যায়। ও বলে–কী যে হচ্ছে! আমি খুব লজ্জিত এবং আন্তরিক দুঃখিত।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–ও দারুণ রেগে গেছে! এখন কী হবে? আমরা এখন কী করবো?

ব্রিজেট বলে–কী করবো মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–তোমাদের আজই ওকে বলা উচিত হয়নি।

ব্রিজেট বললো–কী বলছেন? না বলে আমরা কী করতাম?

এক্ষুনি না বললেও চলতো। যতক্ষণ না তোমরা এখান থেকে নিরাপদে চলে যেতে পারছো, ততক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত ছিলো।

সেটা তর্ক-সাপেক্ষ। আমার মতে এই জাতীয় বিরক্তিকর ব্যাপার যত তাড়াতাড়ি শেষ করা যায় ততই মঙ্গল।

ওঃ বুঝতে পারছে না, এই ব্যাপার যদি কেবল তাই-ই হতো তাহলে।

পুরো কথা শেষ না করে স-প্রশ্ন চোখে লিউকের দিকে তাকান।

লিউকও নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে যে,–এমনও বলা উচিত হয়নি।

বিড় বিড় করে মিস ওয়েনফ্লিট ও আচ্ছা বলে থেমে যান।

ব্রিজেট বলে–আপনি কি কোনো বিশেষ কারণে আমাকে দেখা করতে বলেছিলেন মিস ওয়েনফ্লিট?

ও হ্যাঁ, আমি বলতে এসেছিলাম যে, এখানে তো আর থাকাটা ভালো দেখায় না। কিন্তু ঠিকঠাক করে কোনো একটা ভালো জায়গায় যেতে হলে দুএকদিনের সময়েরও প্রয়োজন–এই দুএকটা দিন তোমরা আমার ওখানেই থেকে যাও।

আপনার সুবিবেচনা মনে রাখবার মতো। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

দেখ, আমার ওখানে আর যাই হোক, তোমার পক্ষে অত্যন্ত নিরাপদ আর

কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ব্রিজেট বলে–নিরাপদ?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–না, এই বলছিলাম যে, আরামে থাকতে পারবে; তবে এখানে যেমন বিলাস-ব্যসনের মধ্যে বাস করছো, ততটা না হলেও আমার ওখানেও গরম জলের কালে গরম জল পাবে; আর আমার ঝি এমিলি মোটামুটি ভালোই রান্না করে।

ব্রিজেট বলে–ও কথা বলছেন কেন মিস ওয়েনফ্লিট? আপনার ওখানে বেশ আরামেই থাকতে পারবো।

তবে, তোমার পক্ষে সবচেয়ে ভালো হবে শহরে চলে যাওয়া।

ব্রিজেট বললো–তাতে একটু অসুবিধে আছে। আমার কাকীমা আজ সকালেই একটা ফুলের মেলা দেখতে চলে গেছেন। আমি এখনও তাকে এখানকার ঘটনা কথা কিছুই বলতে পারিনি; তবে আমি ওকে একটা চিঠি দিয়ে জানাতে পারি যে, আমি ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকবো।

তুমি কি লন্ডনে তোমার কাকীমার ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকবে?

হ্যাঁ, তাছাড়া ওখানে আমার কেউ নেই; তবে খাওয়ার জন্য আমাকে বাইরে যেতে হবে।

কী সর্বনাশ! তুমি একা ওই ফ্ল্যাটে থাকবে? তা কিন্তু উচিত হবে না। ওখানে একা থাকা ঠিক নয়।

ব্রিজেট বলে–ভয় নেই, আমাকে কেউ খেয়ে ফেলবে না। তাছাড়া, আমার কাকীমা কালকেই ফিরে আসবেন।

দুশ্চিন্তা, ভয়ে মিস ওয়েনফ্লিট মাথা নাড়েন।

লিউক বললো, ব্রিজেট, তার চেয়ে তুমি একটা হোটেলে গিয়ে থাকো।

ব্রিজেট বললো–কেন? তোমাদের সব হলো কী? আমাকে কি তোমরা অসহায় শিশু পেয়েছো?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন-না না, ভুল বুঝো না। তোমাকে কেবল কিছুটা সাবধান হয়ে থাকতে বলছি, তার বেশি নয়।

কিন্তু কেন? কী হয়েছে? ব্যাপারই বা কী?

লিউক বললো–ব্রিজেট শোন, আমি তোমার সঙ্গে দুএকটা কথা বলতে চাই, কিন্তু এখানে তা সম্ভব নয়। আমার সঙ্গে গাড়িতে এসো, কোথাও একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে কথা বলবো।

ও মিস ওয়েনফ্লিটের দিকে তাকিয়ে বলে–আপনি যদি কিছু মনে না করেন, ঘন্টা খানেক বাদে আপনার বাড়ি আমরা আসতে পারি? কয়েকটা ব্যাপারে আপনার পরামর্শ দরকার।

নিশ্চয়ই আসবেন, আমি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবো।

লিউক মিস ওয়েনফ্লিটকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্রিজেটকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। চলতে চলতে বলে-বাক্সপত্র পরে এক সময়ে নিয়ে আসা যাবে, এখন চলো।

সামনের দরজা দিয়ে ওরা দুজনে বেরিয়ে আসে। লিউক ব্রিজেটকে গাড়িতে উঠতে বলে এবং নিজে ব্রিজেটের পাশে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে তীব্র গতিতে ভেতরের রাস্তাটা পেরিয়ে গেটের বাইরে এসেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, বাব্বা। শেষ পর্যন্ত তোমাকে নিরাপদেই এ বাড়ির বাইরে বের করে আনতে পেরেছি।

তুমিও কি পাগল হয়ে গেলে লিউক? এই ঢাক-ঢাক-গুড়-গুড়, এখন আমাকে কিছু বলতে পারছো না,–এসবের মানেটা কী?

ধরতে পারো ব্যাপারটা যথার্থই কঠিন। যার ছাদের নিচে তুমি বসবাস করছে, সে যদি নিজেই একজন খুনী হয়, তখন ব্যাপারটা গুছিয়ে বলা কঠিন ব্যাপার বৈকি।

***

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

মিলে-মিশে করি কাজ ব্রিজেট প্রায় এক মিনিট নিশ্চল থেকে বললো–গর্ডন? মাথা নেড়ে লিউক সম্মতি জানায়।

গর্ডন? গর্ডন খুনী? এমন উদ্ভট কথা জীবনে কখনো শুনিনি।

তোমার এই কথা মনে হলো?

ঠিক এই কথাই মনে হলো, কারণ গর্ডনকে দেখেছি–ও একটা মাছি পর্যন্ত মারতে চায় না।

লিউক বলে–হতে পারে, যদিও আমার জানা নেই। কিন্তু একথা সত্যি যে ও ক্যানারীটাকে মেরেছিলো এবং আমার স্থির বিশ্বাস যে, বেশ কিছুসংখ্যক মানুষ ও খুন করেছে।

কিন্তু লিউক, আমি কিছুতেই একথা বিশ্বাস করতে পারছি না।

জানি, শুনতে অবিশ্বাস্যই মনে হয়; তাছাড়া আমার মাথাতেও ঘুণাক্ষরে এ চিন্তা আসেনি– এমন কি গত পরশু পর্যন্ত আমি কোনো রকম সন্দেহ পর্যন্ত করিনি।

কিন্তু আমিও যে গর্ডনকে আগাগোড়া চিনি। আমি জানি ও কেমন মানুষ। ও একেবারে নিপাট, ভালো মানুষ–বড় বড় কথা বলে, কিন্তু তাতে ওকে কেবল করুণা করা চলে, আর কিছু নয়।

লিউক বলে–এখন থেকে ওর সম্পর্কে তোমার ধারণা পাল্টাতে হবে ব্রিজেট।

তাতে কোনো লাভ নেই লিউক, আদতেই আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। তোমার মাথায় কী করে এমন এক অসম্ভব চিন্তা এলো?–কেন, দুদিন আগেও তো তুমি নিশ্চিত ছিলে যে এলসওয়ার্দিই খুনী?

লিউক বলে–জানি জানি, তুমি ভাবছো যে, আগামীকাল হয়তো আমি সন্দেহ করবো টমাসকে, তার পরদিন হয়তো হর্টনকে। তবে তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো–আমি অতটা তালকানা নই। তবে যদি ভালো করে অনুধাবন কর, তাহলে দেখতে পাবে যে প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে অন্যান্য কার্যকারণের পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য আছে। এখন বুঝতে পারছি, মিস পিঙ্কারটন কেন স্থানীয় পুলিশের কাছে যেতে চাননি। ওরা ওঁকে একেবারে হেসেই উড়িয়ে দিতো; কাজেই স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডই ওঁর শেষ ভরসা ছিলো।

কিন্তু পর পর এতগুলো খুন করার পেছনে গর্ডনের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? না না, এ একেবারেই অসম্ভব কথা।

মানছি, কিন্তু একথা তো তুমি জান যে গর্ডন হুইটফিল্ড নিজেকে কী বিশাল একজন কেষ্ট-বিচ্ছু ভাবে?

ব্রিজেট বলে–তবুও আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা লিউক, তোমার হাতে কোনো প্রমাণ আছে?

প্রথম প্রমাণ ওর নিজের কথা। গত পরশু রাতে ও আমাকে বলেছিলো যে, যে-ই ওর বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তাকেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

এছাড়া, আরো কী আছে বলো?

ওই কথাগুলো ও যেভাবে বলেছিলো, সেই ভঙ্গীটাই হলো আসল; কথার সুরে ছিলো নিস্তরঙ্গ, শান্ত আত্মতুষ্টির আমেজ যেন বহুদিনের এক বদ্ধমূল বিশ্বাস থেকে প্রত্যেকটি কথা বলেছিলো। আর তখন ওর চোখমুখের প্রতিটি রেখায় যে হাসির সূক্ষ্ম প্রকাশ আমি দেখেছি তা যদি তুমি দেখতে, সমস্ত শরীরে একেবারে শিহরণ জাগানো অভিব্যক্তি। তারপর যেসব লোক ওর বিরুদ্ধাচরণের জন্য মারা গেছে, তাদের নামের তালিকা আর বিবরণ দিলো। মিসেস হর্টন, অ্যামি, টমি পিয়ার্স, হ্যারি কার্টার, আম্বলবি আর সেই ড্রাইভার রিভার্স।

আতঙ্কিত হয়ে ব্রিজেট বলে ওঠে–যারা সত্যি সত্যি মারা গেছে ও তাদেরই নাম করলো?

হা, হুবহু সেই নামগুলো। এবারে বিশ্বাস করলে তো?

ওঃ ভগবান! না করে পথ নেই? কিন্তু এর পেছনে ওর কী উদ্দেশ্য ছিলো।

একেবারে তুচ্ছ কারণ এবং সেটাই হচ্ছে আরো ভয়ঙ্কর। মিসেস হর্টন ওকে একবার কড়া কড়া কথা শুনিয়েছিলো; টমি পিয়ার্স একদিন ওকে অনুসরণ করে বাগানের মালীদের হাসিয়েছিলো; হ্যারি কার্টার কবে একবার ওকে খুব গালাগাল করেছিলো; অ্যামি গিবস্ অত্যন্ত অভব্য আর অভদ্র আচরণ করেছিলো ওর সঙ্গে; আম্বলবি জনসমক্ষে ওর বিরোধিতা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলো আর রিভার্স মিস ওয়েনফ্লিট এবং আমার সামনে ওকে শাসিয়েছিলা।

আতঙ্কে ব্রিজেট বলে ওঠে–কী ভয়ানক নির্মমতা–কী নিদারুণ…

এছাড়া বাইরের কিছু প্রমাণ আছে; যে গাড়ি মিস পিঙ্কারটনকে লন্ডনে চাপা দিয়েছিলো, সেটা ছিলো রোলস্ এবং সেই গাড়ির নম্বর আর হুইটফিল্ডের গাড়ির নম্বর এক।

এতেই তো সব প্রমাণ হয়ে যায়।আস্তে আস্তে ব্রিজেট বলে।

একথা সহজেই বোঝা যায়। লর্ড-এর মতো একজন বিত্তশালী ক্ষমতাবান লোকের সম্পর্কে কিছু বললে সহজে কেউ বিশ্বাস করবে না; বরঞ্চ ওর কথাই আগে বিশ্বাস করে নেবে।

তাহলেই দেখো, মিস পিঙ্কারটনেরও এই একই অসুবিধে ছিলো।

ব্রিজেট বলে–মিস পিঙ্কারটন দুএকবার আমাকেও কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন, আমি তখন বুঝে উঠতে পারিনি–মনে হয়েছিলো যেন কোনো বিপদ-আপদ থেকে আমাকে সাবধান করতে চেয়েছিলেন। এখন তার অর্থ বুঝতে পারছি।

এভাবে একত্র করলে দেখবে সবই ছকে মিলে যাচ্ছে। মিসেস হর্টনকে আঙুর পাঠালো হুইটফিল্ড, ওদিকে ভদ্রমহিলা ধরেই নিয়েছিলেন যে, নার্সরাই ওঁকে বিষ খাওয়াচ্ছে। ওয়েলারম্যান ক্রেইৎস গবেষণাগার দেখতে যাওয়ার মধ্যেও ওই একই উদ্দেশ্য। যেভাবেই হোক, ও সেখান থেকে কোনোরকমে একটা জীবাণু যোগাড় করে এনে আম্বলবির হাতের ক্ষতস্থানে সংক্রামিত করেছে।

আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না যে কী করে সেটা সম্ভব হলো।

আমিও জানি না। কিন্তু একথা ভুললে চলবে না যে একটা যোগসূত্র ছিলো।

তা চলবে না, তোমার কথায় বলা যায় যে, মিলে যাচ্ছে। তাছাড়া, অন্যের কাছে যা একেবারে অসম্ভব, ওর কাছে তা নয়, কারণ ওকে কেউ সন্দেহই করবে না।

তবে আমার ধারণা মিস ওয়েনফ্লিট সন্দেহ করেছিলেন। খুব আলগা করে কথায় কথায় সেই গবেষণাগারের প্রসঙ্গে দুএকটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন যে, আমি সেই ইঙ্গিত ধরে এগোতে পারবো।

উনি তাহলে প্রথম থেকেই জানতেন?

অন্ততঃ একটা দৃঢ় সন্দেহ ছিলো। তবে, এককালে ভালোবাসতেন বলে একটা অসুবিধেও ছিলো।

ঘাড় নাড়ে ব্রিজেট।-হা, এর থেকেই অনেক ঘটনার হিসেব পাওয়া যায়। গর্ডন একবার আমাকে বলেছিলো যে, ওদের দুজনের বিয়ে হবার কথা একেবারে ঠিক হয়ে গিয়েছিলো।

কি জানো, উনি মনে মনে চেয়েছিলেন যে, গর্ডন যেন সেই লোক না হয়; কিন্তু দিনে দিনে উনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ও-ই আসলে সেই লোক। আমাকে কিছু কিছু ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন কারণ ওর বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু করতে গিয়ে মিস ওয়েনফ্লিটের কিছুতেই মন সরছিলো না। একদিক থেকে মেয়েরা সত্যিই অদ্ভুত! আমার তো বিশ্বাস যে, ভদ্রমহিলা এখনও লোকটাকে অন্তর থেকে ভালোবাসেন…

ব্রিজেট দুএক মিনিট গভীর চিন্তায় ডুবে থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করে–সেদিন ট্রেনে মিস পিঙ্কারটন তোমাকে ঠিক কী বলেছিলেন এবং কিভাবে আরম্ভ করেছিলেন বলো তো?

লিউক বলে-বলেছিলেন যে উনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে যাচ্ছেন। এছাড়া গ্রামের পুলিশটির সম্পর্কে বলেছিলেন যে, এমনিতে নাকি লোকটি ভালো, তবে খুনের তদন্ত করার যোগ্যতা নেই।

এই বলেই কী কথা আরম্ভ করেছিলেন?

হা।

তারপর বলো।

তারপর উনি বলেছিলেন–বুঝতে পারছি আপনি আশ্চর্য হচ্ছেন, প্রথমটায় আমিও হয়েছিলাম–বিশ্বাসই করতে পারিনি। এমনও মনে হয়েছিলো যে, আমি সব কল্পনার চোখে দেখছি।

তারপর?

আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম যে, উনি ঠিক জানেন কিনা যে কল্পনার দৃষ্টিতে দেখেননি। এর জবাবে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উনি বললেন–কক্ষনো না। প্রথমটায় হয়তো মনে হতে পারতো; কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থবার যখন একই ঘটনা ঘটলো তখন আর কোনো সন্দেহ রইলো না। মন্তব্য করলো ব্রিজেট–অপূর্ব! বলল, বলে যাও।

আমি অবশ্য একটু ঠাট্টা করেই বলছিলাম যে উনি নিশ্চয়ই ঠিকই দেখেছেন। আসলে আমার মনোভাব তখন ছিলো একেবারে খাঁটি একজন অবিশ্বাসী টমাসের মতো।

জানি এমনই হয়। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমারও হয়তো একই মনোভাব হতো, নিজেকে ওই বৃদ্ধার থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমতী ভাবতাম। যাই হোক, তারপর কী নিয়ে আলোচনা করলে?

বিষপ্রয়োগ করে খুন করার প্রসঙ্গে ওয়েলসের সেই অ্যাবারক্রোম্বি মামলার কথা তুলে বললেন যে, উনি সেই খুনীর চোখের জিঘাংসাময় বিশেষ দৃষ্টির কথা তখন বিশ্বাস করেন নি, কিন্তু এখন করেন, কারণ অনুরূপ দৃষ্টি উনি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছেন।

তোমার কি মনে আছে যে, কথাগুলি উনি ঠিক কী বলেছিলেন?

লিউক বললো–উনি একেবারে নিখুঁত মহিলাসুলভ স্বরে বলেছিলেন–আমি যখন প্রথম এ খবর পড়ি, তখন আদৌ বিশ্বাস করিনি, কিন্তু ঘটনাটা সত্যি।আমি তখন প্রশ্ন করেছিলাম–কী সত্যি?–উত্তরে উনি বলেছিলেন, একজনের চোখের বিশেষ দৃষ্টি।–ব্রিজেট বিশ্বাস করো, যেভাবে উনি কথাগুলো বলেছিলেন তাতে আমার হৃৎকম্প আরম্ভ হয়েছিলো।

লিউক, সবকিছু আমাকে বিশদ করে বলো। থেমো না।

তারপর যারা খুন হয়েছে তাদের এক করে বর্ণনা দিলেন; অ্যামি গিব, কার্টার, টমি পিয়ার্স–টমি নাকি ছিলো এক দুরন্ত ডানপিটে শয়তান আর কার্টার ছিলো মাতাল। এরপর বলেছিলেন–কিন্তু এবার, এইতো মাত্র গতকাল–ডাঃ আম্বলবির দিকে–ভদ্রলোক অতি সজ্জন আর সত্যিকারের ভদ্রলোক।–আরো বলেন যে, উনি যদি আম্বলবির সঙ্গে দেখা করে তাকে সাবধানও করে দিতেন, তাহলেও কোনো লাভ হতো না কারণ, আম্বলবি ওঁর কথা আদৌ বিশ্বাস করতেন না, উপরন্তু হাসাহাসি করতেন।

ব্রিজেট বলে-বুঝেছি, বুঝতে পারছি।

লিউক চমকে ওঠে–কী হয়েছে ব্রিজেট? তুমি কী এতে ভাবছো?

মিসেস আম্বলবি একদিন আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, সে কথাটা মনে পড়ে গেল। যাকগে, তুমি কী বলছিলে বলো।

আমি বলেছিলাম যে, এতগুলো খুন করে পার পাওয়া খুব কঠিন। উত্তরে উনি বলেছিলেন—মোটেই নয়—ওখানেই ভুল করেছেন। যদি সবার সন্দেহের বাইরে থাকা যায়, তবে খুন করা খুবই সহজ। যে খুনীর কথা বললাম, সে এমনই একজন যে, তাকে কেউ সন্দেহই করবে না।

থেমে যায় লিউক। ব্রিজেটের সারা শরীর কেঁপে ওঠে।–খুন করা সহজ? সত্যিকথা অতি সহজ! এখন বুঝতে পারছি কথাগুলো কেন তোমার মনে গেঁথে আছে। আমি শুনলে আমারও থাকত সারা জীবন ধরে। গর্ডন হুইটফিল্ডের মতো একজনের পক্ষে-হ্যাঁ, খুব সহজ কাজই বটে।

কিন্তু ওর কাঁধে এই খুনের দায় চাপানো অত্যন্ত কঠিন।

তোমার তাই মনে হয়? আমি এ ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।

কিন্তু ব্রিজেট, আমি বারণ করছি।

তুমি তা করতে পারো না। সব শোনার পর কেউ চুপচাপ ঘরের কোণে বসে থাকতে পারে না, আমিও এর মধ্যে থাকছি। শোনো লিউক, আমি স্বীকার করেছি যে, বিপদের মধ্যে পা বাড়াচ্ছি, কিন্তু উপায় নেই; আমার যতটুকু করণীয় সেটুকু আমাকে করতেই হবে।

ব্রিজেট!

না লিউক, এ নিয়ে আর কথা নয় এর মধ্যে আমি থাকবোই। মিস ওয়েনফ্লিটের নিমন্ত্রণ নিলাম, আপাততঃ ওখানেই থাকবো।

কিন্তু ব্রিজেট, দোহাই তোমার!

বিপদ আমার একার নয়, আমাদের দুজনেরই–সে কথা আমি জানি। লিউক, আমরা দুজনেই একই পথের পথিক।

**

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

দস্তানা চাপিয়ে হাতে কেন যাও বন পথে

ওরা গাড়ির মধ্যে সারাক্ষণ যে আতঙ্কময় পরিবেশে কাটিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মিস ওয়েনফ্লিটের বাড়িটাকে মনে হচ্ছিল যেন এক প্রশান্তির আবাস।

লিউক বললো–আপনি যে অনুগ্রহ করে এখানে ওকে রাখছেন, এই ব্যবস্থাই–আমার সবচেয়ে ভালো মনে হচ্ছে মিস ওয়েনফ্লিট। আমি কিন্তু বেল-মোটলিতেই থাকবো, আর ওখান থেকে ব্রিজেটের দিকে নজর রাখবারও সুবিধে হবে–ও শহরে গেলে এ সুযোগ পেতাম না। তাছাড়া শহরে গিয়ে একজনের কী অবস্থা হয়েছিলো জানেনই তো।

মিস ওয়েনফ্লিট জিজ্ঞেস করলেন–আপনি পিঙ্কারটনের কথা বলছেন?

হা। যদিও একথা বলতে পারেন যে, শহরে জন-অরণ্যের মধ্যে নিরাপত্তা অনেক বেশি।

তার মানে এই দাঁড়াচ্ছে যে মানুষ পরস্পরকে হত্যা করতে চায় না–এই শুভবুদ্ধিই

নিশ্চয়ই। সভ্যতার সুফলের ওপর নির্ভর তো করতেই হবে।

গম্ভীর ভাবে মাথা দোলান মিস ওয়েনফ্লিট।

জিজ্ঞেস করে ব্রিজেট–মিস ওয়েনফ্লিট আপনি কতদিন হলো টের পেয়েছেন যে, গর্ডন হত্যাকারী?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া একটু কঠিন। যাই হোক, বলা যেতে পারে, আমার অন্তরের অন্তঃস্থল বেশ কিছুকাল আগে থেকে জানতো; কিন্তু আমি সেকথা মানতে চাইনি কারণ, আমি বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি; তাই নিজেকে একথা বোঝাতাম যে, একজন লোকের সম্পর্কে এ ধরনের চিন্তা করা অন্যায় এবং পাপ।

সরাসরি লিউক প্রশ্ন করে–আচ্ছা, আপনার নিজের জন্য ভয় ছিলো না?

মিস ওয়েনফ্লিট বললেন–অর্থাৎ, আপনি জানতে চাইছেন যে, গর্ডন যদি টের পেতে যে, আমি সব জানি, তাহলে সে আমাকে সরিয়ে ফেলতো কিনা?

হা।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–তেমন একটা সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি সর্বদা সচেতন ছিলাম এবং সেজন্য সতর্কও থাকতাম। মনে হয় না যে, আমার দিক থেকে গর্ডন কখনো বিপদের আশঙ্কা করেছে।

একথা মনে হবার কারণ?

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–কারণ, গর্ডন বোধহয় একথা বিশ্বাস করে যে আমি কখনো এমন কিছু করতে পারি না যাতে ওর কোনোরকম বিপদ হতে পারে।

লিউক প্রশ্ন করে–অত্যন্ত দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে আপনি তো ওকে সাবধান পর্যন্ত করেছিলেন–করেননি?

হ্যাঁ, আকার-ইঙ্গিতে আমি ওকে একথা বলতে চেয়েছিলাম যে, ও যাদের ওপর কোনো কারণে অসন্তুষ্ট, বেছে বেছে তারাই একের পর এক দুর্ঘটনায় মারা গেছে–এ ব্যাপারটা কেমন যেন অদ্ভুত।

তাতে ও কী বললো?–জানতে চায় ব্রিজেট।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–ওর প্রতিক্রিয়া দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যা বলতে চেয়েছিলাম, ও তার কাছেই গেলো না-বরঞ্চ মনে হলো ও যেন বেশ খুশী। বললো–ও তোমার চোখেও তাহলে পড়েছে?–আরো সঠিক করে বলা যায় যে, ও আত্মচর্চায় পরিপূর্ণ বিভোর।

লিউক বলে–একেবারে আস্ত পাগল।

মিস ওয়েনফ্লিট বললেন–সম্পূর্ণ সত্যি বলছেন। এছাড়া ওর সম্পর্কে আর কোনো ব্যাখ্যা নেই। ওর নিজের কাজের জন্য ও দায়ী নয়।

কথা বলতে বলতে লিউকের কাঁধে একখানা হাত রেখে মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–মিঃ ফিস্ উইলিয়াম্ ওরা কি ওকে ফাঁসী দেবে?

না না, হয়তো ব্রডমুরে পাঠাবে।

মিস ওয়েনফ্লিট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন–তবু ততো বেঁচে থাকবেন। আমি তাতেই খুশী।

লিউক বললো–কিন্তু তেমন জায়গায় পৌঁছতে আমাদের অনেক দেরি, যদিও আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে ব্যাপারটা এনেছি এবং তা থেকে এটুকু বলতে পারি যে, ওরা ওদের সাধ্যমত চেষ্টা করবে। কিন্তু একথা ভুললে চলবে না যে আমাদের হাতে সাক্ষী-প্রমাণ অতি সামান্যই আছে।

ব্রিজেট বললো–প্রমাণ আমরা যোগাড় করে ফেলবো।

ব্রিজেটের দিকে মিস ওয়েনফ্লিট চকিতে তাকান এবং ওঁর তাকানোর ভঙ্গী দেখে লিউকের মনে হলো যে, এমনই একটা ভঙ্গী এর আগেও ও যেন কোথায় দেখেছে। প্রাণপণে মনে করার চেষ্টা করেও কিছুতেই মনে এলো না।

মিস ওয়েনফ্লিট বললেন-তোমার খুব আত্মবিশ্বাস ব্রিজেট! সেইজন্যেই হয়তো যোগাড় করে ফেলতে পারবে।

লিউক বলে–ব্রিজেট, আমি গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছি, ম্যানর থেকে তোমার জিনিষপত্রগুলো নিয়ে আসি।

ব্রিজেট বলে–আমিও যাবো।

আমাকে কি একটি শিশু পেয়েছো যে মার মতো আচরণ করছো আমার সঙ্গে? তোমার নিরাপত্তাধীনে আমি কিছুতেই থাকবো না।–কথাগুলো লিউক রেগে বললো।

মিস ওয়েনফ্লিট বলে—ব্রিজেট, আমার মনে হয়, দিনের বেলা গাড়িতে ভয়ের কোন কারণ নেই।

ব্রিজেট বলে–আমি কি বোকা দেখুন! এইসব কাণ্ডকারখানা আমার মাথাটাকেও ঘুলিয়ে দিয়েছে।

সেদিন রাতে মিস ওয়েনফ্লিটও পাহারা দিয়ে আমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। এখন অস্বীকার করে লাভ নেই–বলুন, দেননি আপনি?

লিউকের কথা স্বীকার করে মিস ওয়েনফ্লিট বললেন–আপনি যে ওকে তখন একেবারেই সন্দেহ করেননি মিঃ ফিৎস্ উইলিয়াম। গর্ডন যদি টের পেতো যে আপনার এখানে আসার মূল কারণ খুনের তদন্ত করা, তাহলে আপনার ওপর বিপদ নেমে আসতে পারতো। সেই জন্যই সেই নিরিবিলি সরু রাস্তায় আপনাকে একা যেতে দিতে ভরসা পাইনি-পাছে কিছু বিপদ ঘটে এই ভয়ে। মনে রাখবেন যে, ও অত্যন্ত ধূর্ত। যতটা আপনি ভাবতে পারেন তার চেয়েও অনেক বেশি চালাক–একজন সত্যিকারের বুদ্ধিমান।

আপনার সত বাণী মনে রাখবো।

লিউক বলে–ঠিক করে বলুন তো মিস ওয়েনফ্লিট, আমার কি সত্যিই কোনো বিপদ হতে পারে।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–আমার মনে হয়, আসল বিপদ হলো ব্রিজেটের। ব্রিজেটের প্রত্যাখ্যান ওকে চরম অপমান করেছে। আমি নিঃসন্দেহ যে ব্রিজেটের ওপরই প্রথমে আক্রমণ হবে।

খানিকটা বিচলিত হয়ে লিউক বলে–আমার কথা শোন ব্রিজেট, তুমি এক্ষুনি–এই মুহূর্তে বিদেশে কোথাও চলে যাও।

ব্রিজেট বলে–আমি কোথাও যাচ্ছি না। লিউক আর আমি দুজনেই এই ঘটনার মধ্যে জড়িত।

লিউক বললো–সিংহের গুহা থেকে নিরাপদে ফিরে বেল-মোটলি থেকে তোমায় আমি ফোন করবো।

তাই কোরো।

শোন লক্ষ্মীটি, তুমি একদম দুশ্চিন্তা কোরো না। খুব পাকা খুনীরাও তাদের পরিকল্পনাতে কাজে লাগাতে কিছুটা সময় নেয়। আমার স্থির বিশ্বাস, আগামী দু-একদিন আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। সুপারিনটেন্টে ব্যাটল আজই লণ্ডন থেকে এসে যাচ্ছেন, তখন থেকেই হুইটফিল্ডের ওপর নজর রাখা হবে।

অর্থাৎ, সব কিছু সুসংবদ্ধ অবস্থায় আছে। অতএব, আমাদের আর কোনো রকম অতি নাটুকেপনা করার দরকার নেই।

লিউক ব্রিজেটের কাঁধে একখানা হাত রেখে বললেন–ব্রিজেট, লক্ষ্মীসোনা। তোমার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো যদি তুম হুট-হাট করে কিছু না করো।

বসবার ঘরে প্রবেশ করতেই ব্রিজেট দেখতে পেলো, মিস ওয়েনফ্লিট ঘরের টুকিটাকি জিনিষপত্র নিয়ে খুটখাট করছেন আর আপন মনে কথা বলছেন।

দেখো তো কাণ্ড! এখনো পর্যন্ত তোমার ঘরটা গুছিয়ে দেওয়া হলো না। বেশ তাজা এক কাপ চা করে দেবো। যা একটা ঝড়ঝাপ্টা তোমার ওপর দিয়ে গেল!

কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো আমার জানা নেই মিস ওয়েনফ্লিট! কিন্তু এখন সতিই আমার চায়ের কোনো দরকার নেই।

খেয়ে দেখো, একবার খাঁটি লপচুঙ–সউচ চা।

ঠিক তখনই এমিলি এসে দরজায় দাঁড়ালো,-মেমসাহেব, আপনি আমাকে কি কুঁচি দেওয়া বালিশের ঢাকনাটা পরাতে বললেন?

ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেলেন মিস ওয়েনফ্লিট। এই সুযোগে ব্রিজেট উঠে জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে পুরো চা টা ফেলে দিলো।

অতিথিকে ঠিকমতো পরিচর্যা করা হলো না মনে করে মিস ওয়েনফ্লিট যেন খানিকটা হতাশ হলেন।

ব্রিজেট তাড়াতাড়ি করে বললো–কে জানে লিউক কতক্ষণে আসবে।

ওঁকে নিয়ে ভেবো না। মিঃ ফিস্ উইলয়াম নিজেকে রক্ষা করবার ক্ষমতা রাখেন।

সে আমি জানি। লিউক যথেষ্ট শক্ত লোক।

এই সময়ে টেলিফোনটা বেজে উঠতেই ছুটে গিয়ে ব্রিজেট ধরতেই অন্য প্রান্ত থেকে লিউকের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে-হ্যালো, ব্রিজেট তুমি? আমি বেস-মোটলি থেকে কথা বলছি, তোমার বেরোবার পরিকল্পনাটা দুপুর পর্যন্ত মুলতুবী রাখতে পারবে? কারণ, ব্যাটল এইমাত্র এসে পৌঁছলো-বুঝতে পারছো তো, কার কথা বলছি?

স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের সেই সুপারিনটেটে তো?

হা। ভদ্রলোক কতকগুলো বিষয় নিয়ে এক্ষুনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান।

আমার দিক থেকে কোনো অসুবিধে নেই; তবে তুমি যখন আসবে, আমার জিনিষপত্রগুলো সঙ্গে নিয়ে এসো, আর তখনই শোনা যাবে ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার কী কথাবার্তা হলো।

ঠিক আছে, তাহলে তা-ই ঠিক রইলো–ছাড়ছি।

আচ্ছা।

টেলিফোনের রিসিভার নামিয়ে রেখে ব্রিজেট মিস ওয়েনফ্লিটকে ওদের দুজনের কথাবার্তার আনুপূর্বিক বর্ণনা দেয়।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন,–কিছু পুরানো কাপড়চোপড় নিয়ে কাছেই এক মহিলার বাড়ি যাচ্ছি। যাবে নাকি আমার সঙ্গে? খাওয়ার আগেই আমরা ফিরে আসবো।

ব্রিজেট রাজী হয়ে যায়।

পেছনের দরজা দিয়ে ওরা বেরিয়ে যায়। মিস ওয়েনফ্লিটের হাতে দস্তানা এবং মাথায় একটা ঘাসের টুপি।

নিজের মনে ব্রিজেট বললো–আমরা যেন সেজেগুজে একেবারে বণ্ড স্ট্রীটে যাচ্ছি।

ওরা পর পর দুটো মাঠ পেরিয়ে একটা সরু গোছের ভাঙ্গাচোরা রাস্তা ধরে গিয়ে পড়ে এক রুক্ষ ধূসর জঙ্গলের পথে।

ব্রিজেটের তখন দুটো কবিতার লাইন মনে ওঠে,

দস্তানা চাপিয়ে হাতে কেন যাও বনপথে,
অয়ি, ধূসর-বরণ কৃশাঙ্গী ভালোবাসা যার নেই বরাতে!

মিস্ ওয়েনফ্লিটের কথায় ওর চিন্তায় ছেদ পড়ে।

কথাগুলোর মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা না থাকলেও কী যেন একটা অজানা স্পর্শে ব্রিজেট চোখ মেলে তাকায়। মিস ওয়েনফ্লিট ব্রিজেটের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করেন-তোমার খুব ঘুম পাচ্ছে, না?

ব্রিজেটের এবার আর ভুল হয় না। ভদ্রমহিলার প্রশ্নের প্রচ্ছন্ন সুর সেই প্রায় অদৃশ অনুভূতিকেই এবার সাকার করে তোলে।

তাহলে ও ঠিকই ভেবেছিলো। ও ভেবেছিলেন যে একান্ত গোপনে, কারুকে না বলে ও নিজেই সেই ক্ষীণ সন্দেহের সত্য-মিথ্যে যাচাই করে নেবে। ও ধরেই নিয়েছিলো যে, ওর সন্দেহের কথা কেউ টের পায়নি; তাছাড়া, এত তাড়াতাড়ি যে আক্রমণ আসবে, তাও ছিলো ওর চিন্তার বাইরে। খোকা!–একেবারে ও নিরেট মূর্খ!

চট করে মনে পড়লো–চা!–চায়ের মধ্যে কিছু ছিলো। আমি চা খাইনি সেটা জানে না। এই সুযোগ নিতে হবে! ঘুমের ভান করতে হবে। চায়ের মধ্যে কী থাকতে পারে?-বিষ?-নাকি শুধুই ঘুমের ওষুধ? আশা করছে যে আমার ঘুমিয়ে পড়া উচিত–কথা থেকে সেটা পরিষ্কার।

ও আস্তে আস্তে আবার চোখের পাতা বন্ধ করে যথাসাধ্য ঘুমের ভান করে বলে–পাচ্ছে দারুণ। কী আশ্চর্য! কখনো আমার এত ঘুম পায় না।

মিস ওয়েনফ্লিটের মাথাটা অতি ধীরে দোলে।

ও মিস ওয়েনফ্লিটের ওপর নজর রাখে চোখের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে, আর চিন্তা করে–যাই আসুক না কেন সহজে আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না। কিন্তু ওকে দিয়ে সর্বপ্রথম কথা বলাতে হবে–ওর স্বীকারোক্তি যে দরকার।

গলার স্বর এবার কিছুটা চড়িয়ে আতঙ্কিত সুরে বলে-বুঝতে পারছি না আমার কি হলো!…কেমন যেন লাগছে…অত্যন্ত খারাপ লাগছে।

চতুর্দিকে চকিতে একবার দেখে নিলেন মিস ওয়েনফ্লিট। জায়গাটা একেবারে জনমানব শূন্য। গ্রামের থেকে বেশ খানিকটা দূর-চিৎকার করলে কারুর কানে পৌঁছবে না।

ধারে কাছে কোথাও কুঁড়েঘর পর্যন্ত নেই। কাঁপা কাঁপা হাতে মহিলা পুরানো কাপড়ের মোড়কটা আঁটছেন–মোড়কটা খুলে যেতে একটা বড় উলের পোশাক টেনে বের করে আবার কী যেন একটা খুঁজছেন–তখনও হাতে দস্তানা।

দস্তানা চাপিয়ে হাতে, কেন যাও বন পথে–কেন? দস্তানা কেন?…ঠিক, ঠিক। সমস্ত ব্যাপারটাই নিখুঁতভাবে পূর্বপরিকল্পিত।

কাগজের মোড়কটা খুলতেই তার মধ্য থেকে সেই ছুরি বেরিয়ে এলো। অতি সাবধানে হাতে ধরা, যাতে লর্ড হুইটফিল্ডের আজ সকালের হাতের ছাপ নষ্ট না হয়ে যায়। এইজন্যই হাতে দস্তানা?

ব্রিজেটের গা গুলিয়ে উঠলো। গলাটা ঈষৎ খরখরে করে নিস্তেজ স্বরে ও জিজ্ঞেস করে–ওটা কী? ছুরি?

মিস ওয়েনফ্লিট সঙ্গে সঙ্গে হেসে ওঠেন। সে হাসি বড় সাংঘাতিক। উনি বলেন–এটা তোমার জন্য ব্রিজেট, একান্তই তোমার জন্য। দীর্ঘকাল ধরে আমি তোমায় ঘৃণা করে এসেছি, তুমি হয়তো সে কথা জানোও না।

ব্রিজেট বললো–কেন? আমার গর্ডন-এর সঙ্গে বিয়ে হবার কথা ছিলো। সেইজন্য?

মিস ওয়েনফ্লিট বললেন–তুমি চালাক–অত্যন্ত চালাক মেয়ে; এবং তুমিই হবে ওর বিরুদ্ধে এক জলজ্যান্ত সাক্ষ্য। তোমার দেহ থেকে মাথাটা কাটা অবস্থায় এখানে পাওয়া যাবে এবং তার সঙ্গে পাওয়া যাবে ওরই ছুরি, আর সেই ছুরির হাতলে পাওয়া যাবে ওরই হাতের ছাপ! আজ সকালে এই ছুরিটা দেখতে চাওয়া কি দারুণ বুদ্ধির খেলা বলো তো? এবং তোমরা যখন ওপরে ব্যস্ত তারই ফাঁকে ছুরিটাকে রুমালে জড়িয়ে ব্যাগের মধ্যে রেখে দেওয়া কত সহজ কাজ! সমস্ত ব্যাপারটা যে এত সহজে হবে ভাবতেই পারিনি।

ব্রিজেট বললো–ওটা পেরেছেন কারণ আপনি একেবারে শয়তানের মতো ধূর্ত।

মিস ওয়েনফ্লিট বলেন–ঠিকই বলেছো, ছোটবেলা থেকেই আমার প্রচণ্ড বুদ্ধি। গর্ডন এলো–একজন সাদা-মাটা মুচির ছেলে; কিন্তু ওর খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো। তখন থেকেই আমি জানতাম ও একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে–আর ওই কিনা আমাকে প্রত্যাখ্যান করলো! আমাকে প্রত্যাখ্যান। সবকিছু ঘটেছিলো সেই বিশ্রী বিরক্তিকর পাখিটাকে কেন্দ্র করে।

গর্ডন র‍্যাগ প্রত্যাখ্যান করলো আমাকে কর্নেল ওয়েনফ্লিটের মেয়েকে। সেদিনই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমি এর প্রতিশোধ নেব। দিনের পর দিন রাতের পর রাত ভেবেছি; আর দিন দিন আমাদের অবস্থাও পড়ে যেতে লাগলো–আমরা গরীব হয়ে গেলাম, বাড়িটাও বিক্রি হয়ে গেলো–ওই কিনলো! আমাকে সাহায্য করার জন্য ও আমারই বাড়িতে আমাকে একটা চাকরি দিলো। আর তখন ওর ওপর আমার আরও বেশি ঘৃণা হলো। কিন্তু বুঝতে দিইনি আমার অন্তরের ইচ্ছে। ছোটোবেলায় আমি এই একটা প্রচণ্ড দামী শিক্ষা পেয়েছিলাম যে, মনের কথা মনেই চেপে রাখতে হয়।

প্রথম কটা বছর শুধু ভাবতাম কী করি…। প্রথমে ঠিক করেছিলাম ওকেই খুন করবো এবং তখন থেকেই লাইব্রেরিতে বসে সারাদিন ধরে সবার চোখ এড়িয়ে অপরাধতত্ত্বের বই পড়তে আরম্ভ করলাম। আমার সেই পড়াশোনার ফল কয়েকবারই হাতে-নাতে পেয়েছি–যেমন, অ্যামির বিছানার পাশে বোতল পাল্টাপাল্টি করে রেখে ওর ঘরের তালা ছোট্ট একটা কাঠি দিয়ে বাইরে থেকে বন্ধ করা। ওঃ, সেই মেয়েটার কী নাক ডাকিয়ে ঘুম। অত্যন্ত বিরক্তিকর।

ভদ্রমহিলা একটু দম নেন, তারপর বলেন–কী যেন বলেছিলাম?

ব্রিজেটের চরিত্রের একটা বড় গুণ–যা দিয়ে লর্ড হুইটফিল্ডকে ও খুশী করতে পেরেছিলো, তা হচ্ছে অন্যের কথা নিঃশব্দে সোনার মত ধৈৰ্য্য এবং এক্ষেত্রেও সেই একই গুণ কাজে এলো।

যদিও ওয়েনফ্লিট একজন উন্মাদিনী, খুনী, কিন্তু একথা সত্যি যে, তারও একজন নীরব শ্রোতার বড্ড প্রয়োজন। মিস ওয়েনফ্লিটকে কথা বলাবার জন্য যতটুকু দরকার ব্রিজেট মেপে ঠিক ততটুকু বলে-আপনি বলেছিলেন যে প্রথমে আপনি গর্ডনকে খুন করবেন ভেবেছিলেন।

হ্যাঁ, মনে করেছিলাম; কিন্তু সেটা আমার ভালো লাগলো না, একেবারেই গতানুগতিক মনে হলো। ওকে এমন শাস্তি দেওয়া ঠিক করলাম, যাতে ও খুনী হিসেবে চিহ্নিত হয়, যাতে নিজে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও পরস্পর কতগুলো খুনের দায় ওর ঘাড়ে চাপে। আমার অপরাধের জন্য ও ফাঁসির দড়িতে ঝোলে অথবা ও পাগল হয়ে যায়। একটা পাগল হিসেবে কয়েদখানায় থাকে…এটা যদি হয়, তাহলেই সবচেয়ে ভালো।

ভদ্রমহিলা খুক খুক করে হেসে ওঠেন। এ হাসি বড়ই মর্মবিদারক হাসি!

তোমাকে একটু আগেই বলেছি যে আমি অপরাধতত্ত্বের ওপর বেশ কিছু বই পড়েছি। ওখান থেকেই আমি ঠিক করলাম যে, কাকে খুন করা দরকার। প্রথম দিকে লোকে ওকে খুব একটা সন্দেহ করুক–এ আমি চাইনি। একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি যে খুন করে আমি আনন্দ পেতাম। সেই খুঁতখুঁতে মহিলা লেডি হর্টন–ভদ্রমহিলা এমনিতে আমাকে পছন্দ করতেন, দরকারে সাহায্যও করতেন; কিন্তু একদিন আমার সম্পর্কে বলতে গিয়ে বুড়ী বলে উল্লেখ করলেন। এর ঠিক কিছুদিন পরেই গর্ডনের সঙ্গেও ভদ্রমহিলার ঝগড়া হলো–আমার মনটা একেবারে নেচে উঠলো। ভাবলাম একই ঢিলে দুই পাখি মারবো। কী মজাটাই না করলাম। ওঁর বিছানার পাশে বসে ওঁর চায়ে আমি নিজেই বিষ মেশালাম, আর আমিই আবার বাইরে এসে নার্সদের বললাম যে, লর্ড হুইটফিল্ডের পাঠানো আঙুর মিসেস হর্টনের মুখে তেতো লেগেছে। কিন্তু এ কথার প্রতিবাদ করার জন্য সেই মহিলা আর বেঁচে রইলেন না।

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

তারপর একে একে অন্যদের। যখনই শুনতাম যে গর্ডন কারও ওপর রেগে গেছে, তখনই একটা করে দুর্ঘটনা ঘটানো এমন কিছু কঠিন নয়। আর ও এমন বোকা–এমন নিরেট মূর্খ। আমিই ওকে বিশ্বাস করিয়েছিলাম যে, ও এমনই একজন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ওর বিরুদ্ধাচরণ করলেই তার শাস্তি অনিবার্য। অতি সহজেই ও বিশ্বাস করেছিলো। আহা রে, আমার প্রাণের গর্ডন। সব কিছুতেই ওর অনড়, অটল বিশ্বাস–এমনই মোটা বুদ্ধি ওর!

মনে পড়ে ব্রিজেটের, সেও একদিন লিউককে বলেছিলা–গর্ডন?–সে সবই বিশ্বাস করে।–সহজ?–সত্যিই সহজ। বাগাড়ম্বর সম্পন্ন মূর্খ গর্ডন।

কিন্তু না। থামতে দিলে চলবে না–ওর আরও অনেক শোনার আছে।

ব্রিজেট বলে কিন্তু এসব আপনি করলেন কী করে? আমি কিছুতেই বুঝতে উঠতে পারছি না।

এতো সহজ ব্যাপার। অ্যামিকে যখনই ওর ম্যানর থেকে তাড়িয়ে দিলো, আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে রেখে দিলাম। হ্যাট পেইন্ট দিয়ে কাজ হাসিল করার বুদ্ধিটা আমার ভালোই খেটেছিলো; তার ওপর বাইরে থেকে দরজায় তালা বন্ধ করার কৌশলটাও আরও কাজে দিলো। সর্বোপরি, আমার সুবিধে ছিলো যে, খুন করার পেছনে আমার কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না। উদ্দেশ্য ছাড়া যে কেউ খুন করতে পারে, একথা চিন্তাই করা যায় না। কার্টারের ক্ষেত্রেও খুব সহজেই কাজ হাসিল করা গেছে। চারিদিকে কুয়াশায় আচ্ছন্ন, অস্পষ্ট; তার মধ্য দিয়েও টলতে টলতে আসছিলো। পুলের ওপর অপেক্ষা করছিলাম, ওখান থেকে দিলাম এক ধাক্কা– বিদুৎগতিতে–ব্যাস! রোগাপটকা হলেও আমার গায়ে বেশ জোর আছে।

তারপর ব্রিজেটের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন–জানো, লোকজন যে সত্যিই এতো বোকা একথা আমি আগে জানতাম না।

ব্রিজেট বলে-ডাঃ আম্বলবির ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হয়েছিলো?

তা হয়েছিলো। না হবার সম্ভাবনাই ছিলো বেশি; কিন্তু গর্ডন ওয়েলারম্যান ক্রেইৎস গবেষণাগারে গিয়েছিলো–এই কথা ও যখন সবার কাছে বলে বেড়াতে আরম্ভ করলো তখনই একটা বুদ্ধি আমার মাথায় এলো। ভাবলাম এটা কাজে লাগানো যায় কিনা–সেই অনুযায়ী ওয়াঙ্কিপু-র কানের ঘা-টা দেখাবার জন্য একদিন ডাঃ আম্বলবিকে ডাকলাম। উনি যখন ওয়াঙ্কিপু-র কানে ব্যাণ্ডেজ বাঁধছিলেন, তখন আমার হাতের কাঁচি দিয়ে ডাঃ আম্বলবির হাতটা খানিকটা চিরে দিলাম–যেন হাত ফসকে লেগে গেছে। এমন ভাব করলাম যেন লজ্জায় দুঃখে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছি. একটা ব্যাণ্ডেজ এনে ওঁর কাটা জায়গাটা বেঁধে দিলাম। আগে থেকেই ব্যাণ্ডেজের কাপড়ে ওয়াঙ্কিপু-র কানের পুঁজ-রক্ত খানিকটা মিশিয়ে রেখেছিলাম। ফলও ফললো।

ল্যাভিনিয়া পিঙ্কারটন। ও টের পেয়েছিলো। টমিকে সেই অবস্থায় ওই প্রথম দেখতে পায়। তারপর গর্ডন আর আম্বলবির মধ্যে যেদিন কথা কাটাকাটি হলো, সেদিন আমি আম্বলবির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম–তাও ওর নজরে পড়লো, দেখলাম, ও আমাকে একদৃষ্টে-একমনে লক্ষ্য করছে। তখনই বুঝে গেলাম ও জেনে গেছে। একথাও জানতাম যে, ও কিছুই প্রমাণ করতে পারবে না; তবে আবার এ কথাও মনে হলো যে, কেউ যদি–বিশেষ করে স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের লোকেরা ওর কথা বিশ্বাস করে তাহলেই ঝামেলা। আমি জানতাম সেদিন ও কোথায় যাচ্ছিলো। একই ট্রেনের অন্য একটা কামরায় আমি ওকে অনুসরণ করলাম। তার পরের ব্যাপারটা খুব সহজেই ঘটলো। হোয়াইট হলের সামনে রাস্তা পেরোবার জন্য ও দাঁড়ালো। ওর চোখ এড়িয়ে ঠিক ওর পেছনে আমিও গিয়ে দাঁড়ালাম। যেই একটা বড় গাড়ি এলো, গায়ের জোরে ভীড়ের মধ্য থেকে দিলাম একটা প্রচণ্ড ধাক্কা। আমার শরীরে প্রচণ্ড শক্তি। ও একেবারে সামনের চাকার তলায় পিষে গেলো। আমার পাশের মহিলাকে বললাম যে আমি গাড়ির নম্বর দেখতে পেয়েছি, এবং গর্ডনের গাড়ির নম্বরটা বললাম। ধরেই নিলাম যে ওই মহিলা পুলিশকে এই নম্বরই বলবে।

এই সেদিন লিউক ফিৎস্ উইলিয়ামের সামনেই রিভার্স কী কাণ্ডটাই না করলো গর্ডনের সঙ্গে! আর কৌতুকের ব্যাপার হলো; আমিই সঙ্গে করে লিউককে নিয়ে ও জায়গা দিয়ে যাচ্ছিলাম! তখন পর্যন্ত ভেবে পাচ্ছিলাম না যে, গর্ডনের ওপর কী করে লিউকের সন্দেহ জাগিয়ে তুলি। এবার সুযোগ পেয়ে গেলাম; রিভার্স মরলেই লিউক বাধ্য হবে গর্ডনকে সন্দেহ করতে।

আর এবার? এবারই হলো আসল মার–এই মারেই গোটা নাটকের নিখুঁত পরিসমাপ্তি। –ব্রিজেটের কাছে এবার উঠে সরে এসে বলেন–আমাকে তাচ্ছিল্য করলো গর্ডন। আমার জায়গায় ও তোমাকে বিয়ে করতে চাইলো। সারাটা জীবন ধরে কেবলই হতাশা-কিছুই পেলাম না কিছু না।

অয়ি, ধূসর-বরণ কৃশাঙ্গী ভালোবাসা যার নেই বরাতে।

মিস ওয়েনফ্লিট ব্রিজেটের গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়েন; মুখে মৃদু হাসি, চোখে উন্মাদনা…ছুরির ফলাটা ঝকঝক করছে।

ব্রিজেট সর্বশক্তি দিয়ে বাঘিনীর মতো এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মিস ওয়েনফ্লিটকে ফেলে দিয়ে ওঁর কব্জি সজোরে চেপে ধরে।

ওয়েনফ্লিট আচম্বিত আক্রমণে হতচকিত হয়ে মাটিতে পড়ে যান; কিন্তু নিজেকে পরমুহূর্তেই সামলে নিয়ে প্রতি আক্রমণ করেন। গায়ের জোরে এই দুজনের মধ্যে কোনো তুলনাই করা চলে না।

সময় যতই যায়, ওয়েনফ্লিটের জোরও যেন ততই বাড়তে থাকে। চিৎকার করে ওঠে ব্রিজেট।

লিউক..বাচাও…বাঁচাও।

কিন্তু ওকে বাঁচাতে কেউ আসে না। মরিয়া হয়ে ওয়েনফ্লিটের কব্জিতে প্রচণ্ড জোরে চাপ দিতেই হাত থেকে ছুরিটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই সেই পাগলিনীর দুটো হাত ওর গলায় বেড়ির মতো চেপে বসে ওর প্রাণশক্তিকে চাপ দিয়ে বের করে দিতে চাইলো। শেষবারের মতো এক আর্ত-চিৎকার বেরিয়ে এলো ব্রিজেটের গলা থেকে…।

***

মিসেস আম্বলবির জবানবন্দী

সুপারিনটেন্টে ব্যাটল-এর চেহারা দেখে ভালই লাগলো লিউকের। লিউক বেশ সতর্কতার সঙ্গে ভদ্রলোককে যাচাই করে। ও জানে যে, এদের ওপর আস্থা রাখলে সুফল পাওয়া যায়।

তদন্তে আসার ব্যাপারটাকে কি একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে গেল না?

মৃদু হেসে ব্যাট বললেন–কিন্তু মিঃ ফিস্ উইলিয়া, ঘটনাটা তো মারাত্মক আকারও নিতে পারে? বিশেষ করে লর্ড হুইটফিল্ডের মতো লোক যেখানে জড়িত, কোনো রকম ভুলভ্রান্তি হয়ে গেলে তার ফলাফল বিপজ্জনক হতে পারে।

ঠিক বলেছেন। আপনি কি একা এসেছেন?

না না,আমার সঙ্গে একজন গোয়েন্দা অফিসার আছেন। উনি আপাততঃ সেভেন-স্টার-এ অপেক্ষা করছেন; ওর প্রধান কাজ হলো লর্ড হুইটফিল্ডের ওপর নজর রাখা।

ও, আচ্ছা।

মিঃ ব্যাটল জিজ্ঞেস করেন–মিঃ ফিৎস্ উইলিয়াম, বলুন তো আপনি কি পুরোপুরি নিঃসন্দেহে?–অর্থাৎ, আপনি যাকে নিয়ে আশঙ্কা করছেন, সেখানে কোনো ভুলভ্রান্তির অবকাশ নেই তো?

ঘটনা যা সংগ্রহ করতে পেরেছি, তাতে মনে হয় না, যে আমার সন্দেহ অমূলক। আপনাকে কি ঘটনাগুলো বলবো?

না, তার দরকার হবে না, আমি স্যার উইলিয়ামের কাছে সবই শুনেছি।

তাহলে বলুন আপনার কী মনে হয়? লর্ড হুইটফিল্ডের মতো লোক যেন এমন সব কাণ্ড করতে পারেন, সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে অভাবিত মনে হচ্ছে?

মিঃ ব্যাটল বললেন–খুব কম জিনিষই আমার আছে অভাবিত বলে মনে হয়। আমার মতে অপরাধ-বিজ্ঞানের অসম্ভব বলে কোনো কথা নেই। আপনি যদি একজন বৃদ্ধা মহিলা অথবা স্কুলের একটা ছোট্ট মেয়েকে অপরাধী বলে সন্দেহ করেন, তাহলেও আপত্তি করব না–আমি বরঞ্চ যাচাই করে দেখবো।

আপনি যখন স্যার উইলিয়ামের কাছে আগের সব ঘটনাই শুনেছেন, তখন তার আর পুনরাবৃত্তি না করে বরঞ্চ আজ সকালে যা যা ঘটেছে, তার একটা মোটামুটি বর্ণনা দিচ্ছি।

আজ সকাল বেলায় লর্ড হুইটফিল্ডের বাড়িতে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিলো, লিউক তার আনুপূর্বিক বর্ণনা দেয়।

গভীর মনোযোগ দিয়ে ব্যাটল সব শুনে বললেন–আপনি বলছেন যে, ও ছুরির ধার পরীক্ষা করছিলো? ছুরিটা নিয়ে কি কারো দিকে কোনো রকম ইঙ্গিত করেছিলো বা কাউকে ভয় দেখাতে চাচ্ছিলো?

খোলাখুলি ভাবে তেমন কিছু করেনি; তবে কেমন যেন একটা কুৎসিত ভাবে ধারটা পরীক্ষা করছিলো–চোখে-মুখে কেমন যেন একটা বিজাতীয় আনন্দের ভাব ছিলো। মিস ওয়েনফ্লিটও হয়তো সেটা লক্ষ্য করেছেন।

ও, আপনি সেই ভদ্রমহিলার কথা বলছেন যিনি একেবারে ছোটবেলা থেকে লর্ড হুইটফিল্ডের পরিচিতা-যাঁর সঙ্গে ওর বিয়ে হবার কথা ছিলো?

ঠিকই ধরেছেন।

ব্যাটল বললেন–আপনি মিস কনওয়ের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত থাকতে পারেন মিঃ ফিটস উইলিয়াম। আমি এক্ষুনি কাউকে ডেকে ওঁর ওপর নজর রাখতে বলে দিচ্ছি। ওঁর সঙ্গে যদি লর্ড হুইটফিল্ড-এর গতিবিধির ওপরও জ্যাকসন সতর্ক দৃষ্টি রাখে, তাহলে আর কোনো বিপদ ঘটবে বলে মনে হয় না।

এতক্ষণে সত্যিই আমি নিশ্চিত হলাম।

ব্যাটল বললেন–মিস কনওয়েকে নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তার কারণ আমি বুঝতে পারছি মিঃ ফিস্ উইলিয়াম্। একটা কথা বলছি আপনাকে,–এই কেসটা খুব একটা সহজ বলে আমার মনে হয় না। লর্ড হুইটফিল্ডকে মনে হচ্ছে অত্যন্ত ধূর্ত লোক। আমার মনে হচ্ছে, ও যতক্ষণ পারবে ততক্ষণ আগাগোড়া মিথ্যে কথা বলবে–একেবারে শেষ পর্যন্ত।

শেষ পর্যন্ত বলছেন কেন?

এক শ্রেণীর অপরাধী আছে, যারা নিজেকে প্রচণ্ড বুদ্ধিমান ভাবে; তারা কিছুতেই ধরা পড়বে না–এমন একটা চেতনা ওদের গর্বিত করে তোলে। লর্ড হুইটফিল্ডও মনে হচ্ছে সেই শ্রেণীর অপরাধী। তবে, শেষ পর্যন্ত ওকেও আমরা ধরে ফেলবো।

লিউক বলে–আপনার কথাই যেন সত্যি হয়; তবে আমি যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি–আমাকে বলবেন।

নিশ্চয়ই বলবো।

এক্ষুনি কি করণীয় কিছু ভেবেছেন?

ব্যাটল বলেন–এই মুহূর্তে কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। এই জায়গাটা আর তার পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে আমি কিছু কিছু খবর চাই। সন্ধ্যাবেলায় আপনার সঙ্গে আর একবার খানিকক্ষণ পরামর্শ করতে পারবে তো?

অনায়াসে।

তখন আপনাকে ভালো করে বলতে পারবো যে অবস্থাটা কী!

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

লিউক ঘড়ির দিকে তাকায়। দুপুরবেলার খাওয়ার আগে একবার ব্রিজেটের কাছে যাবে কিনা ভাবে। পরে ওর মনে হয় যে, যাওয়াটা উচিত হবে না; ও গেলে মিস ওয়েনফ্লিট ওকেও খেয়ে যেতে বলবেন, আর তাতে ভদ্রমহিলার খুবই অসুবিধে হবে। ও ওর নিজের কাকীমা, জেঠিমাদের দেখে এইটুকু বুঝেছে যে এই মধ্যবয়স্কা মহিলারা ঘর-সংসার তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে বড়ই খুঁতখুঁতে হয়ে থাকেন। আচ্ছা, মিস ওয়েনফ্লিটও কি কারো পিসি বা মাসি?-হতেও তো পারেন।

হোটেলের বাইরে লিউক বেরিয়ে আসে। কে যেন একজন কালো পোশাক পরা ওকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।

মিস ফিৎস্ উইলিয়াম।

আরে, মিসেস আম্বলবি?–এগিয়ে এসে লিউক মিসেস আবির হাত দুখানা ধরে।

আমি ভেবেছিলাম, আপনি চলেই গেছেন।

না, থাকবার জায়গাটা শুধু বদল করেছি মাত্র–আমি এখন থেকে এই হোটেলেই আছি।

আর ব্রিজেট? শুনেছিলাম যে ও অ্যাশম্যানর থেকে চলে এসেছে।

হ্যাঁ, ও-ও বেরিয়ে এসেছে।

মিসেস আম্বলবি বলেন–আমি সত্যিই খুব নিশ্চিন্ত হলাম। উইচউড থেকে চলে গিয়ে ও সত্যিই ভালো করেছে।

না যায়নি, এখানেই আছে। ও মিস ওয়েনফ্লিটের কাছে রয়েছে।

লিউক দেখলে যে কথাটা শুনেই মিসেস আম্বলবির মুখে একটা আতঙ্কের ছাড়া পড়লো।

হনরিয়া ওয়েনফ্লিটের সঙ্গে আছে? কিন্তু কেন?

মিস ওয়েনফ্লিট ওকে দুচারদিন ওখানেই থাকতে বলেছেন।

মিসেস আম্বলবি বললেন–মিঃ লিউক আমার হয়তো একথা বলার অধিকার নেই–হয়তো কিছুই বলা উচিত নয়; আমি নিজেই দুঃখ-শোকে একেবারে জর্জরিত। আমি যা বলবো, শুনে হয়তো আপনার মনে হবে যে, আমি বাজে কথা বলছি; আপনার একথাও মনে হতে পারে, যে অসুস্থতার ফলে আমি যা-তা বলছি।

লিউক বলে–আপনি কী বলতে চাইছেন?

দুষ্কার্য সম্পর্কে আমার একটা বিশ্বাসের কথা।

লিউক অপেক্ষা করে থাকে উনি কী বলেন শোনার জন্য।

কী প্রচণ্ড এক শয়তানি! উইচউডের আকাশে-বাতাসে সব সময়ে এক শয়তানের খেলা চলেছে; আর ওই মহিলাই হচ্ছে এই সব শয়তানির মূল কারণ এ সম্পর্কে আমার আর কোনো সন্দেহই নেই।

লিউক যেন এক ধাঁধায় পড়ে যায়–আপনি কোনো মহিলার কথা বলছেন?

মিসেস আম্বলবি বলেন–হনরিয়া ওয়েনফ্লিট একটা আস্ত শয়তান! ল্যাভিনিয়া পিঙ্কারটনকেও কেউ বিশ্বাস করেনি; কিন্তু আমরা দু জনেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলাম। ও আমার চেয়ে বেশি জানতো…একটা কথা মনে রাখবেন মিঃ ফিৎস্ উইলিয়াম, কোনো মহিলা যদি জীবনে অসুখী হয়, সে যে-কোনো ধরনের দুষ্কার্য করতে পারে।

লিউক বলে–তা হয়তো পারে।

লিউক ভদ্রমহিলার যাওয়ার পথে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ওর মাথায় কেবলই ঘুরছে যে মিসেস আম্বলবি হনরিয়াকে শয়তান বললেন কেন। আরও একটা কথা কী যেন বললেন ভদ্রমহিলা?–পিঙ্কারটনকেও কেউ বিশ্বাস করেনি। তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে পিঙ্কারটন ওঁর সন্দেহের বিষয়ে মিসেস আম্বলবিকে সব খুলে বলেছিলেন।

লিউকের চোখের সামনে ফুটে উঠলো ট্রেনের কামরায় একটি উদ্বিগ্ন মুখ, যেন আকুল কণ্ঠে বলছে–সেই একজনের কী নির্মম চোখের দৃষ্টি।ভদ্রমহিলার মুখ-চোখ যেন সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিলো এই কথা বলার সময়ে। যে কী অভিব্যক্তি চোখ-মুখের। লিউক মুহূর্তের জন্য দেখেছিলো, ভদ্রমহিলার সেই শান্ত মুখখানার মধ্যে নিমেষেই কী বিরাট পরিবর্তন! চোখের দৃষ্টি তার হয়ে উঠলো মরা মাছের মতো স্থির আর নিশ্চল।

কিন্তু ঠিক এই রকম একটা মুখভঙ্গী, আর সেই একই চোখের দৃষ্টি আমি দেখেছি–দুএকদিনের মধ্যেও দেখেছি–কোথায়…? কখন? আজ সকালেই কি? ঠিকই তো! মিস ওয়েনফ্লিট! উনি যখন নিজের বাড়ির বসবার ঘরে ব্রিজেটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সেই সময়ে!

ল্যাভিনিয়া পিঙ্কারটনও বিশেষ কোনো লোকের–না, না, কোনো ব্যক্তি বিশেষের চোখের দৃষ্টির কথা বলেছিলেন। হয়তো ওঁর ক্ষেত্রেও একই জিনিষ ঘটেছিলো; উনি যেমনটা দেখেছিলেন, তেমনটা নিজের অভিব্যক্তির মধ্যেও ফুটে উঠেছিলো।

লিউক হাঁটা ধরলো মিস ওয়েনফ্লিটের বাড়ির দিকে। লিউকের মন বলতে লাগলো–মিস পিঙ্কারটন কক্ষনো কোনো পুরুষমানুষের কথা বলেননি–তুমি নিজেই ধরে নিয়েছিল লিউক, সে পুরুষ–কিন্তু উনি তা বলেননি–হ্যায় ভগবান, আমি কি পাগল হয়ে গেলাম? আমি যা ভাবছি তা কখনোই হতে পারে না…এ কিছুতেই সম্ভব নয়। আমার ভাবনার মধ্যে কোনো মাথামুণ্ডুই নেই কিন্তু সে যাই হোক, আমাকে এক্ষুনি ব্রিজেটের কাছে যেতে হবে, নিজের চোখে দেখতে হবে ও নিরাপদে আছে কিনা। সেই দুটো হালকা বাদামী রঙের চোখ আর চোখের সেই বিচিত্র ভয়াল দৃষ্টি! নাঃ, আমি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছি। আসলে হুইটফিল্ড অপরাধীও ছাড়া আর কেউ নয়। ও নিজেও একরকম স্বীকারই করেছিলো।

কিন্তু তা সত্ত্বেও লিউক মিস ওয়েনফ্লিটের বাড়ির দিকেই চললো।

ছোটোখাটো সেই ঝি-মেয়েটি লিউককে হতচকিত হয়ে দরজা খুলে দিয়ে ভয়ে ভয়ে বললো–মিস ওয়েনফ্লিট আমাকে বলতে বলেছেন যে, উনি বাইরে চলে গেছেন। আমি এক্ষুনি দেখে আসছি উনি সত্যি সত্যি চলে গেছেন কিনা।

মেয়েটিকে ঠেলে দিয়ে লিউক প্রায় ছুটে হুড়মুড় করে বসবার ঘরে গিয়ে ঢুকলো আর এমিলি দৌড়ে ওপরের তলায় গিয়েই একছুটে নেমে এসে প্রায় দম-ফুরোনো গলায় বললো–সেই নতুন মেম সাহেবও বেরিয়ে গেছেন।

মেয়েটির কাঁধ দুটো ধরে ঝাঁকিয়ে লিউক বললো–কোনো দিকে গেছে? কোথায় গেছে?

ঢোক গিলে মেয়েটি বললো–আমি তো সব সময়ে রান্নাঘরে ছিলাম; সামনের দরজা দিয়ে গেলে আমি নিশ্চয়ই দেখতে পেতাম। ওঁরা পেছনের দরজা দিয়েই গেছেন।

প্রায় ছুটে ছোট একটা বাগান পেরিয়ে লিউক রাস্তায় এসে পড়লো। ওর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিও সদর দরজা পর্যন্ত ছুটে আসে। একজন লোক কিছুটা দূরে বড় একটা কাঁচি দিয়ে গাছের মাথা হেঁটে দিচ্ছিলো; লিউক এগিয়ে গিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো যে, সে দুজন মহিলাকে যেতে দেখেছে কিনা।

লোকটি বললো–দুজন মহিলা? হ্যাঁ, বেশ কিছুক্ষণ আগেই গেছে, আমি তখন ওই বেড়ার নিচে বসে খাচ্ছিলাম–তবে, ওঁরা আমায় দেখেছেন বলে মনে হয় না।

কোনো দিকে গেছেন?

লোকটা লিউকের দিকে তাকিয়ে বললো–ওই মাঠের ভেতর দিয়ে ওঁদের যেতে দেখেছি; তার পরে ওঁরা কোথায় গেছেন লক্ষ্য করিনি।

লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবার ও রীতিমতো ছুটতে আরম্ভ করে।বড্ড দেরি হয়ে গেছে, বড্ড দেরি হয়ে গেছে, যেভাবেই হোক ওদের ধরতে হবে।-ও কি পাগল হয়ে গেল কি?

ও পর পর দুটো মাঠ এভাবে পেরিয়ে গেল। সামনে একটা ছোটো পাড়গেয়ে মেঠো পথ। কোনো দিকে এবারে যাবে বুঝতে না পেরে ও একটু দাঁড়ায়, আর তখনই শুনতে পায়, সেই আকুল আর্তনাদ–লিউক, লিউক…বাঁ-চা-ও!

লিউক দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিলো, সেদিকে ছুটতে আরম্ভ করলো। আরও কিছুটা এগোতেই একটা হুটোপাটি আর তার সঙ্গে একটা গোঙানীর আওয়াজ শুনতে পেলো।

বনবাদাড় পেরিয়ে প্রচণ্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে ও এক উন্মত্ত মহিলার শক্ত বেড়ির মত বসা হাত দুখানা টেনে ধরতেই তার সে কী ভীষণ চীৎকার। মহিলার সমস্ত শরীর তখন থর থক্ করে কাঁপছে, মুখ দিয়ে সাবানের ফেনার মতো গাঁজলা বেরোচ্ছে। সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁকুনি দেওয়াতে মহিলা শেষ পর্যন্ত লিউকের হাতের মধ্যেই এলিয়ে পড়লেন।

***

নতুন দিগন্ত

কী যে হচ্ছে, আমি তার কিছুই বুঝতে পারছি না।-গাম্ভীর্য বজায় রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও লর্ড হুইটফিল্ড ভেতরে অস্থির, হতাশ ভাবটা গোপন রাখতে পারলেন না। হুইটফিল্ড ঘটনারাশির আকস্মিকতায় একেবারে হতচকিত এবং হতভম্ব।

ব্যাটল অবস্থাটা আন্দাজ করতে পেরে শান্ত স্বরে বললেন-আমরা সমস্ত ব্যাপারটা অনুসন্ধান করে দেখেছি তাতে দেখা যাচ্ছে যে, ওয়েনফ্লিট পরিবারের প্রায় সকলের মধ্যেই একটা মানসিক বৈকল্যের লক্ষ্মণ প্রথম থেকেই ছিলো; তার ওপর এই মহিলার ছিলো গগনচুম্বি উচ্চাকাঙ্ক্ষা। প্রথমতঃ কোনো দিকেই সে উচ্চাশা ফলপ্রদ হয়নি, তার ওপর ভালোবাসার ক্ষেত্রেও পেলো এক প্রচণ্ড আঘাতআবার বললেন–শুনলাম, আপনিই ওকে সেই আঘাত দিয়েছিলেন।

এই আঘাত কথাটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না।–আরো গম্ভীর হবার চেষ্টা করে। লর্ড হুইটফিল্ড বললেন।

তৎক্ষণাৎ কথাটা সংশোধন করে সুপারিনটেন্টে ব্যাট বললেন–অর্থাৎ, আপনিই বিয়েটা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?

তা–তা দিয়েছিলাম।

ব্রিজেট বললা–কেন দিয়েছিলে আমাদের বলো গর্ডন।

লর্ড হুইটফিল্ড বললেন–ঠিক আছে, যদি একান্তই শুনতে চাও বলছি। হনরিয়ার একটা ক্যানারী পাখি ছিলো–ও খুব ভালোবাসতো পাখিটাকে। পাখিটার একটা অভ্যাস ছিলো হনরিয়ার ঠোঁট থেকে চিনির টুকরো টুকরে তুলে নেওয়া। একদিন ঐভাবে নিতে গিয়ে পাখিটা হনরিয়ার ঠোঁট কামড়ে দেয় আর তাতে রেগে গিয়ে ও পাখিটার ঘাড় মটকে ওটাকে মেরে ফেললো। সেই দৃশ্য দেখার পর ওর ওপর আমার ধারণা গেল পান্টে। কিছুতেই আর আগে মন নিয়ে ওকে দেখতে পারলাম না এবং ওকেও সেই কথাই বললাম যে, আমরা বোধহয় পরস্পর এতদিন ভুল করেছি।

ব্যাটল বললেন–সেই থেকে আরম্ভ। ও নিজেই মিস কনওয়েকে বলেছে যে, সেই থেকে ওর লক্ষ্য ছিলো প্রতিশোধ নেওয়া–ওর বুদ্ধিবৃত্তি সবই এই দিকেই নিয়োগ করেছিলো।

একটা খুনী হিসেবে আমাকে ধরিয়ে দেবার জন্য? এ আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না।

কিন্তু গর্ডন, এ কথা সত্যি। তুমি নিজেই তো আশ্চর্য হয়েছিলে দেখে, যে-লোক তোমার বিরুদ্ধাচরণ করতো, অচিরেই সে মারা যেতো।–ব্রিজেট বললো।

তার একটা অন্য গূঢ় কারণ। তুমি একথাটা বোঝবার চেষ্টা করো গর্ডন, টমি পিয়ার্সকে জানলা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া বা অন্যান্য যারা একের পর এক খুন হয়েছে, তার পেছনে নিয়তির কোনো হাত নেই–সবই হনরিয়া ওয়েনফ্লিটের কাণ্ডকারখানা।

লর্ড হুইটফিল্ড অস্বীকার করে বলেন–আমার কাছে সবই কেমন একটা ধাঁধার মতো লাগছে।

আপনিই তো বললেন যে আজই কে একজন আপনাকে ফোন করেছিলো?–প্রশ্ন করেন ব্যাট।

হ্যাঁ, বারোটা নাগাদ। বললো। আমি যেন তক্ষুণি শর জঙ্গলে যাই। ব্রিজেট তুমি না-কি খুব জরুরী বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলে?

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

ব্যাটল বলেন–তাহলেই দেখুন, ওখানে একবার গেলে আর দেখতে হতো না; যাকে বলে, একেবারে স-প্রমাণ ধরা পড়ে যেতেন। ভেবে দেখুন, মিস কনওয়ের ঘাড় থেকে মাথা কাটা, পাশেই পড়ে আছে আপনার ছুরি; ছুরির হাতলে আপনার আঙুলের পরিষ্কার ছাপ–সর্বোপরি যে সময়ে খুনটা হয়েছে সেই সময়েই আপনাকে ওই অঞ্চলে দেখা গেছে। দাঁড়াবার মতো একটুকরো মাটিও থাকতো না আপনার পায়ের নিচে-যে কোনো জুরি আপনাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতো।

আমাকে? এমন কেউ আছে যে আমার সম্পর্কে, এসব উদ্ভট কথা বিশ্বাস করতো?–লর্ড হুইটফিল্ডের কণ্ঠস্বরে বিস্ময়, ব্যথা-একীভূত।

ব্রিজেট বললো–অন্ততঃ আমি করতাম না গর্ডন, কখনো আমি তোমার সম্পর্কে একথা মেনে নিতে পারতাম না।

কথা শেষ করেই লর্ড হুইটফিল্ড বাইরে বেরিয়ে গেলো।

লিউক বললো–ব্রিজেট, এবার তুমি বলো, ওয়েনফ্লিটকে তুমি কেন সন্দেহ করলে?

ব্রিজেট ব্যাখ্যা করে–আমি প্রথমে সন্দেহ করলাম, যখন তুমি বললে যে, গর্ডন খুনী। কথাটা আমি বিশ্বাস করিনি কারণ ওর বাইরেটা আর ভেতরটা–দুটোই আমার জানা। এটা স্বীকার করি যে, ও আড়ম্বরশালী, মোটাবুদ্ধি সম্পন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক লোক; কিন্তু ওর মন ফুলের মতো নরম আর ও অস্বাভাবিক রকম দয়ালু। একটা শুয়োপোকা মারতে পর্যন্ত ওর হাত ওঠে না। শুনেই বুঝতে পেরেছিলাম যে ওর পক্ষে ক্যানারী পাখির ঘাড় মটকে মেরে ফেলার কথা সবটাই মিথ্যে-ভুল। দ্বিতীয়তঃ গর্ডন একদিন গল্পচ্ছলে আমাকে বলেছিলো যে, ও-ই ওয়েনফ্লিটকে বিদায় করেছিলো। অথচ তোমার কাছে শুনলাম ঠিক তার উল্টোটা। কিন্তু ক্যানারীর গল্প কিছুতেই সত্যি হতে পারে না, অমন একটা কাজ গর্ডনের পক্ষে একেবারে অসম্ভব। জানো? ও শিকারে পর্যন্ত যায় না, কারণ রক্ত দেখলেই ওর শরীর গুলিয়ে ওঠে।

সুতরাং একথা পরিষ্কার বুঝতে পারলাম যে, গল্পের ওই অংশটুকু পুরোপুরি মিথ্যে।

এরপর মনে প্রশ্ন জাগলো, আর কী কী ও বলে থাকতে পারে? একটা ব্যাপার সহজেই বোঝা যায় যে মহিলা অত্যন্ত অহঙ্কারী; কেউ ওকে প্রত্যাখ্যান করেছে–এ চিন্তা ওর গর্ববোধকে প্রচণ্ড আঘাত করবেই; এবং তার ফলে রেগে গিয়ে প্রতিহিংসা নেবার চেষ্টা করাটা বিচিত্র নয়–বিশেষ করে লর্ড হুইটফিল্ড আবার যখন সামাজিক ও আর্থিক ক্ষেত্রেই উত্তর জীবনে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করলো। তাই গর্ডনের মতো একজন মোটাবুদ্ধির মানুষের কাঁধে এক মিথ্যে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া বা মিথ্যে জাল জড়িয়ে ফেলা ওয়েনফ্লিটের মতো মেয়েমানুষের পক্ষে অতি সহজ। আমার মন বললো–আপাতঃ দৃষ্টিতে যতই কঠিন হোক, এমন যদি হয়ে থাকে যে, এই মহিলাই সবগুলো খুন এমন ফন্দি করে করেছে, যাতে করে গর্ডনকে দিয়ে সহজেই বিশ্বাস করানো যায় যে, পর-পর সবকটা মৃত্যুই এক ঐশ্বরিক অমোঘ বিধান?–ওর পক্ষে গর্ডনকে একথা বিশ্বাস করানো মোটেই দুঃসাধ্য নয়। তোমাকে আমি এর আগেই বলেছি যে, গর্ডন সব কিছুই বিনা দ্বিধায় বিশ্বাস করে। তারপরে ভাবলাম–ওর পক্ষে কি এতগুলো খুন করার সুযোগ ছিলো?–অনুধাবন করে দেখলাম–হ্যাঁ ছিলো। একজন মাতালকে একটা ছোট্ট ধাক্কা দেওয়া, একটা বাচ্চা ছেলেকে জানলা থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া

ওর পক্ষে কঠিন কিছু নয়। আমি গিবস্ তো ওর বাড়িতেই ছিলো। মিসেস হর্টনের অসুস্থতার সময়ে ও প্রতিদিন ওখানে যাতায়াত করতো। ডাঃ আম্বলবির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিছু কঠিন ছিলো। এটা চিন্তা করে বের করতে পারিনি যে, ও ওয়াঙ্কিপু-র কানের ঘা থেকে ব্যাণ্ডেজ বাঁধবার কাপড় দূষিত-করে ডাঃ আম্বলবির হাতে বেঁধে দিয়েছিলো। মিস পিঙ্কারটনের মৃত্যুটা আরো রহস্যময় মনে হয়েছিলো। কারণ ওর মতো একজন মহিলা ড্রাইভারের পোশাক পরে একটা রোলস্ চালাবে–একথা স্বপ্নেরও অগোচর। কিন্তু পর মুহূর্তে মনে হলো–নাঃ তার তো দরকার নেই। ওর পুরানো পদ্ধতি অবলম্বন করে অতি সহজেই ভীড়ের মধ্যে আত্মগোপন করে একটা ছোট্ট ধাক্কা দিয়েই তো কাজ হাসিল করা যায়–এবং হয়েছিলোও তাই। গাড়িটা পালিয়ে যাওয়ার আরো একটা সুযোগের পেয়ে গেল; পাশের এক মহিলাকে ও একটা নম্বর বললো এবং সেই নম্বর লর্ড হুইটফিল্ডের রোলসের নম্বর।

যদিও একথা সত্যি, যে ব্যাখ্যা তোমাদের দিলাম, তার এতটা নিখুঁত রূপরেখা সেই সময়ে আমরা মাথায় ছিলো না। তবে একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, গর্ডন খুনী নয়। তাই যদি হয়, তাহলে এতগুলো খুন কে করলো? উত্তরটাও সহজেই মাথায় এলো। এমন একটা কেউ, যে গর্ডনকে ঘৃণা করে। কে গর্ডনকে ঘৃণা করতে পারে? হনরিয়া ওয়েনফ্লিট ছাড়া আর কে-ই বা হতে পারে?

একটা ব্যাপার জানতাম যে মিস পিঙ্কারটনের সন্দেহ অমূলক নয়–নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে সেকথা মহিলা প্রমাণ করেছিলেন। এই জন্যই তোমাকে বলতে বলেছিলাম যে, মিস পিঙ্কারটন ঠিক কী কী বলেছিলেন। তোমার কাছ থেকে শুনে যখন আবিষ্কার করলাম যে মিস পিঙ্কারটন একবারও কোনো পুরুষমানুষের কথা বলেননি, তখনই বুঝে গেলাম যে, আমার চিন্তাধারার মধ্যে কোনো অসঙ্গতি নেই এবং সে কারণেই সাগ্রহে মিস ওয়েনফ্লিটের নিমন্ত্রণে আমি রাজী হয়ে গেলাম।

লিউক বেশ রাগতস্বরে বললো–আমাকে এর বিন্দুবিসর্গ না বলে?

কী করে তোমায় বলি বলো? তুমি যে একেবারে ধরে বসেছিলে যে গর্ডনই হত্যাকারী; আর সে জায়গায় আমি তো তখনো অনুমানের সাগরে সাঁতার কাটছি! ভাবতেও পারিনি যে আমার কোনো বিপদ আসতে পারে-বরঞ্চ ভেবেছিলাম যে, হাতে আমার প্রচুর সময়…,–বলতে বলতে ব্রিজেট শিউরে ওঠে–উঃ, লিউক! সে কী জান্তব দৃশ্য!…ওর সেই অস্বাভাবিক চোখ আর খুক খুক করে অমানুষিক হাসি।

লিউকও একটু কেঁপে ওঠে সেই দৃশ্যের বীভৎসতায়।

আমিও কোনোদিন ভুলতে পারবো না যে, কী দারুণ এক মুহূর্তে আমি ওখানে গিয়ে পড়েছিলাম।

লিউক ব্যাটলকে জিজ্ঞেস করলো–এখন মহিলার অবস্থা কী?

একেবারে ভেঙ্গে খান্ খান্ হয়ে গেছে। এদের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়। নিজেদের যারা খুব চালাক মনে করে, তারা যে মুহূর্তে বুঝতে পারে যে ওদের চালাকি ধরা পড়ে গেছে, তখন আর দেখতে হয় না-একবারে ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

লিউক বলে–পুলিশ হিসেবে আমি ব্যর্থ। হরিয়া ওয়েনফ্লিটকে আমি ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করিনি। আমার জায়গায় আপনি হলে এমনটা ঘটতো না।

ব্যাটল বলেন–সে কথা বলা যায় না; হতেও পারে আবার না-ও হতে পারে; তবে আপনার বোধ হয় মনে আছে আমি বলেছিলাম যে, অপরাধ-বিজ্ঞানে অসম্ভব বলে কোনো শব্দের স্থান নেই। মনে পড়ে, আমি তখন অবিবাহিত মহিলার কথাও উল্লেখ করেছিলাম?

হ্যাঁ, মনে আছে। তাছাড়াও আপনি চার্চের পাদ্রী, স্কুলের ছোট্ট মেয়েদের কথাও বলেছিলেন।

হেসে ব্যাটল বলেন–ও কথা বলে আপনাকে একথাই বোঝাতে চেয়েছিলাম যে, যে-কোনো শ্রেণীর লোকই অপরাধী হতে পারে।

একমাত্র গর্ডন ছাড়া। চলো লিউক, দেখি গর্ডন কোথায়।–ব্রিজেট বললো।

ওরা গিয়ে দেখে পড়বার ঘরে বসে লর্ড হুইটফিল্ড কতকগুলো নোট মেলাচ্ছেন।

ব্রিজেট আনত-স্বরে বলে–এখন তুমি তো সবই জেনে গেছে। এবার কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে?

ব্রিজেটের দিকে লর্ড হুইটফিল্ড তাকান–চোখের দৃষ্টিতে মমতা মাখানো।

সে কি কথা ব্রিজেট! নিশ্চয়ই পারবো। সত্যকে স্বীকার করার মতো সৎ সাহস আমার আছে। কাজের মধ্যে ডুবে থেকে আমি তোমাকে অবহেলা করেছি। আমার অবস্থা কিপলিং-এর সেই বিখ্যাত উক্তির সঙ্গে মিলে যায়। সেই লোকই দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে, যে একা পথ চলার সাহস রাখে।–আমার জীবনের পথও একলা চলো রের পথ। তারপর বললেন-আমার ওপর যে গুরুদায়িত্ব, তা আমাকে একাই বহন করতে হবে। আমার চলার পথে থাকবে না কোনো মধুভাষিণী সঙ্গী, আমার গুরুভার লাঘব করতে আসবে না কোনো প্রসারিত হাত। আমি নিরবিচ্ছিন্নভাবে শুধু চলবো, কেবল চলবো–একা, সঙ্গিবিহীন। এই অবিরত চলা শেষ হবে সেদিন–যেদিন চলতে চলতে পথভ্রান্তে পড়বো মুখ থুবড়ে।

গর্ডন! তোমার স্বভাবের কোনো তুলনা নেই–সত্যিকারের মাধুর্যমণ্ডিত তোমার স্বভাব।-বলে ব্রিজেট।

এটা মধুর-স্বভাবের প্রশ্ন নয়। এসব বাজে কথা বলে সময় নষ্ট কোরো না–আমি অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ।

আমি জানি তুমি খুবই ব্যস্ত।

আমার কাগজের এই সংখ্যায় একটা প্রামাণ্য প্রবন্ধ ছাপতে দিচ্ছি–বিষয়বস্তু হলো– মহিলাদের অপরাধবৃত্তি-যুগে যুগে।

সপ্রশংস চোখে ব্রিজেট লর্ড হুইটফিল্ডের দিকে তাকিয়ে বলে–অপূর্ব! এর চেয়ে ভালো আর কোনো বিষয় হতে পারে না।

বুকটা টান করে লর্ড হুইটফিল্ড বলেন–ঠিক আছে, এবার তোমরা অনুগ্রহ করে নিজের কাজে যাও, আমার সময় নষ্ট কোরো না–আমার কাঁধে কাজের বোঝা।

নিঃশব্দে লিউক আর ব্রিজেট বেরিয়ে যায়।

ব্রিজেট বলে–ওর স্বভাবটা সত্যিই মিষ্টি।

ব্রিজেট, আমার ধারণা, তুমি ওই লোকটিকে সত্যিই ভালোবাসতে।

জানো লিউক, সত্যিই ওকে ভালোবাসি।

লিউকের দৃষ্টি জানলা পেরিয়ে বাইরে চলে যায়। ও বলে–আর উইচউডে যেতে ভালো লাগছে না। মিসেস আম্বলবির ভাষায় এ জায়গাটা শয়তানের আড়ৎ। সমস্ত গ্রামটাকে অ্যাশরিজ যেন একেবারে গিলে খাচ্ছে।

অশরিজের কথায় মনে হলো–তোমার সেই এলসওয়ার্দির কী হলো?

লজ্জা পেয়ে লিউক হেসে ওঠে–ওর হাতের সেই রক্তের কথা বলছো?

হা।

শুনলাম ওরা নাকি একটা সাদামুর্গী বলি দিয়েছিলো।

কী প্রচণ্ড বিরক্তিকর!

তবে কদিনের মধ্যেই ও একটা ঝামেলায় পড়বে–ব্যাটল ওর পেছনে লেগেছে।

বেচারা মেজর হর্টন! স্ত্রীকে মারবার কোনো পরিকল্পনাই ওঁর ছিলো না। একই কথা মিঃ অ্যাবটের ক্ষেত্রেও। সেই চিঠিটি হয়তো এক মহিলা কোনো মামলার নিষ্পত্তির জন্য লিখেছিলো; আর ডাঃ টমাস একেবারেই একজন সাদাসিধে মামুলি ডাক্তার।

 

লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]
আগাথা ক্রিস্টি

ও একটা প্রথম শ্রেণীর গর্দভ।

রোজ আম্বলবিকে বিয়ে করবে বলে তুমি নেহাৎ গায়ের জ্বালায় ওকে গালাগাল দিচ্ছো!

রোজ একবার ওর পক্ষে বাঁদরের গলায় মুক্তোর হার।

হাত হতোস্মি! তুমি কি পাগল হলে?

মোটেই না।

ব্রিজেট কিছুক্ষণ চুপ করে থেকেজিজ্ঞেস করে–আচ্ছা লিউক, তুমি কি এখন আমাকে পছন্দ করো?

ওর দিকে লিউক এগোবার চেষ্টা করতেই ব্রিজেট ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে-না লিউক, আমাকে ভালোবাসো কিনা জিজ্ঞেস করিনি–পছন্দ করো কিনা তা-ই–জানতে চেয়েছি,

পছন্দ? এখন তোমায় বেশ পছন্দ করি; আর ভালোও বাসি।

আমিও তোমাকে পছন্দ করি লিউক…

পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ওরা দুজনেই হেসে ওঠে। এই হাসি সব পাওয়ার হাসি।যেমন শিশুরা সদ্য-পাতানো বন্ধুত্বের আনন্দে পরস্পরের গলা জড়িয়ে হেসে ওঠে।

ব্রিজেট বলে-ভালোবাসার থেকেও বড় জিনিষ হলো পছন্দ-এ স্থায়ী। আমাদের দুজনের এই সম্পর্ক যেন স্থায়ী হয় লিউক। তা না হলে আমরা যদি দুজনেই দুজনকে কেবলমাত্র ভালোবাসি, আর সেই ভালোবাসার তাগিদে বিয়ে করি এবং কিছুদিন বাদেই ছাড়াছাড়ি করে আবার আর একজনকে বিয়ে করি–এমনটা আমি চাই না লিউক।

ও ব্রিজেট! আমি জানি তুমি কী চাও। কঠিন বাস্তবতা। আমিও তাই চাই ব্রিজেট। আমাদের এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে কঠোর বাস্তবের ওপর ভিত্তি করে–এ সম্বন্ধ অটুট, কখনোই ভাঙ্গবার নয়।

সত্যি বলছ লিউক?

হা গো হা! এবং এই বাস্তব চেতনা এত প্রকট ছিলো বলেই তোমাকে ভালোবাসতে গিয়েও প্রথমটায় অতো ভয় পেয়েছিলাম।

আমারও ভয় ছিলো লিউক।

এখনো সেই ভয় আছে?

না, এখন আর নেই।

মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আমরা দুজনে কাছাকাছি হয়েছিলাম। আমরা সেই অধ্যায় পেরিয়ে এসে এবার দুজনে জীবনের পথে পা বাড়িয়ে এগিয়ে চলবো…

আমাদের আরও পোষ্ট দেখুনঃ

cropped Bangla Gurukul Logo লন্ডনে শলাপরামর্শ -মার্ডার ইজ ইজি (১৯৩৯) ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ]

মন্তব্য করুন