বৈশাখ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বৈশাখ কবিতা – বৈশাখ বাঙালির কাছে ধরা দেয় অন্যরকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে। বৈশাখ , নববর্ষ আর রবি ঠাকুর এক অনন্য বন্ধনে বাঁধা।বৈশাখ তথা পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির এক বৈশিষ্ট্যম-িত দিন। বাঙালি ক্যালেন্ডারের এক মহিমান্বিত দিন, ২৫ শেখ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন।১২৬৮ সালের পঁচিশে বৈশাখ কবিগুরু কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে জন্ম নেন। ৮ ই বৈশাখ ১২৯১ কবির সাহিত্যের সঙ্গী তার বৌদিদি কাদম্বরীর মৃত্যুদিন। কাদম্বরী দেবীর শোক রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা ও গানে বিধৃত হয়েছে।তার বৈশাখী স্মৃতি মধুরতা খেয়ার কবিতাটিতে যেমন তেমনি দুটি গানেও বিধৃত হয়েছে।

 

বৈশাখ কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বৈশাখ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এফআরএএস (৭ মে ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ – ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) ছিলেন অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে “গুরুদেব”, “কবিগুরু” ও “বিশ্বকবি” অভিধায় ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন তার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত হয়।

তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় পত্রসাহিত্য উনিশ খণ্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত। এছাড়া তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এশীয়দের মধ্যে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-এ তার “অভিলাষ” কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত রচনা। ১৮৭৮ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। ১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন।

 ১৯০১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯০২ সালে তার পত্নীবিয়োগ হয়। ১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

কিন্তু ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেন।১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য তিনি শ্রীনিকেতন নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘজীবনে তিনি বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং সমগ্র বিশ্বে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করেন। ১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর কলকাতার পৈত্রিক বাসভবনেই তার মৃত্যু হয়।

 

বৈশাখ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!

ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,

তপঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল

            কারে দাও ডাক

        হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!

 

        ছায়ামূর্তি যত অনুচর

দগ্ধতাম্র দিগন্তের কোন্‌ ছিদ্র হতে ছুটে আসে!

কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে

            নিঃশব্দ প্রখর

        ​​ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!

 

        মত্তশ্রমে শ্বসিছে হুতাশ।

রহি রহি দহি দহি উগ্রবেগে উঠিছে ঘুরিয়া,

আবর্তিয়া তৃণপর্ণ, ঘূর্ণচ্ছন্দে শূন্যে আলোড়িয়া

            চূর্ণরেণুরাশ

        মত্তশ্রমে শ্বসিছে হুতাশ।

 

        দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী,

পদ্মাসনে বস আসি রক্তনেত্র তুলিয়া ললাটে,

শুষ্কজল নদীতীরে শস্যশূন্য তৃষাদীর্ণ মাঠে

            উদাসী প্রবাসী–

        দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী!

 

        জ্বলিতেছে সম্মুখে তোমার

লোলুপ চিতাগ্নিশিখা, লেহি লেহি বিরাট অম্বর,

নিখিলের পরিত্যক্ত মৃতস্তূপ বিগত বৎসর

            করি ভস্মসার।

        চিতা জ্বলে সম্মুখে তোমার।

 

        হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।

উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,

যাক নদী পার হয়ে, যাক চলি গ্রাম হতে গ্রামে,

            পূর্ণ করি মাঠ।

        হে বৈরাগী, করো শান্তিপাঠ।

 

        সকরুণ তব মন্ত্রসাথে

মর্মভেদী যত দুঃখ বিস্তারিয়া যাক বিশ্ব-‘পরে,

ক্লান্ত কপোতের কণ্ঠে, ক্ষীণ জাহ্নবীর শ্রান্তস্বরে,

            অশ্বত্থছায়াতে–

        সকরুণ তব মন্ত্রসাথে।

 

        দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ

তোমার ফুৎকারলুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে,

ভ’রে দিক নিকুঞ্জের স্খলিত ফুলের গন্ধসনে

            আকুল আকাশ–

        দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ।

 

        তোমার গেরুয়া বস্ত্রাঞ্চল

দাও পাতি নভস্তলে, বিশাল বৈরাগ্যে আবরিয়া

জরা মৃত্যু ক্ষুধা তৃষ্ণা, লক্ষকোটি নরনারী-হিয়া

            চিন্তায় বিকল।

        দাও পাতি গেরুয়া অঞ্চল।

 

        ছাড়ো ডাক, হে রুদ্র বৈশাখ!

ভাঙিয়া মধ্যাহ্নতন্দ্রা জাগি উঠি বাহিরিব দ্বারে,

চেয়ে রব প্রাণীশূন্য দগ্ধতৃণ দিগন্তের পারে

            নিস্তব্ধ নির্বাক।

        হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

বৈশাখ কবিতা এর ব্যাখ্যা ঃ

 

বৎসরের প্রথম দিনে পহেলা বৈশাখে রবীন্দ্রনাথ বাঁধা জয়ের অভিযাত্রায় ডাক দিয়েছেন সকলকে , ‘ এসো, এসো ,দলে দলে বাহির হয়ে পড়ো – – নববর্ষের প্রাতকালে পূর্ব গগণে আজ জয়ভেরি বেজে উঠেছে। সমস্ত অবসাদ কেটে যাক জয় হোক তোমার,জয় হোক তোমার প্রভুর । কালবৈশাখীর কালো মেঘ আকাশ আচ্ছন্ন করে ফেললেও অভয়বানী শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মানুষ কে সাড়া দিতে হবে ,বুক পেতে গ্রহন করতে হবে এ ঝড়কে।কারন নড়বড়ে যা কিছু সব ভেঙ্গে শক্ত দৃঢ় ঘাতসহ যা কিছু তাই অক্ষত থাকবে নতুন যাত্রার অবলম্বন হিসেবে। বৈশাখ যদিও সাহসী বৈরী অশান্ত তবু তার সৃষ্টিশীলতা কল্পনাকেও হার মানায়।

প্রেম প্রকৃতি আর মানুষের গান নিয়ে রবি এলেন বৈশাখে আমাদের মাঝে একরাশ পূর্ণতা নিয়ে। কবিগুরু বৈশাখ কে আমাদের মাঝে উপস্থাপন করেছেন বিশেষ দর্শন নিয়ে। বাঙালি ঐতিহ্যের প্রাচীনতম ধারাবাহিকতায় বাউল জারি সারি আর কীর্তন আবহমান কাল ধরে চলে আসলেও রবির আবির্ভাবের পর বাঙালির বৈশাখ উদযাপন অনেকটা বদলে গেছে । হয়তো এ মাসে জন্য নিয়েছিলেন বলে এ মাসের প্রতি বিশেষ টান কবিগুরুর। পৃথিবীর সকল বাঙালি বর্ষ বরণের সাথে নিজেকে একাত্ম করে বৈশাখের আনন্দ ধারায় । বিশ্বকবি নিজের মতো করে বৈশাখ পালনের মাধ্যমে দিনটি কে আরো মহিমান্বিত করেছেন।

বৈশাখে বর্ষবরণের যে ধারা অব্যাহত আছে রবীন্দ্রনাথের এসো ,এসো,এসো হে বৈশাখ ,কাহারবা তালের এই গানের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ভাবনার এক নিপুণ নির্মাণ এর পরিচয় পাওয়া যায়। বৈশাখ এলে আমরা অনুভব করি অসাম্প্রদায়িক এই সাংস্কৃতিক উৎসব কতটা শক্তিশালী। রবীন্দ্রনাথের গানের ‘ মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা শুচি হোক ধরা’ চরণটি যেন সমস্ত বাঙালির প্রাণের কথা। কবিগুরু চেয়েছেন সমস্ত জরা ব্যাধি বৈশাখী বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে অগ্নিস্নানের এক অপরূপ স্নিগ্ধতার সন্ধান পেতে।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]

বৈশাখ কবিতা আবৃত্তি ঃ

 

 

 

আরও দেখুনঃ

 

মন্তব্য করুন