বিরাম চিহ্নের পরিচয় | বিরাম চিহ্নের ব্যবহার | বাক্যতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

বিরাম চিহ্নের পরিচয় , নিচে একটি ছকে বিরাম-চিহ্নগুলোর পরিচয় দেয়া হল :

বিরাম চিহ্নের পরিচয়

Capture 95 বিরাম চিহ্নের পরিচয় | বিরাম চিহ্নের ব্যবহার | বাক্যতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষাCapture 96 বিরাম চিহ্নের পরিচয় | বিরাম চিহ্নের ব্যবহার | বাক্যতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

বিরাম চিহ্নের ব্যবহার

কমা চিহ্ন (, )

বাংলায় কোনো কিছু লিখতে গিয়ে যত ধরনের যতি-চিহ্ন আমরা ব্যবহার করি তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি কমা (,)। বাক্যের ভেতরের বিরাম-চিহ্ন হল কমা। অর্থাৎ বাক্যটি যদি বড়ো হয় তা হলে দম নেওয়ার জন্যে থামার দরকার পড়তে পারে, বক্তব্য একাধিক হলে স্পষ্টতা আনার লক্ষ্যে থেমে থেমে পড়তে হতে পারে, সর্বোপরি অল্পক্ষণ বিরামের জন্যে কমার ব্যবহার হয়।

এখানে ‘এক’ উচ্চারণ করার সমান সময় থামতে হয়। অল্প বিরাম বোঝাতে নিম্নলিখিত স্থানে কমা ব্যবহৃত হতে পারে—বাক্যে একই পদের একাধিক শব্দ পাশাপাশি ব্যবহৃত হলে তাদের মধ্যবর্তী একটি বা একাধিক কমা ব্যবহার করে এক জাতীয় পদকে পৃথক করা হয়। কমা বসে দুই বা ততোধিক পদ, পদগুচ্ছ বা বাক্যাংশে। যেমন— পদ : সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার— এঁরা বাংলা ভাষার জন্যে শহীদ হয়েছেন। সর্বনাম পদ : সে, তুমি, আমি অর্থাৎ আমরা তিনজন যাব। ক্রিয়া পদ : এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।  এক জাতীয় একাধিক বাক্য বা বাক্যাংশ পাশাপাশি ব্যবহৃত হলে কমা প্রয়োগে তাদের আলাদা করতে হয়। যেমন— সে ক্লাসে ঢুকল, বই নিল, ব্যাগে রাখল, তারপর বেরিয়ে গেল ৷

 

বিরাম চিহ্নের পরিচয় | বিরাম চিহ্নের ব্যবহার | বাক্যতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

 

একাধিক অসমাপিকা ক্রিয়া পাশাপাশি থাকলে তাদের মধ্যে কমা বসে। যেমন— ‘আমি কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া, রামধনু আঁকা পাখা উড়াইয়া, রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া, দিব রে পরাণ ঢালি। ’  একই পদের বারবার ব্যবহারের মাঝে কমা বসে। যেমন— আমি কলেজে যাব, একটি বিশেষ্যের স্পষ্টতর পরিচয়ের জন্যে তুল্যভাবে পাশাপাশি অন্য বিশেষ্য পদ স্থাপিত হলে সেই অন্য বিশেষ্য পদের পূর্বে ও পরে কমা বসে।

যেমন – মওলানা ভাসানী, সংগ্রামী জননেতা, স্মরণীয় সম্বোধনের পর কমা বসে। যেমন— ছাত্ররা, মনোযোগ দিয়ে শোন । হ্যাঁ, না, বস্তুত, প্রথমত, দ্বিতীয়ত ইত্যাদি অব্যয়ের পর কমা বসে। যেমন— হ্যাঁ, আমি তোমাকে ডেকেছি। প্রথমত, তুমি এ কাজটা করবে। দ্বিতীয়ত, এ কাজের কোনো সাক্ষী রাখবে না।  অন্যথাসূচক অব্যয় যদি বাক্যে ব্যবহৃত হয়— তা হলে ওই অব্যয়ের পূর্ববর্তী শব্দের শেষে কমা বসবে।

এ- জাতীয় অব্যয়ের উদাহরণ হল : নইলে, নচেৎ, নতুবা, নয়তো, না হলে, তা হলে ইত্যাদি। যেমন- কাল অফিসে যেও, নইলে তোমার চাকরি থাকবে না। নামের শেষে ডিগ্রি থাকলে কমা বসে। যেমন— ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, এম. এ., পিএইচ. ডি. b.  উদ্ধৃতিচিহ্নের আগে কমা বসে। যেমন— আমি বললাম, “আমি ভাল আছি।”

ভাবান্তরমূলক বাক্যাংশের পর কমা দিতে হয়। যেমন— আমার মনে হয়, সে আসবে। বাক্যে প্রক্ষিপ্ত পদগুচ্ছ থাকলে কমা বসে। যেমন— রানা, এদিক ওদিক তাকিয়ে, নিচু স্বরে কথাটা বলল।  বা যৌগিক বাক্যের ছোট ছোট বাক্যকে কমা দিয়ে আলাদা দেখানো হয়। যেমন— লোকটি গরিব, কিন্তু তারিখ লিখতে কমা বসে। যেমন— কমা বসে। যেমন— ১লা বৈশাখ, ১৪০৬ সাল । বড় রাশিতে হাজার, লক্ষ ইত্যাদিকে স্পষ্ট করে বোঝাবার জন্যে কমা বসে। যেমন— ১২,২৪,২৫,৯০৮ (=বার কোটি চব্বিশ লক্ষ পঁচিশ হাজার ন শ আট) ।

সেমিকোলন-চিহ্ন

( ; ) সেমিকোলন বা অর্ধচ্ছেদ হচ্ছে বাক্যের মধ্যে ব্যবহৃত এক ধরনের বাক্যান্তর্গত চিহ্ন। মনোভাব প্রকাশের বেলায় একটা ভাব একটিমাত্র বাক্যে শেষ হয়ে সন্নিহিত ভাবের নতুন বাক্য শুরু করতে চাইলে একটু বেশি থামতে হয়। অর্থাৎ একাধিক বাক্যের মধ্যে অর্থের নিকট-সম্বন্ধ থাকলে বাক্যগুলোকে একটু বেশি থামার চিহ্ন দিয়ে ভাগ করতে হয়। এর জন্যে সেমিকোলন বসে। সেমিকোলনের বিরামের অনুপাত কমার (,) দ্বিগুণ। নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে সেমিকোলোন ব্যবহৃত হয়— একাধিক স্বাধীন বাক্যকে একটি বাক্যে লিখলে সেগুলোর মাঝখানে সেমিকোলন ব্যবহৃত হয়। যেমন— ‘তিনি শুধু তামাশা দেখিতেছিলেন; কোথাকার জল কোথায় গিয়া পড়ে।

বক্তব্য স্পষ্ট করার জন্যে সমজাতীয় বাক্য পাশাপাশি প্রতিস্থাপন করলে সেমিকোলন ব্যবহৃত হয়। যেমন— ‘বৃদ্ধ তাহারাই— যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয়যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘ্ন, শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না; জীব হইয়াও জড়; যাহারা অটল আ সংস্কারের পাষাণ—স্তূপ আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে।

দুটি বা তিনটি বাক্য সংযোজক অব্যয়ের সাহায্যে যুক্ত না হলে সেমিকোলন ব্যবহৃত হয়। যেমন— আগে পাঠ্য বই পড়; পরে গল্প উপন্যাস। কোনো তালিকায় একাধিক ব্যক্তির নাম ও তাঁদের পদের উল্লেখ থাকলে বোঝবার সুবিধার জন্যে সেমিকোলোন ব্যবহার করা হয়। যেমন— এবারের নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী পরিষদে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা হলেন : আকবরউদ্দিন আহমদ, সভাপতি; আফসার রায়হান, সাধারণ সম্পাদক; চিত্ত বড়ুয়া, প্রচার সম্পাদক; এন্ড্রু গোমেজ, সংস্কৃতি সম্পাদক; ইত্যাদি।

 

বিরাম চিহ্নের পরিচয় | বিরাম চিহ্নের ব্যবহার | বাক্যতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

 

সেজন্যে, তবু, তথাপি, সুতরাং ইত্যাদি যে-সব অব্যয় বৈপরীত্য বা অনুমান প্রকাশ করে তাদের আগে বা দুটি সন্নিহিত হলে সেমিকোলন বসে। যেমন— সে ফেল করেছে; সেজন্যে সে মুখ দেখায় না। মনোযোগ, দিয়ে পড়; তাহলেই পাশ করবে। যেসব বাক্যে ভাবসাদৃশ্য আছে তাদের মধ্যে সেমিকোলন বসে। যেমন— দিনটা ভাল নয়; মাঝে মাঝে বৃষ্টি পড়ছে। ছোট ছোট বিতর্কিত অংশ নির্দেশ করার জন্যে সেমিকোলন বসে। যেমন- মেয়েটি, যে প্রথম হয়েছে, একটি পুরস্কার পেয়েছে; এবার আশা করা যায়, সে আরো ভাল করবে।

দাঁড়ি

বাক্য সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে গেলে দাঁড়ি বসে। বাক্যের সমাপ্তি এবং নতুন বাক্যের সূচনার নির্দেশ করে দাঁড়ি। দীর্ঘতম বিরামের প্রতিরূপ হয় দাঁড়ি। যেখানে একটি পূর্ণবাক্য বা প্রসঙ্গ শেষ হয় সেখানে দাঁড়ি বসে। নিচের উদ্ধৃতিটি এক বিখ্যাত লেখকের রচনা থেকে নেওয়া। এখানে লক্ষ করবার মতো দুটি ব্যাপার আছে। প্রথমত, বাক্যগুলো ছোট এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, দাঁড়ি দিয়ে বাক্যের সম্পূর্ণতা যেখানে বোঝানো হচ্ছে সেখানে ভাবেরও বা বক্তব্যেরও সম্পূর্ণতা প্রকাশিত হচ্ছে। ‘বয়স যখন আটত্রিশ গোয়টে পালিয়ে যান ইতালি। সেখানে বছর দেড়েক থেকে পুরোদস্তুর ক্লাসিক দীক্ষা নেন। তার পর যখন দেশে ফিরে আসেন তখন তাঁর মুখে অন্য সুর। তখন তিনি বাণীমূর্তি আরেক যুগের। এ যুগ নয়া ক্লাসিক যুগ। কিন্তু পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে এর মতোবিরোধ ছিল। ঠিক সেই সময়ে শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব। লোকে তখন ক্লাসিক চায় না।

প্রশ্নচিহ্ন ( ? )

বাক্যের মধ্যে সোজাসুজি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন— তোমার নাম কী ? তুমি সেখানে যাবে? সন্দেহ বোঝাতে বাক্যের মধ্যে প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসে। যেমন— এটা তোমার বই? ঠিক তো ? তিনি একা আসেন নি, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী (?) এসেছিলেন। [বাক্যটিতে অনিশ্চয়তার ভাব। না হয়ে আত্মীয়া বান্ধবীও হতে পারেন । ]

বিস্ময়চিহ্ন ( ! )

অবাক বা বিস্ময়ের ব্যাপার বোঝাতে প্রধানত বাক্যের শেষে বসে। যেমন— ক. অবাক কাণ্ড! ঠিক আধ মিনিট আগে পকেটে টাকা ছিল, এখন নেই। অবিশ্বাস্য হাতসাফাই! খ. ইশ! জ্বরে একেবারে গা পুড়ে যাচ্ছে। আবেদন, ভর্তি, হতাশা, আনন্দ ইত্যাদি মনোভাব প্রকাশের ক্ষেত্রেও বিস্ময়চিহ্ন বসে : ক. দয়া করে আমাকে বাঁচান! এই বিপদে আর কার কাছে যাব খ. হঠাৎ রাস্তায় শোরগোল উঠল— চোর! চোর! চোর! বি বলুন! আমার যাওয়ার যে কোনো জায়গা নেই! বাক্যের ভেতরে বন্ধনীর মধ্যে, প্রয়োজন হলে, বিস্ময়চিহ্ন বসানো যায়। যেমন— মেয়েটা ছ ফুটের (!) মতো লম্বা, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং আর স্বাস্থ্য একেবারে যেন পাহাড়ি মেয়েদের—কে বলবে এ-মেয়ে বাঙালি ?

উদ্ধৃতিচিহ্ন ( ‘–’ অথবা “—” )

ইংরেজিতে একে কোটেশন মার্ক বলে। ইংরেজি ভাষা থেকেই এদের আমদানি করা হয়েছে, কারণ বাংলায় এ-ধরনের চিহ্ন ছিল না। একে উদ্ধৃতিচিহ্ন বা উদ্ধারচিহ্ন বলে। উদ্ধৃতিচিহ্নের শুরু ও শেষ আছে; মানে—কোথাও প্রয়োগ করলে বুঝতে হবে—উদ্ধৃতি শুরু হল। ফলে কিংবা ” চিহ্ন প্রয়োগ করে উদ্ধৃতি যে শেষ হয়েছে তাও বুঝতে হবে। স্মৃতি যে শেষ  না। অন্যের কথা উদ্ধৃত করতে হলে কিংবা কোনো কথায় পাঠকের মনোযোগ দাবি করতে হলে উদ্ধৃতিচিহ্নের প্রয়োজন পড়ে। উদ্ধৃতিচিহ্ন দু রকমের হয়ে থাকে:

এক-উদ্ধৃতি (‘ ‘)

বা সিল্ কোট্ এবং জোড়-উদ্ধৃতি (“ ”) বা ডাব্‌ কোট্ এক-উদ্ধৃতি ( ) বা সিল্ কোট্  কথোপকথন ও সংলাপে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন- পা টিপে-টিপে দুপুরবেলা উকিলউদ্দিন এসে হাজির। বললে, ‘কই গো বিবিজান। দেখো এসে কী এনেছি।’ বেরিয়ে আসতে নুরবানুর চক্ষু স্থির। রুপোর জেওর দেখে নয়, চোখের উপরে বাঘ দেখে। ‘চলে যান এখান থেকে।’ চোখে-মুখে আঁচ ফুটিয়ে ঝাপসা গলায় বললে নুরবানু। ‘তোমার জন্যে লবেজান হয়ে আছি। এই দেখ, জেওর এনেছি পড়িয়ে ‘দরকার নেই। আপনি চলে যান। নইলে সোর তুলব এখনি।’ নির্দিষ্ট শব্দে মনোযোগ আকর্ষণের জন্যে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : তার ডাক নাম ছিল লালু।

হিন্দিতে ‘লাল’ শব্দটার অর্থ হচ্ছে-প্রিয়। সে সকলেরই প্রিয় ছিল। বাক্যের ভেতর থেকে একটি নির্দিষ্ট বচন আলাদাভাবে শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়। ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে’– এই ছত্রটির কোনো পরিষ্কার অর্থ আছে কি না জানি না । ৪. নির্দিষ্ট ভবনের নাম বা গ্রন্থের নাম জানানোর জন্যে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : বাংলায় লেখা বাঙালির প্রথম ব্যাকরণ হল মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ‘বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ’ এবং দ্বিতীয় ব্যাকরণ ছিল রাজা রামমোহন রায়ের ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’।

জোড়-উদ্ধৃতি (“ ” ) বা ডাব্‌ল্‌ কোট্‌

যেখানে কেবল এক ধরনের উদ্ধৃতিচিহ্নেরই প্রয়োজন সেখানে এক-উদ্ধৃতিচিহ্ন বা জোড়-উদ্ধৃতিচিহ্ন— যে কোনো একটি ব্যবহার করলেই চলে। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে দু-জাতীয় উদ্ধৃতিচিহ্নই দরকার পড়ে সে-সব জায়গায় দু-একটি নিয়ম অনুসরণ না- করলে চলে না। নিচের উদাহরণ থেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক। এই “ভারতবর্ষ” কাগজেই অনেক দিন পূর্বে ডাক্তার শ্রীযুক্ত নরেশবাবু বলিয়াছিলেন ‘না জানিয়া শাস্ত্রের দোহাই দিয়ো না।’ হৈম ব্যথিত হইয়া প্রশ্ন করিল, “কেহ যদি বয়স জিজ্ঞাসা করে কী বলিব?” বাবা বলিলেন, “মিথ্যা বলিবার দরকার নাই, তুমি বলিয়ো, ‘আমি জানি না — আমার শাশুড়ি জানেন’।”

 

বিরাম চিহ্নের পরিচয় | বিরাম চিহ্নের ব্যবহার | বাক্যতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

 

সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত এবং ‘নতুন সাহিত্য ভবন’ থেকে প্রকাশিত “পঞ্চাশ বছরের প্রেমের গল্প’  সংকলনগ্রন্থে বুদ্ধদেব বসুর ‘আমরা তিন জন’ গল্পটি রয়েছে। ওপরের নমুনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা চলে যে— এক জনের বক্তব্যের ভিতরে যদি ভিন্ন বক্তব্য উদ্ধৃত হয় তা হলে প্রধান বক্তব্যের ক্ষেত্রে জোড়-উদ্ধৃতিচিহ্ন এবং তার অন্তর্গত উদ্ধৃতিতে এক-উদ্ধৃতিচিহ্ন লাগবে। [দ্র. উদাহরণ ১] প্রধান উৎস— বই বা সাময়িকী— থাকবে জোড়-উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতরে। লক্ষণীয়, ভারতবর্ষ মাসিকপত্রের নাম, আবার পঞ্চাশ বছরের প্রেমের গল্প বইয়ের নাম; অথচ উভয় ক্ষেত্রেই জোড়-উদ্ধৃতিচিহ্ন বসেছে। পত্রিকার নাম জোড়-উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতর থাকছে বলেই, এ পত্রিকায় মুদ্রিত কোনো রচনার উল্লেখ যদি থাকত তা হলে তা এক—উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতরে বসত ।

কোলন ( : )

বাংলায় কোলন চিহ্নের ব্যবহার খুব বেশি দিনের নয়, বড়জোর পঞ্চাশ-ষাট বছরের। আগে যে-সব ক্ষেত্রে ড্যাশ বা কোলনড্যাশ দেওয়া হত, আজকাল সে-সব জায়গায় কোলন ব্যবহৃত হচ্ছে। লক্ষ করা দরকার, কোলন কখনোই দেখতে বিসর্গ ( ঃ )-র মতো নয়; কোলনের মাঝখানে কোনো ফাঁক থাকে না।

নিম্নলিখিত স্থানে কোলন ব্যবহৃত হয় —  বাক্যে কোনো প্রসঙ্গ অবতারণার আগে কোলন বসে। যেমন— শপথ নিলাম : পাশ করবই। কোনো বিবৃতিকে সম্পূর্ণ করতে দৃষ্টান্ত দিতে হলে কোলন ব্যবহার করা হয়। যেমন— পদ পাঁচ প্রকার : বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া । উদাহরণ, তালিকা, ব্যাখ্যা, বিশদ মন্তব্যের আগে কোলন বসে। যেমন : বাড়িতে যে-সব জিনিস নিতে হবে : আম, চাল, ডাল, তেল ও দুই গজ সাদা সুতি কাপড়।

কথায় বলে : অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। নাটকের চরিত্রের পরে ও সংলাপের আগে— রাজা : কে কোথায় আছ, উজির-নাজির সবাই এস হাজির হও।  কটা বেজে কত মিনিট তা সংখ্যায় নির্দেশ করতে : ৭:২০; ১১:৪৫; ১২:০৬। ধারাবাহিক উপস্থাপনের বেলায়। যেমন— ছবিতে বাম থেকে : সফিক, শুভ, মোস্তফা, মলি ও সালমা। চিঠিপত্র ও বিভিন্ন রকমের ফর্মে ভুক্তি, উপভুক্তির পরে কোলন বসে। যেমন— নাম : পিতার নাম : বিষয় : প্রসঙ্গ : , ঠিকানা :, তারিখ :  গণিতে অনুপাত বোঝাতে কোলন বসে। যেমন— ফেলের হার ৪:৮।

প্রশ্ন রচনায় কোলন বসে। যেমন— টীকা লেখ । ব্যাখ্যা লেখ :  ও, রা, এবং –এসব অব্যয় ব্যবহার না করে কোলন ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন – বাংলা নাটক : উৎস ও ধারা। ১১. কোনো উদ্ধৃতির আগে কোলন বসে। যেমন— কবি বলেছেন : ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি’।

ড্যাশ (– )

প্রথমেই ড্যাশ আর হাইফেন ( ) চিহ্নের তফাতটা মনে রাখা জরুরি। হাইফেনের চেয়ে ড্যাশ বেশি লম্বা, দুটি হাইফেন পাশাপাশি জোড়া লাগালে ড্যাশ হয়ে যায়।

ড্যাশ চিহ্ন প্রধানত বাক্যের মধ্যে এবং নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় :

কোনো কথার দৃষ্টান্ত বা বিস্তার বোঝাতে : আমার একমাত্র সম্বল – আপনাদের তরুণদের প্রতি আমার অপরিসীম ভালোবাসা, প্রাণের টান। বার্ধক্য তাহাই— যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে। বাক্য অসম্পূর্ণ থাকলে বাক্যের শেষে : ক. “বেহাই, আমি তো কিছু বলিতে পারি না। একবার তাহলে বাড়ির মধ্যে – ” খ. বাবা গর্জিয়া উঠিলেন, “বটে রে— ” গল্পে উপন্যাসে প্রসঙ্গের পরিবর্তন বা ব্যাখ্যায় : ক. শিশির— না, এ নামটা আর ব্যবহার করা চলিল না। খ. অ্যা— এ হইল কী? কলি কি সত্যই উল্টাইতে বসিল ? নাটক বা গল্প উপন্যাসে সংলাপের আগে : – হ গীত না তর মাথা ।

অপরাধ স্বীকার করলে?  বাক্যের গঠনে আকস্মিক পরিবর্তন চিহ্নিত করার জন্যে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : সে বলল— হায়! আমার কী হল । বাক্যের মধ্যে উদ্ধৃতি, দৃষ্টান্ত ইত্যাদি যুক্ত করার প্রয়োজনে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : আমি সব পেয়েছি— বাড়ি, গাড়ি, মানসম্মান। ছড়ানো ব্যক্তি বা বিষয়গুলোকে বাক্যের শুরুতে গুচ্ছিত করতে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।

যেমন  ধন জন মান— সবই চলে গেল । বাক্যের মধ্যে ব্যাকরণ-সম্পর্কহীন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ সংযুক্ত করার জন্যে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : সত্যি— একটুও বাড়িয়ে বলছি না— আমি তেমন পড়ি ইতস্তত বা দ্বিধা প্রকাশে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : আমি—আমি— পরীক্ষায় ভাল করি নি। স্বরকে প্রলম্বিত দেখাবার জন্যে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : রুদ্ধ দ্বারের ভেতর থেকে কাতর স্বর উঠেছে, রবি বাবু—উ—উ—উ উদাহরণ বা তালিকার আগে। যেমন : সবার জন্যে চাই— অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। একটা আঞ্চলিক উপন্যাসের নাম করা যাক— ‘পদ্মানদীর মাঝি’  অভিধানে শব্দ ও তার অর্থের মাঝখানে ড্যাশ বসে।

যেমন : চন্দ্ৰ—চাঁদ। শূন্যস্থান পূরণের প্রশ্নে লুপ্ত জায়গায় ড্যাশ বসে। যেমন : আমাদের মাতৃভাষা—। জাতীয় খেলার নাম ১৪. স্থান বা কালগত ব্যবধান নির্দেশ করতে। যেমন : ঢাকা-দিল্লি, শনিবার – বুধবার, ১৯৮৮–১৯৯৯ ১৫. উদ্ধৃতি চিহ্নের পরিবর্তে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : মা বললেন— দেখো ছেলের কাণ্ড ৷

হাইফেন ( – )

হাইফেন যদিও ইংরেজি ভাষা থেকে এসেছে, তবু এর প্রয়োগ বাংলায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে হাইফেন অত দরকার পড়ে না, বাংলায় যত পড়ে। বাংলা লেখার সময়ে বোঝা যায়, এর ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য। হাইফেন সবসময়ে বসে দুই বা ততোধিক শব্দের মধ্যে। বাক্যের সঙ্গে নয়, তাই একে সংযোগ-চিহ্ন বলা উচিত।

নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে হাইফেন ব্যবহৃত হয় :  বাক্যে সমাসবদ্ধ পদ যদি থাকে তা হলে সেখানে হাইফেন ব্যবহার করতে হবে। যেমন— হিতাহিতজ্ঞান- শূন্য লোকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বিপজ্জনক । যে-সব ক্ষেত্রে সব ক’টি শব্দই সমান দরকারি এবং স্বাধীন, কেউ কারো ওপর নির্ভরশীল নয়, সে-সব জায়গায় হাইফেন ব্যবহার করতে হবে। যেমন— সোনা-রুপা-মণি-মুক্তা কোনো কিছুতেই আমার লোভ নেই; আমি কেবল চাই একটু শান্তি ।

দুই বা ততোধিক শব্দ মিলিয়ে যেখানে শব্দ তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে শব্দগুলোর মধ্যে হাইফেন ব্যবহার করতে হবে। যেমন— ছেলেবেলা থেকে তার খুব চেনা যে-মন-খারাপ, যেটা, স্বাতী এত দিনে বুঝেছিল, —সেটা দুঃখ না । সদ্য-চুলে পাক ধরা মাথাটা আয়নার ভিতরে দেখতে পেলেই ওর মন খারাপ হয়ে যায়—ও, তা হলে শেষ পর্যন্ত বুড়ো হয়েই গেলাম । একই শব্দ পরপর দু-বার বসলে তাদের মাঝখানে হাইফেন করতে হবে।

যেমন— হাঁটতে-হাঁটতে পায়ে ব্যথা ধরে গেল । সমান অর্থ বোঝাচ্ছে বা কাছাকাছি অর্থ বোঝাচ্ছে এমন দুটি শব্দের মধ্যে হাইফেন বসতে পারে। যেমন— ঘর ৫. তো একদম ফাঁকা, টেবিল-চেয়ার খাট-পালঙ্ক কিছু নেই। দুই বা ততোধিক শব্দ যুক্ত করে বিশেষণের কাজ চালানো যায়। সে-রকম ক্ষেত্রে পদগুলোর মধ্যে হাইফেন ব্যবহার করতে হবে। যেমন— কপালে কালো-টিপ পরা মেয়েটি কী সুন্দর, দেখছ? দিক বা স্থান বা সময় নির্দেশের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই হাইফেনের প্রয়োজন পড়ে।

যেমন— উত্তর-পশ্চিম কোণে ঝড়ের কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। স্থান ও অনুষ্ঠানের মধ্যে অনেক সময় হাইফেন বসানো অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। যেমন— বাংলাদেশ ও ভারতের মৈত্রী-চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। দপ্তর, প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়, পদ ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাইফেন ব্যবহৃত হয়। যেমন— শিক্ষা-মন্ত্রণালয় এ-দেশে যত সেমিনার আর সিম্পোজিয়াম করে তার কয়েক শতাংশ যদি শিক্ষার উন্নতি নিয়ে সত্যিকার উদ্যোগ নিত, তো অনেক বেশি উপকার হত দেশের। বাক্যের মধ্যে একই শব্দ যদি বারবার আসে তা হলে ওই শব্দটি হাইফেন সহযোগে মাত্র একবার ব্যবহার করলেও চলে। যেমন : ব্যক্তি- গোষ্ঠী- ও রাষ্ট্র— জীবনে সর্বত্রই আমরা আত্মশ্রদ্ধা হারিয়ে বসে আছি। (বোঝানো হচ্ছে ব্যক্তি-জীবনে, গোষ্ঠী-জীবনে, রাষ্ট্র-জীবনে)।

না, বা, যে— এই তিনটি অব্যয় প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় হাইফেন ব্যবহৃত হয়। যেমন— তুমি না- বললে আমি যাই কী করে ? কোনো কোনো উপসর্গের পরে। যেমন : অ-তৎসম, কু-অভ্যাস, বে-আক্কেল। পাশাপাশি অবস্থিত ভিন্নার্থক বা বিপরীত শব্দের সংযোগ দেখাতে। যেমন— আসা-যাওয়া, হিন্দু-মুসলমান, বাস-ট্রাম। ১৪. স্থানিক পরিচয়ে, ঘটনা বা অনুষ্ঠানের নামকরণে। যেমন— ঢাকা—বৈঠক, মস্কো—চুক্তি, প্যারিস সম্মেলন ।. দুটি নাম-বিশেষ্যের সংযোজনে। যেমন : নজরুল-রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রয়োজন ।  দুটোর বেশি সমাসবদ্ধ শব্দকে নিরেট শব্দ করা না গেলে।

যেমন— আদি-মধ্য-অন্ত ধর্ম–বর্ণ–গোত্র—নির্বিশেষে।সংখ্যা বা পরিমাণগত ব্যবধান বোঝাতে। যেমন— আবাহনী ২-৪ সেটে মোহামেডানের কাছে হেরেছে। বিভক্তির আগে বসে হাইফেন কখনো কখনো পদসংযোগ ঘটায়। যেমন— ২০০১-এ সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। হাইফেন বসবে না অথচ অনেকেই ভুলবশত হাইফেন ব্যবহার করে, এমন জায়গাও আছে। যেমন : এমন হোমরা- চোমরার বেশে আমার সামনে আসতে তোমার লজ্জা করল না? যাও, কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নাও, অসুখ-বিসুখের অজুহাত দেখিয়ে আর কতকাল পালিয়ে থাকবে। ওপরের বাঁকা-হরফের-লেখা সমস্ত শব্দ ভুলপদ্ধতিতে লেখা হয়েছে। এগুলো হবে হোমরাচোমরা, কাপড়চোপড়, অসুখবিসুখ।

এ-রকম অসংখ্য শব্দ রয়েছে, যেমন— রান্নাবান্না, ভাতটাত, চোরটোর, খাওয়াদাওয়া, লেখাটেখা ইত্যাদি। এ-জাতীয় শব্দের সঙ্গে চা-টা, গান-বাজনা, কাপড়-জামা, হাসি-ঠাট্টা, চোর-ছ্যাঁচোড় ধরনের শব্দ গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না, কারণ, লক্ষ করা দরকার যে, কাপড়চোপড়/কাপড়-জামা কিংবা গানটান/গান-বাজনা ইত্যাদি শব্দাবলিতে ‘চোপড়’ বা ‘টান’ শব্দের কোনো অর্থ নেই, অথচ জামা বা বাজনার অর্থ আছে।

তার মানে, প্রথম দলের শব্দগুলোর শেষাংশ (বান্না, টাত, টোর, দাওয়া ইত্যাদি) একেবারে অর্থহীন; এই কথাগুলো এসেছে প্রথমাংশের শব্দগুলোর ধ্বনির প্রতিধ্বনি হয়ে সহানুভূতি জানাতে, শুনতে ভালো লাগবে, দেখতে ভালো লাগবে— সে-জন্যে। দ্বিতীয় দলে যত শব্দ রয়েছে সবেরই শেষাংশ (টা এখানে চায়ের সঙ্গে খাওয়া যায় এমন দ্রব্যাদির দিকে ইঙ্গিত করছে) অর্থ বহন করছে। এই পার্থক্য বিবেচনার মধ্যে যদি না আনা হয়, তা হলে হাইফেন প্রয়োগে ভুল হয়ে যাবে। এমনকী এ-কথাও বলা যায়—দ্বিতীয় দলের শব্দগুলোতে হাইফেন ইচ্ছে করলে

ঊর্ধ্বকমা বা লোপ-চিহ্ন

ঊর্ধ্বকমার ব্যবহার ইদানীং খুবই কমে গেছে। কি বাংলাদেশে কি পশ্চিমবঙ্গে সবখানেই পণ্ডিতবর্গ এই মত পোষণ করেছেন যে, ঊর্ধ্বকমা দেখতে বিচ্ছিরি, যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভাল। সাধারণত শব্দের একটি অংশ, বর্ণ বা অক্ষর বাদ দেওয়া হয়েছে বোঝাতে লোপ-চিহ্ন ব্যবহৃত হতো। যেমন— হইতে > হ’তে, ওপরে > ‘পরে ইত্যাদি। ঊর্ধ্বকমা না-দিলে অর্থ বুঝতে যদি অসুবিধা হয়, তো সেখানে অবশ্যই ঊর্ধ্বকমা দিতে হবে। হাইফেনের বিকল্প হিসেবে। যেমন— যা তো, তোর মা’র কাছ থেকে দুটো টাকা নিয়ে আয় দেখি । নির্দিষ্ট সালের (যেমন – ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৭৫ ইত্যাদি) বর্জিত সংখ্যা বোঝাতে গিয়ে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন : ২১শে ফেব্রুয়ারি ’৫২ / ফেব্রুয়ারি ২১, ’৫২। বন্ধনী-চিহ্নের ব্যবহার : ( ), { }, [ ] সাহিত্যে প্রথম ( ) ও তৃতীয় [ ] বন্ধনী-চিহ্ন ব্যবহৃত হয়, দ্বিতীয় বন্ধনী (অর্থাৎ { } চিহ্ন) ব্যবহৃত হয় না ।

প্রথম বন্ধনী ( )

কোনো বক্তব্যকে বিশদ করতে হলে প্রথম বন্ধনীর প্রয়োজন পড়ে। এক বা একাধিক শব্দ যেমন প্রথম বন্ধনীর মধ্যে থাকতে পারে, তেমনি এক বা একাধিক বাক্য, এমনকী সম্পূর্ণ একটি অনুচ্ছেদ বা প্যারাগ্রাফ পর্যন্ত থাকতে পারে। যেমন— রবীন্দ্রনাথ তাঁর (স্ত্রী) ‘ভাই ছুটি’কে যে-সব চিঠি লিখেছিলেন তা তাঁদের সুখী দাম্পত্যজীবনের অত্যন্ত প্রামাণ্য সাক্ষী। সম্পর্কশূন্য পদ বা পদগুচ্ছ বাক্যে যুক্ত করতে দুটি বন্ধনী-চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন— নাও (বইটা হাতে দিয়ে পড়। ব্যাখ্যা করে বোঝানোর জন্য বন্ধনী চিহ্ন বসে। যেমন : (বিরক্ত সুরে) কী সব বলছ? (প্ৰস্থান 8. – নাটকের সংলাপের সঙ্গে ক্রিয়া নির্দেশের জন্য বন্ধনী চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। যেমন : সেনাপতি অচিরেই দর্পচূর্ণ করব (পদাঘাত)।

তৃতীয় বন্ধনী [ ]

উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতরে কিছু অন্তর্ভুক্ত করার মৌলিক নীতি হল-মূল জায়গায় ঠিক যেভাবে লেখা আছে অবিকল সেভাবে উদ্ধৃত করা, এমনকী ছাপার ভুল থাকলেও তা সুদ্ধ। কিন্তু এমন প্রয়োজন দেখা দিতে পারে যে, ওই উদ্ধৃতির অংশে মন্তব্য সংযোজন না করলেই নয়। তখন সংযোজিত শব্দ বা শব্দাবলি তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে বসবে। যেমন ধরা যাক, কোনো বইয়ে একটি বাক্য এভাবে লেখা হয়েছে— ‘রবিন্দ্রনাথ নভেল পুরস্কার পেয়েছিলেন’।

এখানে দুটি মারাত্মক ভুল দেখা যাচ্ছে। উদ্ধৃতি হিসেবে এই বাক্যটি ব্যবহার করার কায়দা কী? যদি ভুল-সমেতই লিখি, তা হলে অন্যে এমনও ভাবতে পারে যে ভুল দুটি আমিই করেছি। অথচ ‘রবীন্দ্রনাথ’ আর ‘নোবেল’ লিখে অন্যের ত্রুটি সংশোধন করে দেওয়া (অন্তত উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে) বেআইনি। তা হলে করণীয় কী? করণীয় হল এভাবে লেখা— S. ‘রবিন্দ্রনাথ [রবীন্দ্রনাথ] নভেল [নোবেল] পুরস্কার পেয়েছিলেন।

‘ রবিন্দ্রনাথ [য.প্রা.] নভেল [য.প্রা.] পুরস্কার পেয়েছিলেন। ‘ প্রথম উদাহরণে ভুল সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু তৃতীয় বন্ধনীর দ্বারা বলে দেওয়া হল যে সংশোধন আমার করা। আর দ্বিতীয় উদাহরণে, য. প্রা. (অর্থাৎ যথাপ্রাপ্ত, মানে ঠিক যেভাবে পেয়েছি; এ-রকম ক্ষেত্রে ইংরেজিতে sic লেখে) লিখে বোঝানো হলো যে— ভুল আমি করি নি, এই ভুল বানানেই আমি এ দুটো শব্দ পেয়েছি। এক কথায় ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে— অন্যের কথার মধ্যে নিজের কথা ঢোকাতে গেলে তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে তাকে আটকে রাখতে হয়।

একবিন্দু ( . )

একবিন্দু বা ফুটকি চিহ্ন যতি-চিহ্ন হিসেবে পূর্বে কখনোই প্রযুক্ত হত না। বর্তমানে এই চিহ্নকে সংক্ষেপণের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হয়; অবিকল ইংরেজিতে যেভাবে প্রয়োগ করা হয় সেভাবেই বাংলাতেও করা হয়। যেমন—M. A. = এম. এ.; B. A. = বি. এ. Md. = মো./মু. (অর্থাৎ মোহাম্মদ/মুহাম্মদ)। [পূর্বে এক্ষেত্রে লেখা হত : মোঃ / মুঃ। তারো আগে লেখা হত-মোং Dr. = ড. (অর্থাৎ যাঁর পিএইচ. ডি. ডিগ্রি আছে, ডক্টরেট উপাধিধারী), কিংবা ডা. (অর্থাৎ ডাক্তার, চিকিৎসক)। লক্ষণীয় : বিসর্গ (ঃ) সংক্ষেপচিহ্ন নয়। তাই ড., মিঃ ইত্যাদিতে বিসর্গ ব্যবহার করা ভুল। তাহলে এগুলোর উচ্চারণ হয় ডহ্, মিহ্ । যে-সব শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ প্রথম ও শেষ বর্ণ নিয়ে গঠিত হয় সেগুলোতে বিন্দুচিহ্ন না দিলেও চলে। যেমন – বি এ, এম এ, পিএইচ ডি।

ত্রিবিন্দু ( … )

ত্রিবিন্দু ব্যবহার করা হয় মোটামুটি দুটি ক্ষেত্রে : বর্জনচিহ্ন হিসেবে এর ব্যবহার। কোনো কথা বাদ দেওয়া হয়েছে— বোঝাবার জন্যে ত্রিবিন্দু ব্যবহার করা হয়। যেমন : লেস্কোফ্ একজন যথার্থ লেখক … ভাষার ওপরে প্রচণ্ড দখল। [এখানে বর্জিত অংশের চিহ্ন এই ত্ৰিবিন্দু] কথা অসমাপ্ত রেখে দেওয়া হচ্ছে— বোঝাতে ত্রিবিন্দু ব্যবহার করা হয়। যেমন : পাগল কি আমিই নাকি অন্যরা- যারা [এখানে বক্তব্য অসমাপ্ত রেখে দেওয়া হয়েছে। অসম্পূর্ণতার চিহ্ন হিসেবে এখানে ত্ৰিবিন্দু … বসেছে!]

তিন তারকা ( * * *)

তিন তারকাও বর্জনচিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে কবিতার ক্ষেত্রে কোনো স্তবক বাদ দিলে সে স্থানে তিন তারকা ব্যবহার করতে হয়।

বিকল্পচিহ্ন ( / )

বিকল্পচিহ্ন প্রয়োগ করে বোঝানো হয়- দুই বা ততোধিক শব্দ বা বাক্যের মধ্যে যে কোনোটি হতে পারে। অর্থাৎ, এই চিহ্নের অর্থ হচ্ছে ‘অথবা’। যেমন—ঘরের মধ্যে বেশি লোক নেই তো- বড়ো জোর আট/দশ জন হবে। অপ্রয়োজনীয় অংশ কেটে দিন : আমার ভারতভ্রমণের উদ্দেশ্য লেখাপড়া করা । তীর্থদর্শন । তারিখ বা ভগ্নাংশ প্রকাশ করতে ব্যবহৃত হয়। যেমন— ০৩/০২/২০০১; ৫/৮। 8. বাড়ির নম্বর নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। যেমন— ৩৮/২ক বাংলাবাজার, ঢাকা। ব্যবসায়িক কাজ। কবিতা থেকে উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে গদ্যের মতো একটানা লিখতে চাইলে প্রতি পক্তির শেষে বিকল্পচিহ্ন দিতে হয়।

অবশ্য বোঝাই যাচ্ছে, বিকল্প হিসেবে এই যতি-চিহ্ন বসছে না। যেমন : ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, / ও পারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাস।’ এখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতার দুটি পক্তির পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বিকল্পচিহ্ন দিয়ে। এক্ষেত্রে এটি বিকল্পচিহ্ন নয়, ছেদচিহ্ন।

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন