বাংলা ভাষার প্রয়োগ, তাত্ত্বিক অংশ, পলিটেকনিক বাংলা ৬৫৭১১ | Polytechnic Bangla, 65711

অধ্যায় ১. বাংলা ভাষার প্রয়োগ, অংশ : তাত্বিক, বিষয় : পলিটেকনিক বাংলা ৬৫৭১১ [ Polytechnic Bangla, 65711 ]

Table of Contents

তাত্ত্বিক অংশ [ ১. বাংলা ভাষার প্রয়োগ ]

(ক) বাংলা ভাষা

১.১ ভাষার সংজ্ঞা :

মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। চারপাশের এ চলমান, বিচিত্র জগৎ ও জীবন থেকে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ নানা অনুভূতি প্রাপ্ত হয়। সে তার এ অনুভবকে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চায়। অন্যের কাছে অনুভূতি বা মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন বা উপায় হচ্ছে ভাষা। ইশারা ইঙ্গিত, অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ মনোভাব প্রকাশ করতে পারে। তবে তা অতি সামান্য ও সীমিত। মনের ভাবকে ভাষা ভিন্ন অন্য মাধ্যমে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা যায় না।

ভাষা হচ্ছে ধ্বনির সমষ্টি। মানুষ বাগযন্ত্র তথ্য স্বরতন্ত্র, কন্ঠ, জিহ্বা, দত্ত, ওষ্ঠ ইত্যাদির সাহায্যে বাতাসে কাঁপুনি সৃষ্টির মাধ্যমে ধ্বনির সৃষ্টির করে। ঘটনাচক্রে বা সময়ের ব্যবধানে নিরন্তর ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমে মানুষ কোনো কোনো ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে বিশেষ বস্তু বা ভাবের প্রকাশের উপযোগী করে তোলে। অর্থাৎ, কোনো বিশেষ ধ্বনি বিশেষ বস্তু বা ভাবের দ্যোতক হয়ে উঠে। এ অর্থদ্যোতক বা অর্থপ্রকাশক ধ্বনির সমষ্টিই ভাষা।

ভাষা মানুষের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। আদিম মানুষ কথা বলতে পারতো না, অর্থাৎ তাদের কোনো ভাষা ছিল না। ইশারা, ইঙ্গিতের সাহায্যে তারা যতটুকু সম্ভব মনোভাব প্রকাশ করতো। বহু শত্, সহস্র বছরের ক্রমাগত সাধনার মাধ্যমে মানুষ ভাষা করায়ত্ত করেছে। প্রথম দিকে ভাষার শব্দসংখ্যা কম ছিল। কাজেই প্রকাশ ক্ষমতাও ছিল অল্প সময়ের ব্যবধানে ক্রমাগত প্রচেষ্টা বা অধ্যবসায়ের ফলে দিন দিন মানুষের ভাষা উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছে।

ভাষার প্রামাণ্য সংজ্ঞা : “মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে অন্যের বোধগম্য যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি তাকে ভাষা বলে।”

(1) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, “মনুষ্যজাতি যে সব ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টির সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করে, তাকে ভাষা বলে।”

(ii) ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনি দ্বারা নিষ্পন্ন, কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দ সমষ্টিকে ভাষা বলে।”

(iii) ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেছেন, “মানুষ বাগযন্ত্রের সাহায্যে সমাজভুক্ত জনগণের বোধগম্য যে সমস্ত উচ্চারণ করে সে সমস্ত ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টিকে ভাষা বলে।”

(iv) ড. সুকুমার সেনের মতে, “মানুষের উচ্চারিত, অর্থবহ বহুজনবোধ্য ধ্বনির সমষ্টিই ভাষা।” বর্তমান পৃথিবীতে আড়াই হাজারেরও বেশি ভাষা চালু আছে। ভাষাবিজ্ঞানিগণ মনে করেন হাজার পাঁচেক বছর আগে পৃথিবীতে মোটামুটি ১১টি ভাষা বংশ ছিল। যেমন- ইন্দো-ইউরোপীয়, সেমীয়-হামীয়, বান্টু, তুর্ক-মঙ্গল-মান্ষু ইত্যাদি। এ ভাষাগুলো থেকে সময়ের ব্যবধানে হাজার হাজার ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। ভাষা হচ্ছে প্রবহমান নদীর মতো। এটি মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে হতে রূপ পাল্টায়। ফলে একটি ভাষা থেকে উৎপত্তি লাভ করে কয়েকটি ভাষার।

প্রাথমিক আলোচনা বাংলা ভাষার প্রয়োগ, তাত্ত্বিক অংশ, পলিটেকনিক বাংলা ৬৫৭১১ | Polytechnic Bangla, 65711

বাংলা ভাষার উদ্ভব:

ভাষাবিদগণের ধারণা খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ বছর তথা আজ থেকে প্রায় ৭০০০ বছর পূর্বে ইন্দো-ইউরোপীয় নামে একটি ভাষা চালু ছিল।

পূর্বে ইন্ডিয়া, পশ্চিমে ইউরোপ এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বর্তমানে যত ভাষা চালু রয়েছে এর অধিকাংশই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে এসেছে। বলা বাহুল। ইন্দো-ইউরোপীয় নাম আধুনিককালের গবেষকদের দেয়া নাম। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার দুটি প্রধান শাখা ছিল কেস্তম ও শতম। এ শতম শাখা থেকে এসেছে হিন্দু আর্য ভাষা। আর হিন্দ আর্য ভাষার একটি শাখা ভারতীয় আর্য। ভারতীয় আর্য থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে মোটামুটি, সপ্তম খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে উদ্ভব হয়েছে বাংলা ভাষার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যুগবিভাগ:

বাংলা ভাষা সাহিত্যের সবচেয়ে আদি নিদর্শন যা পাওয়া গিয়েছে তার নাম চর্যাপদ বা চর্যাগীতিকা। এটি বৌদ্ধ সহজিয়াদের রচিত এক সাধন সংগীতের সংকলন গ্রন্থ। এতে ২৩ জন কবির ৫১টি গান বা কবিতা ছিল। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সবচেয়ে প্রাচীন চর্যার রচনাকাল সপ্তম শতাব্দীর মধ্যভাগ তথা ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ। তাহলে বাংলা ভাষার বয়স সাড়ে তের শত বছর। এ সময়কে ভাষা ও সাহিত্যের লক্ষণ বিচারে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে সময়। এ সময়ের নিদর্শন প্রধানত চর্যাপদ।

১। প্রাচীন যুগ :

৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত:

বিস্তারিত দেখুন:

বাংলা সাহিত্যের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ । প্রবন্ধ রচনা , রচনা লিখন

maxresdefault বাংলা ভাষার প্রয়োগ, তাত্ত্বিক অংশ, পলিটেকনিক বাংলা ৬৫৭১১ | Polytechnic Bangla, 65711

 

২। মধ্যযুগ:

১২০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, নাথ সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণোয়াপাখ্যান বৈষ্ণব পদাবলি, দোভাষী পুথি, কবিগান ইত্যাদি মধ্যযুগের নিদর্শন।

maxresdefault 1 বাংলা ভাষার প্রয়োগ, তাত্ত্বিক অংশ, পলিটেকনিক বাংলা ৬৫৭১১ | Polytechnic Bangla, 65711

 

৩। আধুনিক যুগ:

১৮০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত।

১.২ বাংলা ভাষারীতি- সাধু, চলিতরীতি ও আঞ্চলিক বা উপভাষা:

পৃথিবীর প্রায় সকল উন্নত ভাষারই দুটি রূপ রয়েছে, যথা- কথ্যরূপ ও লেখ্যরূপ। উল্লিখিত এ দুটি রূপের মধ্যেও রয়েছে বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। বাংলা ভাষার কথ্য ও লেখ্যরূপের মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এ বৈচিত্র্য বাংলা ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ।

ভাষা নদীর গতিশীল জলধারার মতো সবসময় প্রবহমান থাকে। এ প্রবাহ এর প্রাণ। মুখে মুখে ভাষার ব্যবহারে যে পরিবর্তন ঘটে, তাতে অনেক সময় নতুন কোনো নিয়মের সৃষ্টি হয়। সে নিয়ম কালক্রমে ব্যাকরণের আওতাভুক্ত হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষার উৎপত্তির সময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ভাষার গতিপথ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, ধ্বনি, শব্দ ও রূপতত্ত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সবসময়। একটিমাত্র রূপ বিদ্যমান থাকে নি।

১.২.১ সাধু ভাষারীতি শব্দ ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্যঃ

বাংলা ভাষাভাষীরা চিরদিন গদ্যে কথাবার্তা বললেও ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ বা আধুনিক যুগের পূর্বে বাংলা গদ্যের কোনো লেখারূপ ছিল না। তৎকালে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে যে সাহিত্যিক ভাষা একমাত্র ব্যবহার্য ভাষা হিসেবে রূপ লাভ করেছে, তাঁকে বলে সাধুভাষা “সাধু’ অর্থাৎ ‘শিষ্ট’ বা অম্রজনের ভাষা হিসেবে এ রীতির পরিচয়।

সাধারণত পূর্ণ ক্রিয়াপদ সর্বনাম পদ সম্বলিত যে গুরুগম্ভীর কৃত্রিম রীতি কেবল লেখার কাজে ব্যবহার করা হয়, তাকে সাধুভাষা বলা হয়। শুধুমাত্র লেখার কাজে ব্যবহৃত হয় বলে একে আধুনিককালে লেখা ভাষা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

https://youtu.be/3jHbYoCo1YA
https://youtu.be/3jHbYoCo1YA

 

সাধু ভাষারীতির কতকগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

১। সাধু সাধু ভাষারীতি প্রাচীন। এ রীতি সুনির্ধারিত ব্যাকরণ অনুসরণ করে। এর ফলে এ রীতি দুষ্পরিবর্তনীয় এবং এর পদবিন্যাসও সুনির্দিষ্ট।

২। সাধুভাষার সমাপিকা ও অসমাপিকা উভয় শ্রেণির ক্রিয়াপদ আকারে বড়, যেমন- হইয়াছিল, করিয়াছিল, চলিয়াছিল, বলিয়াছে, চলিব ইত্যাদি

৩। সাধুরীতির সর্বনাম পদ চলিতরীতির সর্বনাম পদের থেকে আকারে বড়, যেমন- তাহার > তাঁর, তাহাদের > তাদের, ইহারা > এরা, তাহা > তা, ইত্যাদি।

৪। সাধুরীতিতে হইতে, দিয়া ইত্যাদি অনুসর্গ ব্যবহৃত হয়।

৫। সাধুৱীতিতে সংস্কৃত অব্যয় ব্যবহৃত হয়, যেমন- যদ্যপি, তথাপি ইত্যাদি।

৬। সাধুরীতিতে তৎসম শব্দের ব্যবহার বেশি। তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার খুবই কম। যেমন- নৃত্য, ভাতা, অনা, শয়ন, ভোজন, মনুষ্য ইত্যাদি।

৭। স্বরসঙ্গতি, অভিশ্রুতি ও সমীকরণ প্রকৃতি নিয়মানুসারে সাধুরীতি চলিত রীতির চেয়ে ভিন্নতর। যেমন। ভিতর > ভেতর, নাই স নেই, ইত্যাদি।

৮। সাধুরীতির গতি গুরুগম্ভীর, কৃত্রিম। এজনা দৈনন্দিন জীবনে কথা বলার রীতির সাথে সাধুরীতির সম্পর্ক নেই।

শব্দ ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের জন্য নিম্নে সাধুরীতির কতিপর দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলোঃ

“যদি কেহ অন্যের বস্তু লইতে বাঞ্ছা করে, ঐ বস্তু তাহার নিকট চাহিয়া কিংবা কিনিয়া লওয়া উচিত। অজ্ঞাতসারে অথবা বলপূর্বক কিংবা প্রতারণা করিয়া লওয়া উচিত নহে। এরূপ করিয়া লইলে অপহরণ করা হয়।”

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (বোধদয়) দারোগা আসিতে পরদিন বেলা প্রহরেক হইল। আসিয়া তিনি খুনের তদারকে প্রবৃত্ত হইলেন। রীতিমতো সুরতহাল ও লাশ তদারক করিয়া রিপোর্ট পাঠাইলেন। পরে রোহিনীর মৃতদেহ বাঁধিয়া-ছানিয়া, গরুর গাড়িতে বোঝাই দিয়া চৌকিদারের সঙ্গে ডাক্তার খানায় পাঠাইলেন।” -বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (কৃষ্ণকান্তের উইল)

“বিশ্বের বিচিত্র সৃষ্টির মধ্যে গ্রন্থাগারও একটি। মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল যদি এমনি করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমন্ত শিশুটির মতো চুপ করিয়া থাকিত, তবে সে নীরব মহাশব্দের সহিত এই পুস্তকাগারের তুলনা হইত।” -“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর” (লাইব্রেরি)

১.২.২ চলিত ভাষারীতি ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য, পার্থক্য ও উদাহরণ :

শিক্ষিত বাঙালি সমাজে মার্জিত কথ্য ভাষা হিসেবে প্রচলিত ও সর্বজনমান্য লেখ্য ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ভাষাই হলো চলিত ভাষা। বাংলা লৈখিক ভাষার অপেক্ষাকৃত আধুনিক রূপটিকে বলা হয় চলিত ভাষা।

ভাগীরথী নদীর উভয় তীরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষিত জনগণের মুখের ভাষার আদলে আর একটি লেখ্য ভাষা কলকাতায় অবস্থানকারী বহু শক্তিশালী লেখক তাঁদের গদ্য সাহিত্যে ব্যবহার করতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে প্রমথ চৌধুরী অন্যতম। তাঁর পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রীতিতে লিখতে থাকেন।

বাংলা গদ্য সাহিত্যে চালু হলো একটি নতুন রীতি। এ রীতি কলকাতা বা ভাগীরথী তীরবর্তী অঞ্চখালের কারোর মুখের ভাষা নয়। অথচ এসব অঞ্চলের কথা ভাষার ভিত্তিতে গঠিত একটি পরিমার্জিত লেখ্য ভাষা সর্বজন স্বীকৃতি লাভ করে। এ পরিমার্জিত লেখ্য ভাষার অধিকাংশ শব্দসম্পদ তত্ত্বব, ক্রিয়া সর্বনামের রূপ সাধুভাষার রূপ হতে বহুল পরিমাণে সংকুচিত।

এর গতি হালকা চটুল, ভাবভঙ্গী অনেকটা স্বাভাবিক বলে সাবলীল এবং পদবিন্যাস প্রণালি প্রধানত লেখকের মনোভাব অনুসারী। এ নতুন গন্যরীতির নাম ‘চলিত ভাষা।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে ও প্রবাসী বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যে সাহিত্য রচনায়, বক্তৃতা, ভাষণে, বিজ্ঞপ্তি বিবৃতিতে, পত্রপত্রিকায়, রেডিও-টেলিভিশনে, পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থায় চলিত ভাষার ব্যবহার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বাংলা মৌখিক ভাষা অঞ্চলভেদে বিভিন্ন হয়।

চলিত ভাষা ও মৌখিক ভাষা কিন্তু এক নয়। মৌখিক বা কথ্য ভাষার শব্দ ও তার উচ্চারণ অঞ্চলভেদে এত ভিন্ন হয় যে অনেক সময় এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের মানুষের বুঝতে খুব কষ্ট হয়। আর সব অঞ্চলের মানুষের জন্য গ্রহণীয় বোধগম্য ও মান্য ভাষা হলো চলিত ভাষা। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাজে চলিত ভাষাই প্রধান মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।

চলিতরীতির কতিপয় দৃষ্টান্ত :

“গানের সুর সংসারের উপর থেকে এই সমস্ত চেনা কথার পর্দা এক টানে ছিঁড়ে ফেলে দিল। চিরদিনকার বর-কনের শুভদৃষ্টি হচ্ছে কোনো রক্ত মাংসের সলঙ্ক অবগুণ্ঠন তলে, তাই তাঁর তানে তানে প্রকাশ হয়ে পড়ল। যখন সেখানকার মালাবদলের গান বাঁশিতে বেজে উঠল তখন এখানকার এই কলেটির দিকে চেয়ে দেখলেন তাঁর গলায় সোনার হার, পায়ে দুগাছি মল, সে যেন কান্নার সরোবরে আনন্দের পদ্মাটির উপরে দাঁড়িয়ে।” –রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“পৃথিবীর আর সব সভ্যজাত যতই চোখের সংখ্যা বাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ততই আরব্য উপন্যাসের একচোখা দৈত্যের মতো খোঁৎ ঘোঁধ করি আর চোখ বাড়াবার কথা তুললেই চোখ রাঙাই। চোখ বাড়াবার পন্থাটি কী? প্রথমতঃ বই পড়া এবং তার জন্য দরকার বই কেনার প্রবৃত্তি।”-সৈয়দ মুজতবা আলী (বই কেনা)

বহুকাল মৃত বহুকাল বিস্তৃত কোনো শুরুনো ফুলের পাপড়ি যদি হঠাৎ আবিষ্কার করা যায়, তা হলে যে সেটিকে এককালে সজীব অবস্থায় সাদরে সঞ্চিত করে রেখেছিল, একমাত্র তাঁরই কাছে সে শুদ্ধ পুষ্পের মূল্য আছে, অপরের কাছে তা বর্ণ গন্ধহীন আবর্জনা মাত্র। মানুষের স্মৃতির ভিতরেও এমন অনেক শুকনো কালি সঞ্চিত থাকে, যা অপরের কাছে বার করা যায় না” – প্রমথ চৌধুরী (বর্ষা)

চলিত ভাষারীতির বৈশিষ্ট্যঃ

১। চলিত ভাষারীতির সমাপিকা ও অসমাপিকা উভয় শ্রেণির ক্রিয়াপদ ছোট আকারের, যা বাক্যকে গতিশীল করতে সহায়ক যেমন- করছে করিতেছে, বলছে < বলিতেছে, খাচ্ছে খাইতেছে ইত্যাদি।

২। চলিতরীতির সর্বনাম ছোট আকারের, যা ভাষাকে সহজবোধ্য করতে সহায়ক, যেমন যারা < যাহারা, কারা < কাহারা, এতে < ইহাতে, তার < তাহার ইত্যাদি

৩। চলিতরীতির অনুসর্গ সাধুরীতির তুলনায় শ্রুতিমধুর এবং সহজবোধ্য, যেমন নিয়ে < দিয়া থেকে < হইতে ইত্যাদি

৪। চলিতরীতিতে তত্ত্বব অব্যয় ব্যবহৃত হয়, যেমন— যদি, তবুও ইত্যাদি।

৫। চলিত ভাষায় তদ্ভব দেশি ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার বেশি, ফলে এ রীতি গতিশীল। যেমন

তদ্ভব শব্দ:

আজ, বোন, আটপৌরে ইত্যাদি

 

 

দেশি শব্দ:

ডিঙি, ঢেঁকি, খোকা, ইত্যাদি

বিদেশি শব্দ :

স্কুল, বগী, বেনামি ইত্যাদি।

৬। স্বরসঙ্গতি, অতিশ্রুতি ও সমীকরণ প্রকৃতি নিয়মানুসারে চলিতরীতি শ্রুতিমধুর। যেমন নেই < নাই, ভেতর < ভিতর, শ্রীহট্ট < সিলেট ইত্যাদি।

৭। চলিত ভাষারীতির শব্দপ্রয়োগ সহজ, বোধগম্য ও গতিশীল, ফলে এ রীতির সাহায্যে সাহিত্যের ভাষাকে লোক সাধারণের

কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সাধু ও চলিতরীতির মিশ্রণ দূষণীয় :

আধুনিক যুগে সাধু ও চলিত দুটো রীতিই লেখ্য ভাষারূপে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে উভয় রীতি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করা উচিত। সাধু ও ধরনের। এছাড়া শব্দের ব্যবহারও ভিন্ন। দুই রীতির মিশ্রণ হলে ভাষা গতিশীলতা ও সৌন্দর্য হারায়। তাই উভয় রীতির মিশ্রণ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। যে-কোনো রচনা হয় সাধুভাষায় না হয় চলিত ভাষায় লেখার নিয়ম। কোনো পরীক্ষার উত্তরের বেলায় অবশ্যই এ দুটি রীতির মিশ্রণ সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে।

সাধু ও চলিতরীতির মিশ্রণজনিত গুরুচণ্ডালী দোষ :

সাধু ও চলিত ভাষারীতির মিশ্রণে বাংলা ভাষায় যে তৃতীয় রূপের প্রকাশ ঘটে, তা চলিতরীতির মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান। এ দুই রীতির মিশ্রণের ফলে ভাষা কলুষিত হয়ে যায়। এ কারণেই রচনায় ও কথাবার্তায় এ দু রীতি মিশিয়ে ফেলা দূষণীয় বলে বিবেচিত হয়। সাধুরীতির ক্রিয়া ও সর্বনাম পদ আর চলিতরীতির ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদ ভিন্ন ‘গুরুচণ্ডালী’ দোষে দুষ্ট বলে অভিহিত হয়।

বাংলা ভাষার পরিবর্তনের সূত্রে ভাষায় নানা ধরনের শব্দ এবং তার বিচিত্র প্রয়োগ ঘটেছে। ফলে ভাষায় সাধু ও চলিতরীতির মিশ্রণ তবে এজন্য আঞ্চলিক প্রভাব মারাত্মকভাবে দায়ী। চলিত ভাষার সাবলীল কথ্যরীতির সঙ্গে আঞ্চলিক – রণগত অশুদ্ধরূপ ও সাধু ভাষার ক্রিয়া ও সর্বনাম পদের পূর্ণরীতির মিশ্রণে ভাষায় গুরুচণ্ডালী দোষ ঘটে।

সর্বোপরি এ ও চলিত ভাষাস পূর্ব সম্যক জ্ঞান না থাকা এবং ব্যাকরণগত দুর্বলতাও ভাষারীতির মিশ্রণের অন্যতম কারণ। কবিতার ক্ষেত্রে হয়। এর প্রয়োজন এবং মাত্রা স্মৃতির স্বার্থে সাধু ও চলিতরীতির মিশ্রণ ঘটলে তা দূষণীয় বলে বিবেচিত হয় না। কবিগণ ছন্দের ও মাজনে নির্দিষ্ট মাপের শব্দবহার করতে বাধ্য হন বলে তাঁরা শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করেন।

অর্থাৎ কবিদের গায় সাধু ও চলিতরীতির মিশ্রণ কার করে নেয়া হয়েছে। যেমন- সকালে উঠিয়া (সাধু) আমি মনে মনে বলি সারাদিন আমি যে ভালো হয়ে চলি (চলিত)।

সাধু ও চলিতরীতির পার্থক্য:

বাংলা লেখা ভাষার সাধু ও চলিতরীতির বৈশিষ্ট্য আলোচনার পার্থক্য চিহ্নিত করতে পারি। নিচের ছকে উভয় রীতির পার্থক্য দেখানো হলোঃ

পার্থক্যের বিষয়

১। উৎপত্তিগত পার্থক্য :

সাধুরীতি: বাংলা লেখ্য ভাষার যে রূপটি উনিশ শতকের শুরুতে সংস্কৃত জানা পণ্ডিতদের হাতে নির্মিত হয়, তাই সাধুরীতি।

চলিতরীতি: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভাগীরথী তীরবর্তী এলাকার শিক্ষিত জনের কথ্য ভাষার আদলে চলিতরীতি গড়ে উঠেছে।

২। ক্রিয়াপদের ব্যবহার :

সাধুরীতি: সাধুরীতিতে সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার পূর্ণ রূপ  ব্যবহৃত হয়। যেমন- করিব, করিয়া ইত্যাদি।

চলিতরীতি: চলিত রীতিতে সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ায় সংক্ষিপ্তরূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন- করব, করে ইত্যাদি।

৩। সর্বনাম পদের ব্যবহারঃ

সাধুরীতি: সাধুরীতিতে সর্বনাম পদের পূর্ণরূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন- তাহারা, যাহাকে ইত্যাদি।

চলিতরীতি:  চলিতরীতিতে সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন- তারা, যাকে ইত্যাদি।

৪। অনুসর্গ ও অব্যয়ের ব্যবহার :

সাধুরীতি: সাধুরাতিতে অনুসর্গ ও অন্যান্য অব্যয় পদের প্রাচীন ও পূর্ণরূপ বসে। যেমন— তথাপি, হইতে ইত্যাদি।

চলিতরীতি: চলিতরীতিতে অনুসর্গ ও অব্যয়ের আধুনিক ও সংক্ষিপ্তরূপ ব্যবহৃত হয়। যেমন- তবু, হতে ইত্যাদি।

৫। শব্দ ব্যবহার :

সাধুরীতি: সাধুরীতিতে অধিক হারে তৎসম ও দীর্ঘ সমাসবৃদ্ধ পদ ব্যবহৃত হয়।

চলিতরীতি: চলিতরীতিতে অধিকহারে তত্ত্বব, দেশি ও বিদেশি শব্দ ব্যবহৃত হয়

৬। পদবিন্যাস:

সাধুরীতি : সাধুরীতির পদবিন্যাস ব্যাকরণ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট।

চলিতরীতি:  চলিতরীতির পদবিন্যাস ব্যাকরণ কর্তৃক সুনির্দিষ্ট নয়। সময়ের ব্যবধানে এটি পরিবর্তিত হচ্ছে।

৭. চাল-চলন :

সাধুরীতি : সাধুরীতি গুরুগম্ভীর ধীর লয়ের ভাষারীতি।

সাধুরীতি : চলিতরীতি হালকা-চপল লঘু লয়ের ভাষারীতি।

১.২.৩ আঞ্চলিক বা উপভাষা :

যে ভাষায় কোনো বিশেষ অঞ্চলের লোক কথা বলে তাকে আঞ্চলিক ভাষা বলে। এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের লোকের কাছে সহজবোধ্য নয়। রূপভেদের জন্য একে সাহিত্য সৃষ্টির সর্বজনীন স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, বাংলাদেশে প্রাচীনকালে অনার্য জাতি বসবাস করতো। পরবর্তীকালে উত্তর ভারত থেকে আর্যরা দক্ষিণে অগ্রসর হলে অনার্যরা ভারতের আরও দক্ষিণে চলে যায়। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক সভ্যতার বিস্তার সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে অনুমান করা হয় যে, এ অঞ্চলে অনার্য, আর্য, আরব ও পর্তুগিজ জাতির সংমিশ্রণে একটি শঙ্কর জাতি গড়ে ওঠে।

বিভিন্ন স্থানে এই মিশ্রিত জাতি বসবাসের পর ভৌগোলিক দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব, অর্থনৈতিক ব্যবধান, সামাজিক ও ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের । বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষার প্রচলন হয়। ব্রিটিশ পরবর্তী যুগে বাংলা চলিত ভাষার একটি রূপ কলকাতাকে কেন্দ্র করে গঠিত হলেও আঞ্চলিক ভাষাগুলো পাশাপাশি ব্যবহৃত হতে থাকে।

বাংলাদেশের এই আঞ্চলিক ভাষাগুলোর বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাংলা ভাষাকে আমরা নিম্নোক্ত উপভাষায় শ্রেণিবদ্ধ করতে পারি ।

১। উত্তরবঙ্গীয় : দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনা

২। রাজবংশী : রংপুর

৩। পূর্ববঙ্গীয় :

(ক) ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল

(খ) ফরিদপুর, যশোর, খুলনা

(গ) সিলেট।

৪। দক্ষিণবঙ্গীয় : চট্টগ্রাম, নোয়াখালী।

 

বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার নমুনা :

চট্টগ্রামের উপভাষা : এক বাঅনর অগতয়া মুনিষ পোয়া আছিল।

চলিত রূপ : এক ব্রাহ্মণের একটা ছেলে ছিল।

নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা : কী চলিত রূপ কী দেখলে বুড়ো?

চলিত রূপ : সেইকলা, বুইয় গা?

বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা: বোঝড়ো ব্যাডা, কী কমু!

চলিত রূপ : বুঝেছ ভাই, কী বলব।

অঞ্চলভেদে আঞ্চলিক ভাষার রূপ : “বৃষ্টি আসছে দেখে আমি এক দৌড়ে বাড়ি এলাম।”

রংপুর : অঞ্চল ” বৃষ্টি আইছে বাহে মুই দৌড় দিয়া বাড়ি গেনু”।

চট্টগ্রাম অঞ্চল ‘ঝড় আইস্যে দেখ্যাইয়ারে আই এক দৌড়ত বাড়িত চইল্যা আইসছি।”

সিলেট অঞ্চল : “মেঘ আইছে দেখিয়া আমি এক দৌড়ে বাড়িত আইলাম”।

কুমিল্লা অঞ্চল: ‘মেঘ আইছে সেইক্কা আই এক চালি মাইৱা বাড়িত আইলাম”।

আঞ্চলিক ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:

১। আধুনিক কথা বা চলিত বাংলায় যে-সব শব্দে ‘ডু’ ধ্বনি আছে, উত্তরবঙ্গীয় আঞ্চলিক ভাষায় সে-সব শব্দে “র” ব্যবহৃত হয়। যেমন- বড়/বর।

২। স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভাষায় ‘এ’ এবং ‘ই’ ধ্বনির বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। যেমন- (পাট/প্যাট, আমার/আর, দেখলাম/ দেইখলাম, যাব/যাইমু ইত্যাদি।

৩। চলিত বাংলা ও আঞ্চলিক বাংলা চ/ছ, // ধ্বনির মধ্যে ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মহাপ্রাণ ধ্বনিগুলো অল্পপ্রাণ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়। যেমন- ভাল/বালা, ঝিয়ে/জেংগা, রাধুনী/রাদনী, গর্ভ/ গর্ব, ঘুমাতে/শুমাতে ইত্যাদি।

৪। আঞ্চলিক ভাষায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষত বরিশাল অঞ্চলে ‘স’ ধ্বনি ‘হ’ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়। যেমন- শালা/হালা, মুরগি/মুহ ইত্যাদি।

৫। চট্টগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। এ আঞ্চলিক ভাষাগুলোতে সাধারণভাবে সংযুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনির ব্যবহার অলক্ষণীয়। যেমন –

(নোয়াখালী) চমৎকৃত → আচানক

(সিলেট) বৃষ্টি → মেগ

(চট্টগ্রাম) হউরড → শ্বশুর, বাঁঅনরা ব্রাহ্মণ

৬। অ-কারের ও-কাররূপে উচ্চারণ প্রবণতা। যেমন- বন > বোন, মধু > মৌধু।

৭। পদমধ্যস্থিত অঘোষ ধ্বনি ঘোষবৎ ধ্বনিরূপে উচ্চারিত হয়। যেমন- ছোট > ছুডু কেটা শ, ষ, ম-এর ‘হ’ রূপে উচ্চারণ রীতি। যেমন- সে-হে, শালা-হালা।

৯। আনুনাসিক স্বরধ্বনির প্রচুর ব্যবহার। যেমন- আমি > আই, টাকা > টেঁআ, কুকুর > কুঁউর।

১০। শব্দ মধ্যস্থ বাজন ধ্বনি লুপ্তি প্রকাতা। যেমন পাগল > ফঅল।

আঞ্চলিক ভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য:

১। অঞ্চল বিশেষে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা।

২। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা বিভিন্ন রকম।

৩। আঞ্চলিক ভাষা ব্যাকরণে বর্ণিত নিয়ম মানে না।

প্রমিত ভাষা বা মান ভাষা :

আঞ্চলিক ভাষাকে সর্বজন স্বীকৃতি দিলে ভাবের অন্তরায় দেখা দিতে পারে এজন্য প্রমিত ভাষার সৃষ্টি। যে ভাষা মার্জিত, শোভন এবং সকল অঞ্চাদের সবাই বুঝতে পারে, তাকে প্রমিত ভাষা বলে। যেমন- বিষয়টি কী বুঝলাই? এর প্রমিত ভাষারূপ হলো- বিষয়টি কি বুঝতে পেরেছ?

প্রমিত ভাষার আর এক নাম মান ভাষা (Standard colloquial language)

প্রমিত ভাষার বৈশিষ্ট্যঃ

১। এ ভাষা দেশের শিক্ষিত ও পণ্ডিত সমাজের একটি আদর্শ ভাষা।

২। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এ ভাষাতেই সাহিত্য বেশি লেখা হয়।

৩। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তক এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে।

অনুশীলনী  [ অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – বাংলা ভাষার প্রয়োগ

১.১। ভাষা বলতে কী বুঝায়? অথবা, ভাষা কাকে বলে?

[পলি-২০১৩, ১৪ (পরি), ১৭/ [পলি-২০১৭ (পরি )|

উত্তর : মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে অন্যের বোধগম্য যে ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টি উৎপন্ন করে তাকে ভাষা বলে।

১.২। মানুষের ভাব বিনিময়ের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ বাহন কোনটি?

উত্তর : ভাষা।

১.৩। বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে কোন রীতি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হচ্ছে?

উত্তর : চলিতরীতি।

১.৪। সার্বজনীন কথ্য ভাষা বলতে কী বুঝায়?

(উত্তর = সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ভাষাকে সার্বজনীন কথ্য ভাষা বলে।

১.৫। লেখ্য ভাষার প্রাচীন রীতি কোনটি?

উত্তর : সাধুরীতি।

১.৬। চলিতরীতি কোন এলাকার ভাষার আদলে গঠিত হয়েছে?

উত্তর : ভাগীরথীর তীরবর্তী এলাকার শিক্ষিত মানুষের ভাষার আদলে।

১.৭। সাধুরীতিতে ক্রিয়াপদের কোনরূপ বসে?

(উত্তর) ক্রিয়াপদের পূর্ণরূপ বসে।

১.৮। সাধুরীতিতে অধিক হারে কোন ধরনের শব্দ বসে?

উত্তর স শব্দ।

১.৯। চলিতরীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের কোন রূপ বসে?

উত্তর : সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্ত ও কোমল রূপ বসে।

১.১০। চলিতরীতিতে অধিক হারে কোন জাতীয় শব্দ বসে?

উত্তর : অধিক হারে তত্ত্বব, দেশি ও বিদেশি শব্দ বসে।

১.১১। ভাবগম্ভীর প্রবন্ধের জন্যে কোন ভাষা অধিকতর উপযোগী?

উত্তর : সাধুভাষা।

১.১২। মৌখিক ভাষা কত প্রকার ও কী কী?

(উত্তর) মৌখিক ভাষা দু’প্রকার, যথা- (ক) চলিতরীতি ও (খ) আঞ্চলিক ভাষা।

১.১৩। কীসের মাধ্যমে মানুষ ধ্বনি উচ্চারণ করে থাকে?

উত্তর : বাক্-প্রত্যঙ্গের সাহায্যে।

১.১৪। প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতি কাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল?

উত্তর : এ অঞ্চলের অস্ট্রিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীদের নিয়ে।

১.১৫। কোনো সমাজের মানুষের কথাবার্তা, চাল-চলন, রীতিনীতি নিয়ে কী গড়ে উঠে।

(উত্তর) সেই সমাজের সংস্কৃতি।

১.১৬। বাংলা ভাষার মূল ভাষাগোষ্ঠী কোনটি?

অথবা, কোন ভাষাগোষ্ঠী থেকে বাংলার ভাষার উৎপত্তি হয়েছে?

উত্তর : ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা।

১.১৭। ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার কোন শাখা থেকে বাংলা ভাষার সৃষ্টি?

(উত্তর) শতম শাখা থেকে বাংলা ভাষার সৃষ্টি।

১.১৮। বাংলা ভাষার যুগ-বিভাগ কয়টি ও কী কী?

উত্তর : বাংলা ভাষার যুগ-বিভাগ ৩টি, যথা

(ক) প্রাচীন যুগ (৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) (খ) মধ্যযুগ (১২০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত)

(গ) আধুনিক যুগ (১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত)।

১.১৯।প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন কী? অথবা, বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন কী?

উত্তর : চর্যাপদ। [পলি-২০১৪]

১.২০। প্রথম বাংলা গদ্য চর্চা শুরু হয় কোন কলেজকে কেন্দ্র করে?

উত্তর : কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কেন্দ্র করে।

১.২১। সমাজ বন্ধনের প্রথম ও প্রধান সূত্র কী?

উত্তর : ভাষা।

১.২২। কোন ভাষারীতিতে সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষেপায়ন হয়?

(উত্তর) চলিত ভাষারীতিতে।

১.২৩। বাংলা ভাষা কোন কোন উপভাষায় বিভক্ত?

উত্তর : উত্তরবঙ্গীয়, রাজবংশীয়, পূর্ববঙ্গীয় ও দক্ষিণবঙ্গীয় উপভাষায়।

১.২৪। বর্তমানে কোন ভাষারীতি বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়?

উত্তর = চলিত ভাষারীতি।

১.২৫। বাংলা সাহিত্যে কে সাধুভাষার মার্জিত রূপের প্রবর্তন করেন?

উত্তর = ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

১.২৬। বাংলা সাহিত্যে চলিতরীতির প্রবর্তক কে?

উত্তর = প্যারীচাঁদ মিত্র।

১.২৭। বাংলা লৈখিক ভাষার অপেক্ষাকৃত আধুনিক রূপকে কী বলা হয়?

(উত্তর) চলিত ভাষা।

১.২৮। কোন ভাষাভাষীদের নিয়ে প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছিল?

(উত্তর) অস্ট্রিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীদের নিয়ে প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেছিল।

১.২৯। কোন সময়কালকে বাংলাভাষার আদি যুগ বলা হয়?

উত্তর = ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাভাষার আদি যুগ বলা হয়।

১.৩০। কোন কোন দেশে বাংলা ভাষার প্রচলন রয়েছে?

উত্তর : বাংলাদেশ ও ভারত এবং মায়ানমারের কিছু অঞ্চলে বাংলা ভাষার প্রচলন রয়েছে।

১.৩১। মঙ্গলকাব্য কাকে বলে?

উত্তর : মধ্যযুগে দেবদেবীকে উৎসর্গ করার জন্য যে-সব কাব্য রচনা করা হয়, তাকে মঙ্গলকাব্য বলে।

[পলি-২০১৪ (সমা))

[পলি-২০১৪ (সমা))

[পলি-২০১৪(পরি)|

(পলি-২০১৪ (সমা))

[পলি-২০১৪ (সমা)]

১.৩২। বাংলা ভাষারীতি কয় প্রকার ও কী কী? অথবা, বাংলা ভাষার কয়টি রীতি আছে?

উত্তর : বাংলা ভাষারীতি দুই প্রকার, যথা- ১। সাধুরীতি, ২। চলিতরীতি।

১.৩৩। মৌখিক ভাষা বলতে কী বুঝায়?

উত্তর : যে ভাষায় মানুষ সাধারণত পরস্পরের মধ্যে কথাবার্তা বলে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে, তাকে মৌখিক ভাষা বলে।

[পলি-২০১৪ (পরি)]

অনুশীলনী  [ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর – বাংলা ভাষার প্রয়োগ

১.৩৪। ভাষা বলতে কী বুঝায়? প্রত্যেক উন্নত ভাষার কয়টি রূপ আছে?

উত্তর :  মনের ভাব প্রকাশের জন্যে মানুষ বাগযন্ত্রের সাহায্যে যে-সব অর্থবোধক ধ্বনি উচ্চারণ করে, তাদের সমষ্টিকে ভাষা বলে।।

ড. সুকুমার সেনের মতে – “মানুষের উচ্চারিত অর্থবহ বহুজনবোধ্য ধ্বনির সমষ্টিই ভাষা।”

ভাষার রূপ : পৃথিবীর প্রত্যেক উন্নত ভাষারই দুটি রূপ আছে, যথা-

(১)। লেখ্য বা লৈখিক রূপ এবং (২) মৌখিক রূপ।

 

১.৩৫। বাংলাদেশের সিলেট, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রামের মৌখিক ভাষার একটি করে উদাহরণ দাও। অথবা, বাংলাদেশের তিনটি অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার উদাহরণ লেখ।

উত্তর : বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বিভিন্ন ধরনের। সে সময় তার বড় ছেলে বাড়িতে ছিল।’ এ বাকাটি বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকম হয়। যেমন

সিলেট -হি সময় তার বড়ো পুয়া বাড়িত আছিল।

ঢাকা – তখন তার বড়ো বেটায় বাড়িত আছিলো।

বরিশাল -হে কালে তার বড়ো পোলায় বাড়িতে আছেলে।

চট্টগ্রাম -ত হেত্তর ডগর পোয়া বারিও আছিল।

১.৩৬। লৈখিক বা লিখিত ভাষা বলতে কী বুঝায়? লিখিত ভাষা কত প্রকার ও কী কী?

উত্তর : যে ভাষায় সাধারণত সাহিত্য, বইপুস্তক, পত্রপত্রিকা, দলিল-দস্তাবেজ লিখিত হয়, তাকে লিখিত ভাষা বলে। বাংলা লিখিত ভাষা দু’ প্রকারের, যথা- সাধুরীতি ও চলিতরীতি।

[পলি-২০১৪ (সমা))

১.৩৭। আঞ্চলিক ভাষা কাকে বলে? অথবা, উপভাষা কাকে বলে? অথবা, আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য লেখ।

উত্তর : কোনো অঞ্চল বিশেষের সাধারণ লোকজনের মুখে যে বা উপভাষা বলে।

আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য: আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপঃ

১। আঞ্চলিক ভাষার রূপ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের।

২। আঞ্চলিক ভাষা ব্যাকরণ ও বাক্যরীতি সচরাচর অনুসরণ করে না।

৩। ভাবের আদান-প্রদানে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

১.৩৮। সাধুভাষা কাকে বলে, উদাহরণ দাও।

উত্তর : যে ভাষায় সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পূর্ণরূপ বসে এবং যে ভাষায় অধিক হারে তৎসম ও সমাসবদ্ধ পদ প্রয়োগ হয়, তাকে সাধুভাষা বলে। যেমন –

সূধ উদিত হইয়াছে।

অনেকক্ষণ হইল তাহারা আসিয়াছে।

রাজা সিংহাসন অলংকৃত করিয়াছেন।

[পলি-২০১৬(পরি), ১৮, ১৮(পরি)|

১.৩৯। চলিত ভাষা বলতে কী বুঝায়, উদাহরণ দাও।

অথবা, সার্বজনীন কথ্য ভাষা কী?

(পলি-২০১৭, ১৮।

উত্তর = যে ভাষায় সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সংক্ষিপ্তরূপ বসে এবং অধিকহারে তদ্ভব, দেশি, বিদেশি শব্দ বসে, তাকে চলিত ভাষা বলে। চলিত ভাষা শিক্ষিত মানুষের মুখের ভাষার আদলে রচিত হয়। যেমন –

চাঁদ উঠেছে।

তারা অনেক রাতে বাড়ি এলো।

পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ করে উঠলো।

১.৪০। সাধুভাষা থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরের চারটি নিয়ম লেখ।

উত্তর : সাধুভাষা থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরের চারটি নিয়ম

(ক) ক্রিয়াপনগুলোকে সংক্ষিপ্ত রূপে নিতে হবে। যেমন- করিতেছি করছি

(খ) সাধুরীতির সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত রূপ হবে চলিতরীতিতে। যেমন- তাহারা তারা।

(গ) অনুসর্গের সংক্ষিপ্ত রূপ হবে। যেমন- হইতে → হতে।

(ঘ) তৎসম শব্দের পরিবর্তে তদ্ভব শব্দ ব্যবহার করতে হবে। যেমন- চন্দ্ৰ চাঁদ।

১.৪১। আঞ্চলিক ভাষাও সাহিত্য-শিল্পের বাহন হতে পারে”-এ উক্তির সপক্ষে যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ কর। অথবা, “উপভাযাও সাহিত্যের বাহন হতে পারে”-উক্তিটির সপক্ষে বা বিপক্ষে তোমার মতামত প্রতিষ্ঠা কর। [পলি-২০১২ (পরি) [পলি-২০১৪)

উত্তর : কোনো অঞ্চল বিশেষের সাধারণ মানুষ যে ভাষায় নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে থাকে, তাকে আঞ্চলিক ভাষা বলে। যেমন- বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা চালু রয়েছে। আঞ্চলিক ভাষায় সাধারণত কোন কিছু রচনা করা হয় না।

তবে কথাসাহিত্যিকগণ গল্প, উপন্যাস, নাটকের চরিত্রকে প্রাণবন্ত তথ্য অধিকতর বাস্তবসম্মত করার মানসে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ করে থাকেন। এ বিষয়ে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস, পন্থা নদীর মাঝি’র উল্লেখ করতে পারি। সেখানে ঔপন্যাসিক বিভিন্ন চরিত্রের সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার ব্যাপক ব্যবহার করেছেন।

আর সে কারণেই উপন্যাসটি পাঠকচিত্তকে সহজে জয় করতে পেরেছে। তাই বলা যায়, আঞ্চলিক ভাষা সাহিত্য-শিল্পের বাহন হতে পারে।

১.৪২। ভাষা উচ্চারণে মানব শরীরের কোন কোন অঙ্গপ্রতঙ্গ ব্যবহৃত হয়?

উত্তর :  মানুষ ভাষা উচ্চারণ করে বাগযন্ত্রের সাহায্যে। বাগযন্ত্র বলতে শরীরের কতকগুলো সেগুলো হচ্ছে- স্বরতন্ত্রী, কন্ঠ, জিহ্বা, তালু, মূর্খা, দাঁত, ঠোঁট ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বুঝায়। [পলি-২০১১, ১৮, ১৮(পরি)

১.৪৩। সংস্কৃতি বলতে কী বুঝায়?

উত্তর : সংস্কৃতি একটি ব্যাপক ধারণা প্রকাশক শব্দ। কোনো সমাজের মানুষের চালচলন, কথাবার্তা, আদবকায়দা, ভাষা-সাহিত্য, ওঠাবসা, বিশ্বাস অবিশ্বাস, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সবকিছুর সমন্বিত রূপকে বলে সংস্কৃতি।

১.৪৪। ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল বিশ্লেষণ কর।

[পলি-২০১১, ১৮]

উত্তর :  মানুষ বাগযন্ত্রের সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশের জন্যে অন্যের বোধগম্য যে ধ্বনিসমূহ উচ্চারণ করে, তাদের সমষ্টিকে ভাষা বলে। ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। নদীর ধারা বা প্রবাহ যেমন গতিপথ পাল্টায় তেমনি ভাষাও মানুষের মুখে মুখে সর্বদা পরিবর্তিত হয়। মানুষ নানা কারণে উচ্চারণে ভিন্নতা আনে।

একটু একটু করে এ পরিবর্তন হতে থাকে। ফলে এক সময় এ পরিবর্তনটা বড় হয়ে দেখা দেয়। এভাবেই একটি ভাষা থেকে একাধিক ভাষার উদ্ভব ঘটেছে। যেমন- ভারত উপমহাদেশে সংস্কৃত ভাষা থেকে কালের ব্যবধানে বাংলা, হিন্দি, অসমীয়া ইত্যাদি অনেকগুলো ভাষার উদ্ভব হয়েছে।

১.৪৫। ভাষারীতির রূপান্তর কর।

[পলি-২০১৩)

(ক) স্মৃতিপটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ, যাহা কিছু ঘটিতেছে তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই।

উত্তর = স্মৃতিপটে জীবনের ছবি কে এঁকে যায় জানি না কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ, যা কিছু ঘটছে তার অবিকল নকল রাখবার জন্য সে তুলি হাতে বসে নেই।

(খ) বাপ বলিলেন, “কেন, ঔষধ খাইয়া কেহ মরে না? নামি ঔষধ খাইলে যদি বাঁচিত তবে রাজা-বাদশাহ মরে কোন দুঃখে। যেমন করিয়া তোর মা মরিয়াছে, তোর স্ত্রী তাহার চেয়ে কি বেশি ধুম করিয়া মরিবে।”

উত্তর : বাপ বললেন, “কেন, ঔষধ খেয়ে কেউ মরে না? নামি ঔষধ খেলে যদি বাঁচত তবে রাজা-বাদশাহ মরে কোন দুঃখে। যেমন করে তোর মা মরেছে, তোর স্ত্রী তার চেয়ে কি বেশি ধুম করে মরবে।

(গ) দিব্য বেড়ে উঠছে আমাদের এই নগরী। নিঃশব্দে সম্প্রসারিত হয়েছে এই নগরীর চৌহদি, উঠছে দালানকোঠা, জালের মতো বিস্তারিত হয়েছে রাজপথ, যানবাহনের ভিড় বেড়েছে, কল্লোলহীন জোয়ারের মতো।

উত্তর : দিব্য বাড়িয়া উঠিয়াছে আমাদের এই নগরী। নিঃশব্দে সম্প্রসারিত হইয়াছে এই নগরীর চৌহদ্দি, উঠিয়াছে সালানকোঠা, জালের মতো বিস্তারিত হইয়াছে রাজপথ, যানবাহনের ভিড় বাড়িয়াছে, কল্লোলহীন জোয়ারের মতো।

(ঘ) নীরব ভাষায় বৃক্ষ আমাদের সার্থকতার গান গাহিয়া শোনায়। অনুভূতির কান দিয়া সেই গান শুনিতে হইবে। তাহা হইলে বুঝিতে পারা যাইবে জীবনের মানে বৃদ্ধি, ধর্মের মানেও তাহাই। [পলি-২০১৭/]

উত্তর : নীরব ভাষায় বৃদ্ধ আমাদের সার্থকতার গান গেয়ে শোনায়। অনুভূতির কান দিয়ে সেই গান শুনতে হবে। তা হলে বুঝতে পারা যাবে জীবনের মানে বৃদ্ধি, ধর্মের মানেও তাই।

(ঙ) জ্ঞানের কথা একবার জানিলে আর জানিতে ইচ্ছা হয় না। আগুন গরম, সূর্য গোল, জল তরল- ইহা ভ্রান্তি বোধ হয় না। তাই জ্ঞানের কথা হইতে ভাবের কথার প্রতি আমাদের আকর্ষণ বেশি।

উত্তর : আনের কথা একবার জানলে আর জানতে ইচ্ছা হয় না। আগুন গরম, সূর্য গোল, জল তরল- এটা শ্রান্তি বোধ হয় না। তাই জ্ঞানের কথা হতে ভাবের কথার প্রতি আমাদের আকর্ষণ বেশি।

(চ) ছিনাথ কাকুতিমিনতি করতে লাগল, কিন্তু পিসে মশায়ের রাগ আর পড়ে না। পিসিমা নিজে উপর হতে বললেন, তোমাদের ভাগ্য ভালো যে, সত্যিকারের বাঘ-ভালুক বের হয় নি। যে বীরগুরু তোমরা এবং তোমার দারোয়ানরা। ছেড়ে দাও বেচারিকে আর দূর করে দাও দেউড়ির ঐ খোট্টাগুলোকে। একটা ছেলের যা সাহস, এক বাড়ি লোকেরও তা নেই।

উত্তর : ছিনাথ কাকুতিমিনতি করিতে লাগিল, কিন্তু পিসে মশায়ের রাগ আর পড়িল না। পিসিমা নিজে উপর হইতে বলিলেন, তোমাদের ভাগ্য ভালো যে, সত্যিকারের বাঘ-ভালুক বাহির হয়নি। যে বীরগুরু তোমরা এবং তোমার দারোয়ানরা। ছাড়িয়া দাও বেচারিকে আর দূর করিয়া দাও দেউড়ির ঐ খোট্টাগুলিকে। একটি ছেলের যাহা সাহস, এক বাড়ি লোকেরও তাহা নাই।

১.৪৮। বিশুদ্ধ উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তা লেখ।

উত্তর বক্তব্যকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য বিশুদ্ধ উচ্চারণ অত্যাবশ্যক। বিশুদ্ধ উচ্চারণ প্রজ্ঞা ও রুচিশীলতার পরিচায়ক। শিক্ষিত সমাজে বক্তার বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ ও শ্রোতার মনকে আলোকিত করার জন্যে বিশুদ্ধ উচ্চারণ প্রয়োজন।

অনুশীলনী  [ রচনামুলক প্রত্নাবলি – বাংলা ভাষার প্রয়োগ

[পলি-২০১৬]

১.৪৭। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বর্ণনা কর।

অথবা, বাংলা সাহিত্যের যুগকে কয়ভাগে ভাগ করা যায় ও কী কী? সময়সীমা উল্লেখ করে প্রত্যেক যুগের বৈশিষ্ট্যগুলো লেখ।

অথবা, ‘মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার তার মাতৃভাষা আলোচনা কর।

অথবা, ‘নদী যেমন বাঁক পাল্টায় ভাষা তেমনি দিক পরিবর্তন করে ব্যাখ্যা কর।

উত্তর সংকেত  : ১.১ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৪৮।  সাধুভাষা কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর। অথবা, সাধু ভাষারীতির দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।

উত্তর সংকেত : ১.২.১ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৪৯। চলিত ভাষা কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ কর।

অথবা, চলিত ভাষা কাকে বলে? এটির দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।

উত্তর সংকেত : ১.২.২ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৫০। আঞ্চলিক ভাষা বলতে কী বুঝায়? আঞ্চলিক ভাষার উৎস কী?

উত্তর : ১.২.৩ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৫১। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান আঞ্চলিক ভাষাগুলো উদাহরণসহ

উত্তর  : ১.২.৩ নং অনুচ্ছেদ স্রষ্টব্য।

১.৫২। আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর)

(উত্তর সংকেত : ১,২,৩ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৫৩।  সাধু ও চলিতরীতির মধ্যে ৪টি পার্থক্য উল্লেখ কর।

[পলি-২০১৬(পরি)|, [পলি-২০১৭, ১৮।, (পলি-২০১৭ (পরি)|, [পলি-২০১৬), (পলি-২০১২(পরি)|, [পলি-২০১৬), [পলি-২০১৪], [পলি-২০১৪, ১৫, ১৭ (পরি)|

অথবা, সাধু ও চলিত ভাষার মাঝে পার্থক্য আলোচনা কর। পলি-২০১১, ১২, ১৩ (পরি), ১২(পরি), ১৩(পরি), ১৪ (পরি)|

উত্তর সংকেত : ১.২.২ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৫৪. সাধু ও চলিত রীতির মিশ্রণ দূষণীয় কেন- আলোচনা কর।

উত্তর সংকেত : ১.২.২ নং অনুচ্ছেন দ্রষ্টব্য।

১.৫৫। সাধু ও চলিত ভাষা কাকে বলে? উদাহরণসহ সাধু ও চলিত ভাষার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর।

উত্তর : ১.২.১ ও ১.২.২ নং অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

১.৫৬। “চলিত ভাষা ব্যাকরণের বেড়াজালে আবদ্ধ নয়” ব্যাখ্যা কর।

অথবা, “চলিত ভাষা ব্যাকরণের বেড়াজালে আবদ্ধ নয়’- উক্তিটির স্বপক্ষে বা বিপক্ষে তোমার মতামত প্রতিষ্ঠা কর।

[পলি-২০১৮ (পরি)|

উত্তর : ১.২.২ নং অনুচ্ছে দ্রষ্টব্য।

 

আরও দেখুন:

আমাদের আরও প্রতিবেদন পড়ুন:

“বাংলা ভাষার প্রয়োগ, তাত্ত্বিক অংশ, পলিটেকনিক বাংলা ৬৫৭১১ | Polytechnic Bangla, 65711”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন