বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book । প্রতিবেদন রচনা

বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book । প্রতিবেদন রচনা

বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book
বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book

বই পড়ার আনন্দ রচনা

ভূমিকা:

বই পড়া বা গ্রন্থ পাঠ মানুষের মনে জন্ম দেয় আনন্দ – বেদনার কাব্যিক ও দার্শনিক সত্যবোধ।গ্রন্থ পাঠ আমাদের জন্য আনেবিস্ময় , নীতি , সহানুভূতি ; সর্বোপরি স্নেহ – মায়া – মমতা , ভক্তি – প্রীতি – প্রেম প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তি । গ্রন্থ পাঠ করে মানুষহৃদয়মনে এত অপূর্ব শিহরণ লাভ করে ।

যুগে যুগে গ্রন্থ এনেছে ত্যাগের দীক্ষা , বীরত্ত্বের মহত্ত্বৰোধ , সত্য ও সুন্দরের সাধনা ।পুস্তক পাঠ করে মানুষ বিশাল পৃথিবীর খবরা – খবর জানতে পারে । পুস্তক পাঠ করে – মানুষ জগতের প্রকৃত সত্য , সুন্দর ওকল্যাণের সন্ধান পায়।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই বলেছেন,

বিশাল বিশ্বের আয়োজনে মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্রতারই এক কোণে , সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহে অক্ষয়উৎসাহে । ”

বই ও মানুষ :

মানুষ মানুষের শত্রু হতে পারে , তাকে প্রবঞ্চনা করতে পারে । কিন্তু বই কখনো মানুষের সাথে প্রবঞ্চনা বা শত্রুতা করে । যে জাতির জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য , সে জাতির ধনের ভাণ্ডারও শূন্য । বই যেমন মানুষকে জ্ঞান দেয় তেমনি আনন্দও দেয় । পুস্তকপাঠের অভ্যাস বা রুচি না থাকলে বইকে নিত্যসঙ্গী করা যায় না ।

বই পড়ার অভ্যাস গড়ার জন্য ব্যক্তিকে নিষ্ঠাবান , একাগ্রচিত্তও অধ্যবসায়ী হতে হবে । মননশক্তি ও হৃদয়বৃত্তিকে পূর্ণরূপে জাগ্রত করে পুস্তক পাঠের মাধ্যমেই পুস্তককে সার্থক সঙ্গী করা যায় ।তাই মানুষ যত বেশি বই পড়বে , ততই আনন্দ লাভ করবে এবং জ্ঞানের স্বর্ণরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ পাবে । সৈয়দ মুজতবা আলীযথার্থই বলেছেন , “ বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না । কারণ বই মানুষের জ্ঞান – ঐশ্বর্যকে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করে ।

মানবকৌতুহল অজানাকে জানার আগ্রহ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি । নিত্যনতুন জ্ঞানের সন্ধানে মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল , অপার সমুদ্র ও মহাশূন্যে বিচরণ করে চলেছে । তারা অর্জন করছে নিত্যনতুন জ্ঞান । যুগ যুগ ধরে জ্ঞানী – গুণী– মনীষী ওসাহিত্যিকরা তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও সুখ – দুঃখকে বইয়ের পাতায় সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ মানবসমাজের জন্য মূল্যবানপথপ্রদর্শক হিসেবে রেখে গেছেন।

মহাকালের স্রোতধারায় অজস্র জ্ঞানপিপাসু ঘুরে বেড়াচ্ছেন।তারা জ্ঞানের সুধার সন্ধান পেয়েসেই ভাণ্ডারে ঝাপিয়ে পড়েন নির্বিধায়।সেই জ্ঞানের অমিত ধারা পরবর্তীদের জন্য সাহিত্যের পাতায় সংরক্ষিত থাকে বছরের পরবছর ধরে । সুতরাং জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে সাহিত্যের বা বইয়ের কোনো জুড়ি নেই।

বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book
বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book

বইয়ের বৈচিত্র্য:

নানা ধরনের বই থেকে মানুষ আনন্দ লাভ করে।তাই সভ্য সমাজের মানুষের জন্য চাই অজস্র গ্রন্থরাজির সঙ্গ।ইতিহাস , সাহিত্য, দর্শন , ভূগোল , বিজ্ঞান আইন প্রভৃতি বই থেকে মানুষ লাভ করে আনন্দ , শিক্ষা ও জ্ঞান।এক এক ধরনের বই মানুষকে একএক ধরনের আনন্দ ও জ্ঞান দিয়ে থাকে।

অতীতের ঐতিহ্য , নানা চিন্তার অনুশীলন ও বিচিত্র ভাবধারা সংরক্ষিত রয়েছেগ্রন্থরাজির মাঝে । এখানে এসে মিশেছে বিভিন্ন জাতির বিচিত্র জ্ঞান – বিজ্ঞান ও শিল্প – সাহিত্যের স্রোতধারা , সে ধারার সঙ্গেমিলনেই ঘটে মানুষের আত্মপ্রকাশ । মোটকথা , বিচিত্র ধরনের বই পাঠ করেই মানুষ আনন্দের অনুভূতি লাভ করে থাকে।

বই শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়:

বই শুধুমাত্র জ্ঞানার্জনের উপায় নয়।বই সত্য , সুন্দর ও আনন্দময় অনুভূতিতে পাঠকচিত্তকে আলোড়িত করে।এমন কিছু পাঠকআছে , যারা সবকিছুর মধ্যেই তত্ত্বের সন্ধানে ব্যাপৃত থাকে ।

কিন্তু তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিরাশ হয়।কারণ তারা সবসময়সাহিত্যের মূল্যায়ন করতে পারে না।একটি ছোট প্রেমের কবিতায় কোনো তত্ত্ব নাও থাকতে পারে , কিন্তু সেখানেও একজনকাব্যরসিক মানব প্রকৃতির চিরন্তন আত্মপ্রকাশ খুঁজে পায় । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সঙ্গত কারণেই বলেছেন “ সেই সত্য যা রচিবেতুমি ঘটে যা তা সত্য নয় । ”

বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book
বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book

বই নির্বাচনে সতর্কতা:

পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন , “ রুটি – মদ ফুরিয়ে যাবে , প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে ; কিন্তু একখানা বইঅনন্ত যৌবনা , যদি তেমন বই হয় । ” উৎকৃষ্ট গ্রন্থ মানুষকে আনন্দ ও প্রকৃত সুখ দান করে । মানুষের উন্নততর বৃত্তিগুলো চায়সত্য , জ্ঞান ও আনন্দের আলো। জ্ঞান ও শিল্প সাধনা মানুষকে পশুত্বের স্তর থেকে নিয়ে গেছে উর্ধ্বলোকে।

কিন্তু সেই জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে বই নির্বাচনে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে । বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা তরুণ সমাজকে অবশ্যই পাঠ উপযোগীবই বেছে নিতে হবে । কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল বই নির্বাচনে যুব সমাজ সাময়িক আনন্দ পেলেও তা সার্বিক বিচারে দেশ ও জাতিরজন্য বিপদ ডেকে আনে।তাছাড়া সুষ্ঠুভাবে বই নির্বাচন করে সব ধরনের পাঠকেই অনাবিল আনন্দ পেতে পারে।সুতরাং নির্বাচনেসতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত আবশ্যক।

বই থেকে আনন্দ লাভের উপায়:

অজস্র – অনাবিল আনন্দ পুস্তকাগারে স্থবির হয়ে আছে । এ স্থবিরতা ভেঙে সেখান থেকে পাঠককে আনন্দরস আস্বাদন করতেহবে । বই থেকে আনন্দ লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে । ভূ – গর্ভের অন্ধ জঠরে লুকিয়ে আছে । কত সানা , কিন্তু প্রকৃতিসহজে তা মানুষকে দান করে না।

এর জন্য চাই শ্রম , অদম্য উৎসাহ ও মনের একাগ্রতা।তেমনি বইয়ের পৃথিবী থেকে জ্ঞান – বিজ্ঞান এবং আনন্দ লাভ করতে হলেও তাকে অধ্যবসায়ী হতে হবে।বারট্রান্ড রাসেল বলেছেন , “ সংসারের জ্বালা – যন্ত্রণাএড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভেতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেওয়া , যে যত বেশিভুবন সৃষ্টি করে , ভবন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয় । ” পুস্তক পাঠই সে ভুবন সৃষ্টিতে সর্বাধিক সাহায্য করে ।

বই মানুষের নিঃস্বার্থ বন্ধু :

মানুষ সঙ্গপ্রিয়।সে আনন্দ লাভের জন্য সঙ্গ চায়।এ জন্য সে অন্যের সাথে করে বন্ধুত্ব।কিন্তু এ বন্ধুই তাকে চরমভাবে ঠকায় , তারসাথে প্রতারণা করে , তার জীবনে নিয়ে আসে দুঃখের অমানিশা । কিন্তু বই মানুষের এমন এক ধরনের বন্ধু যার মধ্যে কোনোপাপবোধ বা বন্ধুকে ঠকাবার মন – মানসিকতা নেই ।

সে নিস্বার্থভাবেই বন্ধুকে উপকার করে যায় । বই বন্ধুর জ্ঞানরাজ্যের বিস্তৃতি ঘটায় । বই মানুষকে জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে । তাছাড়া বৃদ্ধ বয়সে মানুষ যখন একাকীত্ব বোধ করে তখনও সে বইপড়ে নির্মল আনন্দ লাভ করতে পারে।ম্যান্সফিল্ড যথার্থই বলেছেন , “ বই পড়ার আনন্দ দ্বিগুণ হয় , যখন এমন একজনের সঙ্গেবাস করা যায় , যে আমার মতো একই বইগুলো ভালোবাসে।

বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book
বই পড়ার আনন্দ রচনা । Essay on Joy of Reading Book

উপসংহার:

বই হচ্ছে মানুষের নিত্যদিনের হাসি , খেলার সাথী।বিচিত্র মানুষের বিচিত্র হৃদয়ের মর্মরিত হচ্ছে গ্রন্থরাজির পাতায় পাতায় , ছত্রেছত্রে।মানুষের মন সেই আনন্দরাজির অন্তপুরে প্রবেশ করে সীমাহীন আনন্দ লাভ করতে পারে।এজন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ , উপযুক্ত সঙ্গ ও উপযুক্ত বই।

আরও পড়ুনঃ

মন্তব্য করুন