ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতা – শামসুর রাহমান

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতা – একটি দেশপ্রেম, গণজাগরণের ও সংগ্রামী চেতনাধর্মী কবিতা। কবিতাটি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত। কবিতায় দেশমাতৃকার প্রতি জনতার বিপুল ভালোবাসা সংবর্ধিত হয়েছে। গদ্যছন্দ ও প্রবাহমান ভাষার সুষ্ঠু বিকাশে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন।

 

স্বাধীনতা তুমি কবিতা - শামসুর রাহমান
স্বাধীনতা তুমি কবিতা – শামসুর রাহমান

 

শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ – ১৭ আগস্ট ২০০৬) বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। জীবদ্দশাতেই তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে মর্যাদালাভ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ, তথা পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক কবি হিসেবে বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হন। এবং অল্প সময়ের ভেতরেই দুই বাংলায় ( তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম বাংলায়) কবি হিসেবে পরিচিতি পান। আধুনিক কবিতার অনন্য পৃষ্ঠপোষক বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘রূপালি স্নান’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে কবি হিসেবে শামসুর রাহমান সুধীজনের দৃষ্টিলাভ করেন । পরবর্তীতে উভয় বাংলাতেই তার শ্রেষ্ঠত্ব এবং জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি নাগরিক কবি, তবে নিসর্গ তার কবিতায় খুব কম ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লিখিত তার দুটি কবিতা খুবই জনপ্রিয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি মজলুম আদিব (বিপন্ন লেখক) ছদ্মনামে কলকাতার বিখ্যাত দেশ ও অন্যান্য পত্রিকায় কবিতা লিখতেন। শামসুর রাহমানের ডাক নাম বাচ্চু।

 

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতা – শামসুর রাহমান

 

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতা - শামসুর রাহমান
ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতা – শামসুর রাহমান

 

আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে
কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়-ফুল নয়, ওরা
শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।
একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রং।
এ-রঙের বিপরীত আছে অন্য রং,
যে-রং লাগে না ভালো চোখে, যে-রং সন্ত্রাস আনে
প্রাত্যহিকতায় আমাদের মনে সকাল-সন্ধ্যায়-
এখন সে রঙে ছেয়ে গেছে পথ-ঘাট, সারা দেশ
ঘাতকের অশুভ আস্তানা।
আমি আর আমার মতোই বহু লোক
রাত্রি- দিন ভূলুণ্ঠিত ঘাতকের আস্তানায়, কেউ মরা, আধমরা কেউ,
কেউ বা ভীষণ জেদি, দারুণ বিপ্লবে ফেটে পড়া।
চতুর্দিকে মানবিক বাগান, কমলবন হচ্ছে তছনছ।
বুঝি তাই উনিশশো উনসত্তরেও
আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।
সালামের চোখে আজ আলোচিত ঢাকা,
সালামের মুখে আজ তরুণ শ্যামল পূর্ববাংলা।
দেখলাম রাজপথে, দেখলাম আমরা সবাই জনসাধারণ
দেখলাম সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো
ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা
আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে
এখনো বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে
ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে
হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায়। সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ,
শিহরিত ক্ষণে ক্ষণে আনন্দের রৌদ্রে আর দুঃখের ছায়ায়।

 

 

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতার মূলভাবঃ

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতার মূলভাবঃ কবি শামসুর রাহমানের ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সংগ্রামী চেতনা, দেশপ্রেম ও গণজাগরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করার মতো একটি কবিতা । ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন, শোষণ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান রূপ নেয় ।

এদেশের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে । ঢাকার রাজপথে জনগণের ঢল নামে । এ কাতারে সামিল হয় গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষ, কলকারখানার শ্রমিক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ ।

কবি এ কবিতায় পরম মমতায়, শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সকল মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামী চেতনাকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন। এই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আসাদুজ্জামান, মতিউর, ড. শামসুজ্জোহা প্রমুখের মৃত্যুকে ভাষা-শহিদ সালাম ও বরকতের প্রতীকে তাৎপর্যময় করে তুলেছেন ।

কবি শামসুর রাহমান [ Shamsur Rahman ]
কবি শামসুর রাহমান [ Shamsur Rahman ]

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতা আবৃত্তিঃ

 

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন