নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতা ও নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতার মূলভাব

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতা ও নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতার মূলভাব – এ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ‘ কবিতাটি তার কাব্যচর্চার সার্থক সৃষ্টি বলেই তিনি মতামত ব্যক্ত করে গেছেন। কবিতাটিতে বাইরের জিনিসকে অন্তরে এবং তার রসায়নই যে এই কবিতার মূল নির্যাস তা তার চিত্তের উচ্ছ্বাস থেকেই বোঝা যায়। এ কবিতায় কবি যেন গ্রহীতা আর প্রকৃতি হচ্ছে দাতা।

 

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের ‘পর,
কেমনে  পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে       উথলি উঠেছে বারি,
ওরে       প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।
থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,
শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,
ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল
গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।
হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়
ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায় –
বাহিরেতে চায়, দেখিতে না পায় কোথায় কারার দ্বার।
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,
চারি দিকে তার বাঁধন কেন!
ভাঙ্ রে হৃদয়, ভাঙ্ রে বাঁধন,
সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া
আঘাতের পরে আঘাত কর্।
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান
কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠেছে বাসনা
জগতে তখন কিসের ডর!

                আমি    ঢালিব করুণাধারা,
আমি    ভাঙিব পাষাণকারা,
আমি    জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া
আকুল পাগল-পারা।
কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,
রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া দিব রে পরান ঢালি।
শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,
ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব,
হেসে খলখল গেয়ে কলকল তালে তালে দিব তালি।
এত কথা আছে, এত গান আছে, এত প্রাণ আছে মোর,
এত সুখ আছে, এত সাধ আছে – প্রাণ হয়ে আছে ভোর।।
কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ –
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারি দিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর –
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর্।
ওরে আজ     কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।

 

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতার মূলভাবঃ

১৮৮৩ সালে প্রভাতসংগীত কাব্যটির প্রকাশ। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় হচ্ছে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। শৈশব থেকে কবি হওয়ার বাসনা ধরে সংশোধিত হতে হতে তিনি প্রভাতসংগীতের কাছে পৌঁছে যান। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি তার কাব্যচর্চার সার্থক সৃষ্টি বলেই তিনি মতামত ব্যক্ত করে গেছেন। কবিতাটিতে বাইরের জিনিসকে অন্তরে এবং তার রসায়নই যে এই কবিতার মূল নির্যাস তা তার চিত্তের উচ্ছ্বাস থেকেই বোঝা যায়। এ কবিতায় কবি যেন গ্রহীতা আর প্রকৃতি হচ্ছে দাতা। প্রকৃতির অকৃপণ দান কবি আনন্দচিত্তে গ্রহণ করেছেন। ১৮৮৩ সাল কবির জীবনে দুটি কারণে স্মরণীয় একটি ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার গ্রন্থভুক্তি এবং প্রকাশ অপরটি তার বিয়ে।

১৮৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বাইশ বছর আট মাস বয়সে কবি রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়। যশোরের মেয়ে ভবতারিণী পরে মৃণালিনী এগার বছর বয়সে তার স্ত্রী হয়ে আসেন। শৈশব এবং কৈশোরের জীবন যাপন কবি খুব একটা উপভোগ করেননি। তিনি জীবনস্মৃতিতে নিয়ম-কানুন এবং পরিবারের অনুশাসনের কথা ধরেই নানা কাহিনীর বর্ণনা দেন। ‘বাড়ির বাইরে আমাদের যাওয়া বারণ ছিল, এমনকি বাড়ির ভেতরেও আমরা সর্বত্র যেমন-খুশি যাওয়া-আসা করিতে পারিতাম না। সেইজন্য বিশ্বপ্রকৃতিকে আড়াল-আবডাল হইতে দেখিতাম।’ (জীবনস্মৃতি : রবীন্দ্রনাথ)। এমন অবস্থার ভেতর রবীন্দ্রনাথের অনুসন্ধিৎসুমন বারবার বাইরে অসীমের পানে বেরুবার স্বপ্ন দেখেছে।

 

এক বাক্যে মূলভাব

‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় কবি মানুষের অন্তর্জগতের জাগরণ ও সকল বাঁধন ভেঙে মুক্ত, গতিশীল ও সৃজনশীল জীবনের আহ্বান জানিয়েছেন।

 

‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতার শব্দার্থ

 

শব্দশব্দার্থ
নির্ঝরঝরনা
রবির করসূর্যের রশ্মি
প্রভাতসকাল
পশিলপ্রবেশ করল
উথলি উঠেছেউত্তাল হয়ে উঠেছে
বারিপানি
বাসনাইচ্ছা
রুধিয়াদমন করে
ভূধরপাহাড়
শিলারাশিপাথরের স্তূপ
ফেনিলফেনাযুক্ত
সলিলজল
গরজি উঠিছেপ্রচণ্ড শব্দে উত্তাল হয়েছে
রোষক্রোধ
হেথায় হোথায়এদিকে-সেদিকে
কারার দ্বারকারাগারের দরজা
পাষাণকঠিন পাথর
বাঁধনবন্ধন
লহরীঢেউ
করুণাধারাকরুণার প্রবাহ
পাষাণকারাপাথরের কারাগার
প্লাবিয়াপ্লাবিত করে
পাগল-পারাউন্মত্ত
কেশ এলাইয়াচুল খুলে
রামধনুইন্দ্রধনু
কিরণআলো
শিখরপাহাড়ের চূড়া
সাধআকাঙ্ক্ষা
কররশ্মি

 

 

নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতা আবৃত্তিঃ

 

Leave a Comment