ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | অধ্যায় ৩ | ভাষা ও শিক্ষা , মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্যে যে কথা বলে তার মূলে আছে কতকগুলো ধ্বনি (Sound)। এ প্রসঙ্গে ধ্বনিতত্ত্ববিদ মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন, ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিকতা বজায় রাখতে হলে তার প্রধান উপায় কথা বলা, মুখ খোলা, আওয়াজ করা। সে আওয়াজ বা ধ্বনিগুলোর একমাত্র শর্ত হচ্ছে যে সেগুলো অর্থবোধক হওয়া চাই। অর্থহীন ধ্বনিও মানুষ করতে পারে কিন্তু তাতে সমাজ-জীবন চলে না।’১ ‘অর্থবোধক ধ্বনিগুলোই মানুষের বিভিন্ন ভাষার বাধ্বনি। ফুসফুস তাড়িত বাতাসের নির্গমনের ফলেই সাধারণত ধ্বনির সৃষ্টি হয়।

ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

কিন্তু এর ব্যতিক্রম অর্থাৎ শ্বাস গ্রহণের সময়ও ঠোঁট কিংবা মুখগহ্বরের স্থান বিশেষে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে ধ্বনিসৃষ্টির উদাহরণ বিরল নয়। ২ তাই দেখা যায় যে, ভাষার মূল উপাদান হল ধ্বনি। এক-এক রকম ধ্বনিসমষ্টি নিয়ে এক-একটি ভাষা এবং নানা দেশের নানা ধ্বনিমূলের সমষ্টি নানান ভাষা। যেমন— বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মান, রাশিয়া ইত্যাদি নানা দেশে নানান ভাষা প্রচলিত। ‘বাংলা ভাষায় সাধারণত তিন শ্রেণির ধ্বনির উপস্থিতি লক্ষ করা যায় : স্বরধ্বনি, অর্ধস্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি।

[৩.১] ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | অধ্যায় ৩ | ভাষা ও শিক্ষা

এ-অধ্যায়ে এসব বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। * ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘কোনও ভাষার উচ্চারিত শব্দকে (word-কে) বিশ্লেষণ করিলে, আমরা কতকগুলি ধ্বনি (sound) পাই। ৩ ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘প্রতিটি মানব-ভাষায় থাকে একগুচ্ছ ধ্বনি, সাধারণত বারোটির বেশি ও ষাটটির কম। কোনো ভাষায়ই নেই অসংখ্য বা বিপুল সংখ্যক ধ্বনি। ওই মুষ্টিমেয় ধ্বনির বিভিন্ন বিন্যাসে গ’ড়ে ওঠে ভাষার বিপুল পরিমাণ শব্দ।

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব ধ্বনিরাশির প্রত্যেকটির যেমন থাকে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তেমনি ওই ধ্বনিরাশি পরস্পরের সঙ্গে সহাবস্থান করে সুশৃঙ্খল ধ্বনিতাত্ত্বিক নিয়মকানুন মেনে। অর্থাৎ প্রত্যেক ভাষার রয়েছে ধ্বনিশৃঙ্খলা বা ধ্বনিসংগঠন। এটা আমরা সবাই জানি যে, ভাষার প্রথম প্রকাশ ঘটে মানুষের মুখে— মানুষের বাগ্যন্ত্রে। মানুষের বাগ্যন্ত্রই ভাষার প্রথম জন্মভূমি। এজন্যেই প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘বাণীর বসতি রসনায়।’ ধ্বনিই সেই বাণী বা ভাষার মূল উপকরণ। অর্থাৎ ভাষা হচ্ছে বাগ্যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির সমষ্টি।

Capture ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা

মানুষের বাগ্যন্ত্রই ভাষার ধ্বনিকে স্বাতন্ত্র্য দান করে। উচ্চারিত ধ্বনি ভাষার ধ্বনির এই স্বাতন্ত্র্য-চিহ্নের ওপর গুরুত্ব দেবার জন্যই ধ্বনিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডানিয়েল জোন্স (Daniel Jones) বলেছেন যে, ভাষা হচ্ছে ‘succession of sounds emitted by the organs of speech.’ সুতরাং ভাষা— প্রক্রিয়ায় বাগ্যন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এই বাগ্যন্ত্রের গঠন-প্রক্রিয়া ধ্বনিবিজ্ঞানের প্রথম আলোচ্য বিষয়। ধ্বনির উচ্চারণে মানব-শরীরের যেসব প্রত্যঙ্গ জড়িত সেগুলোকে একত্রে বাগ্যন্ত্র (speech organ / vocal organ) বা বাক্‌প্রত্যঙ্গ বলে ।

[৩.১] ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | অধ্যায় ৩ | ভাষা ও শিক্ষা

বাগ্যন্ত্রের এলাকা বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে ফুসফুস (lungs), শ্বাসনালি (trachea), স্বরযন্ত্র (larynx), স্বরতন্ত্র (vocal fold), জিভ (tongue), ঠোঁট (lips), নিচের চোয়াল (lower jaw), দাঁত (teeth), তালু (palate), ও গলনালি (pharynx)। এছাড়াও রয়েছে মধ্যচ্ছদা (diaphram) ও চিবুক ( cheek)। ধ্বনির উৎপত্তি ও শ্রুতির দিক থেকে বাক্ – প্রত্যঙ্গাদির মধ্যে ফুসফুসের পরে স্বরযন্ত্রের মধ্যবর্তী স্বরতন্ত্রীর স্থান।

[৩.১] ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | অধ্যায় ৩ | ভাষা ও শিক্ষা

ফুসফুস থেকে শ্বাসবায়ু মুখ ও নাসিকা দিয়ে যাতায়াত করার সময় তার গতিপথে আংশিক বা পূর্ণ বাধা দিয়ে অথবা তার গতিপথ নিয়ন্ত্রিত করে আমরা সেই বাতাসে নানা তরঙ্গের সৃষ্টি করি। এ-তরঙ্গগুলোই ধ্বনি-তরঙ্গ। এগুলো বাতাসে ভাসতে ভাসতে শ্রোতার কানে গিয়ে বাজে। শ্রোতার কান থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে সে-তরঙ্গের খবর তার মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছায়। তখন তার মস্তিষ্ক সেই বিশেষ বিশেষ ধরনের তরঙ্গের বিশেষ বিশেষ অর্থের ব্যাখ্যা করে।

আরও দেখুন:

“ধ্বনি কী ও কেন | ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব | ভাষা ও শিক্ষা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন