তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা – শামসুর রাহমান

“তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা” – শামসুর রাহমান হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণজাগরণের প্রতি এক উজ্জীবিত কণ্ঠস্বর। কবি শামসুর রাহমান এই কবিতায় মানুষের স্বাধীনতা-আকাঙ্ক্ষা, দেশপ্রেম এবং সংগ্রামী চেতনাকে সঙ্গীতময় ও শক্তিশালী ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। কবিতার মূলভাব হলো মানুষের স্বাধীনতার জন্য অদম্য লড়াই ও আত্মত্যাগের মূল্য তুলে ধরা।

কবিতায় দেখা যায়, মানুষের অন্তরের অপেক্ষা, তৃষ্ণা ও সংগ্রামী মনোভাব শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে। প্রতিটি স্তবকে প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জনগণের অবিরাম প্রচেষ্টা, ত্যাগ ও সাহসিকতা। শামসুর রাহমান দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতা কোনো সহজলভ্য বস্তু নয়; এটি অর্জন করতে হয় সদা সচেতন, সাহসী ও একতাবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে

এ কবিতা শুধু ইতিহাস বা রাজনৈতিক আন্দোলনের চিত্র নয়, বরং মানবিক ও নৈতিক চেতনার শিক্ষাও দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে রয়েছে দায়িত্ব, সততা ও আত্মত্যাগের মূল্য। কবিতার মাধ্যমে কবি পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য লড়াই করার ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রেরণায়

সংক্ষেপে, “তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা” হলো দেশপ্রেম, সংগ্রাম ও মানুষের সাহসের এক চিরন্তন প্রতীক, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা – শামসুর রাহমান

 

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?

তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,
সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাডায় প্রভূর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁডিয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর।
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুডি দিলো পিতামাতার লাশের উপর।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুডো
উদাস দাওয়ায় ব’সে আছেন – তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নডছে চুল।
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাডির এক বিধবা দাঁডিয়ে আছে
নডবডে খুঁটি ধ’রে দগ্ধ ঘরের।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।
তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাডার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী ব’লে নৌকা চালায় উদ্দান ঝডে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুডে বেডানো
সেই তেজী তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে –
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনিপ্রতিধ্বনি তুলে,
মতুন নিশান উডিয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।

 

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা কবিতা এর মুল্ভাব ঃ

‘তােমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সর্বস্তরের বাঙালি নারী-পুরুষের সংগ্রামী চেতনা এবং তাদের মহান আত্মত্যাগের মহিমাকে তুলে ধরা হয়েছে। এ কবিতায় বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। তারা এদেশের নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালায়। ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ এদেশের সাধারণ মানুষকে তারা নির্বিচারে হত্যা করে, আগুন দিয়ে মানুষের ঘরবাড়ি-বন্তি পুড়িয়ে দেয়। তাদের নির্মমতায় সাকিনা বিবির মতাে নারীদের সহায়-সম্বল-সন্ড্রম সবকিছু বিসর্জিত হয়। হরিদাসীর মতাে নারীরা স্বামী হারান। শিশুরা মা-বাবাকে হারায়।

এদেশের নিরীহ মানুষ সগীর আলী, কেষ্ট দাস, মতলব মিয়া, রুস্তম শেখও তাদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। কবি এদের নাম ও পেশার কথা কবিতায় উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। কবি স্বাধীনতার কাছে জানতে চেয়েছেন- এত রক্ত, এত ত্যাগের পরও কি সে আসবে? তার আসতে হলে কি আরও রক্ত লাগবে? লাশ লাগবে? আগুনে পােড়া ঘরের খুঁটি ধরে মােল্লাবাড়ির বিধবার প্রতীক্ষার প্রহর কি শেষ হবে না? অনাথ কিশােরীর শূন্য থালায় ক্ষুধার অন্ন সংস্থানের উপায় হিসেবে কি সে আসবে না? তাকে অবশ্যই আসতে হবে। আত্মবিশ্বাসী কবি তাই চারদিকে দামামা বাজিয়ে, নিশান উড়িয়ে স্বাধীনতার আগমনের নিশ্চয়তার বাণী শােনান স্বাধীনতাকামী এদেশের সব মানুষকে।

তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা কবিতা [ Tomake pawar jonno he shadhinota poem ] ব্যাখ্যা করেছেন সায়েম রুম্মান ৷

 

 

 

 

 

Leave a Comment