ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]

ক্লাবের এক কোণে

ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]

ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

টু ওয়ার্ডস জিরো (অন্যান্য)

০১.

ক্লাবের এক কোণে যারা সেদিন আসর জমিয়ে বসেছিলেন, মামলা মোকদ্দমার ব্যাপারে, তাদের প্রত্যেকেই বেশ ঝানু লোক। বসেছিল মিঃ মার্টিনবেল, মিঃ রুকাস নও লিউয়িস। এদের মধ্যে কেউ অ্যাটর্নি, কেউ বা ব্যারিস্টার আর বসে ছিলেন সলিসিটার মিঃ ট্রিভস। তিনি অনেক দেখেছেন, অনেক শিখেছেন কিন্তু আর কাউকে তিনি মামলা করতে বলেন না। নথিপত্তরের ওপর চোখ বুলিয়ে বলেন, মামলা করে লাভ কি, মামলা চালাবার ঝক্কি কম নয়, খরচও বিস্তর। তার চাইতে চেষ্টা করো আপসে মামলা মিটিয়ে নেবার।

মিঃ ট্রিভস অপরাধ বিজ্ঞানে একজন পণ্ডিত। একটা মামলা নিয়ে আলোচনা চলছিল। ওল্ড বেলিতে যে খুনের মামলা চলছিলো তাই নিয়ে একটা তর্ক বেধে উঠেছিল। খুনের মামলা জোরালো কিনা তা প্রমাণ দাখিল করা যায়নি, মামলা ওল্ড কোর্সে গিয়েছে।

মিঃ মার্টিনবেল বললো যে গোড়াতেই ভুল হয়েছিল। সবছেড়ে মিঃ ডিক্রিচি কেন যে একটা উকিলের কথায় কেস দাঁড়া করাতে গেল কে জানে। আসামী পক্ষের কৌসুলী কিভাবে তাকে নাস্তানাবুদ করল দেখলে তো। এরপর আর মামলা টেকে।

লিউয়িসের মতে ওই ব্যাপারে জুরি বেঁকে বসল। জনিয়েল মনে করেন যে উকিলের সাক্ষ্যের উপর নির্ভর না করে উপায় ছিলো না। তাছাড়া সে সাক্ষ্য ভালই দিচ্ছিল। হঠাৎ সে অমন বেফাঁস কথা বলবে তা কেউ ভাবেনি।

মিঃ ক্লিভাব বললেন, তা ভাবুক সেটা কোন কথা নয়। কিন্তু মেডিক্যাল এভিডেণ্ডের উপর কেসটাকে দাঁড় করিয়ে যেত। ট্রিভস তখনো কোন কথা বলেনি।

মিঃ ট্রিভস বললো, তিনি অনেক বইপত্তর ঘাটলেন, তিনি বুঝতে পারলেন না হত্যাকে কেন আমরা আমাদের চিন্তা কিংবা আলোচনার একটা প্রাথমিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করি। হত্যা হল সমাপ্তি, অনেক দিন আগে থেকেই হত্যাকারীর মধ্যে যার সূচনা হতে থাকে। হত্যা রহস্য যদি বুঝতে হয় তাহলেই সূচনা পর্ব বুঝতে হবে। প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্য যেটা ধীরে ধীরে পঞ্চম অঙ্কে দৃশ্যে এগিয়ে যেতে হবে। পঞ্চম অঙ্কের শেষ দৃশ্য হল হত্যার দৃশ্য। তা তোমরা শেষ দৃশ্যটাকে গোড়ায় বসাতে চাও। ওই করে মামলায় জেতা যায় কিন্তু হত্যা রহস্য বোঝা যায় না। ট্রিভস বলত লাগলো রহস্য কাহিনী এমন হবে সূচনা থেকে শুরু হবে সমাপ্তি হবে হত্যায়। ট্রিভসের সঙ্গীরা তাকে বুড়ো বলতে লাগলো এবং তাকে অবসর নিতে বললো।

ট্রিভস নানারকমের হত্যার রহস্য কাহিনীর কথা ভাবতে ভাবতে বাড়িতে ঢুকলেন। ঢুকেই তিনি টেবিলের ওপর একটা চিঠি দেখতে পেলেন। সেটা পড়তে পড়তে তার মুখের চেহারা পালটে গেল। তিনি বলতে লাগলেন এতদিন পরে কী আশ্চর্য। তাকে হুশিয়ার থাকতে হবে। তখন তাকে যদি কেউ দেখত তাহলে হয়তো বলতো, তিনি তাঁর জীবনের একটা মৌলিক সমস্যার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

.

০২.

 ১১ই জানুয়ারী

হাসপাতালের বিছানায় সে শুয়েছিল। তার কোকানির আওয়াজে নার্স এসে তার মাথায় হাত দিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলো, তার খুব কষ্ট হচ্ছে কিনা।

মার্ক হোয়াটারের সত্যই কষ্ট হচ্ছিল। যদিও নার্সের স্বরে সহানুভূতি ছিল তবুও তার ভালো লাগছিলো না। সে আত্মহত্যা করতে গিয়েও পারেনি। পাহাড়ের ওপর থেকে ঝাঁপ দিয়েও গাছের মাথায় আটকে গিয়েছিল। অন্যেরা তাকে উদ্ধার করে। তার চাকরী নেই, তাঁর স্ত্রী তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। বেঁচে উঠে সেকি স্বাভাবিক জীবন যাপন করবে? সবাই তাকে কৃপা করবে। অন্যেরা তাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলবে এই লোকটা আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। এটা খুবই লজ্জার ব্যাপার। তাহলে সে কেন বেঁচে উঠলো।

তাকে নার্স ঘুমের ওষুধ দিতে চাইলে তিনি ওষুধ খেতে রাজি হলেন না। তাকে কেন বাঁচানো হল এই কথা জিজ্ঞাসা করতে নার্স বললেন, আত্মহত্যা করা মহাপাপ।

মার্কহোয়াটারের ক্ষেত্রে পাপ নয়। সে বলল যে, সে মালিকের গাড়িতে করে কারখানায় যাচ্ছিল। মালিক এ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে বসলো। তাকে বলা হলো ঘণ্টায় ৫০ কিমি চালাচ্ছিলেন কেন, কেন তিনি ৩০ কি.মি. চালাচ্ছিলেন না? উত্তরে তিনি বললেন, তাহলে নাকি ইনসুরেন্সের টাকা পাওয়া যাবে না। তিনি মিথ্যে সাক্ষ্য দেননি, উকিলের কাছে তিনি সত্য কথা বললেন, তার জন্য তার চাকরী চলে যায়। তার জন্য তার বন্ধুরা তাকে ত্যাগ করে এবং তাদেরই একজনের সঙ্গে ভাব হলে তার স্ত্রীও তাকে ত্যাগ করে। সেই দুঃখে সে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেয়। সে বাঁচতে চায় না তবে কেন তাকে বাঁচানো হলো।

নার্স বললো, বাঁচা মরা সবই ঈশ্বরের হাতে। তিনিই বাঁচা মরার মালিক।

.

১৪ই ফেব্রুয়ারী

একলা ঘরে একটা কাগজের উপর সে সব প্ল্যান অনুযায়ী লিখে যাচ্ছিল। টেবিলের আলোয় সে মুখটি দেখা গেল না। সে মুখটি বড়ই নিষ্ঠুর সে শুধু প্রতিশোধ চায়। কাগজের উপর সে হত্যার প্ল্যান লিখে যাচ্ছিল। সেপ্টেম্বর মাসের একটা তারিখে সে হত্যা করবে। সে ফায়ার প্লেসের কাছে এগিয়ে গেল। ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালাচ্ছিল। সেই আগুনের মধ্যে কাগজখানা সে নিক্ষেপ করল। আগুনের দিকে তাকিয়ে সে বললো, যাক সমস্ত প্রমাণ পুড়ে যাওয়াই ভলো। তার মাথার প্ল্যান কখনও পুড়ে ছাই হবে না।

.

৮ই মার্চ

পুলিস কমিশনার ও তার মেয়ে সিলভিয়ার গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলেন। সিলভিয়ারের চোখে জল। তার বাবা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন যে, সে তো কোন অন্যায় করেনি। তবে সে কাঁদছে কেন? তিনি মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনেছেন। স্কুলের অবস্থাটা জেলখানার মত। সিলভিয়ারের কোন দোষ না থাকলেও সে দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। কেননা সে দোষ অস্বীকার করলেও তিনি তা মেনে নেবেন না এই ভয়ে অস্বীকার করলে তিনি সন্দেহের চোখে তাকিয়ে থাকবেন, এই ভেবে সিলভিয়া ভেবেছিল যে তার চাইতে শাস্তি পাওয়া ভালো। আজ সকালে সিলভিয়ার স্কুলের হেডমিস্ট্রেস একটি চিঠিতে জানাল।

বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের কাগজপত্র চুরি যাচ্ছিল, তার কন্যা সিলভিয়ার বিরুদ্ধে একজন নালিশ জানায়। নানাভাবে প্রশ্ন করে তারা সিলভিয়াকেই চোর সন্দেহ করেন। অবশ্য চোরাই মাল সে কোথায় রেখেছে তা এখনও জানা যায়নি। জানি খবর শুনে আপনি মর্মাহত হবেন কিন্তু যে বালিকা চুরিতে হাত পাকিয়েছে তাকে বিদ্যালয়ে রাখা সম্ভব নয়। আপনি যদি এই চিঠি পেয়ে নিজে আসেন তারা এবিষেয়ে আপনার সাথে কথা বলতে পারেন।

সুপারিন্টেন্টে নিজেই গিয়ে বুঝেছিলেন সিলভিয়া নির্দোষ। তিনি অনেক চোর ডাকাত ঘেটেছেন। তিনি এটাও বুঝেছিলেন তারা প্রশ্ন করে মেয়েটাকে দোষ স্বীকার করিয়েছেন। তিনি তার মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যদি দরকার হয় তারা পুলিসে খবর দিতে পারেন। তারা না দিলে তিনিই তা করবেন। সিলভিয়ার ক্রন্দনরতা মুখটির দিকে চেয়ে গাড়িতে যেতে যেতে তার বাবা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, সে দোষী না হলেও কেন দোষ স্বীকার করল।

আসলে শিশুরা ভয়ে তার দোষ স্বীকার করে।

.

১৯শে এপ্রিল

খেলা-টেলার খবর যারা রাখেন লেভিলকে না চেনার কথা তাদের নয়। সে একজন খেলোয়াড়। ফুটবল, ক্রিকেট, গল্ফ, সাঁতার ইত্যাদি যাবতীয় খেলায় সে পটু। তার সবচেয়ে বড় গুণ হারলেও তার মুখের হাসিটা ম্লান হয় না। তার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হল তার স্ত্রীভাগ্য। তিনি খ্যাতিবান ও অর্থবান। লেভিলের বয়স এখন ৩৩, তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটেছে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী কো। এত কিছুর পরে তার মনে একটা অস্বস্তির কাটা বিধে আছে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল লেভিল।

কয়েকদিন আগে ফ্রান্স থেকে ফিরেছে তারা সস্ত্রীক।

কো বললো, তার বন্ধু শাটি তাকে সামনের জুনে নরওয়েতে যেতে লিখেছে কিন্তু সেপ্টেম্বরে যদি ক্যামিলিয়ার কাছে যাওয়া হয় তাহলে কি জুন মাসে যাওয়া সম্ভব হবে।

লেভিল বললো, এই তারা ফ্রান্স থেকে ফিরলেন। সেপ্টেম্বরে যদি ক্যামিলিয়ার কাছে যাই, তাহলে জুন মাসে যাওয়া সম্ভব হবে না।

কো বললেন ক্যামিলিয়া তার মায়ের মতন, স্যার ম্যাথু ট্রেসিলিয়ানের স্ত্রী তিনি। যার সাহায্যনা  পেলে তিনি জীবনে দাঁড়াতে পারতেন না। যিনি তার অবিভাবক ছিলেন। তিনি তাকে তার ছেলের মত মানুষ করছেন। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে তিনি তার বাড়ি গিয়ে থাকেন। এবারে যদি তিনি না যান তাহলে খারাপ দেখাবে। তাছাড়া তোমাকেও তিনি নিয়ে যেতে বলেছেন।

কোর বক্তব্য ভদ্রমহিলা মারা গেলে বিস্তর টাকা পাবে বলে যাওয়া উচিত। তাছাড়া টাকার উপর ক্যামিলিয়ার হাত নেই, এটা বোঝাল লেভিল। তিনি ভালোবাসেন বলে তার কাছে তারা যাবে। ম্যাথু তার মৃত্যুর সময় যে ব্যবস্থা করে গেছেন, সেই অনুযায়ী ক্যামিলিয়া তার জীবনদশায় সে টাকার সুদ পাবে। উইলে লেখা আছে ক্যামিলিয়ার মৃত্যুর পর এমনিতেই সেই টাকা স্ত্রীর কাছে চলে আসবে। ক্যামিলা সেই উইল পাল্টাতে পারেন না।

কো বললো তাকে ভালোবাসলেও কোকে তিনি ভালোবাসেন না। তিনি অড্রেকে ভালোবাসতেন। তার মতে গলাস পয়েন্টে সবাই তাকে ঘেন্নার চোখে দেখে। কো বললো যে, অড্রের প্রতি তার এখনও অস্বস্তি যায়নি। তার মনে হয় সে তার প্রতি অন্যায় করেছে। আসলে অড্রের কাছ থেকে লেভিল ডির্ভোস চায় কিন্তু সে মন থেকে তা দিতে না চাইলেও লেভিলের কথা ভেবে একবাক্যে তাকে ডিভোর্স করে দেয়। কেননা সে কো-কে ভালোবাসত। অড্রেকে নিয়ে কো একটু বিরক্ত। তার মনে হল লেভিল একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছে। সে তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে ছুটি কাটাতে বেড়াতে যাচ্ছে এখানে প্রথম স্ত্রীকে ডাকার কোন প্রয়োজন আছে?

লেভিল বললো, তাকে যে ডাকা হল কারণ প্রতি বছর তাকে সেখানে ডাকা হয়। অড্রে প্রতিবারের মত এবারেও আসবে, কেন না তাতে প্রতিপন্ন হবে যে, লেভিলকে ভালো মনেই নিয়েছে। লেভিল বললো, অড্রের সঙ্গে সে বন্ধুত্বের মত সম্পর্ক রাখতে চায়। এইকথা শুনে কোর ভালো লাগলো না। লেভিল বললো যে, তার চিঠি পেয়ে সে খুশী হয়েছে। এটা ক্যামিলিয়াকে জানিয়ে দেওযা হোক সেপ্টেম্বরে তারা দুজনেই তার বাড়িতে উঠবে।

.

৩০শে এপ্রিল

লেভিলের চিঠি পেয়ে পাগল হয়েছে বলে সেই চিঠি সে তার ভগ্নীর দিকে ছুঁড়ে দিলেন, ক্যামিলিয়া মেরীর বয়স ছত্রিশ, কিন্তু সে তার মায়ের মৃত্যুর পর আর বিয়ে করেনি। মেরি তার পিসীমার কাছে আছে।

ক্যামিলয়া বললেন যে তাকে সেপ্টেম্বরে আসতে বলা হয়েছে বলেই কি ওকে আসতে হবে। তাও আবার প্রথম স্ত্রীর উপস্থিতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে। প্রথম স্ত্রীকে সে ত্যাগ করেছে। বিনা অপরাধে।

মেরি বললেন এসব তার দ্বিতীয় পত্নীর দোষ। সে একজন স্ত্রীকে ত্যাগ করতে সাহায্য করেছে আবার সেই স্ত্রীকে মুখের উপর অপমান করতে চায়।

মেরী জানাল একজন ভদ্রলোক তাদের সঙ্গে আসছে। এটা শুনে তিনি অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন বিয়ের আগে কোর পেছনে ঘুরত সে এখনও তার পেছন ছাড়েনি। নেহাত লেভিলের মত ভদ্র ছেলে বলে এসব করছে।

মেরীর বক্তব্য সে আসতে চাইলে তাকে বারণ করা যায় না। তাছাড়া সে হোটেলে থাকবে। তাই শুনে ক্যামিলিয়া বললেন, তিনি আর কাউকে নেমন্তন্ন করবেন না। তিনি লেভিলের কথা বললেন বেহায়া একটা মেয়ের পাল্লায় পড়ে যে অড্রের মত বউকে ত্যাগ করতে পারেন, তার মুখ তিনি দেখতে চান না।

লেভি ট্রেসিলিয়ানের সামনে জানালা তার সামনে হোটেল, সেখানে হৈচৈ হল্লা, এই নিভৃত সুন্দর প্রাচীর পরিবেশে এই বাড়িটা মোটেও খাপ খায় না। বাড়িটা একটা ভয়ঙ্কর ইন্দ্রপতনের মত। ক্যামিলিয়া বললেন তিনি কি লেভিলকে আসতে নিষেধ করে দেবেন।

অড্রে আসতে মেরী বললেন যে অড্রের নাকি এতে আপত্তি নেই। লেভিদের সঙ্গে তার এই ব্যাপারে কথা হয়েছে। কো এখানে এলে নাকি খুশিই হবে।

আসলে লেভিল অড্রেকে ত্যাগ করে অস্বস্তিতে আছে। সে তার বিবেক দংশনে ভুগছে। সে তার ক্ষমতা পেতে চায়। তাই ইচ্ছে করেই এমন সময় আসছে যখন কিনা অড্রে এখানে থাকবে।

মেরী বললো, এগুলো আসলে কোর কারসাজি। সে অড্রেকে দগ্ধে মারতে চায়।

লেভি ট্রেসিলিয়ান বললেন বিয়ের পরে যারা পুরুষ বন্ধু নিয়ে ঘুরে বেড়ায়; তাদের পক্ষে সবই সম্ভব। এরজন্য লেভিলকে পস্তাতে হবে।

.

২৯শে মে

মালয়ীচাকরটা সব বাঁধাছাদা করে দিচ্ছে, টমাস রয়েড সেদিকে তাকিয়ে বসে ছিল। সে ইংল্যাণ্ডে যাবে। অ্যালেন ট্রেক তার বাংলোয় এসে ঢুকল। টমাসের দিকে তাকিয়ে বললো যাচ্ছ তাহলে। টমাস সাত বছর পর তার দেশে যাচ্ছে। সে কারো সাথে কথা বলে না, চাপা স্বভাবের। গতবার তার এক দাদার মৃত্যু হলেও সে দেশে যায়নি, যার সঙ্গে তার প্রকৃতিগত মিল ছিল না। তার মা বেঁচে আছেন। টমাসের কোন বোন নেই। দূর সম্পর্কের আত্মীয়া আছে, বাবা মা মারা যেতে তার বাড়িতেই মানুষ হয়েছিল। যার স্বামী ছিলেন লেভিল, যিনি বিখ্যাত খেলোয়াড় তিনি সেপ্টেম্বরে মাসে ক্রীনে যেতে চান, তিনি ওখানে এক পরিচিতা মহিলার সঙ্গে দেখা করবেন। অ্যালেন তাকে ব্যলমোরান কোর্টে থাকার পরামর্শ দিল।

.

২৯শে জুন

বৃদ্ধ সলিসিটার মিঃ ট্রিভসকে ব্যারিস্টার রুফার্স লর্ড ব্যালমোরাল কোর্টে থাকতে বললেন। যেখানে রজাম নামে এক ব্যক্তির বউ রান্নার কাজ করে, যা অত্যন্ত উপাদেয়।

রুফার্স লর্ড বললেন, সেপ্টেম্বর মাসে হোটেলে ঘর মিলবে এ আশ্বাস দিলেন। ভদ্রলোক নিজের শরীর সারাতে ওখানে যাবেন। সেখানে গেলে পুরনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা হবে। স্যর ম্যাথুর বিধবা স্ত্রী এখন সেখানে থাকেন। এবারে গিয়ে লেভি ট্রেসিলিয়ানের সঙ্গে দেখা করা হবে। তিনি তো তার বন্ধুর বাড়িতে থাকতে পারতেন! লেভি ট্রেসিলিয়ান যদি জানতে পারেন যে তিনি সস্ত্রীক এখানে আছে তাহলে মাঝে মাঝে ওখানে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবেন। রজাসক ট্রিভস বললেন যে, তার জন্য যেন ব্যালমোরাল কোর্টে ঘর ভাড়া করা হয়।

.

২৮শে জুলাই

কো ও ট্রেড খেলা দেখছিল। মেরীক আর লেভিলের সেমি ফাইনাল খেলা। মেরীক তরুণ। কে জিতবে এই খেলায় বলা শক্ত। তিন সেটের খেলা। প্রথম দুটি সেটের একটি জিতেছে লেভিল। অন্যটি মেরীক। এখন তৃতীয় সেটের খেলা চলছে হঠাৎ ট্রেড নামক বন্ধুর প্রবেশ ঘটল। যে তার কুমারী জীবনের বন্ধু।

ওদিকে দুজনের খেলাই জমে উঠছে। শেষ পর্যন্ত সেট হারল লেভিল, জিতল মেরীক, লেভিল হারার পরে কোকে জড়িয়ে ধরল। সে সত্যিই যে একজন খেলোয়াড় তাই তার প্রমাণ। খেলা সেরে লেভিল তার স্ত্রীকে ট্রেডের কথা জিজ্ঞাসা করল।

কো বললো, ট্রেড-কে সে হিংসে করে, ট্রেড কি তাকে হিংসা করে না? কেননা সে মনে করে তিনি তার স্বামী, এককালে তার সঙ্গে তার বন্ধুত্বের সম্পর্কে ছিল, কিন্তু আজও সে তার বন্ধু।

.

১০ই আগস্ট

লর্ড কর্নেলকে যারা চেনেন তারা বললেন, লোকটি ভালো কিন্তু খামখেয়ালী, তবে তিনি আদর্শবাদী। এহেন মানুষটি অফিস কামরায় বসেছিলেন। তিনি ভাবছিলেন দক্ষিণ আমেরিকায় তার ব্যবসা দেখাশুনা করার জন্য একজন লোক দরকার। সেক্রেটারী একটা স্লিপ রাখল। মার্ক হোয়াটার নামের একজন ব্যক্তি। তিনি এই নামে কাউকে চেনেন না।

একটু বাদে মার্কহোয়াটার ঘরে ঢুকলেন। তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন কর্নেল। জিজ্ঞাসা করলেন তিনি কি হার্বাট ক্লে কারখানায় কাজ করতেন, সে সম্মতি জানাল।

সে বললো সে মিথ্যে সাক্ষ্য দেয়নি বলে তার চাকরী গেছে। সে মিথ্যা কথা বললো।

লর্ড কর্নেল বলেন, যে তার একটা ব্যবসা আছে। দক্ষিণ আমেরিকায়, সেখানে তিনি তার ম্যানেজার করে তাকে পাঠাতে চান, অতঃপর কিছু কথাবার্তা হল এবং তারপর কর্নেল চলে গেলেন। মার্ক হোয়াটারের পকেটে তখন নতুন চাকরীর কাগজপত্র; ব্যাপারটা তার কাছে স্বপ্নের মত ঘটে গেল। সে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে যাবে বলে কথা দিল। তার শরীর এখনও সুস্থ হয়নি। সে সেপ্টেম্বরে কোন নির্জন জায়গায় গিয়ে বিশ্রাম নেবে। লর্ড কর্নেল তাকে কিছু টাকা দিলেন। সে কোথায় যাবে এখনও ঠিক করতে পারলো না।

 

ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

১৯শে আগস্ট

সুপারিটেণ্ডেন্ট ব্যাটেল বললেন, ব্যস ছুটির বারোটা বেজে গেল। তিনি ভাবছিলেন মাস খানেকের ছুটি নিয়ে কোথাও যাবেন কিন্তু দপ্তরে কি চুরি ধরা পড়েছে, তার তদন্তের জন্য তার যাওয়া হবে না। তার স্ত্রী এটা শুনে বললেন, সেপ্টেম্বর না হয় অক্টোবর মাসে যাবে। তার ঘর বুক করা আছে। তাই তিনি বললেন তার স্ত্রী বেন, ছেলেমেয়েদের নিয়ে চলে যায়। তার তদন্তের কাজটা তাড়াতাড়ি চুকে গেলে তিনি হপ্তাখানেকের জন্য ওয়াশিংটন থেকে বেড়িয়ে আসবেন তার সাথে জিমের দেখা হবে। জিমের পুরো নাম জেমস্ লীচ। এটা পছন্দ না হলেও মিসেস ব্যাটল করতে রাজী হলেন।

.

০৩.

৩.১

সলাটিংটন স্টেশনে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে টমাস লয়েডের জন্য অপেক্ষা করছিল মেরী। টমাস নামার পর তার সাথে মেরীর দেখা হল। ওরা দুজন ছোটবেলার বন্ধু, তাদের মধ্যে পত্রবিনিময় হয়।

টমাস বললো যে, সে হোটেলে থাকবে। মেরী তাকে তার পিসীমার বাড়ি রাখতে চায়। মেরীর কথামত টমাস বসল গাড়িতে মেরী গাড়ি স্টার্ট দিল। মেরী বললো, সলাটিংটন থেকে সল্টীক মাত্র সাত মাইল। একটু বাদেই আমরা সেখানে পৌঁছে যাব। পিসীমা তোমাকে দেখলে খুশী হবেন। পিসীমার বাড়ির নাম গাল পয়েন্ট। মেরী জানাল তার বাড়িতে একটা অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটেছে। লেভিলের সঙ্গে অড্রের বিচ্ছেদ ঘটেছে, প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে তারা ছুটি কাটাতে আসত। এবার দুজনকে পিসিমা নিমন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু লেভিল তার দ্বিতীয়া পত্নীকে নিয়ে আসছেন। এটাতেই অশান্তিজনক অবস্থা তৈরী হয়েছে।

টমাস বললো যে, লেভিল কি জানত যে অড্রে আসবে। পিসীমা তার চিঠিতে লেভিলকে জানিয়েছিলেন। টমাস একথা শুনে খুব আশ্চর্য হল।

মেরী বললো, আশ্চর্য বলে আশ্চর্য। এখন আর একটা ফ্যাশন হয়েছে নতুন বউয়ের সঙ্গে পুরানো বউয়ের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। একটা থমথমে আবহাওয়া সৃষ্টি হবে। এইসময় যদি একজন বাইরের লোক থাকে তবে সবাই স্বাভাবিক ভাবে চলবে।

টমাস অড্রের কথা জিজ্ঞাসা করল। অড্রেকে এককালীন ভালোবাসত টমাস। কিন্তু সেকথা সে মুখ ফুটে বলতে পারেনি। অড্রের সঙ্গে লেভিলের বিচ্ছেদের কথা ভেবে সে ইংল্যাণ্ড ছেড়ে মালয়ে চলে গেছিল। এতদিন বাদে সেকি অড্রের বিচ্ছেদের কথা শুনে চলে এল? এটা ভাবছিল মেরী।

গালস পয়েন্টে গাড়ি ঢুকল। লন পেরিয়ে বাড়ি, প্রথমে ড্রইংরুম। ড্রইংরুম পেরিয়ে ওদিকে বারান্দায় গিয়ে পৌঁছাল টমাস। দেখা হল অড্রের সঙ্গে, সে ভীষণ রোগা হয়ে গেছে। তার চোখ দুটি উজ্জ্বল।

টমাসকে অড্রে দেখতে পায়নি। অড্রের পাশে একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটি কি অড্রের সপত্নী? একজন ঠাণ্ডা অপরজন উগ্র; খুব আকস্মিক ভাবেই তুলনা করা যায়। ওদিক থেকে লেভিল বারান্দায় ঢুকল। তার হাতে একটা পত্রিকা। সেও দেখতে পায়নি টমাসকে। এগিয়ে এসে সে বললো, একটাই মাত্র কাগজ ছিল। তা সেইটিই নিয়ে এলাম। পরমুহূর্তে দুটি ঘটনা ঘটল। কো বললে দাও। আর অড্রেও হঠাৎ মুখ না তুলে হাত বাড়িয়ে দিল লেভিলের দিকে। লেভিল বুঝতে পারছিল না কাগজটা কাকে দেবে। হঠাৎ তীব্র গলায় কো বলে উঠল কাগজটা তাকে দেওয়া হোক। অড্রে বললো যে, সে বুঝতে পারেনি। টমাস দেখতে পাচ্ছিল লেভিলের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে ঘরে যাবার সময় ধাক্কা খেল টমাসের সাথে। টমাস দেখল তার চোখে অশ্রুপ্লাবিত। লেভি ট্রেসিলিয়ানকে বললেন সব লেভিলের কাণ্ড, তাকে আসতে বললেন, তিনি তার নতুন বউকে নিয়ে এসেছেন এবং এই নিয়ে অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

টমাস বললো, এতে অড্রের সম্মতি ছিল।

টমাসকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনিও অড্রেকে ভালোবাসতেন কি?

তিনি বললেন, যে এখনও বাসেন। টমাস অড্রেকে বিয়ের প্রস্তাব করবেন বলেই এখানে এসেছেন।

মিসেস স্পাইসারকে নিরিবিলিতে পেয়ে বুড়ো বাৰ্টলার হার্টল তার মনের কথাটা খুলে বললেন। সবাই কথাবার্তা বলছেন কিন্তু কেউ কারো মনের কথা খুলে বলছেন না।

হার্টল বুড়ো বাৰ্টলার বললেন এরকম কখনো হয়, দুটি বর্তনের মধ্যে কখনো ভাবসাব হয়।

খাবার ঘরে সবাই বসেছিল। মেরী টমাস, লেভিল, কো আর অড্রে। অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

কো’র উদ্দেশ্যে মেরী বললো, আজ সকালে নদীর ওপারে গেছিলাম। সেখানে তোমার বন্ধু মিঃ ল্যাটিমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কাল রাত্রিতে তাকে এখানে খেতে বলেছি।

কো বললো, তার সঙ্গেও ট্রেডের দেখা হয়েছে। ট্রেড ইটার হেড হোটেলে উঠেছে।

লেভিল বললো, সে একটু হোটেল থেকে ঘুরে আসবে। আচ্ছা মেরী নদী পারের জন্য আজকাল খেয়া পারাপার ব্যবস্থা হয়েছে। তাই না?

মেরী জানাল ভোর থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত খেয়া পারাপার করা যায়। লেভিল বললো, সবাই মিলে একদিন নদীপার হয়ে ট্রেডের হোটেলে যাবো।

টমাস অড্রেকে জিজ্ঞাসা করলো আজকাল কি আর তুমি পিয়ানো বাজাও না?

অড্রে বললে, ভালো লাগে না।

টমাস বললো, এককালে তুমি চমৎকার পিয়ানো বাজাতে।

অড্রে বললো, পিয়ানো ছেড়ে দিয়েছি।

লেভিল বললো, পিয়ানো ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

কো বললো, তুমি কবে থেকে আবার পিয়ানোর সমজদার হলে লেভিল?

লেভিল বললো, অড্রের হাত তো খুব ছোট। অত ছোট হাত দিয়ে অর্কেস্ট্রাকে ধরা খুব সুবিধে নয়।

অড্রে বললো, তার কড়ে আঙ্গুল খুব লম্বা।

কো বললো, যার কড়ে আঙ্গুল খুব লম্বা হয় তারা স্বার্থপর হয়। নানারকম আলোচনা হল কড়ে আঙ্গুল নিয়ে।

মেরী বললো, কো কি হাত দেখতে পারে?

এক জ্যোতিষী বলেছিল তাকে যে, তার অনেক ছেলেমেয়ে হবে। কিন্তু এখনো তার বিয়েই হয়নি। সে অনেক দূরদেশ যাবে একথা ঠিক হলো? ছত্রিশ বছর বয়সেও সে ইংল্যাণ্ড ছেড়ে কোথাও যায়নি। টমাসের এই কথাগুলো একটু করুণ শোনাল। টমাস তাকে আশা দিল। মেরী হেসে বললো, ছুটির শেষে তুমি কি আমাকে মালয়ে নিয়ে যাবে। একথায় লজ্জা পেল টমাস। সবাই হাসছিল টমাসের কথায়। একজন সলিসিটর ট্রিভস আজ রাতে এখানে খাবেন। বুড়ো মানুষ আড্ডাবাজ।

কো বললো, সে বুড়োদের সঙ্গে মেশে না।

.

৩.২

একটু আগে ডিনারের পালা শেষ হয়েছে। প্রশস্ত ড্রইংরুমে এসে জড়ো হয়েছে সবাই। মিঃ ট্রিভস তাদের সঙ্গে জড়ো হয়েছেন। গানবাজনা চলছিল। মিঃ ট্রিভস ভাবলেন যৌবনের মতন সময় আর হয় না। মেরী বললো, একটু ব্রীজ খেলা যাক; বেশিক্ষণ হয়তো খেলা যাবে না কারণ পিসীমা ডাকবেন। তিনি এখন আর নীচে নামেন না।

কথায় ছেদ পড়ল। কো তার নাচের সঙ্গী করে নিল ল্যাটিমারকে। লেভিল জিজ্ঞেস করল অড্রেকে, তার সাথে সে নাচবে না কি? অড্রে নাচতে রাজী হলো। সে জানতো লেভিলের সঙ্গে যদি নাচতে রাজী না হয় তাহলে সেটা ভারী বিশ্রী হবে। লেভিলের হাতে হাত মিলিয়ে পা মিলিয়ে সে এগিয়ে এল।

মিঃ ট্রিভস সব দেখলেন, তিনি ভাবছিলেন বিগত যৌবনের কথা। তার আনন্দ আর যন্ত্রণার কথা। অড্রে লেভিলের বাহুবদ্ধ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন। তিনি একটু অস্বস্তিভাবে বললেন তার নাচতে ভালো লাগছিল না। তিনি ঘর ছেড়ে বারান্দায় চলে গেলেন। টমাসকে তার কাছে যেতে বলছিল ট্রিভস।

মেরী বললেন, টমাসকে বলা হয়েছে অড্রেকে বিয়ে করার জন্যে। মিঃ ট্রিভসকে তিনি সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

মিঃ ট্রিভস বললেন মানুষের চেহারা দেখে চরিত্রের আন্দাজ করা হয়। এটা তিনি পারেন। আরও কিছু বলার আগে কফি এসে গেল। মেরী অড্রেকে বারান্দায় কফি দিয়ে আসলেন।

অড্রের সঙ্গে লেভিল বারান্দায় ছিল, মেরী চা নিয়ে যেতে তাদের দেখতে পেলেন। অড্রের চুলের সঙ্গে লেভিলের কোর্টের হাতার বোতাম আটকে গেছিল। তারা ছাড়াবার চেষ্টা করছিলেন। তাতে অড্রের একটু কষ্ট হয়েছিল। মিঃ ট্রিভস দেখতে পেলেন অড্রে কাঁপছে। ট্রিভস মেরীর অলক্ষ্যে তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে ছাড়িয়ে দিতে চাইলে লেভিল বললো, সে ছাড়িয়ে নিতে পেরেছে। অড্রে শীতে কাঁপছিল মেরী তার কফিটা নিয়ে এলো।

 

ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

৩.৩

মিঃ ট্রিভসকে দেখে ট্রেসিলিয়ান খুশী হলো, তাদের পুরানো দিনের কথা নিয়ে গল্প হলো। তারা অতীত দিন থেকে বর্তমানে পৌঁছালেন। প্রেম নিয়েই কথা হচ্ছিল। আগে জীবনে যাই থাক সুখ ছিল, শান্তি ছিল। অথচ একালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভালোবাসা একটা নেশা ছাড়া কিছু নয়। তাও চোখের নেশা; যদি তাই না হবে তাহলে অড্রেকে ছেড়ে কো-কে কেন লেভিল বিয়ে করল?

তাদের বাড়িতে একটা ক্রিকোণ প্রেমের সৃষ্টি হয়েছে। আচ্ছা মিঃ ট্রিভস এটি দেখে আপনার কি মনে হয়?

তার মতে উভয়ই সুন্দরী। তাহলে কেন তাকে ছেড়ে দিল। মেরী বললো, দ্বিতীয় পত্নীকে নিয়েই যে খুশী থাকবে তার কি মানে?

ট্রিভস বললো, দ্বিতীয় পত্নীকে ছেড়ে দিয়ে প্রথম পত্নীর কাছে ফিরে যাওয়ার ঘটনা সে অনেক দেখেছে।

ট্রেসিলিয়ান বললে এটা তার ক্ষেত্রে ঘটবে না। কারণ অড্রে খুব অভিমানী মেয়ে তার স্বামী তার ভালবাসার সম্মান দেয়নি। লেভিল যদি অড্রের কাছে ফিরে আসতে চায় সে রাজী হবে না। অড্রে দুঃখ জ্বালায় মরে গেলেও কাউকে সে কথা জানাতে চায় না। ও দেখাতে চায় লেভিলকে ছাড়া ও বাঁচতে পারে। না আসলে এটা অভিমানের ব্যাপার। ট্রিভস মনে করেন এমন হতে পারে সেই ছেলেটিকে আবার কাছে টানতে চাইছে।

লেভি ট্রেসিলিয়ান বললেন তাহলে এটা একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে। তিনি চান অড্রে এখান থেকে চলে যাক। কিন্তু এটা সম্ভব নয়; এক্ষেত্রে লেভিলের এখান থেকে বিদায় নেওয়া উচিত, তিনি মনে করেন।

ট্রেসিলিয়ান মিঃ ট্রিভসকে বললেন যেন তিনি সময় পেলেই চলে আসেন। যদি কিছু না মনে করেন তাহলে ঘণ্টির দড়ি টেনে দিয়ে যাবেন। এটি মাদামের ইলেকট্রিক কলিংবেলের বদলে করা হয়েছে। ঘন্টি আছে উপরতলায় ব্যারেটের ঘরে। সেখান থেকে দড়ি টানলেই সেটা বেজে ওঠে।

মিঃ ট্রিভসকে দেখে মেরী অলিডন প্রস্তাব করলেন একরাউণ্ড ব্রিজ খেলা যাক। ট্রিভস হোটেলে ফিরতে চাইলেন। লেভিল বললেন সবে তো দশটা বাজে। আসলে এই হোটেল রাত বারোটায় কাজ হয়।

কো বললো, ট্রেড তুমি ইচ্ছে করলে ব্যালমোরাল কোর্টে আসতে পার। ট্রেড বললো, অত তাড়াতাড়ি তার পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়।

মেরী বললো, ট্রিভস দেখেছেন কি, খুনের মামলায় একজন নাকি গ্রেপ্তার হয়েছে?

ট্রিভস বললো, কারো বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া না গেলেও আর আজকাল নিশ্চিন্ত হবার উপায় নেই। কে খুনী নয়, আমি নিজেই এমন একজনকে জানি যে কিনা শিশু হত্যার অপরাধী। কিন্তু আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারেনি। জনকয়েক সাথী জুটিয়ে এমন একটা অ্যালিবাই সে দাঁড় করিয়ে দিলে, কিছুতেই তাকে মিথ্যা প্রমাণ করা গেল না। ফলে প্রমাণের অভাবে সে ছাড়া পেয়ে গেল। ভদ্রসমাজে দিব্যি সে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে।

টমাস প্রশ্ন করল, অথচ আপনি জানেন সে হত্যাকারী?

বিলক্ষণ।

তাহলে আপনি তাকে নিজের হাতে শাস্তি দেননি কেন? দেইনি কারণ আইনকে আমি নিজের হাতে তুলে নিতে পারি না।

সে হলে পারত টমস রাইভ বললো। যদি অপরাধ সম্পর্কে নিঃসন্দেহে হতেন তাহলে যে স্রেফ প্রমাণের অভাবে আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারছে না, তাহলে শাস্তি দেবার ভার আমি নিজের হাতে তুলে নিতুম।

ট্রিভস বললেন, এটা ঠিক নয়। বিশৃঙ্খলা তাতে বেড়ে যায়। আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়া অন্যায়।

টমাস বললেন, স্রেফ প্রমাণের অভাবে খুনী ছাড়া পেলে তাকে তিনি হত্যা করতেন। ট্রিভস বললেন তার ফলে পুলিস তাকে গ্রেপ্তার করবে।

টমাস বললো, ন্যায় বিচারের স্বার্থে যদি সে হত্যা করে তাহলে সে প্রমাণ সোপ করে দেবে।

খানিকবাদে ট্রিভস একটা গল্প বললেন, তীর ধনুক নিয়ে দুটি অল্পবয়সী শিশু একদিন খেলা করছিল। তাদের মধ্যে একজনের তীর হঠাৎ অন্যশিশুর বুকে বিধে যায় এবং সে তার ফলে মারা যায়। এ নিয়ে তদন্ত হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত রায় দেওয়া হয়েছিল এটা দুর্ঘটনার ব্যাপার। কেননা খেলতে খেলতে এমন দুর্ঘটনা হতেই পারে।

মেরী মন্তব্য করল যে, যতই মর্মান্তিক হোক এরজন্য শিশুটিকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু এটা যদি দুর্ঘটনা না হয়। কেননা দিনকয়েক পরে সেখানে গিয়ে (ওই দুর্ঘটনার স্থলে) দেখলো এটা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। একটা শিশু অন্য একটা শিশুকে হত্যা করতে চেয়েছিল। সে তারজন্য তীরধনুক নিয়ে দিবারাত্র প্র্যাকটিস করতো।

মিঃ ট্রিভস বিদায় নিলেন। টমাস তার সঙ্গে গেল। কো, মেরী বিদায় নিল। লেভিল উঠে দাঁড়াল। সে বারান্দায় গিয়ে বসতে চাইল, লেভিল বারান্দায় ঘুরতে গেল। ট্রেড বললো যে, ভোরের দিকে হোটেলে সে একসঙ্গে যেতে চায় ট্রিভসের সাথে। তাই সে কতগুলি রেকর্ড কো কে দেওয়ার জন্য গুছিয়ে রাখছে।

ট্রিভস টমাসকে বললো যে, মিঃ ট্রেড-এর বন্ধু অত্যন্ত ছটফটে।

অড্রের কথায় টমাস বললো যে, তার মত শান্ত মেয়ের পক্ষে তাকে বন্ধু করা সম্ভব নয়। অড্রে তার সঙ্গে ছেলেবেলায় একসঙ্গে মানুষ হয়েছে। টমাস জানাল যে অড্রের সৌজন্যের খাতিরে সে এখানে এসেছে।

ট্রিভস বললেন অড্রে আসবে জেনে লেভিল নিজের থেকে এখানে আসতে চেয়েছিল এর কারণ অড্রের সঙ্গে দেখা করা তার উদ্দেশ্য ছিল। ভাঙ্গা মন কি কখনও জোড়া লাগে।

লেভিল ট্রেডল্যাটিমার ঘরে ঢুকল। ট্রেডের হাতে রেকর্ড ছিল, টমাস বেরিয়ে গেল। লেভিল বললো, টমাস খুব চাপা স্বভাবে, মানুষ। ট্রেড ল্যাটিমাকে সঙ্গে নিয়ে ড্রইংরুম থেকে চত্বরে নেমে এলেন। লেভি ট্রেসিলিয়ানের বাড়ি থেকে ব্যালমোরাল কোর্টের দূরত্ব কম, ট্রেড যাবে ফেরীঘাটে, সে নদী পার হয়ে ইটারহেড হোটেলে যাবে।

ব্যালমোরাল কোর্টে গিয়ে নেমে পড়লেন ট্রিভস, ট্রেড ল্যাটিমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তিনি বললেন যতদিন না একঘেয়ে লাগে ততদিন নিশ্চয়ই তিনি এখানে থাকবেন।

ফেরীঘাট থেকে টমাস আসলেন। তিনি বললেন, রাত্রিতে খাবার পর পায়চারি না করলে তার ঘুম আসে না। তিনি হাঁটতে হাঁটতে ফেরীঘাটে গেছিলেন। এবার ফিরে শুয়ে পড়বেন। হোটেলের দরজা দিয়ে লিফটের সামনে এলেন। লিফটের সামনে নোটিশ ঝুলছে।

লিফটটা বিকল হয়ে গেছে। মিঃ ট্রিভস বললেন তাকে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হবে। টমাস বললেন তার সিঁড়ি ভাঙ্গা উচিত নয় কিন্তু উপায় তো নেই। সিঁড়ি দিয়ে রাস্তায় ট্রিভস বেরিয়ে গেলেন। টমাসও রাস্তায় বেরিয়ে গেল। দুজনে দুদিকে যাবে। টমাস গাল পয়েন্টের দিকে যাবে আর ট্রেড ফেরীঘাটের দিকে যাবে।

মেরী বললো, ঠিক যেন গ্রীষ্মকাল। মেরী আর অড্রে ইটারহেড হোটেলের সামনে বসেছিলো। ওপারে গালস পয়েন্ট লেভি ট্রেসিলিয়ানের বাড়ি। কো জলে নামল না। সে মেরীর পাশে এসে বসল, বললো ভীষণ ঠাণ্ডা। ট্রেড ল্যাটিমার তার পিছনে এসে দাঁড়াল, সে জলে নামবে না। কো বললো যে, সে জলে নামে না খালি পাড়ে বসে রোদ পোহায়। কো ট্রেডের সঙ্গে ঘুরতে চাইল। তারা চলে যেতে মেরী বললো যে দুটোকে বেশ মানায়। কিন্তু কেন যে লেভিল তাদের মধ্যে এল। অড্রের মতে তাদের মানিয়েছে। অড্রের কথা শুনে মেরী মনে করল সে নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্যই এই কথাটা বলছে। অড্রের আগে লেভিলের জন্য কষ্ট হত এখন আর হয় না। অড্রে গরম কাপড় পরার জন্য ভেতরে গেল।

মেরী বসে ভাবছিল। ট্রেড হঠাৎ ফিরে এসে তার পেছনে দাঁড়িয়েছেন সে এসে কো-র কথা জিজ্ঞেস করল। মেরীর মনে হল কো-কে লেভিল বিয়ে করেছে দেখে ট্রেডের মনে কোন দুঃখ আছে। ট্রেডের হয়তো এ জায়গাটা ভালো লাগছে না। ট্রেড আসলে কোর বন্ধু বলে তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। আসলে পাছে কো কিছু মনে করে তাই তাকে কাছে টানা হয়েছে। মেরীর ভীষণ খারাপ লাগছিল। তার নিজের জন্য নয়, ট্রেডের জন্য তার সমবেদনা জাগছিল।

ট্রেড তাকে জানাল যে, তাকে কো ভালোবাসত কিন্তু তা লেভিলকে দেখার আগে। তারপরও সে ভালোবাসে কো-কে। মেরী তাকে এখান থেকে চলে যেতে বললো। কেননা চলে না গেলে দুঃখের বোঝা আরও বাড়বে। ট্রেড শুনে বললো যে, তাকে তিনি চেনেন না। নীরবে নতমুখে সব কিছুকে মেনে নেওয়া তার স্বভাব নয়। খুব শিগগির হয়তো নতুন কিছু ঘটতে পারে। মেরী তার কথা বুঝতে পারল না। ট্রেড তাকে অপেক্ষা করতে বললো।

.

৩.৪

ইটারহেড হোটেলের সামনে বেলাভূমির উপর টমাস রয়েড বসে ছিল। একটু আগে মেরী আর ট্রেন্ড সেখানে বসে গল্প করছিল। অড্রে এসে টমাসের পাশে বসল। তাদের মধ্যে প্রথম অড্রেই কথা বললো। সে জিজ্ঞাসা করল গালস পয়েন্ট এখান থেকে কত কাছে?

অড্রে সাঁতরে পার হতে চেয়েছিল। অড্রে জানালা দিয়ে দেখেছে স্রোতের ওদিকে পাহাড় থেকে একটা লোক ঝাঁপ দিয়ে মরতে চেয়েছিল। কিন্তু মরতে পারেনি। গাছের ডালে আটকে গেছিল। কাগজে সেইরকম পড়েছে। মানুষ কেন আত্মহত্যা করে এই প্রশ্নে অড্রে জানাল যে বাঁচতে ভালো লাগে না।

টমাস অড্রের দিকে তাকাল। চুপচাপ সে অড্রেকে দেখছিল। তার সৌন্দৰ্য্য এখনও ম্লান হয়নি। আসলে অড্রের চেহারায় এমন ম্লান বিষণ্ণতা আছে যে তাকে সুন্দর দেখায়। উচ্ছ্বসিত সৌন্দর্য্যের থেকে যার আকর্ষণ বেশী। অড্রের কানবালাটা টমাস কুড়িয়ে পেয়েছিল। সেটা তাকে দিল। তার কানে একটা খুঁত আছে বলে বোধহয় সে অতবড় কানলাবাটা পড়ে। সে আসলে সব ব্যাপারেই নিখুঁত। পোশাকে, কথায়, আবরণে। অড্রে মনে করে কো-র চেহারা তার থেকে সুন্দর। টমাস বললো, সে তো বাইরে।

অড্রে বললো যে, সে তাকে ভালোবাসত বলে বিয়ে করেছিল।

অড্রে বললো, তার কোন সুখ নেই।

তোমাকে বাঁচতে হবে অড্রে। সেই জন্যই সামনের দিকে তাকাতে হবে।

টমাসকে সে বললো, লেভিলকে সে কি ঈর্ষা করে?

টমাস বললো, হা করে, সে তাকে ভালোবাসত এবং বিয়ে হল তার লেভিলের সাথে। এক্ষেত্রে ঈর্ষা যদি না করে তাহলে অস্বাভাবিক ব্যাপার হত।

অড্রে বললো যে, সে তার ভালোবাসার যোগ্য নয়। সে এখন বদলে গেছে।

টিলার ধারে উবু হয়ে লেভিল কি করছিল। অড্রে উঠে সেখানে যেতে তার সাথে লেভিলের দেখা হল।

অড্রে বললো, তার বউ তাকে ডাকছে।

লেভিল বললো, বউ বলতে সে তাকেই বোঝে।

 

ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

৩.৫

গালস পয়েন্টে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। মেরী উপরে গেল। পিসীমা জানালেন মিঃ ট্রিভস মারা গেছেন।

মেরী বললো, কখন?

পিসীমা বললেন, তিনি কাল রাত্রিতে মারা গেছেন। তিনি তেমন কিছু খাননি। রান্না সাদামাটা হয়েছিল। মিসেস রজার্সকে গিয়ে জিজ্ঞেসা করেন যে কিছু করতে হবে কিনা। কারণ তিনি এবং তার পিসেমশাই খুব বন্ধু ছিল।

মেরী তার পিসীমার কথা শুনে লেভিল ও টমাসকে জানালেন। তারা এ খবরে চমকে উঠল। টমাসের মতে রাত্রিতে লিফট খারাপ থাকায় তিনি হার্টের রুগী সিঁড়ি বাইতে পারেননি, যার জন্য তার মৃত্যু হয়।

মেরী টমাসকে নিয়ে ব্যালমোরাল কোর্টে ঢুকতে গেলেন। সেখানে হোটেলের কত্রী রজার্স হোটেলের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে স্থানীয় ডাক্তার ল্যাজনবি দাঁড়িয়ে ছিলেন।

মেরী বললেন, তিনি গালস পয়েন্ট থেকে আসছেন। মিঃ ট্রিভস তার পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। মিসেস রজার্স তাদের ভেতরে যেতে বললেন।

ডাক্তার তাদের জিজ্ঞাসা করলেন মিঃ ট্রিভস গতরাতে কেমন ছিলেন।

মেরী বললেন তিনি হঠাৎ এভাবে মারা যাবেন এটা কেউ বুঝতে পারেননি।

ল্যাজনবি বললেন, তার ঘরের প্রেসক্রিপশন দেখে মনে হয় তার হার্ট খুব দূর্বল ছিল।

মিসেস রজার্স বললেন তিনি সবসময়েই সতর্ক থাকতেন, পরিশ্রমের কাজ করতেন না।

ডাক্তারকে জানান হলো যে, মিঃ ট্রিভস রাতে অনেক সিঁড়ি ভেঙ্গেছেন তার জন্য তার হার্ট অ্যাটাকে হয়তো মৃত্যু হয়েছে কেননা যা তার হার্টের পক্ষে ভালো ছিল না।

ডাক্তারকে রজার্স বললেন লিফট ভালোই আছে।

রজার্স টমাসকে বললেন যে লিফট রাত্রিতে চালু ছিল না। তিনি আর মিঃ ল্যাটিমার তার সাক্ষী। কাল রাত্রিতে হোটেলের চত্বরে ট্রিভসের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। সেখানে লিফট বিকল হওয়ায় একটা নোটিশ ঝোলানো ছিল, তাই তাকে সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে উঠতে হয়েছিল।

মিঃ রজার্স বললেন যে লিফট খারাপ হলে তাদের নোটিশ দিয়ে জানানো হয়। কিন্তু নোটিশ তো লাগানো হয়নি, যদি কেউ লাগিয়ে থাকে তাহলে সে খুলে নিল কেন? কেননা তিনি সকালে উঠে নোটিশ দেখতে পাননি।

ডঃ ল্যাজনবি বললো, মজা করার জন্য কেউ হয়তো টাঙ্গিয়ে রেখেছিল, তারপর আবার খুলে নিয়েছে। কিন্তু তার রসিকতায় কারো যে মৃত্যু হতে পারে এটা সে ভাবেনি। মিঃ ট্রিভসের সোফারের কাছে এক আত্মীয়ের ঠিকানা পাওয়া গেছে। তাকে একটা খবর পাঠাতে হবে। মেরী ও টমাস উঠে পড়ল। মেরি বললো যে, নোটিশটা সে দেখেছিল কি?

ল্যাটিমার বললো, হ্যাঁ, সে দেখেছিল। তারা দুজনে হাঁটতে লাগল।

.

৩.৬

মেরী বললো, আর মাত্র দুদিন–টমান তার দিকে তাকাল।

সে বললো, অতিথিরা বিদায় নিলে বাঁচা যায়।

মেরী বললো, সে বড়ই অস্বস্তি বোধ করেছে। অথচ লেভিল এলে আমরা সুখী হই। অড্রে এলেও আমাদের ভালো লাগে। অথচ এবারে ওদেরকে দেখে মনে হচ্ছে বোমার ওপর বসে আছি আমরা আর সেই বোমাটা যে কোন মুহূর্তে ফাটতে পারে।

টমাস প্রশ্ন করল অড্রে বুধবার এখান থেকে চলে যাবে?

লেভিলরা বৃহস্পতিবার যাবে আর তিনি যাবেন শুক্রবারে। মেরী বললো, টমাস আছে বলে সে ভরসা পাচ্ছে।

টমাস বললো, এরা একই সঙ্গে থাকার পর একটা অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। ওপরকার ভদ্রতাটা যদি এরা বজায় রাখতে না পারে তাহলে একটা ঝগড়া লেগে যাবে।

মেরী বললো, তার ঝি চাকর রাধুনী কেউ কাজ করতে চাইছে না। এর কি কারণ তিনি জানেন না। তবে লেভিল যদি এমন পাগলামি না করত তাহলে এসব কিছুই হতো না। লেভিল চেয়েছিল অড্রের সঙ্গে কোর বন্ধুত্ব করিয়ে দিতে। কো সহ্য করতে পারে না অড্রেকে। সে মনে করে লেভিল নিজের সুখটাকে বড় করে দেখে। অড্রেকে ছেড়ে দিয়ে যদি অনুতপ্ত হয় তাহলে অড্রেকে ছেড়ে দেওয়া তার উচিত হয়নি।

টমাস মনে করে লেভিল কো-কে ছেড়ে যদি অড্রের দিকে হাত বাড়ায় তাহলে কো ছেড়ে দেবে না। কো ভীষণ জেদী মেয়ে। মেরীও এই আশঙ্কা করছিল।

টমাস চলে যেতে লেভিল মেরীকে বললো, টমাস মনে হয় আমাকে পছন্দ করে না।

মেরী বললো, সে চাপা স্বভাবের মানুষ। তবে ওর মন সাদা। সঙ্গে এও বললো সহ্য না করার যথেষ্ট কারণ আছে, অড্রেকে সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। লেভিল তাকে তার কাছ থেকে প্রায় ছিনিয়েই নিয়েছে। টমাস ভেবেছিল যে, সে বেহায়ার মত তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব তুলবে না, টমাস বিয়ের প্রস্তাব তুলছিল না দেখে অভ্রের সারাজীবন বিয়ে হতো না। অড্রে টমাসকে বিয়ে করবে কিনা জানিনা। অড্রের আর টমাসের চরিত্র একেবারে আলাদা। অড্রে তা জানে। আর জানে বলেই অড্রের পক্ষে টমাসকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। অড্রের হয়ত আদৌ কাউকে বিয়ে করবার কথা এখন ভাবছে না। তার বোধহয় একা থাকতেই ভালো লাগছে।

লেভিল বুঝলো অড্রেকে ছেড়ে সে খুব ভুল করেছে।

মেরী বুঝল এখানে তার থাকা উচিত নয়।

লেভিল বাগানে ঘুরছিল। ঘুরতে ঘুরতে নদীর ধারে অড্রের সঙ্গে দেখা হল। অড্রে বাইরে থেকে ভেতরে যেতে চাইল। সেখানে একটু ঘুরে বেড়াতে চাইল। লেভিল অড্রেকে একটা কথা বলতে চাইল। অড্রে তা শুনতে চাইল না কারণ সে জানে সেকি বলবে। লেভিল সবকিছুকে ভুলে গিয়ে তার আগের জীবনকে ফিরে পেতে চায়।

অড্রে জিজ্ঞাসা করলো কো-কে ভুলে যেতে চায় কিনা।

লেভিল বললো, কো-কেসবকিছু বোঝালে নিশ্চয়ই সব বুঝবে। তাকে সে মুক্তি দিতে চায়।

অড্রে বললো, তাকে তো সে ভালোবেসেই বিয়ে করছে, তবে কেন সে মুক্তি পেতে চায়?

লেভিল বললো, সে ভুল করেছে, সেই ভুলটাকে শুধরে নিতে চায়।

বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ কো এলো, তার চোখে জ্বলন্ত ছবি। সে বললো, তার যা ক্ষতি করার সে করে দিয়েছে। পরে তা নিয়ে সে অড্রের সঙ্গে বোঝাপড়া করবে। এখন লেভিলের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চায়।

তাদের মধ্যে কোন বোঝাপড়া যদি হতেই হয় তাহলে তারা নিজেরাই করবে এতে অড্রেকে টেনে আনার দরকার কি?

অড্রে চলে যেতে চাইছিল, কো অনেক গালাগালি করছিল, সে বললো যে, আমাকে তুমি ভালোবেসেছিলে তার জন্য তাকে তার আগের স্ত্রী সহ্য করতে পারে না। লেভিলের মুখ সাদা হয়ে গেছিল, সে বললো, সত্যিই কো আবার অন্যায় করেছে। তার ভুল যা হবার তা হয়েছে। সেই ভুলের জের টেনে চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ক্ষতি যা হবার তা হয়েছে, সে মুক্তি চায়।

লেভিল বললো যে, তার জন্য তিনবছর অপেক্ষা করতে হবে। তারপর তাকে ডিভোর্স করবে।

কো বললো, হ্যাঁ, তারপরে আবার অড্রের কাছে ফিরে যাবে। কিন্তু আমার কি হবে।

লেভিল বললো, তার চেয়ে ভালো কাউকে সে বিয়ে করবে। টাকার জন্য চিন্তা করতে হবে না। যতটাকা চাইবে, তত দেওয়া হবে।

কো বললো, ঘুষ দিয়ে বিদায় করতে চাও। সে দুজনকেই খুন করবে।

লেভিল কো-কে ধরলো, চাপা গলায় তাকে চুপ করতে বললো, আর বললো, সে নিজের বাড়িতে যাই করুক, এখানে সে যেন পাগলামি না করে।

সেই মুহূর্তে তাদের চা খাবার জন্য ডাকা হল।

 

ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

৩.৭

লেভিল ইন্টারহেড হোটেলে ল্যাটিমার-এর সঙ্গে বিলিয়াড খেলতে যেতে চাইল। কো উপরে শুতে গেল। ড্রইংরুমে ফাঁকা হয়ে গেল। লেভিল বর্ষাতি পরে ফেরীঘাট দিয়ে হোটেলে যাওয়া ঠিক করল।

লেডি লেভিলকে বললেন, কারও ব্যক্তিগত কথাবার্তা শুনতে তার ইচ্ছে নেই। কিন্তু তুমি আর তোমার বউ যদি আমার ঘরের জানালার ঠিক নীচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তোমাদের ব্যক্তিগত জীবনের কথাবার্তা বল, তাহলে তা না শুনেও আমার উপায় থাকে না। আজ বিকালে বাগানে দাঁড়িয়ে যেসব কথাবার্তা তোমরা বলেছো এখান থেকেই তা আমি শুনেছি, বুঝতেও পেরেছি। তুমি চাও কো তোমায় ডিভোর্স করুক। তারপর তুমি অড্রেকে বিয়ে করবে।

লেভিল সব শুনে শান্ত গলায় বললো, চেঁচিয়ে ঝগড়া করা আমাদের উচিত হয়নি। তার জন্য তিনি ক্ষমা চাইছেন কিন্তু অড্রেকে বিয়ে করা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। লেভিল এ বিষয়ে অড্রেকে দোষী করতে চায় না।

লেভি মনে করেন তারা উভয়ে অন্যায়ের সুযোগ নিয়েছে। কো তার স্ত্রী, তার দাবী আছে সে যেন তার দাবীগুলি মেটাতে পারে এটা লেভি মনে করেন। তার সম্পর্কে যে কর্তব্যগুলো আছে সেগুলি অবশ্য পালনীয়। লেভি ট্রেসিলিয়ান মনে করেন ব্যাপারটা যদি না তার বাড়ির মধ্যে না ঘটতো তাহলে তিনি মাথা গলাতেন না।

অড্রেকে তিনি তার বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতে চান। লেভিল তাকে বাধা দিল। কিন্তু লেভি তাকে চলে যেতে বললেন।

বারান্দার ওদিকে কোন ঘরে কো দরজা বন্ধ করল।

.

৩.৮

গালস পয়েন্টে ঝিদের কাজের গুরুত্ব অনুযায়ী মর্যাদার তারতম্য আছে। অ্যালিস, যে ব্যারেটের ঘরে চা পৌঁছে দেয়। আজ ব্যারেটকে অনেক ডাকার পরেও সে এলো না।

মিসেস স্পাইসার ট্রের উপর সবকিছু সাজিয়ে দিতে সে চা নিয়ে উপরের ঘরে গেল। দরজা ভেজানো বলে টোকা দিল অ্যানিস। দরজায় কোন সাড়া না পেয়ে ঠেলে ঢুকলো। যা দেখলো তাতে সে ভয় পেয়ে গেল। সে ছুটতে ছুটতে বাইরে এলো। সে চেঁচিয়ে উঠে জানাল সারাঘর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কর্তামা (লেভি ট্রেসিলিয়ান) খুন হয়েছেন।

.

আমাদের আরও পোষ্ট দেখুনঃ

cropped Bangla Gurukul Logo ক্লাবের এক কোণে -টু ওয়ার্ডস জিরো ( আগাথা ক্রিস্টির অন্যান্য উপন্যাস ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]

মন্তব্য করুন