কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]

কথা বলার পর

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

একবিংশ পরিচ্ছেদ

০১.

একঘন্টা পরে অনেকের সাথে কথা বলার পর অ্যান্টহুইসল এরকুল পোয়ারোর সাথে কথা বলছিলেন।

মিঃ অ্যান্টহুইসল বললেন : কিছু ঘটেছে?

হা, মিসেস লিও এবারেনথীকে ওদের বাড়ির কাছের লোক কুড়ি মিনিট আগে ফোনের কাছে অচেতন অবস্থায় দেখেছে। মাথায় একটা গুরুতর আঘাত।

মাথায় আঘাত?

হতে পারে পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন, তবে আমার তা মনে হয় না। ও সেই মুহূর্তে আমাকে ফোন করছিল, হঠাৎ লাইনটা কেটে গেল।

তাহলে তোমাকে ও ফোন করেছিল, কি বলছিল? কিছুদিন আগে ও আমায় বলেছিল, যে অন্ত্যেষ্টির দিন কোরা যখন তার ভাইয়ের খুন হওয়ার কথা বলেছিল তখন কিছু একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার লক্ষ্য করেছিল। তখন তার মনে পড়েনি।

এখন তার হঠাৎ মনে পড়েছে?

হুঁ।

সেটা বলার জন্য তোমায় ফোন করেছিল?

হা, সে আমায় বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু হঠাৎ বাধা পায়।

মিঃ অ্যান্টহুইসল বললেন : ওর জ্ঞান না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। গম্ভীরভাবে পোয়ারো বলল : সে আশা নাও করতে পারেন।

কিন্তু পোয়ারো, হেলেনের কি হবে? এণ্ডারবি ওর পক্ষে নিরাপদ জায়গা নয়।

না এণ্ডারবিতে সে নেই। ওকে নার্সিংহোমে পাঠানো হয়েছে, যেখানে আত্মীয় বা কোনো লোককেই ঢুকতে দেওয়া হবে না।

একটু পরে আবার পোয়ারোর গলা শোনা গেল। আমায় নিশ্চিত হতে হবে যে অন্য কেউ শুনছে না। যাক, তোমাকে কোথাও যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে।

যাওয়া? অ্যান্টহুইসলের গলায় হতাশা, এণ্ডারবিতে যেতে বলছো?

না না, তোমায় লণ্ডনের বেশি দূরে যেতে হবে না। মানসিক চিকিৎসালয়ে ডাঃ পেনরিথের সাথে দেখা করে সদ্য ছাড়া পাওয়া একজন রুগীর ব্যাপারে খোঁজখবর নেবে।

রুগীটা কে?

রুগীর নাম গ্রেগরী ব্যাঙ্কস, খোঁজ করে দেখবে কি ধরনের মানসিক রোগে ও ভুগছিল।

সাবধানে থাকো পোয়ারো।

নিশ্চয়ই, আমি আমার মাথায় বাড়ি খেতে চাই না। আমি সব সাবধানতা নিচ্ছি, চলি।

অন্য প্রান্তে রিসিভার রাখার শব্দ শুনতে পেল পোয়ারো, তারপর সে একটা মৃদু আওয়াজ পেল।

সে তাড়াতাড়ি হলে গেল কাউকে দেখতে পেল না। শব্দ না করে সে সিঁড়ির পেছনে কাপবোর্ডটার কাছে গিয়ে ভেতরটা দেখল। সেই মুহূর্তে একটা ট্রেতে করে ল্যান্সকম্ব টোস্ট আর কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল। পোয়ারোকে কাপবোর্ড থেকে বেরোতে দেখে অবাক হল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকল পোয়ারো। ওর পেছনের দিকটা ল্যান্সকম্ব বিরক্ত দৃষ্টিতে দেখতে লাগল।

বাড়িতে বিদেশী, ল্যান্সকম্বের মনে তিক্ত ভাবনা। মিসেস লিওর মাথায় মারাত্মক আঘাত। জানি না আর কি ঘটবে?

জ্যানেটকে পোয়ারো ঘটনাটার কথা জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল : আমি স্টাডির দরজা খুললাম এবং হুভারের সাথে ভেতরে ঢুকলাম। তারপরেই দৃশ্যটা দেখলাম। পড়ে আছেন তিনি, আমি ভেবেছিলাম মারা গেছেন। ভাবছিলাম এত সকালে ফোন করতে এলেন কেন, যা কোনোদিন করেন না।

কেউ উঠেছিল মনে হয়?

না না মিসেস্ টিমোথি উঠেছিলেন, বরাবরই খুব সকালে ওঠেন। ব্রেকফাস্টের আগে বেড়িয়ে আসেন।

মড উঠে পড়েছিল, আর তরুণ তরুণীরা তখনও ঘুমোচ্ছিল। এমনও তো হতে পারে ওদের মধ্যে কেউ কাজটা শেষ করে আবার শুয়ে পড়েছিল।

পোয়ারো ভাবল, যদি আমি ঠিক হই। তবে প্রায়ই আমার ভাবনা ঠিক হয়। তাহলে কে উঠেছিল বা শুয়েছিল ভেবে কাজ হবে না। প্রথমে আমি প্রমাণ খুঁজব। তারপরে আমি একটা ছোট্ট বক্তৃতা করে দেখব কি ঘটে।

পোয়ারো ফোন করল, শোন অ্যান্টহুইসল, আমি যে কাজটা তোমায় দিলাম সেটার কথা ভুলে যাও। কেউ শুনেছে সে কথা? এবার আসল কাজের কথা বলছি। তুমি এবার ট্রেনে করে টিমোথি এবারেনথীর বাড়ি চলে যাও।

কিন্তু টিমোথি আর মড তো এণ্ডারবিতে আছে। হ্যাঁ ঠিক বলেছ, এখনও বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য জোনস নামে একজন মেয়ে আছে। তোমাকে ঐ বাড়ি থেকে একটা জিনিস আনতে হবে।

তা হয়ত হবে। কিন্তু তুমি নিজে গিয়ে তো নিয়ে আসতে পার?

তা সম্ভব নয়, আমি একে অচেনা তারপরে বিদেশী। ওর সন্দেহ হবে।

তোমাকে সন্দেহ করবে না।

কি জিনিস?

ওকে পোয়ারো বলে দিল।

কি করব ওটা নিয়ে?

তুমি ওটা লণ্ডনের এলম গার্ডেনেসে নিয়ে যাবে। ঠিকানাটা নিয়ে নাও।

হেলেনের কি বলার ছিল জানা যেত!

পরে ব্যাখ্যা করব। তবে আমি নিশ্চিত, হেলেন আয়নায় কি দেখেছিল?

.

০২.

ব্রেকফাস্টের আবহাওয়া ভারী। টিমোথি আর রোজামণ্ড ছাড়া সবাই উপস্থিত থাকলেও কেউ খেতে পারল না।

জর্জ বলল, আশা করি আন্ট হেলেন ভালো হয়ে উঠবেন। ডাক্তাররা সব ব্যাপারেই মুখ লম্বা করে।

সুসান বলল, অত সকালে আন্ট হেলেন কাকে ফোন করছিলেন?

মড বলল, বোধহয় অসুস্থ বোধ করে ডাক্তারকে ফোন করছিলেন।

রোজামণ্ড বিরক্ত মুখে ঘরে ঢুকল।

আমি মোমের ফুলগুলো দেখতে পাচ্ছি না। সেগুলো আঙ্কল রিচার্ডের অন্ত্যেষ্টির দিন টেবিলের উপর ছিল। সুসান বলল, তুমি মোমের ফুলের কথা ভাবছ আন্ট মারাত্মক আঘাত নিয়ে নার্সিংহোমে শুয়ে আছে।

ওগুলো সম্বন্ধে ভাবব না কেন? আমি আর মাইকেল কালই চলে যাচ্ছি।

সেই মুহূর্তে ল্যান্সকম্ব ঢুকল।

জর্জ উঠে পড়ে বলল, আমাদের হয়ে গেছে, ল্যান্সকম্ব আমাদের বিদেশী বন্ধু কোথায়?

উপরে ওর ঘরে কফি আর টোস্ট খাচ্ছেন। রোজামণ্ড জিজ্ঞেস করল, ল্যান্সকম্ব তুমি জান মোমের ফুলগুলো কোথায় গেল?

মিসেস লিও অসাবধানে ভেঙে ফেলেছেন।

ও এই ব্যাপার।

ওগুলো বোধহয় সিঁড়ির পেছনে কাপবোর্ডটাতে আছে।

আমি গিয়ে দেখছি, মাইকেল চল না। আমার অন্ধকার কোণে যেতে ভয় করছে। আন্ট হেলেনের ঐ অবস্থা হওয়ার পর থেকে….

মড গম্ভীর গলায় বলল : তুমি কি বলতে চাইছ রোজামণ্ড?

ওর মাথায় কেউ বাড়ি মেরেছে তাই না?

তীক্ষ্ণস্বরে গ্রেগরী ব্যাঙ্কস বলল : তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে গেছেন। রোজামণ্ড হাসল।

তোমাকে উনি বলেছেন? ওকে নিশ্চয়ই মারা হয়েছে। জর্জ বলল : রোজামণ্ড তুমি এমনভাবে কথা বোল না।

না না সবই চক্রান্ত, রোজামণ্ড বলল। বাড়িতে একজন রহস্যসন্ধানী সূত্র খুঁজে বেড়াতেন। রিচার্ড এবারেনথীকে বিষ দেওয়া হয়েছে, আন্ট কোরাকে কুড়ুল দিয়ে মারা হল। মিস গিলক্রিস্টকে ওয়েডিং কেকের মধ্যে বিষ দিল কেউ, আন্ট হেলেনের মাথায় কেউ বাড়ি দিয়ে মারল। সব কিছুর মধ্যে একটা সংযোগ আছে। আমরা কোনোদিন মারা পড়তে পারি।

 

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

সুন্দরী রোজামণ্ড তোমায় কেউ মারবে কেন? জর্জ জিজ্ঞেস করল।

চোখ বড় বড় করল রোজামণ্ড।

কারণ আমি অনেক কিছু জানি। সে বলল।

কি জান? মড আর গ্রেগরী জিজ্ঞেস করল।

ভাবশূন্য হাসি হাসল রোজামণ্ড। আপনারা সবাই জানতে চান না? সে বলল, চল মাইকেল।

.

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

০১.

পোয়ারো এগারটার সময় লাইব্রেরী ঘরে একটা মিটিং ডাকল। সবাই উপস্থিত ছিল। পোয়ারো সবার মুখে একবার করে চোখ বোলালো।

গতরাতে আরম্ভ করলেন তিনি, মিসেস্ যেন আমায় ছদ্মবেশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। যদিও ছদ্মবেশটা আর দুএকদিন দরকার ছিল। যাই হোক দুএক দিনের মধ্যে আপনাদের আমি কয়েকটা কথা বলব। আপনারা মন দিয়ে শুনুন, আমি মিঃ অ্যান্টহুইসলের অনেক দিনের বন্ধু। তিনি তার পুরোন বন্ধু রিচার্ডের হঠাৎ মৃত্যুতে খুব আঘাত পেয়েছিলেন। তিনি রিচার্ডের বোন কোরার কয়েকটা কথার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিল।

কোরার কথায় বিশ্বাস করে খুব বোকামো করেছেন। মড বললো।

বলতে লাগলেন পোয়ারো : মিঃ অ্যান্টহুইসল কোরার মৃত্যুতে আরও অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন এটা একটা দুর্ঘটনা এবং রিচার্ডর মৃত্যুটা স্বাভাবিক। সেই জন্যই তিনি আমাকে এটা ভার দিয়েছেন অনুসন্ধান করার জন্য। আমি অনুসন্ধান করেছি।

পেছন দিকে মাথা নিয়ে পোয়ারো বললেন : আপনারা শুনে খুশী হবেন যে মিঃ রিচার্ড এবারেনথীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। খুব সন্দেহ করার মত কোনো কারণই নেই।

তবে ওদের মুখ দেখে মনে হল না এটা একটা ভালো খবর।

ব্যতিক্রম হলো টিমোথি। তিনি একমত হয়ে ঘাড় নাড়ছিলেন।

নিশ্চয়ই রিচার্ডকে মারা হয়নি। কি করে সবাই খুনের কথা ভাবছিল কে জানে? কোরা আমার বোন হলেও বলছি কোরার মাথাটা একটু খারাপ ছিল। মিঃ পোয়ারো আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি ব্যাপারটার একটা সুরাহা করেছেন।

টিমোথি বলল, আজ সকালের আন্ট হেলেনের ব্যাপারটা কি?

মড বলল, হেলেনের বয়স হয়েছিল, স্টোক হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু ও ডাক্তারকে ফোন করেনি, রোজামণ্ড বলল, আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছি–

তবে কাকে ফোন করেছিল?

সুসান জিজ্ঞেস করল।

আমি জানি না। তবে আমি খুঁজে বের করব।

.

০২.

ভিক্টোরিয়ান গ্রীষ্মবাসে বসেছিলেন এরকুল পোয়ারো। প্রথমে গিলফ্রিস্ট এল। কেমন যেন বিশৃঙ্খলা। মিঃ পনটার্নিয়ার আপনার নামটা আমার মনে থাকে না, সে বলল। যাই হোক আমি না এসে পারলাম না মিসেস যেন, ঠিক বলছেন সবই পরিকল্পিত। স্টোকও হতে পারে না। মিসেস লিও এই অবস্থার পর আমি না এসে থাকতে পারলাম না।

পোয়ারোর দিকে সে অনুনয়ের দৃষ্টিতে তাকাল। বল, তুমি যেন কি বলবে বলছিলে? পোয়ারো বলল। আমার বলার ইচ্ছে ছিল না, কারণ তিনি খুব দয়ালু। টিমোথিদের বাড়িতে আমার কাজ ঠিক করে দিয়েছিল। সেইজন্যই অকৃতজ্ঞ মনে হচ্ছে। মিসেস ল্যান্স কোয়েনেট আমাকে একটা ভালো জ্যাকেটও দিয়েছিল।

তুমি মিসেস ব্যাঙ্কসের কথা বলছ?

হ্যাঁ, আমি শুনেছি।

তুমি বলছ কোনো কথাবার্তা আড়াল থেকে শুনেছ?

না না আমি আড়াল থেকে কিছু শুনি না। তবে মিঃ রিচার্ড এবারেনথী যখন ওর বোনের কাছে গেছিল তখন শুনেছি। আমি জানি না মানুষের যখন আর বেশিদিন আয়ু থাকে না তখন মানুষ কেন এসব করতে চায়।

কি শুনেছিলে?

হা, তিনি বলেছিলেন, টিমোথির সাথে কথা বলে কোনো লাভ নেই। সে সবকিছু উড়িয়ে দেয়। কিছুই শুনল না। আমি ভাবলাম আমি তোমার কাছে বুকটা খালি করব। আমরা তিনজন মাত্র বেঁচে আছি! তুমি বোকার ভাব করলেও তোমার সাধারণ বুদ্ধি বেশ ভালো, তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে কি করতে?

আমি কোরার কথা ঠিকমত শুনতে পাইনি, তবে মনে হয় পুলিশ কথাটা শুনেছিল, এরপর মিঃ এবারেনথী জোরে হেসে উঠে বললেন, আমি তা করতে পারি না। কারণ এটা আমার নিজের ভাগ্নীর ব্যাপার। তারপর আমাকে রান্না ঘরে চলে যেতে হয়। যখন ফিরলাম তখন রিচার্ড বলছিলেন, যদি আমি অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করি তবুও চাই না পুলিশ ডাকা হোক, বুঝতে পারলে বোন, তবে ঘাবড়িয়ো না, এবার থেকে আমি সমস্ত সাবধানতা নেব।

আবার তিনি বললেন, তিনি একটা নতুন উইল করবেন যাতে কোরাকে ভাগ দেওয়া হয়, তিনি আরও বলেছিলেন কোরার প্রতি অন্যায় করে তিনি ভুল করেছেন।

পোয়ারো বললেন, ও তাই নাকি?

আমি বলতে চাইনি, কিন্তু আজ সকালে মিসেস লিওকে কেউ আঘাত করল, আর আপনিও বললেন, এটা দুর্ঘটনা, আমি আর থাকতে পারলাম না।

.

০৩.

গিলফ্রিস্ট বিদায় নিলে গ্রেগরী ব্যাঙ্কস এল পোয়ারোর কাছে।

অবশেষে! ওঃ ভেবেছিলাম মেয়েটা আর যাবেই না। আপনি সকালে যতকিছু বলেছেন সবই ভুল। আঙ্কল রিচার্ডকে খুন করা হয়েছে।

তাহলে ওকে তুমি মেরেছ? কি করে?

গ্রেগরী হেসে বলল, আমার পক্ষে ওটা শক্ত কাজ ছিল না, আমার পনের কুড়িটা ওষুধ জানা আছে যাতে কাজ হয় এবং মৃত্যুর সময় আমাকে বাড়ির ধারে কাছেও থাকতে হয়নি।

পোয়ারো বলল, কেন ওকে মারলে? তোমার স্ত্রী কিছু টাকা পাবে বলে?

আমি টাকার পিচাশ নই। টাকার লোভে আমি সুসানকে বিয়ে করিনি।

হঠাৎ গ্রেগ তিক্ততার সাথে বলল, রিচার্ড এবারেনথী। তিনি সুসানের প্রশংসা করতেন। ওর মধ্যে এবারেনথীদের রক্ত আছে সেই বলে গর্ব করতেন। উনি মনে করতেন আমি ওর যোগ্য নই। তিনি আমার প্রতি অন্যায় আচরণ করতেন।

হতে পারে।

কেউ আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে পেরোতে পারবে। আপনি জানেন একজন ভদ্রমহিলা আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন বলে ওকে কি করেছিলাম?

জানি, পোয়ারো বলল।

মৃত্যুমুখে পৌঁছে দিয়েছিলাম, সন্তুষ্টির সাথে গ্রেগ বলছিল, রিচার্ড এবারেনথীও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন আর সেই জন্যই মরেছেন।

আমার কাছে বলছ কেন?

কারণ আপনি বললেন এটা খুন নয়। প্রমাণ করতে চাই আপনি যতটা বুদ্ধিমান ভাবেন ততটা বুদ্ধিমান নন– তাছাড়া তাছাড়া।

বল বল, তাছাড়া?

আমার–আমার শাস্তি পাওয়া উচিত, আমার শাস্তির ব্যবস্থা করুন…?

 

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

০৪.

দৌড়তে দৌড়তে সুসান এল।

গ্রেগ কোথায় গেল? এখানেই ছিল তো?

হ্যাঁ, সে আমাকে বলতে এসেছিল যে সে-ই রিচার্ড এবারেনথীকে বিষ দিয়েছে।

পোয়ারো বলল : সব বাজে কথা! ওর কথা বিশ্বাস করবেন না।

কেন বিশ্বাস করব না?

কারণ আঙ্কলের মৃত্যুর সময় সে এখানে ছিল না।

সম্ভবতঃ ছিল না। কোরা ল্যান্স কোয়েনেটের মৃত্যুর সময় ও কোথায় ছিল?

লণ্ডনে আমরা দুজনেই ছিলাম।

পোয়ারো বললেন: তুমি সেদিন বিকেলে গাড়ী নিয়ে বেরিয়েছিলে?

তুমি লীচেট সেন্ট মেরীতে গেছিলে?

না না।

পোয়ারো বলল, ম্যাডাম তদন্তের দিন তুমি কিংস আর্মের গ্যারেজে একজন মেকানিকের সাথে কথা বলছিলে, সেখানে আর একটা গাড়ীতে এক বয়স্ক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি উনাকে না দেখলেও উনি তোমায় দেখলেন। সেই মেকানিক বলেছিল তোমাকে আগে কোথাও দেখেছে। সে বলেছিল তুমি কোরার বোনঝি। তাহলে সেকি তোমাকে কোরার কটেজের আশেপাশে আগে দেখেছিল। তদন্তে দেখা গেছে কোরাকে এবং তোমাকে মৃত্যুর দিন বিকেলে লীচেট সেন্ট মেরীতে দেখা গেছে। তুমি সেই কোয়ারীটাতেই তোমার গাড়ী লুকিয়েছিলে। গাড়ীর নাম্বার নেওয়া হয়েছিল।

মিঃ পোয়ারো আপনি আজে বাজে কথা বলছেন। আমি নিজেই ভুলে যাচ্ছি আমি আপনাকে এখানে পাওয়ার জন্য এসেছিলাম।

তোমার স্বামী নয় তুমি খুনটা করেছ স্বীকার করার জন্য? কোরা অন্ত্যেষ্টির দিন যে কথাটা বলেছিল তাতে আমি চিন্তিত হয়েছিলাম, তাই আমি সেদিন বিকেলে লীচেট সেন্ট মেরীতে গেছিলাম। কোরাকে জিজ্ঞেস করতে কেন সে একথা বলল, আমি ওখানে তিনটের সময় পৌঁছে কড়া নাড়ি। কোনো উত্তর না পেয়ে ভেবেছিলাম। আন্ট কোরা কোথাও বেরিয়ে গেছে। তাই আমি আবার লণ্ডনে ফিরে এলাম। খুনের কথা আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি।

তোমার স্বামী কেন নিজেকে খুনী বলেছে?

কারণ সে-গলা কাঁপছিল সুসানের।

আগ্রহ ভরে সুসান বলতে লাগল।

গ্রেগ টাকা আয় করতে পারত, আঙ্কল রিচার্ডের টাকা আমাদের প্রচণ্ডভাবে দরকার ছিল। আমি ভেবেছিলাম আমরা নিজেদের ল্যাবরেটোরি করতে পারলে গ্রেগের অশান্তভাব কেটে যাবে।

লোককে কিছু দিলে তার সেটা করার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। এতসব পরেও সে একটা জিনিস চায় না?

কি চায় না।

সুসানের স্বামী হতে।

আপনি নিষ্ঠুর, আপনি কি বলছেন এসব?

যেখানে গ্রেগরী ব্যাঙ্কসের প্রশ্ন সেখানেই তুমি বেপরোয়া, টাকা তুমি নিজের জন্য চাওনি তোমার টাকার প্রচণ্ড দরকার ছিল না।

সুসান রাগের মাথায় বেরিয়ে গেল।

আমি আপনাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে এলাম, মাইকেল শেন হাসল।

ওকে পোয়ারো পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

তোমার স্ত্রী একটু অস্বাভাবিক ধরনের, পোয়ারো বলল।

হা, সে সুন্দরী তবে বুদ্ধি-সুদ্ধি একটু কম। হ্যাঁ, চালাকীর ভান করে না। তবে ও জানে সে কি চায়। পোয়ারো বললেন : বেশির ভাগ লোকই এটা জানে না। মাইকেল হাসল, স্যালাটীট টেবিলের ব্যাপারে কী বলছেন?

সম্ভবতঃ পোয়ারো ডাকলেন, তারপরে বললেন, মোমের ফুল।

হা, মোমের ফুল।

মাইকেল হেসে বলল, আপনি একটা অস্বস্তিকর আবহাওয়া দূর করেছেন, আপনাকে ধন্যবাদ।

আচ্ছা, তুমি রিচার্ডকে কেমন বুঝেছিলে।

উনি আমাকে পছন্দ করেননি।

তুমি জানো তদন্ত করা হয়েছে।

আপনার দ্বারা?

শুধু আমার দ্বারা নয়।

আপনি বলছেন পুলিশ এর মধ্যে আছে?

পুলিশ কোরার মৃত্যুটাকে সাধারণ ভাবেনি।

ওরা আমার সম্বন্ধে তদন্ত করছে?

পোয়ারো বললেন : কোরার সমস্ত আত্মীয়দের সম্বন্ধে খোঁজ নিচ্ছে।

আমি সেদিন একজন অস্কার লুইসের সাথে ডিনার খাচ্ছিলাম। একথা রোজামণ্ডকে বলেছি।

কিন্তু বাস্তবে তা তুমি করনি।

আমি সোরেলের সাথে কেন্টে ছিলাম, আমি অনেক মাইল দূর থেকে কুড়ুল দিয়ে কোরাকে খুন করতে পারি না।

মিস ডেইনটন তা বলবেন তো?

বলবেন নিশ্চয়ই।

তুমি ওর সাথে না থাকলেও ও বলবে তুমি ছিলে।

কি বলতে চাইছেন? মাইকেলের মুখ হঠাৎ রক্তের মত লাল হয়ে উঠল।

.

এয়োবিংশ পরিচ্ছেদ

০১.

চত্বরে পায়চারী করছিলেন দুজন লোক।

ইনসপেক্টর মর্টন বললো, আপনি এখানে তদন্ত করছেন। আপনার চোখের সামনে মিসেস লিওর এই অবস্থা হল।

আমার দোষে নয় উনি লণ্ডনের ল-ইয়ার্ডে ফোন করার সময়–পোয়ারো বললেন।

ফোনে কি বলেছিলেন?

খুব সামান্য, তিনি আয়নায় নিজের মুখ দেখছিলেন।

মর্টন পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল : এ দিয়ে কিছু বুঝতে পেরেছেন?

হাঁ, কি বলতে যাচ্ছিল আমি বুঝেছি।

চমৎকার কি বলতে যাচ্ছিল?

মাপ করবেন, আপনি কি রিচার্ডের মৃত্যুর ব্যাপারে তদন্ত করছেন?

অফিসিয়ালি করছি, তবে সন্দেহ করছি মিসেস ল্যান্স কোয়েনেটের মৃত্যুর সাথে যোগ আছে

তারপরে মর্টন বললে, তুমি কাউকে গ্রেপ্তার করেছ নাকি?

না না, এখনও একজনের চলাফেরা সম্বন্ধে আমাদের একটু সন্দেহ হয়েছে।

মিসেস ব্যাঙ্কস?

হা ও সেদিন গাড়ী করে ওখানে গেছিল।

ওকে গাড়ীটা চালাতে দেখা যায়নি?

না।

তারপরে মর্টন আবার বলল, ভদ্রমহিলা খুব চালাক।

বেশি চালাকী করেই খুনীরা ধরা পড়ে। পোয়ারো বললেন, জর্জ ক্রসফিল্ড সম্বন্ধে আর কিছু জানতে পারলে।

আমার কনভেন্টের মাদার সুপিরিয়রের কাছ থেকে একটা অদ্ভুত খবর পেয়েছি। তিনি বললেন ওদের কনভেন্টের দুজন কোরার মৃত্যুর আগের দিন ওরা কটেজে চাঁদা নিতে গেছিল। ওরা কড়া নেড়ে কারুর সাড়া পায়নি। স্বাভাবিক কারণে কোরা গেছিল এণ্ডারবি আর গিলক্রিস্ট গেছিল বোর্নমাউথে বেড়াতে। ঐ নান দুজন বলেছে ওরা কটেজের মধ্যে নিশ্বাসের ও গোঙানীর শব্দ শুনেছে। আমি নিশ্বাস ও গোঙানীর শব্দ বিশ্বাস করি। খুনের বাড়িতে লোকে ওরকম কল্পনা করে নেয়। কেউ কি কটেজে কিছু খুঁজতে গেছিল। সেদিন হয়ত পায়নি, আবার পরের দিন গিয়ে এই কাণ্ডটা করেছে।

 

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

পোয়ারো প্রশ্ন করল।

ঐ নানরা কি আবার এসেছিল?

হ্যাঁ প্রায় একসপ্তাহ পরে এসেছিল, বোধহয় তদন্তের দিন।

বেশ মিলে যাচ্ছে, পোয়ারো বলল।

নানের ব্যাপারে উৎসাহিত হয়ে পড়লেন কেন?

কারণ নানেরা দ্বিতীয়বার যেদিন গেছিল সে দিন বিষাক্ত ওয়েডিং কেক গিলক্রিস্ট পেয়েছিল।

হাস্যকর অনুমান।

আমি হাস্যকর অনুমান করি না। পোয়ারো বললেন।

.

০২.

পোয়ারো দেখলেন রোজামণ্ড একটা বেঞ্চে বসে আছে। তুমি বোধহয় তোমার বোনের কথা ভাবছ, পোয়ারো ওর পাশে বসলো।

রোজামণ্ড বলল, আমি ভেবেছিলাম চলে গেছেন।

আমি ট্রেনটা মিস করলাম।

কেন?

তুমি ভাবছ কোনো কারণে আমি থেকে গেলাম?

তাই মনে হচ্ছে। ট্রেন ধরার ইচ্ছে থাকলে ধরতে পারতেন।

ম্যাডাম আপনি কি জানেন আমি গ্রীষ্মবাসে আপনার প্রত্যশায় বসে ছিলাম।

কেন আপনি সবাইর বিদায় নিয়েছিলেন, লাইব্রেরী হলে।

হ্যাঁ, আমাকে বলার মত তোমার কিছুই নেই।

না, রোজামণ্ড মাথা নাড়ল, আমাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা চিন্তা করতে হবে।

তুমি চিন্তা করছিলে?

হ্যাঁ, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিতে চাই কোনো একটা ব্যাপারে।

তোমার স্বামীর ব্যাপারে।

সেই রকম।

পোয়ারো বলল : ইনসপেক্টর মর্টন এসেছেন সবার বিবৃতি নিতে কোরার মৃত্যুর দিন কে কি করছিল?

সন্তুষ্টির ছাপ রোজামণ্ডের মুখে।

মাইকেল, বেশ জব্দ হবে। ও ভেবেছে আমি জানি না, ও সেদিন সেই মেয়েটার কাছে গেছিল।

কি করে জানলে?

ও যখন মিথ্যে কথা বলে ওর নামে একটা দাগ পড়ে। ও যখন অফিসারের সাথে ডিনার খেতে যাচ্ছে, তখনই বুঝেছিলাম।

ওঃ ভগবান বাঁচিয়েছেন আমাকে, তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়নি।

তারপরে আমি অস্কারকে ফোন করেছিলাম, লোকে যে কেন এইরকম বোকার মত মিথ্যে কথা বলে।

সে খুব বিশ্বাসযোগ্য নয়, স্বামী নয় তো?

না।

তবে তুমি কিছু মনে কর না।

হা, আমি সেইরকম স্বামী পছন্দ করি যাকে সব মেয়ে ছিনিয়ে নিতে চায়।

ধর তোমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিল?

এখন ছিনিয়ে নিতে পারবে না, কারণ টাকা, মাইকেলের কাছে মেয়ের চেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষাটাই বড়। আমিই তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার সিঁড়ি করে দিতে পারি। তারপর বলল : আমায় একটা বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমি সেদিন বাজারে যাইনি মাইকেল বুঝতে পেরেছে, রিজেন্ট পার্ক সম্বন্ধে খুব সন্দেহ।

রিজেন্ট পার্কের ব্যাপারটা কি?

আমি একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম সেদিন। মাইকেলের সন্দেহ আমি কোনো পুরুষ বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছিলাম। রিজেন্ট পার্ক সম্বন্ধেও খুব সন্দিগ্ধ।

তারপরে পোয়ারো বলল : তুমি সুসানকে সবুজ স্যালাটীট টেবিলটা দিয়ে দাও।

রোজামণ্ডের চোখ বড় বড় হল।

কেন? আমার ওটা চাই।

জানি আমি, আমার কাছে তোমার স্বামী থাকবে কিন্তু বেচারা সুসানের ছাড়াছাড়ি হবে স্বামীর সঙ্গে।

আপনি বলতে চাইছেন গ্রেগ আঙ্কল রিচার্ড আর আন্ট কোরাকে খুন করেছে–তাই…।

আমি বিশ্বাস করি না।

তাহলে কে করল?

জর্জ আমি শুনেছি আমার বন্ধুর কাছ থেকে জর্জ টাকার ব্যাপারে একটা বিপদে পড়েছিল। আমি জানি জর্জই সম্পত্তির লোভে করেছে। সন্ধ্যে ছটার সময় সেদিন টেলিগ্রামটা এল।

ওটার জন্যই পোয়ারো অনেকক্ষণ থেকে সামনের দরজায় অপেক্ষা করছিলেন।

একটা বিরাট স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন পোয়ারো।

ইনসপেক্টর মর্টন কোথায়? ল্যান্সকম্বকে জিজ্ঞেস করলেন। দুজনের একজন চলে গেছেন। আর একজন বোধ হয় স্টাডিতে আছেন।

ল্যান্সকম্বের কাঁধ জড়িয়ে পোয়ারো বললেন : আমরা প্রায় শেষে এসে গেছি।

অবাক হয়ে বলল ল্যান্সকম্ব : তাহলে আপনি আর সাড়ে নটার ট্রেনে যাচ্ছেন না?

পোয়ারো মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল : অন্ত্যেষ্টির দিন এখানে পৌঁছে মিসেস ল্যান্স কোয়ানেট প্রথম কি কথা বলেছিল মনে আছে?

হ্যাঁ, বেশ ভালো মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, তুমি কতদিন আমাদের কুটীরে সারাং নিয়ে যাওনি। ঐ বেড়ার ধারে সব ছেলেমেয়েদেরই একটা করে কুটীর ছিল। আমি সারাং নিয়ে যেতাম। কোরা এই খাবারটা খুব ভালোবাসত।

 

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

মাথা হেলাল পোয়ারো।

হ্যাঁ, আমি এইরকম কিছু ভেবেছিলাম। পোয়ারো এবারে স্টাডিতে গিয়ে মর্টনের হাতে টেলিগ্রামটা ধরিয়ে দিলেন কোনো কথা না বলে।

পড়ার পর মর্টন বলল, কিছুই বুঝছি না। তোমাকে সবকিছু বলার সময় এসেছে।

মর্টন হাসল।

একটু স্বস্তি দিন তো। আমাকে ঐ মিঃ ব্যাঙ্কস জ্বালিয়ে মারছে। বলেছে ও খুন করেছে। কি মনে হয় ও খুন করেছে? গিলফ্রিস্ট বলেছে রিচার্ড বলেছিলেন তার নিজের ভাগ্নী। ওকি স্ত্রীর হয়ে খুন করেছে? সুসানকে খুনী বলে ভাবতে ইচ্ছে করে না।

আমি তোমায় সব বলছি। এবার এরকুল পোয়ারো তার শ্রোতাদের জমায়েত করছিলেন বড় বসার ঘরটাতে।

পোয়ারো তাঁর জাঁকজমকপূর্ণ বক্তৃতা আরম্ভ করলেন।

দ্বিতীয় বার আমি আবার যাত্রা ঘোষণা করছি। বারটার ট্রেনে যাইনি, এবার ডিনার শেষ করে সাড়ে নটার ট্রেনে চলে যাবো। কারণ এখানে আর কিছু করার নেই।

খালি এইসব বকবক করছে, টিমোথি বললেন কিছু তো করতে দেখি না।

আমি রহস্যের সমাধান করতে এসেছিলাম, পোয়ারো বললেন, রহস্য উদঘাটন হয়ে গেছে। মিঃ অ্যান্টহুইসল যে কথাগুলো আমায় বলেছিলেন সেগুলো আগে বলছি।

প্রথমতঃ মিঃ রিচার্ড এবারেনথী হঠাৎ মারা গেলেন।

দ্বিতীয়তঃ অন্ত্যেষ্টির দিন কোরা ল্যান্স কোয়েনেট বললো ওকে খুন করা হয়েছে তাই না?

তৃতীয়তঃ কোরা খুন হলে প্রশ্ন হচ্ছে এই ঘটনা কি এক সূত্রে জড়িত? তারপর মিস গিলক্রিস্টকে ওয়েডিং কেকের মধ্যে বিষ দিয়ে কেউ বা কারা মেরে ফেলতে চাইছিল।

সবাই শুনেছে কোরা ঐ চাঞ্চল্যকর কথাটা বলার পরের দিনই খুন হলেন। অস্ত্র ছিল কুড়ুল, এবার চতুর্থ ব্যাপার, স্থানীয় পোস্টাপিসের পিয়ন বলেছে যে ঘটনার দিন কোরাদের কটেজে কোনো প্যাকেট দিয়েছে বলে তার মনে হয় না। তাহেল ওখানে কারা উপস্থিত ছিলেন যাদের পক্ষে প্যাকেট দেওয়া সম্ভব, তারা হলেন মিস গিলফ্রিস্ট নিজে, সুসান ব্যাঙ্কস। যিনি তদন্তের কারণে ওখানে পরে গিয়ে পৌঁছেছিলেন, মিঃ অ্যান্টহুইসল, মিঃ গাথরী যিনি কোরার বন্ধু হিসাবেই পরিচয় দিয়েছিলেন আর একজন নান সে সকালে চাঁদা চাইতে গেছিল।

মিস গিলফ্রিস্টের কোনো লাভ ছিল না রিচার্ডের মৃত্যুতে, কোরার মৃত্যুতে সামান্য লাভ। বস্তুত পক্ষে ক্ষতিই হয়েছিল কারণ আবার তার কাজটা গেছিল, বিশেষ করে বিষাক্ত কেক খেয়ে ওকে হাসপাতালের যেতে হয়েছিল।

রিচার্ডের মৃত্যুতে সুসানের লাভ। কোরা ল্যান্স কোয়েনেটের মৃত্যুতে সামান্য লাভ হয়েছিল যদিও এক্ষেত্রে তার মোটিভ টাকার নয় নিরাপত্তার। সে যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তা করতে পারে মিস গিলক্রিস্ট। কোরা ও রিচার্ডের মধ্যে কথাবার্তা শুনেছে সুতরাং ওকেও সরিয়ে দেওয়া দরকার। যে ওয়েডিং কেকের অংশটা খান সেটা গিলক্রিস্ট ওকে দিয়েছিল, এবং পরের দিন সকাল পর্যন্ত ডাক্তার না ডাকার কথা বলেছিল।

এই দুই মৃত্যুতে মিঃ অ্যান্টহুইসলের কোনো লাভ হয়নি। কিন্তু এবারেনথীদের ব্যাপারে তার অনেক ক্ষমতা ছিল এবং খুনের কারণও থাকতে পারে।

আপনারা হয়ত বলবেন তাহলে মিঃ অ্যান্টহুইসল কেন আমার কাছে গেছিলেন, অনেক উদাহরণ আছে যেখানে খুনীরা নিজে রহস্য সন্ধানীর কাছে গেছে।

এবার দুজন বাইরের লোক মিঃ গাথরী আর নান। তারা যদি সত্যি গাথরী বা নান হন তাহলে সন্দেহ থাকবে। কিন্তু তারা যদি গাথরী বা নানের ছদ্মবেশে গিয়ে থাকেন? নানের একটা রহস্যজনক ভূমিকা আছে এই কেসে। মিস গিলফ্রিস্টের মতে লীচেট সেন্ট মেরীতে যে নান গেছিল মিঃ টিমোথির বাড়িতেও সেই একই নান এসেছিল, রিচার্ডের মৃত্যুর আগের দিনও একজন নান এণ্ডারবিতে এসেছিল।

আমি আরও কয়েকটা ব্যাপার উপস্থাপিত করব।

একজন কথা সমালোচকের (গাথরীয়) আগমন, তেল রঙের গন্ধ, গোল বন্দরের ছবির পোস্টকার্ড এবং সবশেষে মোমের ফুল। এই সব ব্যাপার নিয়ে ভাবতে আমি সত্যে উপনীত হয়েছি। তাহলে রিচার্ডের খুনের কতটা নির্ভর করছে কোরার কথার উপরে নয়, কোরার নিজের উপর।

আমি নিজেই একটা প্রশ্ন করেছিলাম। প্রশ্নটা হচ্ছে– আপনারা সবাই কোরাকে কতটা জানতেন?

তিনি একটু হাসলেন।

আবার বললেন, কেউ তো ভালো করে চেনে না–এটা হল উত্তর। বাচ্চা বয়েসে ছাড়া তিনজন মাত্র লোক ওকে দেখে চিনতে পারে। এক হচ্ছে বৃদ্ধ ল্যান্সকম্ব, চোখে কম দেখে। দুই মিসেস টিমোথি এবারেনথী: ওকে ওঁর বিয়ের সময় কয়েকবার দেখেছিলেন, তিন মিসেস লিও এবারেনথী ইনি কোরাকে ভালো করে চিনতেন। তবে কুড়ি বছর আগে।

তাই আমি ভাবলাম এমনও তো হতে পারে অন্ত্যেষ্টির দিন কোরা ল্যান্স কোয়েনেটের বদলে এখানে অন্য কেউ এসেছিল। সুসান বলল, আন্ট কোরা আসেননি, আন্ট কোরা খুন হয়নি? না না কোরা ল্যান্স কোয়েনেট আসেনি। যিনি এখানে এসেছিলেন তিনি রিচার্ডের হঠাৎ মৃত্যুটাকে কাজে লাগাতে এসেছিলেন এবং তিনি একাজে বেশ সফলও হয়েছিলেন।

তাতে লাভ? মড বললো।

লাভ আছে, অন্য একটা খুনকে অন্যভাবে দেখাতে। এখন বলল রিচার্ডের খুন সম্বন্ধে সে কিছু শুনেছিল, তারপরের দিনই কোরা খুন হল। সবাই একটা কার্যকারণ সম্পর্কে ভেবে নেবে। কিন্তু কোরা যদি খুন হয় এবং ওর কটেজের দরজা জানলা ভাঙা হয় এবং ডাকাতি যদি প্রমাণ না হয় তাহলে তদন্ত আরম্ভ হবে, সন্দেহটা গিয়ে পড়বে সেই মহিলার উপর যার সাথে কোরা থাকত। মিস গিলফ্রিস্ট প্রতিবাদ করল, আমি একটা এ্যামেথি ব্রোচ আর দু-একটা বাজে ছবির জন্য খুন করতে পারি না।

না, পোয়ারো বলল, ওগুলো থেকে একটু বেশি কারণে। গোল ফ্লেসান বন্দরের ছবি ছিল ওজনের মধ্যে। সুসান বুঝতে পেরেছিল ছবিটা একটা ছবির পোস্টকার্ড থেকে নকল করা। ছবিটাতে যুদ্ধের আগের গীয়ারটা ছিল। কিন্তু গিলফ্রিস্ট বলেছিল কোরা সবসময় প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকে এবং মিঃ অ্যান্টহুইসল ওখানে যাওয়ার পর তেল রঙের গন্ধ পেয়েছিলেন। তুমি ছবি আঁকতে পারো গিলফ্রিস্ট? তোমার বাবা ভালো ছবি আঁকতেন এবং তুমি ছবি সম্বন্ধে অনেক কিছু বোঝ। কোরা ছবিটার দাম বুঝতে পারেনি তুমি পেরেছিলে। একটা প্ল্যান তোমার মাথায় এল। অন্ত্যেষ্টির দিন তুমি কোরার চায়ের কাপে ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলে এবং নিজে চলে এসেছিলে এই এণ্ডারবি। তুমি যে কোরা নয় সেটা কেউ বুঝতে পারেনি। তুমি কোরার কাপড় চোপড় পরেছিলে। কোরা সামনের দিকে নকল চুল লাগাতো। তাতেও তোমার অসুবিধে না হয়ে সুবিধে হয়েছে। কুড়ি বছর পরে লোকে আলো পাল্টায় কিন্তু ধরনধারণ কথা বলার ভঙ্গী পাল্টায় না। তুমি আয়নার সামনে কোরার ভঙ্গীগুলো অভ্যেস করেছিলে।

কিন্তু ওখানেই তুমি তোমার প্রথম ভুল করলে। কোরার মাথা হেলিয়ে কথা বলাটায় তুমি ভুল নকল করেছিলে, কোরা মাথাটা ডাইনে হেলাত আর তুমি ভুল করে বাঁয়ে হেলানো অভ্যেস করলে।

এটাতেই হেলেন হতভম্ব হয়েছিল। সেদিন জর্জ মানুষের মুখের চেহারায় পার্থক্যের কথা বলছিল, তারপর হয়ত কোরার কথা মনে পড়তে তার পরিচিত মাথা ডাইনে হেলিয়ে কথা বলার ভঙ্গীটা মনে পড়েছিল, হঠাৎ তার অর্ধসচেতন মনটা থেকে সন্দেহটা উঠে আসে সে পার্থক্যটা বুঝতে পারে। যাইহোক সে কথাটা ভোরে উঠেই অ্যান্টহুইসলকে জানাতে গেছিলো, তুমি গেছিলে পেছনে পেছেনে। অত সকালে কাকে ফোন করতে শুনলে? তারপর কথাগুলো শোনার পর তার মাথায় আঘাত করলে।

আমি এসব কোনোদিন করিনি, গিলক্রিস্ট বলল, সমস্ত ব্যাপারটাই বানানো, মিথ্যে।

খুনের কথাটা বলা অবশ্য তোমার প্রথম ধাপ্পা অন্ত্যেষ্টির দিন, পোয়ারো বললেন, তোমার আরও পরিকল্পনা ছিল। যে কোনো মুহূর্তে গিলফ্রিস্ট স্বীকার করতে রাজী ছিলেন যে তিনি কোরা ও রিচার্ডের কথাবার্তা শুনেছেন। আসলে রিচার্ড যা বলেছিলেন সেটা হল, তিনি, আর বেশিদিন বাঁচবেন না এবং চিঠিতে এই কথাটা কাউকে বলতে বারণ করেছিলেন। নানের ব্যাপারটা ওর আর একটা আবিষ্কার, তুমি সবাইকে বিপথে চালাতে চেয়েছিলে এবং টিমোথিদের সাথে তুমি এখানে আসতে চেয়েছিলে। বিষ খাওয়াটা পুরোনো কৌশল এবং এতেই ইনসপেক্টর মর্টনের সন্দেহ জেগেছিল।

ছবিটার ব্যাপার বলবেন না? রোজামণ্ড বলল।

আস্তে আস্তে পোয়ারো একটা টেলিগ্রাম খুললেন। আজ সকালে আমি মিঃ অ্যান্টহুইসলকে ফোন করে বলেছিলাম, স্টানফিল্ড গ্র্যাঞ্জ থেকে মিঃ এবারেনথীর নাম করে গিলফ্রিস্টের ঘর থেকে ছবিটা নিয়ে আসতে। ওটা লণ্ডনে নিয়ে গিয়ে ওকে গাথরীকে দেখাতে বলেছিলাম, ওপরের পলফ্লেক্সান বন্দরের ছবিটা খুলে ফেলার পর আসল ছবিটা পাওয়া গেছে।

তিনি টেলিগ্রামটা পড়লেন।

এটা নিশ্চিত ভাবে একটা ভারমীয়ার –গাথরী।

হঠাৎ তড়তড়িয়ে কথা বলতে আরম্ভ করল গিলফ্রিস্ট। আমি জানতাম ওটা ভারমীয়ার। কিন্তু কোরা বুঝতে পারেনি, সবসময় আর্ট নিয়ে বকবক করতো কিন্তু আর্টের একরত্তিও বুঝতো না। সবসময় এণ্ডারটি বাচ্চা বয়েসে কি করেছে সেই নিয়ে বকবক করত। একজন যদি দিনের পর দিন একই কথা বকে যায়। আমার কোনো আশা ছিল না ভবিষ্যতের–তারপরে ভারমীয়ার। আমি কাগজে দেখেছিলাম একটা ভারমীয়ার পাঁচ হাজার পাউণ্ডেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।

তুমি পাঁচ হাজার পাউণ্ডের জন্য ওকে এমন নৃশংসভাবে খুন করলে–সুসান বলল।

পাঁচ হাজার পাউণ্ড দিয়ে, পোয়ারো বললে, একটা চায়ের দোকান করা যায়।

ঘুরে দাঁড়াল গিলক্রিস্ট।

তাহলে বুঝতে পেরেছেন। আমার কত টাকার দরকার ছিল। তার গলা আবেগে কাঁপছিল।

আমি একটা চায়ের দোকান করতে চেয়েছিলাম, পাম টি নাম দেব ঠিক করেছিলাম।

 

কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]
আগাথা ক্রিস্টি

চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ

কিন্তু আমি মোমের ফুলটা সম্বন্ধে বুঝলাম না, রোজামণ্ড বলল। মোমের ফুলটা মিস গিলফ্রিস্টের দ্বিতীয় ফুল, সে বলেছিল মোমের ফুলগুলো ঐ টেবিলটার উপর সুন্দর মানায়। অথচ মোমের ফুলটা সেখানে ছিল না। কারণ হেলেন ওটা ভেঙে ফেলেছিল এবং টিমোথির বাড়ি থেকে গিলফ্রিস্ট এণ্ডারবিতে আসার আগেই ওটা এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তাহলে সে ওটা দেখেছে অন্ত্যেষ্টির দিন যখন ও কোরার ভূমিকায় অভিনয় করছিল।

খুব বোকামো করেছেন তো? রোজামণ্ড বলল।

পোয়ারো বললেন, যে যত বুদ্ধিমানই হোক তার সাথে অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা বললে সে সত্যি কথাটা বলে ফেলবে।

রোজামণ্ড বলল, জানেন আমি মা হতে যাচ্ছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি অভিনয় ছেড়ে আমি শুধু মা হয়ে যাব। এই ভূমিকায় তোমার সুন্দর মানাবে। বলল, সুসান স্যালাটীট টেবিলটা নিয়ে নিল, কিন্তু আমার একটা বাচ্চা হতে যাচ্ছে।

হেলেন বলল, সুসান তার ব্যবসায়ে সফল হবে। হঠাৎ তারপরে বললো, জানেন মিঃ পোয়ারো, রিচার্ড আমার জন্য যে টাকা রেখে গেছে সেটা আমার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। আমাদের কোনো বাচ্চা ছিল না বলে ওতে আমরা দুঃখিত ছিলাম। কিন্তু এখন আমি মা হতে চলেছি। এবার আমি আমার ছেলের শিক্ষাদীক্ষায় খরচ করতে পারব।

ঘরে ঢুকে মিঃ অ্যান্টহুইসল বললো, তোমার খুনের আসামী এখন বেশ খোস মেজাজে আছে। জেলে পাঠানোর বদলে ওকে বোধ হয় মানসিক হাসপাতালে পাঠাতে হবে। বেশ আনন্দে আছে আর ভবিষ্যত চায়ের দোকানের পরিকল্পনা করছে সবসময়।

পোয়ারো তার আগের খুনীদের কথা ভাবতে লাগলেন…..।

আমাদের আরও পোষ্ট দেখুনঃ

cropped Bangla Gurukul Logo কথা বলার পর -আফটার দি ফিউনারেল ( এরকুল পোয়ারো সমগ্র-আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ) [ অনুবাদ সাহিত্য ]

মন্তব্য করুন