অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা

অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা , অভিধান প্রণয়নের শুরুতেই স্থির করে নিতে হয় লক্ষ্য পাঠকমণ্ডলী এবং এটা স্থির হয়ে গেলে সংকলক সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারেন তাঁর অভিধানে গৃহীত হবে কোন ধরনের শব্দ। যদি তাঁর লক্ষ্য, পাঠকেরা হয় বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তাহলে তিনি সে-সমস্ত শব্দই গ্রহণ করবেন, যার মুখোমুখি সাধারণত হয় ছাত্রমণ্ডলী।

অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা

অভিধান নির্মাণকৌশল

সাধারণত  তিনি গুরুত্ব আরোপ করবেন সমকালের জীবন্ত শব্দপুঞ্জের ওপর বেশি জোর দেবেন সাহিত্য ও মানববিদ্যা বিষয়ক শব্দের ওপর, কিছু পরিমাণে সংগ্রহ করবেন বিজ্ঞানশাস্ত্রীয় শব্দ এবং সংকলন করবেন সে-সব অপ্রচলিত শব্দ, যা ব্যবহৃত হয়েছে প্রধান সাহিত্যস্রষ্টাদের রচনায়। লক্ষ্য পাঠকমণ্ডলীর ভিন্নতা অনুসারে সংকলিত শব্দেরও ভিন্নতা ঘটবে আনুশাসনিক ব্যবহারিক অভিধানে। লক্ষ্য নিশ্চিত হলে অভিধানপ্রণেতা শুরু করেন শব্দ সপ্তাহ। অভিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে গৃহীত শব্দের বানাননির্ধারণ, উচ্চারণ-নির্ণয়, ব্যুৎপত্তি শনাক্তি, অর্থনির্ণয় ও সংজ্ঞারচনা এরপর অভিধানপ্রণেতা প্রবেশ করেন তার মূল ও জটিল দুরূহ কাজে শব্দের অর্থনির্ণয় ও সংজ্ঞার্থরচনায় অভিধানে সাধারণত শব্দটির মৌল অর্থ পায় অগ্রাধিকার এবং পরে স্থান পায় অন্যান্য অর্থ।

 

অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা

 

বাংলা অভিধান

বাংলা ভাষাতত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছিল অভিধানসংকলনের মাধ্যমে, ওই অভিধানসংকলনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল ধর্ম। বাংলা ভাষাতত্ত্বের প্রথম পুরুষ ও প্রথম অভিধান-সংকলক মানোএল দা আসসুম্পসাঁউ ধর্মযাজক ও প্রচারক জানতেন যে প্রচারক তার ধর্মগোষ্ঠীর ভাষা জানে না সে প্রচারক হওয়ার উপযুক্ত নয়”। বাংলায় জেসাসের ধর্ম প্রচারের জন্যে তাঁর জানা দরকার ছিল বাংলা ভাষা। এ-উদ্দেশ্যে তিনি ১৭৩৪ অব্দে দেশি সহকারীদের সহযোগিতায় সংকলন করেন ‘ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগয়া, ই পোর্তুগিজ।

দিতিদিনো এম দুয়াস পার্ডেন! (সম্পাদক অনুবাদক—সুনীতিকুমার ও প্রিয়রঞ্জন সেন ১৯৩১)। লিসবন থেকে অভিধানটি প্রকাশিত হয় ১৭৪৩। এ অভিধানটিতে স্থান পায় তাঁর এলাকার ঢাকার ভাওয়ালের জনসাধারণের প্রাতাহিক শব্দাবলি – শব্দসংকলনের জন্যে তিনি কোনো অমরকোষ বা বাংলা কাব্যের ধারে যান নি, গিয়েছিলেন নিরক্ষর দরিদ্র মানুষের দরোজায়, যেখানে বিরাজ করে মর্মস্পর্শী দারিদ্র্য ও  করুণাময় ঈশ্বর। আসসুম্পসাঁউ সংকলন করেছিলেন এমন অনেক শব্দ, যার একটি বড়ো অংশ এখনো অগৃহীত মান বাংলা অভিধানসমূহে। ‘জাবল’, ‘বাদাম’, “গতর”, “মাকুন্দা’, ‘আব’, ‘আকুশ’, ‘আলিয়া’, ‘অনপুস্থি’, ‘আহা’, “চামচারার মতো অনেক শব্দ আছে তাঁর অভিধানে। এটি আঞ্চলিক শব্দসংগ্রহ বলে আসসুম্পসাঁউর অভিধানকে মেনে নিতে পারি বাংলা উপভাষাতত্ত্বের প্রথম বই বলে।

হেনরি পিট্স ফরস্টারের এ ভোকাবুলারি, ইন টু পার্টস, ইংলিশ অ্যান্ড বেললি’র প্রথম খণ্ড (ইরেজি-বাংলা : ১৭৯৯) ও দ্বিতীয় খণ্ড (বাংলা ইরেজি : ১৮০২) প্রকাশিত হয়ে সৃষ্টি করে এক অভিধানস্রোত। বাঙালিদের মধ্যে প্রথম অভিধান প্রণয়ন করেন মোহনপ্রসাদ ঠাকুর, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সহকারী গ্রন্থাগারিক, এ ভোকাবুলারি, বেংগলি অ্যান্ড ইংলিশ ফর দি ইউস অফ স্টুডেন্টস (১৮১০) নামে। কিন্তু ফরস্টারের বিশাল পদক্ষেপের পর অভিধানপ্রণয়নে বিশালতর পদক্ষেপ নেন উইলিয়াম কেরি।

 

অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা

 

তাঁর অভিধানের নাম ঐ ডিকশনারি অফ দি বেংগলি ল্যাংগুয়েজ, ইন হুইচ দি ওয়র্ডস আর ট্রেসড টু দেয়ার অরিজিন অ্যান্ড দেয়ার ডেরিয়াস মিনিংস গিভেন’ (প্রথম খণ্ড ১৮১৫, প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণ ১৮১৮, দ্বিতীয় খণ্ড (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ) ১৮২৫)। ১৮৩৩-এ প্রকাশিত হয় জি সি হটনের মহিমামণ্ডিত এ ডিকশনারি, বেংগলি অ্যান্ড স্যানটি / অ্যাক্সপ্লেইনড ইন ইংলিশ, যার পৃষ্ঠাসংখা প্রায় তিনহাজারের কাছাকাছি। উনিশ শতকে আর যারা অভিধান রচনা করেন, তাঁদের মধ্যে আছেন পীতাম্বর মুখোপাধ্যায় (১৮০৯), রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ (১৮১৭), ইয়েটস (১৮২০), মার্শম্যান (১৮২৭), উইলিয়াম মর্টন (১৮২৮),

পিয়ার্সন (১৮২৯), জগন্নাথপ্রসাদ মল্লিক (১৮৩১), হলধর ন্যায়রত্ব (১৯৪৬), দেবীপ্রসাদ রায় (১৮৪১), কেশবচন্দ্র রায় (১৮৬১), মথুরানাথ তর্করত্ন (১৮৬০), নন্দকুমার কবিরত্ন (১৮৬৬), শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় ১২১), রামকমল বিদ্যালঙ্কার (১৮৬৬) প্রমুখ। বিশ শতকের দুটি ব্যাপক বাংলা অভিধান হচ্ছে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (১২৫৩), ও হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ 0060 এবং উপকারী ব্যবহারিক অভিধান হচ্ছে রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ ( ১০৪০) ও শৈলেন্দ্র বিশ্বাসের ‘সংসদ বাঙ্গালা অভিধান’ (১৯৯৫)। ব্যবহারিক শব্দকোষ (কাজী আবদুল ওদুদ, কলকাতা ১৯৮৩)।

১৯৫৫ সালে ঢাকায় বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পর বাংলা অভিধানের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ত্রিশ বছরে বাংলা একাডেমী প্রায় ৬০ খানা অভিধানজাতীয় যন্ত্র প্রকাশ করে। এ প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (১৯৬৫), ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (১৯৭৪), ছোটদের অভিধান (১৯৮৩) চরিতাভিধান (১৯৮৫), উচ্চারণ অভিধান (১৯৮১), সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান (১৯৯২), সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান (১৯৯৩), ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি (১৯৯৩), বেঙ্গলি-ইংলিশ ডিকশনারি (১৯৯৪), বানান অভিধান (১৯৯৪), সহজ বাংলা অভিধান (১৯৯৫), লেখক অভিধান (১৯৯৮) প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য

বাংলা অভিধানে প্রথমে দেয়া হয় গৃহীত শব্দটির বানান (এক বা একাধিক), নির্দেশ করা হয় ব্যুৎপত্তি (ও শব্দটির রূপতত্ত্ব— সংস্কৃত শব্দের বেলা), ক্যাটেগরিগত বা পদগত পরিচয় ও সবশেষে পরিবেশিত হয় শব্দটির বিভিন্ন অর্থ ধাতুগত অর্থ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের অর্থ। দু-একটি অভিধানে উচ্চারণও নির্দেশিত হয় এবং প্রায় সব অভিধানেই শব্দার্থ স্পষ্ট করার জন্যে পরিবেশিত হয় শব্দটি প্রয়োগের উদাহরণ।

 

অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা

 

আরও দেখুন:

“অভিধান নির্মাণকৌশল | বাংলা অভিধান | শব্দ-ভুক্তির বৈশিষ্ট্য | ভাষা ও শিক্ষা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন