পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , ভাব-সম্প্রসারণ হচ্ছে এভাবে সুসংগত সমর্থক প্রসারণ। ভাবের সংহতিকে উম্মোচিত, নির্ণীত করে একটি অতুলনীয় দৃষ্টান্ত বা প্রবাদ প্রবচন এর সাহায্যে সহজ ভাষায় বিস্তারিত তত্ত্বের প্রসারণ ঘটে তাকে মূলত ভাব-সম্প্রসারণ বলা হয়। ভাব সম্প্রসারণ সাধারণত কবিতা বা যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটি চলন এর মাধ্যমে তা ভাবে পূর্ণ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না

পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানবজীবন সার্থকতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ফুলের মতোই মানুষের জীবন। ফুল ফোটে সুবাস ছড়ায়। তার সৌরভে চারদিক আমোদিত হয়। এভাবে সৌরভ ছড়ানোর মধ্যেই সে নিজের সার্থকতা খুঁজে পায়। তদ্রুপ, অপরের কল্যাণে নিজকে নিয়োজিত করতে পারলেই জীবন সুখময় ও আনন্দময় হয়ে ওঠে।

সমাজের কল্যাণে নিজেদের নিঃশেষে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে আছে পরম সুখ, অনির্বচনীয় আনন্দ ও অপরিসীম পরিতৃপ্তি। পুষ্প যেন মানবব্রতী জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। সে কখনো তার নিজের জন্য ফোটে না। সে তার সৌরভ ও সৌন্দর্যে সকলকে মোহিত করে। ফুলের এই সৌন্দর্য উপভোগ করে যেমন ভ্রমর, মৌমাছি, প্রজাপতি, তেমনি সৌন্দর্য- পিপাসু মানুষের মনও ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। তার সৌরভে মন উদ্বেলিত হয়। মৌমাছি তার মধু পান করে পরিতৃপ্ত হয়। ফুল আবার কালক্রমে পরিণত হয় ফলে। সেই ফল আস্বাদন করে পরিতৃপ্ত হয় মানুষ। ক্ষুধা নিবৃত্তি করে বনের প্রাণিরা।

পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না

আবার, পবিত্রতার প্রতীক বলে ফুল দেবতার চরণে নিবেদিত হয় নৈবেদ্য হিসেবে। আমরা প্রিয়জনকে ফুল উপহার দিই, শ্রদ্ধা ও স্বাগত জানাতে শহীদমিনারে, স্মৃতিসৌধে ফুল দিই। ফুল দিয়ে কাউকে যেমন বরণ করি আবার বিদায় ও চিরবিদায়েও দিই ফুল। তাই দেখা যায় আমাদের জীবনের নানারূপ আবেগ-অনুভূতিতে ফুল জড়িয়ে আছে। এভাবে ফুলের সৌরভ ও সৌন্দর্য তার নিজের হলেও সকলের কাছে নিজেকে উজাড় করে দিয়েই সে তৃপ্ত। মানুষের জীবনও অনেকটা ফুলের মতো। মানুষের চারিত্রিক মাধুর্যও হওয়া উচিত ফুলের মতোই সুন্দর ও সুরভিত, পবিত্র ও নির্মল।

বাংলা সাহিত্যে ও বাঙালির জীবনে নববর্ষ | ভাষা ও সাহিত্য | বাংলা রচনা সম্ভার

ফুলের মতোই তা নিবেদিত হওয়া উচিত পরের জন্যে, সমাজের স্বার্থে। মানুষ শুধু ভোগ-বিলাস ও স্বার্থের জন্যেই জন্মগ্রহণ করে নি। পরের কল্যাণে জীবনকে উৎসর্গ করার মাঝেই তার জীবনের চরম ও পরম সার্থকতা। পরের কল্যাণ সাধনই মহত্ত্বের লক্ষণ। জগতের সাধু ও মহৎ ব্যক্তিগণও তাই করেন। তাঁরা সর্বদা পরের হিত সাধনে ব্যাপৃত থাকেন এবং পরের তরে জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। কেননা ব্যক্তিস্বার্থ পরিহারের মাধ্যমেই সমাজ সুন্দর ও সার্থক হয়ে ওঠে। মহৎ ব্যক্তিগণ বিশ্বমানবের। তাঁরা সকলের প্রিয় এবং সকলের আপনজন। তাঁদের জীবন পুষ্পের ন্যায় পরার্থে উৎসর্গীকৃত। তাই মানুষকে ব্যক্তিস্বার্থের কথা না ভেবে সবার স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। হৃদয়কে ফুলের মতো বিকশিত করতে হবে।

পুষ্পের এই যে আত্মোৎসর্গ, পরের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেওয়া— এখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। এ শিক্ষা বিনয়ী হওয়ার, এ-শিক্ষা নিজের জীবন দিয়ে অন্যকে সুন্দর ও সুখী করার শিক্ষা। তবেই মানুষের জীবন হয়ে উঠবে আনন্দঘন ও কল্যাণময়।

আরও দেখুন:

সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , সাধারণত ভাব সম্প্রসারণ করার জন্য প্রদত্ত কবিতার অংশ অথবা গদ্যের অংশ অতিসংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। আর এই ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে লুকিয়ে থাকে সহস্ত্র ভাবের ইঙ্গিত। আর এইভাবে রিংগিত কে সম্প্রসারণ করার জন্য অবশ্যই সতর্কতার সাথে সেই মৌলিক বিষয় খুঁজে বের করতে হয় এবং এর মাধ্যমে ভাব সম্প্রসারণ করতে হয়।

সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে

পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানবজীবন সার্থকতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সমাজের কল্যাণে নিজেদের নিঃশেষে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে আছে পরম সুখ, অনির্বচনীয় আনন্দ ও অপরিসীম পরিতৃপ্তি। অন্যের উপকার সাধনই তাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত । মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল বলে তাকে সমাজবদ্ধভাবে বাস করতে হয়। এজন্য পরস্পর প্রীতি ও ভালোবাসা, নির্ভরতা ও সহযোগিতার পরিবেশ মানুষ নিজের প্রয়োজনেই সৃষ্টির গোড়া থেকে গড়ে তুলেছে।

শুধু পরিবার বা সমাজ নয়, রাষ্ট্র নয়, সমগ্র পৃথিবী ও রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং জাতিগোষ্ঠী পরস্পর সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, নির্ভরতা ও সহযোগিতার মধ্যে বাস করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। কারণ একজন মানুষ যেমন সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করতে পারে না, তেমনি পৃথিবীর বৃহৎ মানবগোষ্ঠীও পরস্পর নির্ভরশীলতা ছাড়া বাস করতে পারছে না।

এমন একটি বৈশ্বিক সমাজে আমরা নিজেদের নিয়ে আত্মকেন্দ্রিকভাবে, শুধু নিজের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করে বাস করতে পারব না। প্রকৃতপক্ষে, মানুষ শুধু ভোগ-বিলাস ও স্বার্থের জন্যেই জন্মগ্রহণ করে নি। পরের কল্যাণে জীবনকে উৎসর্গ করার মাঝেই তার জীবনের চরম ও পরম সার্থকতা। পরের কল্যাণ সাধনই মহত্ত্বের লক্ষণ। অপরের কল্যাণে নিজকে নিয়োজিত করতে পারলেই জীবন সুখময় ও আনন্দময় হয়ে ওঠে। জগতের সাধু ও মহৎ ব্যক্তিগণও তাই করেন। তাঁরা সর্বদা পরের হিত সাধনে ব্যাপৃত থাকেন এবং পরের তরে জীবন বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না।

কেননা ব্যক্তিস্বার্থ পরিহারের মাধ্যমেই সমাজ সুন্দর ও সার্থক হয়ে ওঠে। মহৎ ব্যক্তিগণ বিশ্বমানবের। তাঁরা সকলের প্রিয় এবং সকলের আপনজন। তাঁদের জীবন পুষ্পের ন্যায় পরার্থে উৎসর্গীকৃত। মানুষকে ব্যক্তিস্বার্থের কথা না ভেবে সবার স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। হৃদয়কে ফুলের মতো বিকশিত করতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে মানুষ যা করে তা নিরর্থক, নিষ্ফল। মহাকালের চিরন্তন স্রোতে তা বিলীন হয়ে যায়। মানুষ সমস্ত জীবন ধরে ফসল চাষ করে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে মৃত্যুর পরও তার সৃষ্ট সোনার ফসল টিকে থাকে।

তাই সবার স্বার্থে আত্মনিয়োগ করতে পারলে জীবন হয় সার্থক ও সফল। যাঁরা সত্যিকারের মানুষ তাঁরা নিজের স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে আচ্ছন্ন করে রাখে না। যেসব আবিষ্কার ও মহৎ কর্ম আজ বিশ্বকে সভ্যতার চরম শিখরে উপনীত করেছে তার মূলে রয়েছে মানুষের অবদান।

সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে

কিন্তু তা ব্যক্তিগতভাবে কুক্ষিগত করে রাখা হয় নি, বরং মানুষের জন্যে, দেশ ও দশের জন্যে তা উৎসর্গ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে মহৎ কর্মের জন্যে সে অমরতা লাভ করে মানুষের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।আমরা শুধু নিজের জন্যই জন্মগ্রহণ করিনি, নিজের সুখই আমাদের একমাত্র কাম্য হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে—পরের কল্যাণকামনা, অন্যের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই সুখ। এ সুখই আমাদের প্রার্থিত হওয়া উচিত।

আরও দেখুন:

অসি অপেক্ষা মসি অধিকতর শক্তিমান | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

অসি অপেক্ষা মসি অধিকতর শক্তিমান | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , ভাব সম্প্রসারণ এর সময় সেই চরণের মূল গভীর ভাবটুকু উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং উপমা ব্যবহার করে সেইসাথে প্রয়োজন অনুসারে উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়া। কবি বা লেখকের যেখানে তার বক্তব্যকে ব্যঞ্জন এবং ইঙ্গিত ধর্মী করে প্রকাশ করেন সেগুলো কে আলোক ধর্মী হিসাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে ভাব সম্প্রসারণ করা হয়।

অসি অপেক্ষা মসি অধিকতর শক্তিমান

মানুষকে বিধাতা জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়ে শ্রেষ্ঠজীব হিসেবে সৃষ্টি করে এই সুন্দর পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শারীরিক শক্তি বা বল প্রয়োগে এই পৃথিবীকে জয় করার জন্যে স্রষ্টা মানুষকে সৃষ্টি করেন নি, বরং সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রেখে পৃথিবীকে জয় করার জন্যে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন।

অসি অর্থাৎ তরবারি— যার ক্ষমতা বিশাল। এই মারণাস্ত্রের সাহায্যে শত্রু দমন হয়, মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ প্রাণ বিনষ্ট হয়। এমনকী গোটা দেশও সমূল ধ্বংস হয়। আপাতদৃষ্টিতে অসি অপেক্ষা মসির ক্ষমতা নগণ্য মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সত্য নয়। কারণ, অসির ক্ষমতা সাময়িক বা ক্ষণস্থায়ী। বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়— চেঙ্গিস খান, নাদির শাহ, হিটলার প্রমুখ তাদের মারণাস্ত্রের আঘাতে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে দিগ্বিজয়ী বীরের আখ্যায় আখ্যায়িত হলেও ইতিহাসে অক্ষয় আসন লাভ করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ক্ষণিকের জন্যে তারা প্রভাব বিস্তার করলেও, তাদের কার্যক্রম নৃশংস ও কলঙ্কিত হওয়ায় মৃত্যুর পর নিন্দিত হয়েছে, ধিকৃত হয়েছে এবং চিরতরে হারিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে।

অসি অপেক্ষা মসি অধিকতর শক্তিমান

পক্ষান্তরে, মসি বা লেখনীরূপী অস্ত্রের মাধ্যমে অনেক মনীষী তাঁদের জ্ঞানগর্ভ দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, চিকিৎসাশাস্ত্র, রাজনীতি প্রভৃতি বিষয়ে বিশ্ব-মানবতার কল্যাণে তাঁদের চিন্তাধারা লিপিবদ্ধ করে গেছেন, তাঁরা মানব-সভ্যতার ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন। তাঁদের অবদানের কথা মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। কাজেই তরবারি অপেক্ষা লেখনী অধিকতর শক্তিমান। আর এ জন্যই ইংরেজিতে বলা হয়— ‘Pen is mighter than the sword.’ পার্থিব জীবনে যা কিছু শক্তি বা বল দিয়ে জয় করা যায় না তা জ্ঞান ও বুদ্ধি দিয়ে খুব সহজেই জয় করা যায়।

আরও দেখুন:

অভাব অল্প হলে দুঃখও অল্প হয়ে থাকে | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

অভাব অল্প হলে দুঃখও অল্প হয়ে থাকে | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , প্রাসঙ্গিক অংশে ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক এবং পৌরাণিক তথ্য উল্লেখ করেছে তা বুঝে সম্প্রসারণ করতে হবে। ভাব সম্প্রসারণ লেখার সময় এর ব্যাখ্যা মূলত নির্ভর করে মান নির্ধারণের নম্বর। ভাব সম্প্রসারণ করার সময় অবশ্যই মান নির্ধারণ অনুসারে ভাবের সম্প্রসারণ করতে হয়। ভাব সম্প্রসারণ এর আলোচনাতে যাতে না হয় সে দিকে মনোযোগী হতে হবে এবং প্রকাশভঙ্গি যতটা সৌন্দর্য হবে ভাব সম্প্রসারণ এর সার্থকতা ততটাই বৃদ্ধি পাবে।

অভাব অল্প হলে দুঃখও অল্প হয়ে থাকে

পৃথিবীতে সম্পদ সীমিত কিন্তু অভাব অসীম। ধনী-দরিদ্র সবারই কম-বেশি অভাব থাকে। সে অভাব পূরণের জন্যে মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে। তবে ধনীদের অভাব অসীম। সে প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে কখনোই তুষ্ট নয়। সে সর্বদাই ধন বাড়ানোর জন্যে চিন্তাক্লিষ্ট থাকে। অভাবজনিত দুঃখবোধ তাকে কুরে কুরে খায়। কিন্তু প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে মানুষ যদি সুখী থাকে তবে তার কোনো দুঃখ থাকে না ৷

অভাব অল্প হলে দুঃখও অল্প হয়ে থাকে

চাহিদা বা অভাববোধ থেকেই মানুষের মনে দুঃখবোধ জন্মে। চাহিদার তারতম্যের ওপর নির্ভর করে দুঃখবোধের স্বল্পতা বা আধিক্য। ধনী-দরিদ্র সকলেরই অভাব আছে। তবে তাদের মধ্যে অভাবের ধরন এক নয়। বস্তুত প্রাপ্ত সম্পদ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে কোনো দুঃখ থাকে না। ধনীদের অনেকেই গগনচুম্বী অট্টালিকায় বাস করে বিলাস সামগ্রীর মধ্যে ডুবে থাকলেও আরও বেশি পাবার আশায় সর্বদা চিন্তাক্লিষ্ট থাকে। সম্পদ বৃদ্ধির নেশায় উন্মাদের মতো ছুটতে থাকে, এমনকি বৈধ-অবৈধ যে পন্থাই হোক, তা অবলম্বন করতে দ্বিধা করে না। দরিদ্র জনগণের মুখের অন্ন পর্যন্ত কেড়ে নেয়।

অপরদিকে বিত্তহীনরা বিত্তবানদের ধনৈশ্বর্য দেখে সম্পদ আহরণের ব্যর্থ চেষ্টা করে এবং সর্বদা হা-হুতাশ করে। বস্তুত যে কোনো জিনিসের আধিক্য মানবজীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। বিশেষ করে পার্থিব সম্পদ মানুষকে ক্রমেই অতৃপ্ত করে তোলে এবং মনুষ্যত্ব বিলীন করে দেয়। স্বপ্নাহার যেমন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, তদ্রূপ অল্প চাহিদাসম্পন্ন মানুষ সহজেই নিজেকে সুখী ভাবতে পারে।

মানুষ যদি তার যা আছে সেগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে তাহলে তার আর দুঃখ থাকে না। জনৈক মনীষী বলেছেন, ‘যত কম উপকরণ নিয়ে দিনাতিপাত করা যায় জীবনযাত্রা তত সুখের হয়।’ সুখী মানুষের গল্পে আমরা জানতে পারি তার কিছু না থাকায় সে সুখী জীবনযাপন করে। সুতরাং অভাববোধ যার যত কম তার দুঃখও তত কম হবে।বস্তুত অভাবকে অভাব হিসেবে বিবেচনা না করলে দুঃখের আগমন ঘটে না। তাই জীবন থেকে অভাববোধকে দূরে রাখতে হবে। অভাবকে জয় করার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।

আরও দেখুন:

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , ভাব সম্প্রসারণ শব্দের অর্থ ভাবের সম্প্রসারণ অর্থাৎ বিস্তারিতভাবে প্রয়োজনীয় উপমা দৃষ্টান্তমূলক যুক্তিসহকারে সহজ উপায় এবং সরল ভাষায় উপস্থাপন করতে হয় সম্প্রসারিত ভাব এর বিষয়বস্তু কি ছোট ছোট অনুচ্ছেদ আকারের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

অন্যায়কারী এবং অন্যায়কে যে প্রশ্রয় দেয় তথা অন্যায় সহ্য করে, উভয়েই সমান অপরাধী। নিজে অন্যায় না করলেই যে তার কর্তব্য ফুরিয়ে যায় এমনটি নয়। বরং অন্যায়কে প্রতিহত করাই সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য।সমাজকে যারা উৎপীড়ন করে, ব্যক্তির অধিকারকে যারা হরণ করে, মানুষের বহু অভিজ্ঞতা এবং প্রযত্নে রচিত আইন ও শৃঙ্খলাকে যারা বিঘ্নিত করে তারা নিঃসন্দেহে অন্যায়কারী। অন্যায়ের যেমন বহুক্ষেত্র আছে, অপরাধেরও তেমনি মাত্রার তারতম্য আছে।

এই মাত্রা অনুসারেই অন্যায়কারীর অপরাধের পরিমাপ করা হয়। আইনের দৃষ্টিতে অন্যায়কারী বা অপরাধী দণ্ডযোগ্য বলে বিবেচিত। কিন্তু অন্যায়কে যারা নিঃশব্দে সহ্য করে, তারাও কি পরোক্ষভাবে পাপের প্রশ্রয় দিয়ে সমান অপরাধী নয়? — অবশ্যই তারাও সমান অপরাধী। উদার মনোভাব প্রদর্শন করার জন্য অন্যায়কে ক্ষমা করা বা দয়া দেখিয়ে অন্যায়কারীকে আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব তো নেই-ই, বরং তাও অন্যায়কারীর মতো সমান অপরাধের কাজ। সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে যেমন রয়েছে অপরাধের প্রবণতা, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রয়েছে অন্যায়কে মানিয়ে চলার মানসিকতা। এই মানসিকতায় কতখানি ক্ষমাশীলতা, কতখানি ঔদার্য, কতখানি সহনশক্তি তার পরিমাণ করা দুঃসাধ্য।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

অন্যায়কে সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা না করে ক্ষমা করে দেওয়ার মধ্যে মানবচরিত্রের দুর্বলতম দিকেরই প্রকাশ ঘটে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দান করলে পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। বস্তুত মানুষ শুধু তিতিক্ষা ও করুণাবশতই অন্যায়কারীকে ক্ষমা করে না; তার এই মনস্তত্ত্বের নেপথ্যে রয়েছে এক আত্ম-পলায়নী মনোভাব। নিজেকে অপরাধীর সংস্রব থেকে দূরে সরিয়ে রাখাকেই সে নিরাপদ বলে মনে করে। অধিকাংশ মানুষেরই এই নির্লিপ্ত নিস্পৃহতা অন্যায়কারীকে পরোক্ষভাবে সাহস জুগিয়েছে। স্বার্থভীরু আত্মমগ্ন মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠতে ভয় পায়।

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

এভাবেই সমাজে অপরাধপ্রবণতা কালক্রমে প্রবল হয়ে ওঠে; অত্যাচারীরা নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে চলে। মানব সংসারে অন্যায়কারীরা ঘৃণিত হলেও অন্যায় সহ্যকারী কিংবা ক্ষমাকারীরা অনেকসময় ঘৃণিত বলে বিবেচিত হয় না। মানুষের ন্যায়-অন্যায়ের এই চেতনা ও ভ্রান্ত। অন্যায়কারীর মত সহ্যকারীও সম-অপরাধে অপরাধী। মনুষ্যত্বের বিচারে মানুষের এই বিকৃতিও ক্ষমার অযোগ্য। বিশ্ববিধাতার ঘৃণার রুদ্র রোষানলে অন্যায়কারীর মতো অন্যায় সহ্যকারীও বিশুষ্ক তৃণের মতো ভস্মীভূত হবে। আসলে বস্তুজগতের স্থূল বিচারে সে নিরপরাধের ছাড়পত্র পেলেও নিখিল বিশ্বমানবতার দরবারে তার অপরাধের রেহাই নেই ।

কারও অপরাধ ক্ষমা করার মধ্যে যে উদারতা আছে তা মনুষ্যত্বেরই পরিচয়। কিন্তু ক্ষমার মাত্রা থাকা চাই। অন্যায়কারী যদি ক্ষমা পেয়ে বার বার অন্যায় করতে থাকে তবে সে ক্ষমার যোগ্য নয়। এতে তার অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। এই ধরনের অন্যায়কারীর অন্যায় ক্ষমা করা কোনো মহৎ ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। বরং সেও অন্যায়কারীর মতো সমান অপরাধী হবে। তাই অন্যায় যে করে সে যেমন সমাজে নিন্দনীয় ও ঘৃণার পাত্র, তেমনি অন্যায়কে যিনি বিনা বাধায়, মৌন অবলম্বন করে প্রশ্রয় দেন তাঁকেও ঘৃণার পাত্র ও নিন্দনীয় ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা উচিত।

আরও দেখুন:

অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে চেনা যায় | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে চেনা যায় | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , যে গদ্য এবং কবিতার অংশটুকু ব্যবহার করে ভাবের সম্প্রসারণ করতে হবে সেই অংশটুকু অবশ্যই বারবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে বুঝে নিতে হবে সে অংশটিতে কি বোঝাতে চেয়েছেন। আর এজন্য লেখোকের অর্থবহ রচনা |

অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে চেনা যায়

মানুষ তার দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাধ্যবাধকতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়। বাধ্যবাধকতার মধ্যে মানব মনের বিকাশ ঘটে না বলে তার প্রকৃত স্বভাব সম্পর্কেও অবগত হওয়া যায় না। পক্ষান্তরে তাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হলে তার স্বরূপ চেনা খুব সহজ হয়ে যায়। কেননা তখন তার প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মানুষ তার আয় ও ব্যয়ের হিসেব করে নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাধ্যবাধকতার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে বলে, সে স্বাধীনভাবে কিংবা মনের ইচ্ছানুযায়ী কিছু করতে পারে না। ফলে তার আসল চেহারাটা বের হয়ে আসে না। মানুষের আসল রূপের পরিচয়ের জন্যে তাকে গণ্ডির বাইরে ছেড়ে দিতে হবে। স্বাধীনভাবে সে যখন চলাফেরা করবে কিংবা নিজের খেয়ালখুশি মতো খরচ করবে তখন তার আসল পরিচয় পাওয়া যাবে।

অন্য খরচের চেয়ে বাজে খরচেই মানুষকে চেনা যায় | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

আমাদের সমাজ জীবনে হিসেবি এবং বেহিসেবি মানুষের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। মানুষ যখন নিছক বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে অপব্যয় করে তখন তাকে আমরা উচ্ছৃঙ্খলতার পর্যায়ে ফেলি। আবার কেউ যদি পূর্ণস্বাধীনতা পেয়েও কোনো খরচ না করে তবে তাকে আমরা কৃপণ বলি। ফলে, অপব্যয়ের মধ্য দিয়ে আমরা সমাজের মধ্যে নানা বৈশিষ্ট্যের লোক খুঁজে পাই। বস্তুত বেহিসেবি খরচের মধ্য দিয়েই মানুষের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আরও দেখুন:

সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , সাধারণত ভাব সম্প্রসারণ করার জন্য প্রদত্ত কবিতার অংশ অথবা গদ্যের অংশ অতিসংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। আর এই ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে লুকিয়ে থাকে সহস্ত্র ভাবের ইঙ্গিত। আর এইভাবে রিংগিত কে সম্প্রসারণ করার জন্য অবশ্যই সতর্কতার সাথে সেই মৌলিক বিষয় খুঁজে বের করতে হয় এবং এর মাধ্যমে ভাব সম্প্রসারণ করতে হয়।

সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি

মানুষ নিজেই তার নিজের জীবনের প্রকৃত রূপকার। প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে এগোতে হয় মানুষকে। তাতে জয়-পরাজয়ের আনন্দ-দুঃখ, উল্লাস-বেদনা আছে। কিন্তু কিছু পরাভূত ভাগ্যহত মানুষের ধারণা তাদের পরাভবের পেছনে আছে এমন এক অদৃশ্য অমোঘ দৈব শক্তি, যা তাদের বিড়ম্বিত ভাগ্যবিপর্যয়ের কারণ। এই অদৃশ্য শক্তিই ‘অদৃষ্ট’ বা ‘নিয়তি’ বলে অভিহিত। এ শক্তি নাকি মানুষের করায়ত্তের বাইরে, সাধ্যের অতীত, এর হাতে মানুষ ক্রীড়নক, মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত। বস্তুত যারা ভীরু, দুর্বল; যাদের আত্মবিশ্বাস কম, শুধু তারাই অদৃষ্টবাদী। মানুষ অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠ শ্রমের দ্বারা তার নিজ ভাগ্যকে সার্থক করে তোলে। এ জগৎ সংসারে প্রতিটি মানুষের অগ্রযাত্রা নির্ভর করে তার সচেতন ও সক্রিয় কর্মপ্রয়াসের ওপর। কর্মজীবনে সফল

সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি

প্রতিটি মানুষই নিজেদের চেষ্টা, সাধনা ও শ্রমে রচনা করেছেন নিজেদের সৌভাগ্য। কিন্তু আজও কোন কোন বিপন্ন মানুষকে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে নিশ্চেষ্ট হতে দেখা যায়। আজও বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কেউ কেউ নিজেকে সমর্পণ করে অদৃষ্টের অলীক হাতে। তাদের ধারণা এক অদৃশ্য দৈবশক্তি নেপথ্য থেকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে চালনা করে চলেছে। বস্তুত নিয়তি, দৈবশক্তি বা অদৃষ্ট মানুষের জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে না। মানুষের কর্মধারাই গড়ে তোলে তার জীবনকে। অতীতের কর্মই তাকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, আর বর্তমানের কর্মের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সে ভবিষ্যৎপানে এগুচ্ছে।

এটাই জগতের কর্মচক্র ও জীবনচক্রের গতি। যৌবনশক্তির দুর্বার গতিবেগে প্রাণচঞ্চল যারা, দুর্মর সংগ্রামের ক্ষুরধার পথে হাঁটাই তাদের ধর্ম। অদৃশ্য দৈবী শক্তিতে তারা বিশ্বাসী নয়, সংগ্রামে- সংঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসলটি তুলে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। তাদের দৃঢ় প্রত্যয় হলো ভাগ্য মানুষকে চালিত করে না, মানুষই ভাগ্য গড়ে। কর্ম হল সুপ্রসন্ন সৌভাগ্যের জনক। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে কর্মবিমুখতা নিজের শক্তিমত্তার কাছ থেকে পলায়নী মনোবৃত্তির নামান্তর। কর্মবীর মানুষই সৌভাগ্যের স্বর্ণশীর্ষে হয় আসীন।

অপরদিকে অদৃষ্টনির্ভর মানুষ তার নিশ্চেষ্ট আলস্যহেতু পদে পদে বরণ করে পরাজয়, জীবনভর তাকে হতাশায় নিরাশায় দীর্ঘশ্বাসের সেতু রচনা করতে হয়। এজন্য ভবিষ্যৎ জীবনকে সহজ ও সুন্দর, সুখ ও আনন্দময় করতে হলে মানুষকে বর্তমান মুহূর্তকে কাজে লাগাতে হয়। একনিষ্ঠ শ্রমে ও সাধনায় রচনা করতে হয় ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি। সে কাজ যদি ভালো হয় তবে তার ফলও হয় ভালো। কর্মমুখর অতীত রচনা করে সুন্দর বর্তমান ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ; কর্মহীন

অতীত জন্ম দেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের। অতীত মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। অতীত নীরবে মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর তার প্রভাব রাখে। অতীতের ওপর ভিত্তি করেই মানুষের আগামী দিনের জীবন গড়ে ওঠে। অতীতের কৃতকর্ম, কর্মপ্রেরণা, অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই মানুষ সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তাই জীবনের ব্যর্থতার দায় অদৃষ্টের ওপর চাপিয়ে হা-হুতাশ না করে প্রত্যেকেরই উচিত আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সচেষ্ট ও ব্রতী হওয়া।

আরও দেখুন:

অর্থসম্পত্তির বিনাশ আছে কিন্তু জ্ঞানসম্পদ কখনো বিনষ্ট হয় না | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

অর্থসম্পত্তির বিনাশ আছে কিন্তু জ্ঞানসম্পদ কখনো বিনষ্ট হয় না | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , ভাব সম্প্রসারণ এর সময় সেই চরণের মূল গভীর ভাবটুকু উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং উপমা ব্যবহার করে সেইসাথে প্রয়োজন অনুসারে উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়া। কবি বা লেখকের যেখানে তার বক্তব্যকে ব্যঞ্জন এবং ইঙ্গিত ধর্মী করে প্রকাশ করেন সেগুলো কে আলোক ধর্মী হিসাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে ভাব সম্প্রসারণ করা হয়।

অর্থসম্পত্তির বিনাশ আছে কিন্তু জ্ঞানসম্পদ কখনো বিনষ্ট হয় না

নশ্বর এই পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তুর ক্ষয় বা বিনাশ অনিবার্য, কিন্তু যে-সম্পদটির বিনাশ নেই বরং বিকাশ আছে তা হল জ্ঞানসম্পদ। জ্ঞান অবিনাশী বলে একবার তা অর্জন করলে সারাজীবনের সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। জ্ঞানই মানুষের চরম, পরম ও একান্ত নিজস্ব মহামূল্যবান সম্পদ ।

মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। অর্থের জন্যে মানুষ উদয়-অস্ত পরিশ্রম করে। অর্থ এমন একটি সম্পদ যা দিয়ে আমরা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে মানুষের অবস্থানকে নির্ণয় করে থাকি। কিন্তু এ অর্থসম্পদ কেবল মানুষের বাইরের দিকটিকেই প্রকাশ করে। অর্থ-সম্পদ যতই শক্তির অধিকারী হোক না কেন, জ্ঞানসম্পদের কাছে তা নিষ্প্রভ। সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি বিত্তশালী লোকের চেয়ে অনেক বেশি ধনবান ও শক্তিমান।

বস্তুত অর্থ- সম্পদের কোনো স্থায়িত্ব নেই। আজকে রাজা, কালকে ফকির এরকম দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। বিত্তবানের ধনভাণ্ডার এক সময়ে নিঃশেষ হয়ে আসে, কিন্তু বিদ্বানের জ্ঞানভাণ্ডার ক্রমাগত সমৃদ্ধ হতে থাকে। সময়ের ব্যবধানে সে অধিকতর জ্ঞানী হতে থাকে। নশ্বর পৃথিবীতে জ্ঞান অবিনশ্বর। যিনি জ্ঞানী তিনি আমৃত্যু জ্ঞানরূপ সম্পদে সম্পদশালী । তার ক্ষয় নেই।

অর্থসম্পত্তির বিনাশ আছে কিন্তু জ্ঞানসম্পদ কখনো বিনষ্ট হয় না

এমনকি মৃত্যুর পরেও জ্ঞানের প্রাচুর্য পৃথিবীতে বিরাজ করে জ্ঞানীদের অমরত্ব দান করে। তাই অর্থ- সম্পদে নয় জ্ঞানসম্পদে সমৃদ্ধ ব্যক্তিগণই দেশ ও জাতির প্রকৃত সম্পদ, আর এ জন্যে অর্থসম্পদের মাপকাঠিতে নয়, জ্ঞানসম্পদের মাপকাঠিতেই মানুষের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। তাই, মহানবী (স) ‘জ্ঞানীর কলমের কালিকে শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র’ বলেছেন। তিনি ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত ‘ ‘ মানুষকে জ্ঞানার্জনের উপদেশ দিয়েছেন এবং এ-জন্য ‘সুদূর চীনেও যেতে’ উৎসাহিত করেছেন।

বিশ শতকের বাংলা সাহিত্য | ভাষা ও সাহিত্য | বাংলা রচনা সম্ভার

জ্ঞান অতুলনীয় সম্পদ। জ্ঞানার্জন ধনার্জনের চেয়েও মহত্তর। মানুষ তার স্বরূপকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করতে পারে শুধু জ্ঞান, আহরণের মধ্য দিয়েই। জাগ্রত করতে পারে নিজের ক্ষমতাকে, সেবাদান করতে পারে বিশ্বমানবতাকে। তাই সবমানুষেরই উচিত জ্ঞান আহরণ করা। স্মরণ রাখতে হবে যে, ‘শিক্ষা বা জ্ঞানই একমাত্র সম্পদ, যা তোমার জীবনের মতো মহামূল্যবান। ‘

আরও দেখুন:

অর্থই অনর্থের মূল | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

অর্থই অনর্থের মূল | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , ভাব-সম্প্রসারণ হচ্ছে এভাবে সুসংগত সমর্থক প্রসারণ। ভাবের সংহতিকে উম্মোচিত, নির্ণীত করে একটি অতুলনীয় দৃষ্টান্ত বা প্রবাদ প্রবচন এর সাহায্যে সহজ ভাষায় বিস্তারিত তত্ত্বের প্রসারণ ঘটে তাকে মূলত ভাব-সম্প্রসারণ বলা হয়। ভাব সম্প্রসারণ সাধারণত কবিতা বা যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটি চলন এর মাধ্যমে তা ভাবে পূর্ণ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আর এই আলোচনায় ভাবনা লুকায়িত সকল মানব জীবনের আদর্শ এবং ব্যক্তিচরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য, নৈতিকতা এবং বিচ্যুতি ফুটে উঠে।

অর্থই অনর্থের মূল

স্রষ্টা মানুষকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, অপরদিকে পার্থিব জীবনে মানুষের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অর্থ। তাই অর্থ মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন, তথা অর্থকে সে পরিচালিত করে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষ যখন অর্থের কাছে জিম্মি হয়ে অর্থের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখনই জগতসংসারে অর্থ অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়ায়। অর্থ-সম্পদ মানবজীবনের জন্যে অপরিহার্য হলেও এর যথাযোগ্য ব্যবহার না হলে ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নেমে আসে অকল্যাণ

জীবনধারণের জন্যে অর্থের প্রয়োজন অপরিহার্য। পার্থিব জীবনে অর্থ বা বিত্তই মানুষের একান্ত কামনা। অর্থ বা সম্পদের-মোহে মানুষ জীবনসংগ্রামে লিপ্ত হয়। মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত অর্থ উপার্জনের জন্যে কঠোর পরিশ্রম করে এবং নানা প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করে। অর্থ মানুষের আজীবন প্রয়োজন মেটায় বলে অর্থ ছাড়া জীবন অর্থহীন বা মূল্যহীন বলে বিবেচিত হয়। তাই সারাজীবন মানুষ অর্থের পেছনে ছোটে। বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র অর্থের মাপকাঠি দ্বারাই প্রতিপত্তি ও সম্মান নির্ণীত হয় বলে, কী করে অর্থ উপার্জন করা যায় তার জন্যে মানুষের চেষ্টার অন্ত নেই।

বিপদে-আপদে, উৎসবে-আনন্দে, জন্ম-মৃত্যুতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ ও সম্পদ অনেকসময় সুখ ও কল্যাণের বদলে অকল্যাণ বয়ে আনে। জগতে সকল অপকর্মের মূলে অর্থ। অর্থই জীবনকে প্রবাহিত করে, আবার অর্থই জীবনকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে— ‘অর্থই জীবন, অর্থই মৃত্যু।’ অর্থের লোভে নীতিবর্জিত হয়ে মানুষ অহরহ নানা দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়। অন্যায় পথে অর্জিত অর্থ মানুষকে বিবেকহীন ও দাম্ভিক করে তোলে। অর্থের লালসা মানুষের নৈতিক অধঃপতন ঘটায়। অর্থের লোভেই চরিত্রহীন হয়ে মানুষ সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়। পৃথিবীর সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও অশান্তির মূলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে অর্থ।

অর্থই অনর্থের মূল

অর্থ-সম্পদের স্বার্থেই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধের উন্মাদনা জাগে, শ্রমিকে মালিকে বাধে মত-বিরোধ, ভাইয়ে ভাইয়ে শুরু হয় চরম শত্রুতা। অর্থের লোভেই মানুষ মানুষকে খুন করে। তাই জগতের সব অশান্তি ও অনর্থের মূলে রয়েছে অর্থ। অর্থের লোভেই মানুষ নৈতিকতা বিসর্জন দেয়। অর্থই মানুষকে ভুল পথে চালিত করে।

অর্থই অনর্থের মূল

সুষ্ঠু সমাজজীবন ও স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করার জন্যে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু অর্থ যেন অনর্থের মূল না হয় তার দিকে লক্ষ রাখতে হবে। সকল অনর্থের মূল হিসেবে বিবেচিত অর্থ-সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারই এর মর্যাদা বৃদ্ধি করে। প্রসঙ্গত বেকনের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য: ‘টাকা-পয়সা ভৃত্য হিসেবে উত্তম হলেও মনিব হিসেবে একেবারে মন্দ।’

আরও দেখুন:

ভাব-সম্প্রসারণ লেখার পদ্ধতি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

ভাব-সম্প্রসারণ লেখার পদ্ধতি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা , ভাবের সুসঙ্গত সার্থক প্রসারণই ভাব-সম্প্রসারণ। আবৃতকে উন্মোচিত, সংকেতকে নির্ণীত করে তুলনীয় দৃষ্টান্ত ও প্রবাদ-প্রবচনের সাহায্যে সহজ ভাষায় ভাবের বিন্দুকে বিস্তার করার নাম ভাব-সম্প্রসারণ। সাধারণত কবিতা বা গদ্যের দু-একটি তাৎপর্যপূর্ণ বা ভাবব্যঞ্জনাময় চরণ ভাব-সম্প্রসারণের জন্যে দেওয়া হয়। এই ভাবব্যঞ্জনায় লুক্কায়িত থাকে মানব-জীবনের কোনো মহৎ আদর্শ কিংবা কোনো ব্যক্তিচরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নৈতিক কোনো বিচ্যুতি। ভাব-সম্প্রসারণের সময় সেই গভীর ভাবটুকু উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় যুক্তি, বিশ্লেষণ, উপমা, উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। কবি বা লেখক যেখানে তাঁর বক্তব্যকে ব্যঞ্জনা বা ইঙ্গিতধর্মী করে প্রকাশ করেন, ভাব-সম্প্রসারণে তাকে সেখানে আলোচনাধর্মী করে উপস্থাপিত করা হয়।

ভাব-সম্প্রসারণ লেখার পদ্ধতি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

ভাব-সম্প্রসারণের জন্য প্রদত্ত কবিতা বা গদ্যের অংশটি সাধারণত খুব সংক্ষিপ্ত হয়। পরিসর যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, তা কিন্তু একটি বড় ভাবকে আশ্রয় দিয়ে থাকে। সতর্কতার সঙ্গে সেই মৌল ভাবটিকে খুঁজে বের করতে হবে। নিচের উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যাক :

কেরোসিন শিখা বলে মাটির প্রদীপে “ভাই বলে ডাক যদি দেব গলা টিপে’ ।

হেনকালে আকাশেতে উঠিলেন চাঁদা;

কেরোসিন শিখা বলে, ‘এসো মোর দাদা’।

এখানে ‘কেরোসিন শিখা’, ‘মাটির প্রদীপ’ এবং ‘চাঁদ’ এই তিনটি বস্তুই রূপক। অর্থাৎ এদের রূপের আড়ালে কবি ভিন্ন কোনো ভাবের কথা ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। যে কেরোসিন শিখা মাটির প্রদীপের আত্মীয়তা অস্বীকার করে, সেই আবার নিজের অবস্থা বিস্মৃত হয়ে চাঁদকে আত্মীয় সম্ভাষণে বিগলিত হয়ে ওঠে। এখানে কেরোসিন শিখার মধ্যেই মূল ভাবটি দ্যোতিত হয়েছে। সে আসলে কেরোসিন শিখা নয়; সে হল আত্মমর্যাদাহীন, সংকীর্ণচিত্ত, আত্মম্ভরি তোষামোদপ্রিয় মানুষ। এখানে সেই মানুষের কথাই বিশদভাবে বলতে হবে। আর একটি উদাহরণ উল্লেখ করা যাক :

দণ্ডিতের সাথে

দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।

এই কাব্যাংশটি রূপকাশ্রিত নয়; ভাবব্যঞ্জক এই চরণে একটি বিশেষ চিন্তা নিহিত আছে। কবিতাটির বাচ্যার্থ হল, সেই বিচারই শ্রেষ্ঠ যেখানে দণ্ডদাতা দণ্ডিতের সঙ্গে সমান বেদনা বোধ করেন। কিন্তু বাচ্যার্থ এখানে সমগ্র ভাবটিকে প্রকাশ করতে পারছে না, কেননা বাচ্যার্থকে ছাপিয়ে বিষয়টির ভাব ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে। বিচারক যদি নিষ্প্রাণ যন্ত্রবিশেষরূপে শুধু আইনের অনুসরণ করেই বিচারকার্য সম্পন্ন করেন তবে সে বিচার সার্থক নয়। দণ্ডিতকে ঘৃণিত অপরাধীরূপে নয়, তাকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে, মমতা ও সহানুভূতির সাহায্যে বিচার করতে হবে।

ভাব-সম্প্রসারণের আবশ্যকতা

জ্ঞান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে ভাব-সম্প্রসারণের অনুশীলন করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, ভাব-সম্প্রসারণ নিয়মিত অনুশীলন করলে—

১. কোনো সংক্ষিপ্ত, অর্থপূর্ণ বক্তব্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

২. কোনো বিশেষ বক্তব্য থেকে সাধারণ সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।

৩. ভাব-প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষা চর্চার যে গুরুত্ব আছে তা অনুধাবন করা যায়

ভাব-সম্প্রসারণ লেখার পদ্ধতি

ভাব-সম্প্রসারণের কাজটি সার্থক করতে হলে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে :

১. ভাব-সম্প্রসারণ করতে হলে উদ্ধৃত অংশ বা সারগর্ভ বাক্যটি মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ে তার প্রচ্ছন্ন ভাবটুকু বুঝে নিতে হবে। লেখকের রসঘন অর্থবহ রচনার মূল্যবান অংশ, কবিগণের ভাবগর্ভ ও উজ্জ্বল পঙ্ক্তি, প্রবাদ

ইত্যাদি যেসব অংশ ভাব-সম্প্রসারণের জন্যে দেয়া হয়, তার যথার্থ মর্ম বুঝতে পারলে ভাব-সম্প্রসারণ সহজ হয়।

২. মূলভাব উপমা, রূপক, প্রতীক বা সংকেতের আড়ালে আছে কিনা তা দেখে, মূল তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

৩. ভাব-সম্প্রসারণ কথাটির অর্থ যেহেতু ভাবের সম্প্রসারণ বা বৃদ্ধি, তাই প্রয়োজনীয় উপমা বা দৃষ্টান্ত এবং যুক্তি দিয়ে বক্তব্য-বিষয়কে সহজ-সরলভাবে উপস্থাপন করতে হবে। প্রাসঙ্গিক হলে ঐতিহাসিক, পৌরাণিক বা বৈজ্ঞানিক তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে।

৪. ভাব-সম্প্রসারণের সময় ভাবের সম্প্রসারণ বা বৃদ্ধি করতে হয় বলে বাহুল্য বর্জন করতে হবে, অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় কথা কিংবা একই কথার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সেদিকে বিশেষ লক্ষ রাখতে হবে। সম্প্রসারিত লেখার আয়তন হবে প্রদত্ত মান নির্ধারক নম্বর অনুযায়ী।

৫. সম্প্রসারিত-ভাবের বিষয়বস্তুকে ছোট ছোট অনুচ্ছেদের মাধ্যমে স্পষ্ট করে তুলতে হবে। তবে তিন-চার অনুচ্ছেদের বেশি না হওয়াই ভাল।

৬. আলোচনাটি যাতে রসহীন মনে না হয় সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। প্রকাশভঙ্গির সৌন্দর্যের ওপরে ভাব- সম্প্রসারণের সার্থকতা নির্ভর করে।

৭. কাজটি যেহেতু ভাবের বিস্তার তাই কবি বা লেখকের নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। এমনকি প্রদত্ত কবিতা বা গদ্যে লেখকের অভিপ্রায় বিষয়েও মন্তব্য করা যাবে না। যেমন : ‘কবি এখানে বলতে চেয়েছেন …’,

‘লেখকের মতে …

‘ ইত্যাদি।

৮. প্রবাদ-প্রবচনের যথাযথ ব্যবহার লেখার তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি করে বলে তা গ্রহণযোগ্য। প্রয়োজনে যুক্তিযুক্ত উপমা কিংবা উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে অযথা উদ্ধৃতির ব্যবহার মূল বিষয়ের সৌন্দর্যহানি ঘটায় বলে তা অবশ্যই বর্জনীয়।

উপর্যুক্ত নিয়মগুলো অনুসরণ করার সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।

ভাব-সম্প্রসারণ লেখার পদ্ধতি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

সঙ্গতি

একজাতীয় ভাবের বাক্যকে পাশাপাশি অবস্থিত আরেক জাতীয় ভাবের বাক্যের সঙ্গে গঠনগত এবং ভঙ্গির দিক থেকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, অর্থাৎ একটি বাক্যের ভাবের গতিকে পরবর্তী ভাবের মধ্যে মসৃণভাবে অনুপ্রবিষ্ট করে দিতে হবে। এভাবে একটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে পরবর্তী অনুচ্ছেদটিকে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গেঁথে দেয়া যায় তাও ভাবতে হবে। বাক্যের সঙ্গে বাক্যের বা অনুচ্ছেদের সঙ্গে অনুচ্ছেদের এই সঙ্গতি বিধানের উপায়কে ‘সঙ্গতি’ (coherence) বলে আখ্যায়িত করা যায়।

নিচের অনুচ্ছেদটি লক্ষ কর

মানুষ সামাজিক জীব। তাকে সমাজের আর দশজনের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। এই বন্ধন পারস্পরিক নির্ভরশীলতার, পারস্পরিক সহানুভূতির। কারণ, কোনো মানুষই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। একের সুখে-দুঃখে, আনন্দে-বিষাদে, আচারে অনুষ্ঠানে, সব ক্ষেত্রেই অপরের অবদান বিদ্যমান। সমাজের বিশাল পরিবারের তারা প্রত্যেকেই এক এক জন সদস্য। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সঙ্গে বাঁধা। ফলে, প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের কোনো-না-কোনো দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক বিদ্যমান। মোটের ওপর, এই দেয়া-নেয়া হল বন্ধুত্বের দেয়া-নেয়া, হৃদ্যতার আদান-প্রদান। কিন্তু, বিশেষভাবে সংকীর্ণ অর্থে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, সেই দেয়া- নেয়ার মধ্যে বস্তুগত উপাদানও রয়েছে। উপর্যুক্ত অনুচ্ছেদটিতে মোটা অক্ষরবিশিষ্ট পদগুলো বাক্যের সঙ্গে বাক্যের সঙ্গতি রক্ষার জন্যে ব্যবহৃত হয়েছে।

ভাব-সম্প্রসারণ লেখার পদ্ধতি | ভাব-সম্প্রসারণ | ভাষা ও শিক্ষা

তথ্য এবং অভিমত

যে-কোনো লেখায়, লেখকের কিছু তথ্য এবং অভিমত মিশ্রিত থাকা স্বাভাবিক। এ কারণে এ দুটি উপাদানকে লেখার মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন কোনটি তথ্য আর কোনটি অভিমত তা পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়। যেমন : তথ্য উপস্থাপন করার আগে অনেক সময় কোনো সংকেত দেয়াই হয় না। আবার কখনো কখনো কিছু শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে সে ব্যাপারে আগে থেকে আভাস দেয়া হয়। যেমন : অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, … / বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন, … / প্রকৃতপক্ষে, …/ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, … ইত্যাদি। অপরপক্ষে, মতামত বা অভিমত প্রকাশ করার আগে কিছু শব্দ বা শব্দগুচ্ছ অবশ্যই ব্যবহার করা উচিত, যেমন : এ-ক্ষেত্রে, আমি মনে করি, … / অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বা হচ্ছে, … / বলা হয়ে থাকে যে… ইত্যাদি।

  • বৈচিত্র্য এবং বাক্যবিন্যাস

রচনা, ভাবসম্প্রসারণ, প্রতিবেদন, গল্প, গবেষণাপত্র ইত্যাদি লেখার সময় — যথাযথ বাক্যবিন্যাসের মাধ্যমে লেখায় বা বক্তব্যের উপস্থাপনে কীভাবে বৈচিত্র্য আনা যায় সে-দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। দেখতে হবে সব বাকের

দৈর্ঘ্য যেন একরূপ না হয়। তাতে লেখাটিতে একঘেয়েমির দোষ এসে যাবে। এছাড়া কিছু কিছু বিশেষ গঠনের বাক্যের সঙ্গে অন্যান্য নির্দিষ্ট কিছু গঠনের বাক্য খাপ খায় না, বা তারা পাশাপাশি অবস্থান করলে লেখার সৌন্দর্য নষ্ট হয়। যেমন, একই ভাবকে ফুটিয়ে তোলার জন্যে একই অনুচ্ছেদে কর্তৃবাচ্যের বাক্য এবং কর্মবাচ্যের বাক্য ব্যবহার করলে অনুচ্ছেদের গঠনগত সৌন্দর্য নষ্ট হবার সঙ্গে সঙ্গে তার উপস্থাপনগত অসঙ্গতি দেখা দেয়। আরো কিছু ক্ষেত্রে এরূপ সমস্যা দেখা দেয়। সুতরাং এ-বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখতে হবে।

  • অন্তঃস্থাপন

কখনো কখনো একটি বাক্যকে অন্য একটি বাক্যের অংশ হিসেবে অনুপ্রবিষ্ট করানো হয়, যাকে পুরোপুরি স্বতন্ত্র একটি বাক্য হিসেবে ব্যবহার করা যেত। বৈচিত্র্য, সংক্ষিপ্ততা এবং নাটকীয়তা আনয়নের উদ্দেশে লেখার মধ্যে এভাবে একটি বাক্যকে অন্য একটি বাক্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই উপায়টিকে ‘অন্তঃস্থাপন’ নামে অভিহিত করা যায়। লেখার মান উন্নত করার জন্যে এটি একটি বহুল ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এভাবে ব্যবহৃত অনুপ্রবিষ্ট বাক্যকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল বাক্য থেকে কমা (, ) বা ড্যাশ (—) চিহ্ন দ্বারা বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। যেমন : রহিম সাহেব আজ মারা গেছেন। তিনি ছিলেন এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এ-বাক্য দুটির বদলে একটিমাত্র বাক্য লেখা যায়, যেখানে প্রথমটিতে দ্বিতীয়টি অন্তঃস্থাপিত। যেমন : রহিম সাহেব এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আজ মারা গেছেন।

আরও দেখুন:

Exit mobile version