একটি ভাষাকে কেবল বলা বা লেখার সমষ্টি মনে করলে ভুল হবে; ভাষা হলো একটি সুশৃঙ্খল জৈবিক ও গাণিতিক কাঠামো। এই কাঠামোর নামই হলো ব্যাকরণ। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ব্যাকরণকে কেবল নিয়মের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি ‘বিজ্ঞান’ এবং এর ‘দার্শনিক ভিত্তি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
Table of Contents
ব্যাকরণ বিজ্ঞান: সংজ্ঞা, প্রয়োজনীয়তা ও দার্শনিক ভিত্তি
১. ব্যাকরণ বিজ্ঞানের সংজ্ঞার্থ (Definition of Grammar Science)
‘ব্যাকরণ’ শব্দটি সংস্কৃত। এর ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ হলো: বি + আ + √ কৃ + অন। যার আক্ষরিক অর্থ হলো— ‘বিশেষভাবে বিশ্লেষণ’।
ব্যাকরণ বিজ্ঞান বলতে কী বোঝায়?
যে শাস্ত্র পাঠ করলে ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা যায় এবং ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠনতন্ত্রের নিয়মাবলী স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়, তাকে ব্যাকরণ বিজ্ঞান বলে। ব্যাকরণকে ভাষার ‘সংবিধান’ বা ‘মানচিত্র’ বলা হয়।
মনীষীদের চোখে ব্যাকরণ:
- ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: “যে শাস্ত্রে বাংলা ভাষার স্বরূপ ও প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয় এবং যে শাস্ত্র পাঠ করলে বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।”
- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: “যে শাস্ত্র জানিলে বাঙ্গালা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখিতে, পড়িতে ও বলিতে পারা যায়, তাহার নাম বাঙ্গালা ব্যাকরণ।”
২. ব্যাকরণ কেন একটি ‘বিজ্ঞান’? (Why Grammar is a Science?)
ব্যাকরণকে কেবল সাহিত্যিক আলোচনার অংশ মনে করা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে একটি ভুল ধারণা। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান কারণ:
- পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ: একজন বিজ্ঞানী যেমন উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করেন, একজন ব্যাকরণবিদ বা ভাষাবিজ্ঞানী তেমনি মানুষের মুখনিঃসৃত ধ্বনি পর্যবেক্ষণ করে তার প্যাটার্ন বা ছাঁচ খুঁজে বের করেন।
- সার্বজনীন সূত্র: রসায়নের সূত্রের মতো ব্যাকরণেরও সুনির্দিষ্ট সূত্র আছে। যেমন— ‘কর্তা অনুযায়ী ক্রিয়া পদ পরিবর্তিত হবে’—এটি একটি ভাষাতাত্ত্বিক সূত্র।
- গাঠনিক নিখুঁততা: গণিতের মতো ব্যাকরণও একটি নির্দিষ্ট লজিক বা যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সন্ধি, সমাস বা কারক মূলত গাণিতিক বিন্যাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩. ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা (Importance of Studying Grammar)
ভাষা বহমান নদীর মতো। একে শৃঙ্খলিত রাখা এবং এর উৎকর্ষ সাধনের জন্য ব্যাকরণ অপরিহার্য:
- ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ: ব্যাকরণ আমাদের শেখায় কোথায় ‘এ’ ধ্বনি হবে আর কোথায় ‘অ’ ধ্বনি। এটি ভাষার বিকৃতি রোধ করে।
- স্থায়িত্ব ও শৃঙ্খলা দান: নিয়ম না থাকলে ভাষা কয়েক দশকের মধ্যে এতটাই বদলে যেত যে পূর্বপুরুষের সাহিত্য পরবর্তী প্রজন্ম বুঝতে পারত না। ব্যাকরণ ভাষাকে একটি সুসংহত রূপ দেয়।
- বোধগম্যতা: ব্যাকরণ ব্যবহারের ফলে বক্তার বক্তব্য শ্রোতার কাছে দ্ব্যর্থহীনভাবে পৌঁছায়। পদের সঠিক সংস্থাপন (Syntax) ভিন্ন অর্থ তৈরির হাত থেকে বাঁচায়।
- নতুন শব্দ গঠন: উপসর্গ, প্রত্যয় বা সমাসের নিয়ম জেনে আমরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শব্দ তৈরি করতে পারি, যা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
- বিদেশি ভাষা শিক্ষা: যেকোনো নতুন ভাষা শিখতে গেলে সেই ভাষার ব্যাকরণ হলো প্রবেশদ্বার।
৪. ব্যাকরণের দার্শনিক ভিত্তি (Philosophical Foundations of Grammar)
ব্যাকরণের দার্শনিক ভিত্তি বলতে বোঝায়— ব্যাকরণ কেন প্রয়োজন এবং এটি মানুষের চিন্তার সাথে কীভাবে যুক্ত।
ক. ন্যাচারালিজম বনাম কনভেনশনালিজম (Naturalism vs. Conventionalism):
দার্শনিক প্লেটোর সময় থেকেই বিতর্ক ছিল— শব্দের সাথে অর্থের সম্পর্ক কি প্রাকৃতিক নাকি মানুষের তৈরি করা নিয়ম? ব্যাকরণের দর্শন বলে, ভাষা মূলত একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract), আর ব্যাকরণ হলো সেই চুক্তির শর্তাবলী।
খ. ইউনিভার্সাল গ্রামার (Universal Grammar – নোয়াম চমস্কি):
আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনক নোয়াম চমস্কি মনে করেন, মানুষের মস্তিষ্কে জন্মগতভাবেই একটি ‘ল্যাঙ্গুয়েজ একুইজিশন ডিভাইস’ (LAD) থাকে। অর্থাৎ ব্যাকরণ কেবল বাইরের বই নয়, এটি মানুষের স্নায়বিক কাঠামোর একটি অংশ। মানুষের সব ভাষার মূলে একটি অভিন্ন ব্যাকরণিক কাঠামো থাকে।
গ. অর্থের দর্শন (Philosophy of Meaning):
ব্যাকরণ কেবল শব্দ সাজানো নয়, এটি ‘সত্য’ প্রকাশের মাধ্যম। দর্শন বলে, একটি বাক্য তখনই ব্যাকরণসিদ্ধ হয় যখন তার গঠনগত কাঠামো বাস্তবের কোনো যৌক্তিক ঘটনার প্রতিফলন ঘটায়।
৫. ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় (Scope of Grammar)
একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ বিজ্ঞানে প্রধানত চারটি স্তর থাকে:
- ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology): ধ্বনির উচ্চারণ ও পরিবর্তন।
- রূপতত্ত্ব (Morphology): শব্দের গঠন ও প্রকারভেদ।
- বাক্যতত্ত্ব (Syntax): বাক্যে পদের বিন্যাস ও ক্রম।
- বাগর্থতত্ত্ব (Semantics): শব্দের অর্থের ভিন্নতা ও গভীরতা।
ব্যাকরণ হলো ভাষার মেরুদণ্ড। এটি কেবল পরীক্ষার পড়া নয়, বরং একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের দলিল। ব্যাকরণ বিজ্ঞান আমাদের শেখায় কীভাবে সীমিত শব্দ ব্যবহার করে অসীম ভাব প্রকাশ করা যায়। ভাষার সৌন্দর্য যেমন অলঙ্কারে, ভাষার শক্তি তেমনি তার ব্যাকরণে।
তথ্যসূত্র:
১. ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ — ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
২. বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত — ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
৩. Syntactic Structures — Noam Chomsky.
আরও দেখুন: