গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে যখন মিশর সফর করেন, তখন মেমফিসের মন্দিরের পুরোহিতরা তাকে একটি বিস্ময়কর কাহিনী শুনিয়েছিলেন। কাহিনীটি ছিল মিশরের ফারাও সামেটিকাসকে নিয়ে। তৎকালীন সময়ে মিশরীয়রা বিশ্বাস করত তারাই পৃথিবীর প্রাচীনতম জাতি। কিন্তু দূরদর্শী সামেটিকাস চাইলেন এর একটি পরীক্ষামূলক প্রমাণ। তিনি নির্ণয় করতে চাইলেন—মানুষের মুখ নিঃসৃত প্রথম ভাষাটি আসলে কোনটি?
এই রহস্য উন্মোচনে তিনি এক অনন্য ও কিছুটা কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি দুই নবজাতককে এক মেষপালকের জিম্মায় দিয়ে নির্দেশ দেন যেন তাদের সামনে কোনো শব্দ উচ্চারণ করা না হয়। শিশু দুটিকে এক নির্জন স্থানে রাখা হয়েছিল, যেখানে মেষপালক কেবল তাদের আহার ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করত। ফারাওয়ের ধারণা ছিল, বাইরের জগতের কোনো প্রভাব ছাড়া শিশু দুটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে শব্দ প্রথম উচ্চারণ করবে, সেটিই হবে পৃথিবীর আদি ভাষা; আর সেই ভাষার উত্তরসূরিরাই হবে আদিমতম জাতি।
দীর্ঘদিন পর মেষপালক লক্ষ্য করলেন, একটি শিশু চিৎকার করে বলছে—‘Bekos’ (বেকোস)। ফ্রাইজিয়ান ভাষায় যার অর্থ হলো ‘রুটি’। এই সংবাদ ফারাওয়ের কানে পৌঁছালে তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ফ্রাইজিয়ানই হলো মানবজাতির প্রথম ভাষা। যদিও হেরোডোটাসের প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে মাইলেটাসের হেকাটিয়াসও মিশরে গিয়ে অনুরূপ কাহিনী শুনেছিলেন, তবে সত্য যাই হোক—ভাষার আদি উৎস খোঁজার এই আকুলতা মানুষের চিরায়ত এক কৌতূহল।
Table of Contents
ভাষাকোষ সূচিপত্র
ভাষার মহাসমুদ্র: পরিসংখ্যান ও বর্তমান বাস্তবতা
প্রথম ভাষা কোনটি তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের তথ্যানুযায়ী পৃথিবীর ভাষার মানচিত্র অত্যন্ত বিশাল ও বৈচিত্র্যময়। বিশ্বখ্যাত ভাষা সমীক্ষক প্রতিষ্ঠান ‘এথনোলগ’ (Ethnologue)-এর মতে, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৬,৯০৯টি জীবিত ভাষা রয়েছে। অন্যদিকে, ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর ল্যাংগুয়েজ ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি’-এর গবেষণায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৭৩টি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ভাষা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত বলার উপায় নেই। ভাষার মহাসমুদ্র এতটাই অতল যে, আজও অনেক ভাষার হদিস পাওয়া বাকি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো এক দুর্গম অঞ্চলের নতুন খোঁজ পাওয়া ভাষার শেষ জীবিত মানুষটির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের আগেই তিনি পরলোকগমন করেছেন। এমন ট্র্যাজেডি ভাষার ইতিহাসকে বারবার অপূর্ণ করে দিয়েছে।
বিলুপ্তির মহড়া ও আগামীর উদ্বেগ
গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদন আমাদের এক অশনিসংকেত দেয়—আগামী একশ বছরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৩,০০০টি ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামার ইনস্টিটিউট অব লিংগুয়িসটিকস’-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমানে দুনিয়ায় এমন ৫১টি ভাষা আছে যার শেষ মাত্র একজন বক্তা জীবিত আছেন। একশ জনের কম মানুষ জানেন এমন ভাষা রয়েছে প্রায় ৫০০টি, আর এক হাজার জন বলতে পারেন এমন ভাষার সংখ্যা প্রায় ১৫০০।
গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর পাঁচটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে ভাষা সবচেয়ে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে:
১. সাইবেরিয়ার পূর্বাঞ্চল
২. অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাংশ
৩. দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যাঞ্চল
৪. ওকলাহোমা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
৫. দ্য ইউ.এস. প্যাসিফিক নর্থ ইস্ট
বিগত ৫০০ বছরে আমরা পৃথিবীর অর্ধেক ভাষা হারিয়েছি, কিন্তু বর্তমান সময়ে এই বিলুপ্তির হার ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুততম।
ভাষা হারানো মানে জ্ঞান হারানো
পেনসিলভানিয়া সোয়ার্থমোর কলেজের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক ডেভিড হ্যারিসন এক গভীর সত্য উচ্চারণ করেছেন। তাঁর মতে, “যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন বহু শতাব্দী ধরে প্রাণী, উদ্ভিদ, গণিত এবং সময় নিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের সামগ্রিক জ্ঞান ও দর্শনও হারিয়ে যায়।” আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির বহু অজানা রহস্য ও ভেষজ বিজ্ঞানের অমূল্য তথ্য। অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের ঔষধি জ্ঞান সংরক্ষণের জন্য গোপন ভাষা ব্যবহার করে, যা তারা বাইরের পৃথিবীর সাথে বিনিময় করে না। ভাষা হারিয়ে গেলে সেই হাজার বছরের প্রাচীন আবিষ্কারগুলোও চিরতরে ছুঁড়ে ফেলা হয়।
‘লিভিং টাংস ইনস্টিটিউট ফর এনডেনজারড ল্যাংগুয়েজ’-এর গবেষক গ্রেগরি অ্যান্ডারসন মনে করেন, ভাষা তখনই ঝুঁকির মুখে পড়ে যখন একটি জাতি মনে করে যে তাদের নিজস্ব ভাষা সামাজিক বা অর্থনৈতিক উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেক্সিকোর আজটেক সংস্কৃতি গবেষক মিগুয়েল লিয়ন-পোরটিল্লা তাঁর ‘হোয়েন আ ল্যাংগুয়েজ ডাইজ’ কবিতায় আক্ষেপ করে বলেছেন:
“…যখন ভাষার মৃত্যু হয়,
স্বর্গীয় যা কিছু—
সূর্য, চাঁদ, তারা
মানুষের যা কিছু—
চিন্তা, অনুভব, ভাবনারা
সব হারিয়ে যায়
আর প্রতিফলিত হয় না ভাষার আয়নায়…”
ভাষাকোষ: একটি সংরক্ষণ প্রয়াস
বর্তমান বিশ্বের পরিসংখ্যান অত্যন্ত অসম। পৃথিবীর মাত্র ৬ শতাংশ ভাষায় কথা বলেন বিশ্বের ৯৪ শতাংশ মানুষ। বাকি মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ ধরে রেখেছেন পৃথিবীর ৯৪ শতাংশ ভাষার বৈচিত্র্য। এই বিপুল সংখ্যক ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই ‘ভাষাকোষ’-এর অবতারণা।
এই গ্রন্থে ইংরেজি বর্ণানুক্রমে (A to Z) পৃথিবীর বহু ভাষার পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে যেমন বর্তমানে বহুল প্রচলিত জীবিত ভাষাগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিলুপ্ত ভাষাগুলোকেও অবজ্ঞা করা হয়নি। মূল বর্ণনামূলক অংশের পাশাপাশি এই বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে:
বিলুপ্ত ভাষার ইতিহাস ও ভাষা পরিবারের শ্রেণীবিন্যাস।
অপাঠোদ্ধারকৃত লিপি ও বিখ্যাত লিপির অর্থ-উদ্ধারের রোমাঞ্চকর কাহিনী।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও আদিবাসী ভাষার বর্তমান পরিস্থিতি ও তথ্যাবলি।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ভাষা বিষয়ক এনসাইক্লোপিডিয়া ‘এথনোলগ’ এবং ‘ওমনিগ্লট’। এছাড়া প্রথিতযশা ভাষাবিদ ও গবেষকদের তাত্ত্বিক কাজগুলো প্রতিটি খণ্ডের শেষে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শ্রমসাধ্য ও দীর্ঘ পথচলায় আমার সকল ধৈর্য ও প্রেরণার উৎস হয়ে পাশে ছিলেন অনন্যা মেহেরীন। তাঁর অবিচল সমর্থন ছাড়া এই ‘ভাষাকোষ’ পূর্ণতা পাওয়া হয়তো অসম্ভবের নামান্তর ছিল।

ভাষাকোষ সূচিপত্র
প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায়
পঞ্চম অধ্যায়
ষষ্ঠ অধ্যায়
সপ্তম অধ্যায়
