বঙ্গবন্ধুর শিশুকাল রচনা । প্রতিবেদন রচনা

বঙ্গবন্ধুর শিশুকাল রচনাটি প্রবন্ধটি একটি নমুনা। তোমরা এখান থেকে তথ্য, মহৎ গুণের বিবরণ এবং ভাষার সাবলীলতা গ্রহণ করে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর শিশুকাল নিয়ে নিজস্ব একটি রচনা তৈরি করার চেষ্টা করবে। মনে রাখবে, মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং মহানায়কের আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে লিখতে পারাই আসল সার্থকতা।

বঙ্গবন্ধুর শিশুকাল: এক মহানায়কের শৈশব

ভূমিকা

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে আমরা অর্জন করেছি পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। কিন্তু এই হিমালয়সম ব্যক্তিত্বের যে বিশালতা আমরা দেখি, তার ভিত্তি রোপিত হয়েছিল তাঁর বর্ণাঢ্য শৈশবেই। টুঙ্গিপাড়ার সেই শান্ত নিভৃত পল্লীর ধুলোবালিতেই গড়ে উঠেছিল এক অকুতোভয় ও দরদী মানুষের হৃদয়।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদার এবং মাতা সায়েরা খাতুন ছিলেন মহীয়সী গৃহিণী। চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। আদর করে বাবা-মা তাঁকে ‘খোকা’ বলে ডাকতেন। টুঙ্গিপাড়ার সেই ছোট্ট খোকাই যে একদিন বিশ্বমঞ্চে বাঙালির ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হবেন, তা হয়তো সেদিন কেউ কল্পনাও করেনি।

প্রকৃতির কোলে শৈশব

বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছে রূপসী বাংলার ছায়াসুনিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে। মধুমতী নদীর তীরে টুঙ্গিপাড়ার আদিম শ্যামলতা তাঁকে দিয়েছে উদারতা। তিনি ছিলেন প্রকৃতির বরপুত্র। পাখির কলকাকলি, নদীর ঢেউ আর মেঠো পথের ধুলোবালি ছিল তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। তিনি কেবল প্রকৃতিকে ভালোবাসতেনই না, বরং প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সাথে তাঁর ছিল আত্মিক সম্পর্ক। দোয়েল-বাবুইয়ের গান শোনা, শালিক-ময়না পোষা কিংবা খালের পাড়ে বসে মাছরাঙার ডুব দেওয়া দেখা ছিল তাঁর শৈশবের প্রিয় মুহূর্ত। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটা আর বর্ষার কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যাওয়া মুজিবের মাঝে বাংলার মাটির সুবাস মিশে ছিল আজীবন।

শিক্ষাজীবন ও হাতেখড়ি

মুজিবের শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাত বছর বয়সে টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাঁর পিতা ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ ও শিক্ষার অনুরাগী। পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুল এবং গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি খেলাধুলায় ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। বিশেষ করে ফুটবল ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। বিদ্যালয়ের প্রতিটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। তিনি ইতিহাসের বই পড়তে দারুণ পছন্দ করতেন, যা তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিল।

প্রতিবাদী চেতনা ও পরোপকার

বঙ্গবন্ধুর শিশুকাল থেকেই ফুটে উঠেছিল তাঁর চরিত্রের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য—অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং আর্তমানবতার সেবা। তিনি অসহায় মানুষের দুঃখ সইতে পারতেন না। একবার নিজের গোলার ধান গরিব প্রতিবেশীদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন এবং নিজের ছাতা অন্যকে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরেছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি বিদ্যালয়ে দাবি আদায়ের জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল পরিদর্শনে আসেন, তখন কিশোর মুজিব অকুতোভয় চিত্তে বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের ছাদ মেরামতের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। এই নির্ভীকতাই তাঁকে পরবর্তী জীবনে আপসহীন নেতায় রূপান্তরিত করেছিল।

অসাম্প্রদায়িকতা ও নৈতিকতাবোধ

টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ সমাজে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার সাথে মিলেমিশে বেড়ে উঠেছেন তিনি। শৈশবেই তিনি চাক্ষুষ করেছেন জমিদার ও মহাজনদের শোষণ। সাধারণ মানুষের এই শোষণমুক্তি আর অসাম্প্রদায়িক বাংলার স্বপ্ন তিনি শিশুকাল থেকেই লালন করতেন। গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না, উৎসব-পার্বণ তাঁকে শিখিয়েছিল মানুষের ভেদাভেদ ভুলে ভালোবাসতে। তাঁর এই নৈতিক ভিত্তিই তাঁকে আমৃত্যু সত্যের পথে অবিচল থাকতে শক্তি যুগিয়েছে।

জাতীয় শিশু দিবস ও বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা

বঙ্গবন্ধু শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আজকের শিশুরাই আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তাঁর মতে, শিশুদের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ দেশ গড়াই ছিল স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য। শিশুদের প্রতি এই অগাধ ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর জন্মদিন ১৭ই মার্চকে বাংলাদেশে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। তিনি ছোটদের সংগঠন ‘কচিকাঁচার মেলা’ ও ‘খেলাঘর’-এর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

উপসংহার

বঙ্গবন্ধুর শিশুকাল ছিল সততা, সাহস এবং মানবিকতায় পরিপূর্ণ। টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির পিতা। তাঁর শৈশবের প্রতিটি ঘটনা আমাদের শেখায় কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর শৈশব যেন প্রতিটি শিশুর জন্য এক অনুপ্রেরণার বিদ্যালয়, যেখান থেকে দীক্ষা নিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব একটি সমৃদ্ধ ও সোনার বাংলাদেশ।

Leave a Comment