পদ্যাংশের সারাংশ ও সারমর্ম । বিরচন

বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি (বিরচন) অংশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সারাংশ ও সারমর্ম। এটি মূলত কোনো বিশদ ভাব বা বক্তব্যকে সংকুচিত করে তার অন্তর্নিহিত নির্যাসটুকু উপস্থাপনের একটি সৃজনশীল পদ্ধতি।

সারাংশ ও সারমর্ম কী?

‘সার’ শব্দের অর্থ মূল বা নির্যাস এবং ‘অংশ’ শব্দের অর্থ ভাগ। সহজ কথায়, কোনো দীর্ঘ রচনার বা বক্তব্যের বিস্তারিত অংশ থেকে অবান্তর ও ব্যাখ্যামূলক কথাগুলো বাদ দিয়ে শুধু মূল ভাবটুকু সংক্ষেপে প্রকাশ করাকেই সারাংশ বলা হয়।

  • সারাংশ: সাধারণত গদ্যাংশের (Prose) মূল বক্তব্য সংক্ষেপে লিখলে তাকে সারাংশ বলে।
  • সারমর্ম: পদ্যাংশ বা কবিতার (Poetry) ভেতরের মূল ভাব বা মর্মার্থ সংক্ষেপে লিখলে তাকে সারমর্ম বলে।

সারাংশ ও সারমর্ম লেখার অপরিহার্য নিয়মাবলি

একটি মানসম্মত সারাংশ বা সারমর্ম লিখতে হলে নিচের কৌশলগুলো অনুসরণ করা প্রয়োজন:

  • গভীরভাবে পাঠ: উদ্দীপক বা উদ্ধৃত অংশটি অন্তত তিন-চারবার অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। এর ফলে রচনার মূল সুর বা কেন্দ্রবিন্দুটি অনুধাবন করা সহজ হয়।
  • অপ্রাসঙ্গিকতা বর্জন: মূল রচনায় ব্যবহৃত অলংকার, বিশেষণ, দীর্ঘ উপমা, রূপক বা কোনো দৃষ্টান্ত সারাংশে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না।
  • সংক্ষিপ্ততা ও স্পষ্টতা: মূল রচনার আয়তন সাধারণত তিন ভাগের এক ভাগ (১/৩) হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে মনে রাখতে হবে, সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে যেন মূল ভাবটি হারিয়ে না যায়।
  • সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা: গুরুগম্ভীর শব্দ পরিহার করে নিজের ভাষায় সহজ-সরলভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে।
  • পুনরাবৃত্তি রোধ: একই কথার বা ভাবের বারবার প্রকাশ ঘটানো যাবে না। এতে সারাংশের গুণমান নষ্ট হয়।
  • পরোক্ষ পদ্ধতি (Objective Tone): সারাংশ লেখার সময় ‘আমি মনে করি’, ‘লেখক বলেছেন’ বা ‘কবি বোঝাতে চেয়েছেন’—এই জাতীয় শব্দগুচ্ছ বর্জন করতে হবে। বক্তব্যটি হবে নৈর্ব্যক্তিক ও পরোক্ষ।
  • এক অনুচ্ছেদ: সারাংশ বা সারমর্ম সবসময় একটি মাত্র অনুচ্ছেদে (Para) লিখতে হয়।

 

 

সারাংশ লিখন কাঠামো: এক নজরে

বৈশিষ্ট্যকরণীয়বর্জনীয়
ভাষাসহজ, সরল ও নিজের ভাষাজটিল শব্দ ও উদ্ধৃতি
আয়তনমূল পাঠের ১/৩ অংশদীর্ঘ ব্যাখ্যা বা উদাহরণ
পদ্ধতিপরোক্ষ বর্ণনাউত্তম পুরুষ (আমি/আমরা)
ভাবমূল ভাবকে অক্ষুণ্ণ রাখাব্যক্তিগত মতামতের প্রতিফলন

 

কেন সারাংশ চর্চা করবেন?

সারাংশ ও সারমর্ম চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং কোনো বিশাল বিষয় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁকে নেওয়ার দক্ষতা তৈরি হয়। এটি ভাষাজ্ঞানকে সংহত ও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

সঠিক নিয়ম মেনে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে লিখলে সারাংশ যেমন সুন্দর হয়, তেমনি তা পাঠকের কাছে বিষয়ের মূল নির্যাসটি মুহূর্তেই পৌঁছে দেয়। সৃজনশীল লেখায় এটি এক অনন্য দক্ষতা।

 

সারাংশের কয়েকটি উদাহরণ [ পদ্যাংশ ]:

 

১। বসুমতি কেন তুমি সারমর্ম

 

“বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা?

কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।

দিতে যদি হয় সে-মা প্রসন্ন সহাস,

কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস?

বিনা চাষে শসা দিলে কি তাহাতে ক্ষতি?

শুনিয়া ঈষৎ হাসি কহেন বসুমতি—

“আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,

তোমার গৌরব তাহে একেবারে ছাড়ে।

সারমর্ম : কৃষকগণ বহু পরিশ্রমের বিনিময়ে ঘরে ফসল তোলে। কিন্তু তারা যদি জমি থেকে বিনা পরিশ্রমে ফসল লাভ করত তাহলে তাদের গৌরব বিনষ্ট হত। নিজের প্রচেষ্টায় কিছু অর্জন করার মধ্যেই যথার্থ গৌৱধ নিহিত।

 

২। ছোট ছোট বালুকার কণা সারমর্ম

ছোট ছোট বালুকার কণা, বিন্দু বিন্দু ভাল,

গড়ি তোলে মহাদেশ, সাগর অতল ।

মুহূর্ত নিমেষকাল, তুচ্ছ পরিমাণ

গড়ে যুগ-যুগান্তর অনন্ত মহান।

প্রত্যেক সামান্য ত্রুটি ক্ষুদ্র অপরাধ

ক্রমে টানে পাপ পথে, ঘটায় প্রমাদ;

প্রতি করুণার নাম, স্নেহপূর্ণ বাণী,

এ ধরায় স্বর্গসুখ নিত্য দেয় আনি।

সারমর্ম : ক্ষুদ্রকে ক্ষুদ্র বলে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। কারণ বালুকণায় মহাদেশ, জলকণায় সমুদ্র এবং মুহূর্তের সমন্বয়ে অনন্ত মহাকালের সৃষ্টি হয়। তুচ্ছ অপরাধেই জঘন্য পাপের সূচনা হয়। পক্ষান্তরে মানুষের প্রতি মানুষের সামান্য সমবেদনাই সম্মিলিতভাবে পৃথিবীতে স্বর্গের সুখ-শান্তি উপহার দিতে পারে।

 

৩। নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল সারমর্ম

নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,

তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল;

গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,

কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অন্ন দান;

স্বর্ণ করে নিজ রূপে অপরে শোভিত,

বংশী করে নিজ স্বরে অপরে মোহিত

শস্য জন্মাইয়া নাহি খায় জল ধরে,

সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।

সারমর্ম : পরের উপকারে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই প্রকৃত সুখ। এ জগতে নদী, বৃদ্ধ, গাভী, কাঠ, স্বর্ণ ও জলধর কেউই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত নয়; সবাই অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃত সাধু ব্যক্তির ঐশ্বর্য অন্যের ভোগে লাগে, তাঁর নিজের ভোগে নয়।।

 

৪। চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন সারমর্ম

চিরসুখী জন             ভ্রমে কি কখন

ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে,

কি যাতনা বিষে             বুঝিবে সে কিসে

কভু আশি বিষে দংশেনি যারে?

যতদিন ভবে             না হবে না হবে।

তোমার অবস্থা আমার সম

ঈষৎ হাসিবে              শুনে না শুনিবে

বুঝে না বুঝিবে যাতনা মম।

 

সারমর্ম : জগতে সুখী ব্যক্তিরা দুঃখীর বেদনা কখনও অনুভব করতে পারে না। নিজেরা দুঃখের কবলে পতিত হলে তবেই তারা দুঃখের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে।

 

৫। বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই সারমর্ম

বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই

“কুড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই?

আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে।

তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।”

হাসিয়া বাবুই কহে, “সন্দেহ কি তায়,

কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়।

পাকা হোক তবু ভাই পরের বাসা

নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।”

 

সারমর্ম : পরের জিনিস নিয়ে বাহাদুরি করা উচিত নয়। নিজের জিনিস তা যতই ছোট বা কমদামি হোক না কেন। তার মধ্যে আত্মতৃপ্তি রয়েছে। চড়াই পাখি পরের দালানে থেকে বাহাদুরী দেখায় এবং ঝড়ের সময় বাবুই পাখির দুঃখ-কষ্ট দেখে টিটকারি দেয়। কিন্তু বাবুই পাখির মনে এতে কোন দুঃখ নেই। কারণ এ বাসা তার নিজের তৈরি।

 

৬। সিন্ধু তীরে বসি শিশু খেলে বালু নিয়ে খেলা সারমর্ম

সিন্ধু তীরে বসি শিশু খেলে বালু নিয়ে খেলা,

বাস গৃহে হাসি মুখে ফিরে সন্ধ্যা বেলা।

জননীর অংকেপিরে প্রাতে ফিরে আসি

হেরে তার গৃহখানি কোথা গেছে ভাসি।

আবার গাড়িতে বসে— সেই তার খেলা

ভাঙ্গা আর গড়া নিয়ে কাটে তার বেলা।

এ যে খেলা হায় তার আছে কিছু মানে?

যে জন খেলায় খেলা-সেই বুঝি জানে।

 

সারমর্ম : ভাঙ্গা আর গড়া নিয়েই মানুষের জীবন। এ পৃথিবীর সর্বত্রই ভাঙ্গা-গড়ার খেলা চলছে। এ খেলার অর্থ আপাত দৃষ্টিতে বোধগম্য নয়। তবে যে বিধাজ্ঞা এ ভাঙ্গা গড়ার পশ্চাতে রয়েছেন তিনি হয়তো তার তাৎপর্য বুঝেন।

 

৭। বহুদিন ধরে বহুক্রোশ দূরে সারমর্ম

বহুদিন ধরে বহুক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে –

একটি শিশির বিন্দু।

 

সারমর্ম : সৌন্দর্যের অনুসন্ধানে দূরে যাওয়া নয়, চোখের সামনেই বিশ্ব প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দু’চোখ ভরে উপলব্ধি করা যায়। দূরের সমুদ্র ও পর্বতের সৌন্দর্য দর্শনের জন্য দূরদেশে গিয়ে বাহুল্য ব্যয়ের কোন প্রয়োজন নেই। দেখতে জানলে কাছের প্রান্তরে ধানের শীষের উপর শিশির বিন্দুর মত তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তুর মাঝেও সৌন্দর্যের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।

৮। সার্থক জনম মোর জন্মেছি এই দেশে সারমর্ম

সার্থক জনম মোর জন্মেছি এই দেশে,

সার্থক জনম মাগো, তোমায় ভালবেসে।

জানিনে তোর ধন রতন আছে কিনা রাণীর মতন,

শুধু জানি, আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।

কোন বনেতে জানিনে ফুল, গন্ধে এমন করে আকুল,

কোন গগনে উঠেরে চাঁদ এমন হাসি হেসে

আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো

আলোতে নয়ন রেখে মদুবো নয়ন শেষে।

 

সারমর্ম : বাংলাদেশ আমাদের মাতৃভূমি। এদেশকে ভালবেসে আমাদের জন্য সার্থক। ধনরত্ন না থাকলেও এদেশ আমাদের প্রিয়। এদেশের বাতাসে প্রাণ জুড়ায়। আকাশের চাঁদ, বনের ফুল মন আকুল করে। জন্মগ্রহণ করে এদেশের সুন্দর রূপ আমরা দেখেছি। আবার এদেশের সৌন্দর্য দেখে একদিন এ মাটিতেই শেষ শয্যা নেব।

 

৯। মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে সারমর্ম

মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

এই সূর্যকরে, এই পুষ্পিত কাননে,

জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই।।

ধরার প্রাণে খোলা চির তরঙ্গিত

বিরহ মিলন, কত হাসি, অশ্রুময়

মানুষের সুখে দুঃখে গাথিয়া সঙ্গীতে

যদিগো রচিতে পারি অমর আলয়।

তা যদি না পারি তবে বাঁচি যতকাল

তোমাদেরই মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই,

তোমরা ভুলিবে বলে সকাল বিকাল

নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই।

সারমর্ম ঃ পার্থিব জীবনের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। পৃথিবীর সূর্যকর, পুষ্পিত কানন, জীবনের স্নেহ প্রীতি সবই মানুষকে আকর্ষণ করে তীব্রভাবে। পৃথিবীর বুক জুড়ে মানুষ বেঁচে থাকতে চায় চিরকাল। বেঁচে থাকার সেই আকাক্ষাতেই বিরহ-মিলন, সুখ-দুঃখের সঙ্গীত রচনায় মানুষ প্রার্থনা করে চির অমরতার।

Leave a Comment