গণ শিক্ষা | শিক্ষাবিষয়ক | বাংলা রচনা সম্ভার , ভূমিকা : যে কোনো জাতির উন্নতির মূলে রয়েছে শিক্ষা। পৃথিবীর সমস্ত সমৃদ্ধশালী জাতির উন্নতির নেপথ্য কারণ যদি আমরা খুঁজি, তাহলে তাদের শিক্ষার ভূমিকাই সর্বাগ্রে আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের শতকরা প্রায় সত্তর জন লোকই অশিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানহীন । এ বিপুল জনগোষ্ঠী যেখানে অশিক্ষা ও অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে আছে, সেখানে দেশের সামগ্রিক কল্যাণ অসম্ভব। কাজেই এ দেশের নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা খুবই জরুরি।
গণ শিক্ষা | শিক্ষাবিষয়ক | বাংলা রচনা সম্ভার
গণ শিক্ষা
আশার কথা যে, সাম্প্রতিককালে দেশের অনেক সচেতন নাগরিক এবং শিক্ষিত ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তি এ কথা অনুধাবন করছেন যে, গণশিক্ষা অর্থাৎ সর্বজনীন শিক্ষাদান ব্যতীত দেশ তথা রাষ্ট্রের কল্যাণ হতে পারে না । তাছাড়া দেশের সরকারও শিক্ষার সম্প্রসারণে ব্যাপক ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
গণশিক্ষা কি? : একটি দেশের নর-নারী সকলকে উপযুক্ত শিক্ষাদান করলে তাকে ‘গণশিক্ষা’ বা ‘সর্বজনীন’ শিক্ষা বলে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নর-নারী গ্রামে-গঞ্জেই বাস করে। এ দেশে সেকালের সভ্যতার কেন্দ্রস্থল ছিল গ্রাম। সুতরাং প্রাচীনকালে গ্রামবাসীদেরকে পুঁথিপাঠ, জারী গান, যাত্রা প্রভৃতির মাধ্যমে গণ’শিক্ষা দেয়া হলেও সে শিক্ষার যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রামের অজ্ঞ ও অশিক্ষিত লোকজন শক্তিমান শিক্ষিতদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে।
অবিলম্বে এর প্রতিকার হওয়া দরকার। গণ’শিক্ষার প্রচলন ছাড়া এর সত্যিকারের প্রতিকার সম্ভবপর নয়। এর জন্য সর্বাগ্রে জনগণের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষা বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। নতুবা তারা দেশের উন্নতি কিংবা নিজেদের ভালোমন্দ বিচার করতে ব্যর্থ হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশে গণ’শিক্ষার অবস্থা অতীব শোচনীয়।
মূলত গণশিক্ষা বলতে বোঝায় এমন একটি শিক্ষা, যা দ্বারা জনসাধারণ নিজেদের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা লাভ করে। মানুষ তখন কেবল নিজের ব্যক্তিগত চিন্তায় মগ্ন থাকে না, বরং দেশের সামগ্রিক মঙ্গল চিন্তায় লিপ্ত থাকে। দেশ যদি বিপদের মধ্যে পড়ে তা হলে প্রত্যেকটি মানুষ ব্যক্তিগতভাবে বিপদের মধ্যে পড়বে, এ উপলব্ধি যখন প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে জাগ্রত হবে তখনি বুঝতে হবে যে, গণ’শিক্ষার ফল ফলতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ও গণশিক্ষা : একটা স্বাধীন দেশে বর্তমান যুগে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মূর্খ ও নিরক্ষর হয়ে থাকবে, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের ও লজ্জাজনক। আমাদের স্বাধীনতার তিন দশক পেরিয়ে গেছে। এর আগে পাকিস্তানিদের প্রবঞ্চনা ও ব্রিটিশদের অবহেলার কুচক্রে এ দেশের মানুষ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়নি। এজন্য শিক্ষার হার এত নিচে। আর শিক্ষার অভাবেই এ দেশ এত অনুন্নত। ফলে আমাদের দেশে গণ’শিক্ষার সমস্যা নিয়ে গভীর ভাবনা-চিন্তার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান আর্থ-সামাজিক
অবস্থায় এ সমস্যার সমাধান করা কঠিন। কারণ এখনো পর্যন্ত জীবনে শিক্ষার যে কত প্রয়োজন সে সম্পর্কে অনেকেরই সম্যক ধারণা নেই। আমাদের অসচেতনতা ও অবহেলার ফলেই এ অবস্থা। তাই এখন প্রয়োজন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন।
গণশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা : শিক্ষা মৌলিক অধিকার। তাই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নাতীত। আমাদের দেশের শিক্ষার হার অতি নিচু। সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশে গণশিক্ষার বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলো শিক্ষাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে ধরে নিয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা সর্বস্তরে চালু করেছে বলে সর্বত্র উন্নতির জোয়ার বয়ে চলেছে। গণ’শিক্ষার মাধ্যম দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, চেতনা জাগত হয় এবং শিল্প-সংস্কৃতির গুরুত্ব অনুভূত হয়। আর এর মাধ্যমে উপার্জন ও আর্থিক উন্নতিরও সুযোগ সৃষ্টি হয় । তাই গণ’শিক্ষার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে গণশিক্ষার উদ্দেশ্য : সরকার কর্তৃক গৃহীত গণ’শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ হচ্ছে :
১. নিরক্ষর লোকদের সাক্ষরতাজ্ঞান অর্জন, কর্মদক্ষতা অর্জন ও উৎপাদনমুখী কর্মে উদ্বুদ্ধ করা।
২. মেধাবী নিরক্ষরদের সাক্ষরতা জ্ঞান ও মেধা বিকাশের মাধ্যমে সমাজের সম্পদে পরিণত করা, যাতে তারা আত্মনির্ভরশীল হতে পারে ।
৩. ন্যূনতম লেখাপড়া শেখানো এবং সাধারণ হিসাব-নিকাশ করার মতো অঙ্ক শেখানো।
৪. উন্নয়নশীল পৃথিবীর আধুনিক গতিশীলতার সাথে পরিচয় করিয়ে তাদের বিবেক ও বুদ্ধির বিকাশ সাধন।
৫. বিভিন্ন পেশা, বৃত্তিমূলক কাজ, কৃষি উন্নয়ন, সমাজকল্যাণ ও আর্থিক সচ্ছলতা মোতাবেক সুখী জীবনযাপনে সক্ষম করে তোলা ।
৬. শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান, শক্তি, সহনশীলতা ও মানবীয় জ্ঞানের বিকাশ সাধন ।
৭. নিজেদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে তোলা।
৮. সমাজের সমস্যা সমাধানে নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের শিক্ষাদান এবং জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা ।
বাংলাদেশে গণশিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা : ব্যাপক ভিত্তিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী (১৯৮০- ৮৫) পরিকল্পনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটা গণ’শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করে। গণশিক্ষা সাক্ষরতা কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অশিক্ষিত লোকদের সাক্ষরতা দান করা। এ সাক্ষরতা প্রদান শুধু লিখতে ও পড়তে জানাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং এ শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্য ছিল তাদের এ শিক্ষা গ্রহণ করে সাধারণ চিঠিপত্র লেখা, পারিবারিক হিসাবপত্র রাখা, খবরের কাগজ পড়া ও গ্রামীণ উন্নয়ন সহজ ভাষায় লেখা সরকারি প্রচার পুস্তিকা পড়ে ও বুঝে নিজ নিজ এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করা। এ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য কিছু কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল।
এনজিওসমূহের গণশিক্ষা কার্যক্রম : বাংলাদেশে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন এনজিও তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় গণ’শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইউনিসেফ, ব্র্যাক, প্রশিকা, গণ সাক্ষরতা সমিতি প্রভৃতি এনজিও গ্রামে-গঞ্জে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে অত্যন্ত আধুনিক প্রক্রিয়ায় গণ’শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বর্তমান সরকারের গণশিক্ষা কার্যক্রম : গণ’শিক্ষা কার্যক্রমকে বাস্তব রূপদানের উদ্দেশ্যে সরকার ইতিমধেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বিদ্যালয়, ক্লাব, মসজিদ, বাড়ির আঙ্গিনা প্রভৃতি স্থানে বয়স্কদের জ্ঞানদান কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যে বই- পুস্তক, খাতা ইত্যাদি বিনামূল্যে সরবরাহ করা এ সকল কার্যক্রমের অন্যতম। এছাড়া সরকারি ভুলগুলো শিফটে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে দুই শিফটে ক্লাস হচ্ছে। সরকারি এ কার্যক্রমের ফলে দেশের অনেক জেলা নিরক্ষরমুক্ত হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় : দেশে ১৯৯২ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বল্পশিক্ষিত জনগণকে উচ্চশিক্ষিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ পরিকল্পনায় এসএসসি কার্যক্রমের মাধ্যমে ঝরে পড়া মেধাশক্তিকে পুনরুজ্জীবনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঘরে বসেই বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ২ থেকে ৫ বছর মেয়াদে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব । এ কার্যক্রমও অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে বিবেচিত ও প্রংশসিত হচ্ছে।
উপসংহার : দেশের লক্ষ লক্ষ জনগোষ্ঠীকে নিরক্ষরমুক্ত করা এবং জাতীয়ভাবে মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষার বিস্তার অত্যন্ত জরুরি। আর এক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও বাস্তবভিত্তিক গণ’শিক্ষা কার্যক্রম ফলপ্রসূ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত। বাংলাদেশ সরকার তথা দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ফোরাম, এনজিওর সার্বিক সহযোগিতায় সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে গণশিক্ষা কার্যক্রমকে সফল করে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে এবং বর্তমান কার্যক্রমকে আরো সুবিন্যস্ত ও সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।