কাশফুলের কাব্য – নির্মলেন্দু গুণ

কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ‘কাশফুলের কাব্য’ বাংলা সাহিত্যের প্রকৃতিনির্ভর ও মানবিক চেতনার এক অনন্য নিদর্শন। এই কবিতায় কাশফুল কেবল একটি ঋতুবিশেষের প্রাকৃতিক উপাদান নয়; বরং তা হয়ে ওঠে জীবনের নানান বেদনাবোধ, নিঃসঙ্গতা ও নীরব সৌন্দর্যের প্রতীক। শরতের সাদা কাশফুলের দোলায় কবি দেখেন সময়ের প্রবাহ, মানুষের অন্তর্লীন অনুভূতি এবং সমাজের নীরব কথা না–বলা ইতিহাস।

নির্মলেন্দু গুণ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সহজ, সংবেদনশীল ও গভীর ভাষায় কাশফুলকে জীবনের সঙ্গে মেলান। মাঠের প্রান্তে, নদীর ধারে কিংবা পথের পাশে দোল খাওয়া কাশফুল যেন সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের মতোই অবহেলিত, অথচ অনিবার্যভাবে উপস্থিত। কবিতায় কাশফুলের কোমলতা ও দৃঢ়তা একসঙ্গে ধরা পড়ে—ঝড়-ঝঞ্ঝায় ভেঙে না পড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা কাশফুল জীবনের প্রতিরোধ ও টিকে থাকার প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক গভীরভাবে অন্বেষিত। কাশফুলের শুভ্রতা কবির কাছে স্বচ্ছতা ও আশার ইঙ্গিত বহন করে, আবার তার নির্জন অবস্থান সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘কাশফুলের কাব্য’ তাই শুধু প্রকৃতিচিত্র নয়; এটি মানবজীবনের নীরব সৌন্দর্য, বেদনা ও প্রতিবাদের এক কাব্যিক দলিল।

 

কাশফুলের কাব্য – নির্মলেন্দু গুণ

ভেবেছিলাম প্রথম যেদিন ফুটবে তোমায় দেখব,
তোমার পুষ্প বনের গাঁথা মনের মত লেখব।

তখন কালো কাজল মেঘ তো ব্যস্ত ছিল ছুটতে,
ভেবেছিলাম আরো ক’দিন যাবে তোমার ফুটতে।

সবে তো এই বর্ষা গেল শরত এলো মাত্র,
এরই মধ্যে শুভ্র কাশে ভরলো তোমার গাত্র।

ক্ষেতের আলে নদীর কূলে পুকুরের ওই পাড়টায়,
হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে বাঁশ বনের ওই ধারটায়।

আকাশ থাকে মুখ নামিয়ে মাটির দিকে নুয়ে,
দেখি ভোরের বাতাসে কাশ দুলছে মাটি ছুঁয়ে।

কিন্তু কখন ফুটেছে তা কেউ পারে না বলতে,
সবাই শুধু থমকে দাঁড়ায় গাঁয়ের পথে চলতে।

উচ্চ দোলা পাখির মত কাশ বনে এক কন্যে,
তুলছে কাশের ময়ূর চূড়া কালো খোঁপার জন্যে।

শরত রানী যেন কাশের বোরখা খানি খুলে,
কাশ বনের ওই আড়াল থেকে নাচছে দুলে দুলে।

প্রথম কবে ফুটেছে কাশ সেই শুধুরা জানে,
তাইতো সেটা সবার আগে খোঁপায় বেঁধে আনে।

ইচ্ছে করে ডেকে বলি, “ওগো কাশের মেয়ে―
আজকে আমার চোখ জুড়ালো তোমার দেখা পেয়ে
তোমার হাতে বন্দী আমার ভালোবাসার কাশ
তাইতো আমি এই শরতে তোমার কৃতদাস”

ভালোবাসা কাব্য শুনে কাশ ঝরেছে যেই

দেখি আমার শরত রানী কাশবনে আর নেই।

 

কাশফুলের কাব্য কবিতা আবৃত্তি:

 

Leave a Comment