কারিগরি শিক্ষা | শিক্ষাবিষয়ক | বাংলা রচনা সম্ভার , ভূমিকা : শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মানব সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষার অবদান নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। কেননা, শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানের আলো দান করে, সমাজ থেকে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার দূর করে সমাজকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে। এ শিক্ষা মানুষে মানুষে সম্প্রীতি বাড়ায় এবং সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে করে সমৃদ্ধ। তাই শিক্ষা জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষাই হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা।
কারিগরি শিক্ষা | শিক্ষাবিষয়ক | বাংলা রচনা সম্ভার
কারিগরি শিক্ষা
বাংলাদেশে অর্ধেকেরও বেশি লোক অদ্যাবধি নিরক্ষর। তাই আজ জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার প্রয়োজন পদে পদে অনুভূত হচ্ছে। অন্যদিকে সঠিক পদ্ধতিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশবাসীকে বাস্তবমুখি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মদক্ষ করে তোলার ওপর দেশের ভাগ্য বহুলাংশে নির্ভরশীল। সেজন্য কারিগরি শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ একমাত্র কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষাই পারে শিক্ষা শেষে মানুষের কাজের নিশ্চয়তা দিতে। আর কাজের নিশ্চয়তার মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীভূত হলে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা যে অনেকাংশে হ্রাস পাবে সে কথা বলাই বাহুল্য ।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার সংজ্ঞার্থ : যে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ কোনো একটা বৃত্তি বা পেশা সম্বন্ধে হাতেকলমে শিক্ষা লাভ করে জ্ঞানার্জনের যোগ্যতা অর্জন করে তাকেই আমরা বৃত্তিমূলক শিক্ষা বলতে পারি। এ শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষ জীবিকা অর্জনের জন্য হাতেকলমে বা বাস্তব শিক্ষালাভ করে বলে বর্তমান বিশ্বে এ শিক্ষার গুরুত্ব দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। কেননা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশে বেকার সমস্যার সমাধান নিতে পারছে না। তাই দিন দিন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ সমস্যার মোকাবিলা করতে হলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করা অতীব প্রয়োজন।
বর্তমান বিশ্বে জীবনধারণ করা একটা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবিকার তাগিদে মানুষকে দেখা যায় উদ্ভ্রান্তের মতো যত্রতত্র ছুটে চলতে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিতে পারছে না জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা। তাই আজ প্রয়োজন দেখা দিয়েছে পেশাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার। ‘বৃত্তি’ কথাটির অর্থ হলো জীবিকা নির্বাহের জন্য কর্ম বা পেশা। তাই শিক্ষা হবে আত্ম প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। অন্যথায় সে শিক্ষা হবে নিরর্থক। কিন্তু আমরা যে শিক্ষা গ্রহণ করছি তা জীবনযুদ্ধের পাথেয় যোগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। অতএব, এসব শিক্ষা বৃত্তিমূলক শিক্ষা হিসেবে গণ্য হতে পারে। না। জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষাব্যবস্থাই বৃত্তিমূলক শিক্ষা বলে গণ্য ।
বাস্তবতাবর্জিত বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজও বিজ্ঞানসম্মত ও জীবনসম্পৃক্তরূপে গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে স্বাধীনতা লাভের পর কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন, মজিদ খানের শিক্ষানীতি প্রভৃতি প্রণীত হলেও স্বাধীনতার ৩৫ বছর পরও কোনো আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা অন্ধভাবে পরীক্ষার সার্টিফিকেট ও ডিগ্রির পিছনে ফুটছে। সে শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে তাদের বিশেষ ধারণা নেই। অপরদিকে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে যথার্থ শিক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তুলতে পারছে না।
যারা প্রকৃত মেধাবী, দেশ ও জাতির জন্য বৃহৎ ও মঙ্গলজনক কিছু করার কথা যাদের, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সঠিক পরিচালনার অভাবে গতানুগতিকতার বৃত্তে বন্দি হয়ে সে প্রতিভা ক্রমে ম্লান হয়ে যায়। অনেক উচ্চ ডিগ্রিও তাদের একটি উপযুক্ত কাজের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। অন্যদিকে যারা অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী তাদেরকে উপযুক্ত কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা নেই। ফলে সবাইকে গড্ডলিকা প্রবাহ অনুসরণ করতে হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি একটি কাজ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
এভাবে ডিগ্রি অর্জনের পর অন্ধমোহ কাটিয়ে এক সময় তরুণেরা বেকারত্বের চরম হতাশায় হাবুডুবু খায়। তাদেরকে সঠিক পথনির্দেশনা দেয়ার জন্য এ দেশে কেউ নেই। আমাদের অবৈজ্ঞানিক পশ্চাৎপদ শিক্ষাব্যবস্থা বস্তুত মানুষের দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ। বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি মানুষের মেধা ও শ্রমের অপচয় করে তাকে উপহার দিচ্ছে একটি অনিশ্চিত অভিশপ্ত বেকার জীবন। এভাবে দেশে ক্রমাগত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় একটি স্থানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতি। বার বার শিক্ষা সংস্কারের কথা ওঠে, কমিশন গঠিত হয়, রিপোর্ট প্রদান করা হয়; কিন্তু রিপোর্ট বাস্তবায়িত হয় না ।
মানুষের মেধা ও মননকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার । প্রতিটি মানুষই একটি সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিক্ষা ছাড়া সে সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। কিন্তু সে শিক্ষা মানুষকে এমন পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে দিতে হবে যা তাকে স্বনির্ভর, সচেতন মানুষরূপে গড়ে তুলবে, পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারার উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। শিক্ষাকে জীবনসম্পৃক্ত করে জীবিকার্জনের উপায়রূপে গ্রহণ করাও আবশ্যক। বিশেষত, বাংলাদেশের অশিক্ষা এবং অপরিকল্পিত শিক্ষার কারণে যেখানে প্রায় দেড় কোটি লোক কর্মহীন। এ দুরবস্থা লাঘব করার জন্য বৃত্তিমূলক বা কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রকারভেদ : বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো যারা বিজ্ঞান শিক্ষায় পারদর্শী নয় তারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে সহজে ভর্তি হতে পারেন না। অর্থাৎ তাদেরকে কমপক্ষে এইচএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। অন্যটি হলো সাধারণ বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষার দরকার নেই। সাধারণত প্রাইমারি কিংবা মাধ্যমিক শিক্ষাই এর জন্য যথেষ্ট। এ সাধারণ বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে কাউকে জীবিকা নির্বাহের জন্য অসহায়ত্বের বোঝা বহন করতে হবে না।
এসব বৃত্তিমূলক শিক্ষার মধ্যে ঘড়ি মেরামত, মোটর চালানো, কামার, কুমার, দর্জি, কলকারখানার কারিগর, সাইকেল মোটর ইত্যাদি মেরামত ও ইলেকট্রনিকের কাজ উল্লেখযোগ্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি, ১৯৭৪ কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিষয়সমূহ উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিষয়সমূহ : প্রস্তাবিত বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিষয়সমূহের একটি তালিকা নিচে দেয়া হলো : ক. কারিগরি শিল্পভিত্তিক : ১. কাঠের কাজ, ২. ধাতুর কাজ, ৩. বিজলীর কাজ, ৪. যন্ত্রের কাজ, ৫. ফাউন্ড্রির কাজ, ৬. মোটরগাড়ি মেরামত, ৭. রেডিও মেরামত, ৮. গৃহ নির্মাণ, ৯. ড্রাফট ম্যানস্পি, ১০. মেরিন ডিজেল ইঞ্জিনের কাজ, ১১. ইলেকট্রোপ্লেটিং ও বাস্তব সীটের কাজ, ১২. বান শিল্প, ১৩. সাবান শিল্প ও এমব্রয়ডারির কাজ, ১৪ মুদ্রণ শিল্প, ১৫. গ্রাফিক আর্টস, ১৬. মৃৎ শিল্প, ১৭. চামড়ার কাজ ইত্যাদি।
খ. কৃষিভিত্তিক : ১. কৃষিবিদ্যা— শস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ, ২. মৎস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ, ৩. হাঁস- মুরগি ও পশুপালন, ৪. খাদ্য সংরক্ষণ ও পুষ্টিবিজ্ঞান, ৫. কৃষি যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি। গ. ললিতকলাভিত্তিক : ১. অংকনবিদ্যা, ২. কন্ঠ সঙ্গীত, ৩. যন্ত্র সঙ্গীত, ৪. নৃত্য, ৫. অভিনয় ও আবৃত্তি ইত্যাদি। ঘ. ব্যবসা ও বাণিজ্যভিত্তিক : ১. টাইপরাইটিং ও স্টেনোগ্রাফি, ২. বুককিপিং ও হিসাবরক্ষণ, ৩. বাণিজ্যিক পদ্ধতি ও সেলসম্যানশিপ ইত্যাদি ।
ঙ. চিকিৎসাভিত্তিক : ১. নার্সিং ২. প্যারা মেডিক্যাল ইত্যাদি
চ. অন্যান্য : ১. শিক্ষক শিক্ষণ, ২. ধর্ম শিক্ষা, ৩. গ্রন্থাগার সহকারী শিক্ষণ, ৪. খেলনা তৈরি, ৫. প্লাস্টিক শিল্প, ৬.সাবান তৈরি, ৭. বাঁশ ও বেতের কাজ, ৮. কেটারিং ও হোটেল ব্যবস্থাপনা, ৯. বই বাঁধান ইত্যাদি ।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা : বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব আজ সর্বত্র স্বীকৃত। এর মাধ্যমে হাতে কলমে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা বৃত্তির যোগ্যতা অর্জন করে এবং দক্ষকর্মী হিসেবে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে। বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ও উৎকর্ষ সাধন ব্যতীত কোনো জাতি কৃষি, শিল্প, কারখানা এবং অন্যান্য উৎপাদন ও কারিগরি ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে পারে না। বর্তমান যুগে মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৃত্তিমূলক- শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
বৃত্তিমূলক শিক্ষা তুলনামূলকভাবে অল্প সময় সাপেক্ষ এবং সেজন্য অল্পকাজের ভিতরেই এর ফল লাভ করা যায়। বৃত্তিমূলক’ শিক্ষার বিস্তার লাভের দ্বারা জনসাধারণের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি করা সম্ভব। এর নজির পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। বিশ্বের যেসব জাতি আজ উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছে তারা অনেক আগেই বৃত্তিমূলক শিক্ষার তাৎপর্য অনুধাবন করে সে অনুযায়ী বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সেখানে আমাদের দেশের মতো সকলেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী নয়।
যারা যে শাস্ত্রে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন, সে শাস্ত্রে তারা বিশেষজ্ঞ হন। অন্যরা নিছক কেরানি হবার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করে না। বরং অর্থ উপার্জনের মোক্ষম ও বাস্তবমুখী শিক্ষার প্রতিই তাদের অধিক আগ্রহ। ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, জাপান প্রভৃতি দেশে যেমন বড় ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক তৈরি হচ্ছে পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাভিত্তিক কাজেও কর্মদক্ষ মানুষ গড়ে তোলার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ উচ্চ শিক্ষিত গবেষক বা বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে নিতান্ত সাধারণ শ্রমিককেও সেখানে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগতে হয় না। বেকারত্বের অভিশাপে সেখানে মানুষ জর্জরিত হয় না।
বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বৃত্তিমূলক শিক্ষার অপরিহার্যতা নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। তবে বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্প, চামড়াশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে আমাদের দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার বড় কোনো পদক্ষেপ বা কর্মপন্থা নেই। বাংলাদেশের যে বিশাল জনগোষ্ঠী তাদেরকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিদেশে ঐ শ্রমশক্তি রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। কিছুকাল পূর্বে এ খাত থেকে বাংলাদেশ প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করত। বর্তমানে এশিয়ার মুদ্রাসংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা দূরীভূত হবার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে জনশক্তি রপ্তানির একটি বড় সুযোগ আসছে।
অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ যাবৎ জনশক্তি রপ্তানি খাতকে বিস্তৃত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ গত ২০/২৫ বছরে বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক পাঠিয়েছে। এ শ্রমিকদের কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো হলে তাদের পক্ষে দুই-তিন গুণ বেশি অর্থ উপার্জন করা সম্ভব হতো। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, দক্ষ শ্রমিক তৈরির সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য কোনো পরিকল্পনা ও কাঠামো এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। শুধু শ্রমিক রপ্তানি নয়, দক্ষ শ্রমিক দেশে থাকলে কৃষি, শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়। অর্থনীতি হয়ে ওঠে চাষা। তাই দক্ষ শ্রমিক ও পেশাজীবী তৈরির গুরুত্ব কাউকে আজ বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। তাছাড়া কৃষি ও শিক্ষার জন্য সুদক্ষ কারিগর গড়ে তোলা দুরূহ কোনো কাজ নয়।
এজন্য মাধ্যমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা স্তরে বাস্তবমুখী বৃত্তিমূলক’ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা আবশ্যক। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশে-বিদেশে কোন কোন ক্ষেত্রে সবচেয়ে সার্থকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উপযুক্ত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বৃত্তিমূলক’ শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের প্রতিটি মানুষকে এভাবে কর্মক্ষম করে তুলতে পারলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন আর অসম্ভব বলে বিবেচিত হবে না ।
বৃত্তিমূলক শিক্ষা যে কেবল মানুষের কর্মের নিশ্চয়তা দেবে তাই নয়। কার্যকরী বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা অনেক সামাজিক সমস্যা থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারে। কারণ, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে নানাবিধ সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। কর্মমুখী শিক্ষা মানুষকে স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কর্মহীনতার দরুন সৃষ্ট হতাশা দূরীভূত হওয়ায় পারিবারিক কলহ-বিবাদ লোপ পায়। তরুণ সমাজের মধ্যে সন্ত্রাস, ছিনতাই, রাহাজানি, নেশাদ্রব্য গ্রহণ প্রভৃতি অপরাধপ্রবণতা কমে আসে।
আমাদের দেশে পুঁথিগত বিদ্যাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে । মনে রাখা দরকার পুঁথিগত বিদ্যা আর জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিদ্যা পঙ্গু। তাইতো দেখা যায়, উচ্চ শিক্ষা সমাপনান্তে এ দেশের হাজার হাজার প্রতিশ্রুতিশীল যুবক বেকার জীবনের অসহনীয় জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে । এটা জাতির জন্য কখনোই শুভ নয়। আমাদেরকে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। যে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষকে স্বাবলম্বী হতে শিক্ষা দেবে, চাকরি কিংবা জীবিকার্জনের জন্য পরমুখাপেক্ষী হতে হবে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে কল্যাণধর্মী তথা বাস্তবধর্মী চিন্তাভাবনা করতে হবে। নতুবা এ দেশে দিন দিন বেকারত্বের বোঝাই শুধু ভারি হবে ।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার দোষ-ত্রুটি : যেসব কারণে আমাদের দেশে বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসার লাভ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুরোপুরি ফলপ্রসূ হতে পারেনি তা হলো :
ক. বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যথাযোগ্য স্থান দেয়া হয়নি এবং সুসংবদ্ধ করা হয়নি। এখনও বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি শ্রম পরিচালকের অধীনে এবং অন্য কয়েকটি শিল্প পরিচালকের অধীনে রয়েছে, যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা গৌণ স্থান পায় এবং যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা চালনায় উপযুক্ত তদারক এবং নির্দেশনার কোনো সুব্যবস্থা নেই। কারিগরি শিক্ষা পরিচালকের অধীনস্থ বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের তদারক এবং নির্দেশনার যে ব্যবস্থা আছে তাও অপর্যাপ্ত।
খ. বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার এবং উৎকর্ষ সাধনে আজ পর্যন্ত সরকার যেসব ব্যবস্থা অবলম্বন করেছে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য উচ্চতর পর্যায়ের কারিগরি শিক্ষার তুলনায় বৃত্তিমূলক শিক্ষা অল্প সময়ে অধিকতর ফলপ্রসূ। তাছাড়া সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সুসংবদ্ধ বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যতিরেকে উচ্চতর কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা ইন্সিত ফল লাভে ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উচ্চতর কারিগরি শিক্ষার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করলে এর সত্যতা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হবে।
উন্নয়ন প্রসার এবং উৎকর্ষের দিক দিয়ে বিচার করলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা অন্যান্য স্তরের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার অনেক পেছনে রয়েছে। অথচ দেশের এবং জনসাধারণের স্বার্থের দিক থেকে বিচার করলে বৃত্তিমূলক শিক্ষা অন্যান্য স্তরের শিক্ষা থেকে অধিকতর প্রসারিত হওয়া উচিত ছিল।
গ. বৃত্তিমূলক শিক্ষা সমাপ্তির পর শিল্প কারখানা বা অন্যান্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় স্বল্প সংখ্যক এবং নিম্নমানের শিক্ষার্থীরা এসব কোর্সে ভর্তি হয়।
ঘ. কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা করতে শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানসমূহের অনিচ্ছর দরুন শিক্ষার্থীরা বাস্তব কারিগরি অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পায় না। যার ফলে তাদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ঙ. বৃত্তিমূলক শিক্ষা সমাপ্তির পর শিক্ষার্থীদের উচ্চতর শিক্ষা কোর্সে যাবার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা এবং তাদের অভিভাবকগণ শিক্ষা পরিহার করে।
চ. কায়িক শ্রমের প্রতি শিক্ষিত সমাজের বিরুদ্ধ মনোভাবের জন্য দেশের যুব সমাজ শ্রমবৃত্তিতে দক্ষতা অর্জনকে সম্মানজনক কাজ বলে মনে করে না।
ছ. শিল্প-কারখানাসমূহের মধ্যে উৎপাদনের কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো প্রতিযোগিতা না থাকায় শিল্প প্রতিষ্ঠান কম পারিশ্রমিকে অদক্ষ ব্যক্তিদের দ্বারা নিম্নমানের জিনিস উৎপাদন করে প্রচুর মুনাফা লাভে সমর্থ হওয়ায় তারা দক্ষ কারিগর নিয়োগ প্রয়োজন বোধ করে না।
জ. দেশে উপযুক্ত এবং দক্ষ কারিগরি শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষক নিযুক্তির সময় তাদের কারিগরি দক্ষতার প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয় না এবং পরবর্তীকালে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো ব্যবস্থা করা হয় না।
ঝ. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থানা হাতের কাজ এবং কায়িকশ্রমের প্রতি গুরুত্ব না দেয়ায় পরবর্তীকালে শিক্ষার্থীরা হাতের কাজকে ঘৃণা করে।
ঞ. বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপযোগী বইয়ের একান্ত অভাব রয়েছে। বাংলা ভাষায় লিখিত এ রকম বই নেই বললেই চলে। বাজারে যেসব বই আছে তা ইংরেজি ভাষায় লিখিত। প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য এবং অত্যন্ত উচ্চ মূল্যের, যা সাধারণ স্তরের ছেলেমেয়েদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে।
ট. . কোন কোন বৃত্তিমূলক শিক্ষা পেলে শিক্ষার্থীরা সমাজের প্রয়োজনে আসবে এবং নিজেরাও উপকৃত হবে সে সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্যের অভাব থাকায় শিক্ষার্থীরা সঠিক বৃত্তি নির্বাচন করতে পারে না।
ঠ. শিক্ষাদানের পদ্ধতি, বিষয়বস্তু ও পরিবেশের সঙ্গে বাস্তব ক্ষেত্রের কাজকর্মে পদ্ধতি, বিষয়বস্তু ও পরিবেশের সামঞ্জস্যের অভাব থাকায় শিক্ষার্থীরা পরবর্তীকালে কর্মক্ষেত্রে সহজে খাপ খাওয়াতে এবং সফলকাম হতে পারে না ।
ড. বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা আজ পর্যন্ত কারিগরি শিল্পভিত্তিক কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে দেশের অর্থেনৈতিক উন্নয়নের ফলাফল সীমিত।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশে বর্তমানে বৃত্তিমূলক’ শিক্ষার যে ব্যবস্থা রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় তা অপর্যাপ্ত এবং নিম্নমানের। পূর্ববর্তী শিক্ষা কমিশনসমূহ, কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞগণ দেশে মানসম্পন্ন বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রসারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত বৃত্তিমূলক’ শিক্ষাকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেয়া হয়নি। এর ফলে একদিকে দেশে যেমন দক্ষ কর্মীর অভাব, অন্যদিকে দেশে শিক্ষিত বেকার সমস্যার সম্মুখীন। এ অবস্থার বিহিত করার অন্যতম পন্থা হলো বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা জনসাধারণের মধ্যে প্রসারিত করে যুব সম্প্রদায়কে কর্মমুখী করে তোলা, যাতে অল্প সময় থেকেই তারা পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে সক্রিয় সহায়তা করতে পারে।
জাতীয় পর্যায়ে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, দক্ষ কাজে নিয়োজিত ৮৫%-৯৪%-শ্রমিকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। মধ্যস্তরে ৬৪% কারিগরি পদে নিয়োজিত সুপারভাইজারদেরও কোনো প্রশিক্ষণ… নেই। এছাড়া উচ্চস্তরে নিয়োজিত কারিগরি পেশাজীবীদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে মধ্যস্তরে নিয়োজিত কারিগরি পেশাজীবীদের তুলনায় বেশি। জব মার্কেটে এমপ্লয়মেন্ট প্যাটার্নে উল্লিখিত এ তিন ধরনের বিকৃতি বিদ্যমান থাকায় কৃষি, শিল্প কারখানা এবং অন্যান্য সেবামূলক কাজে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অন্য একটি জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় বিদেশে ক্রমান্বয়ে অধিকহারে অদক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ফলে এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার আয় দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থা দেশের উৎপাদনশীলতা তথা জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে মোটেও সহায়ক নয়। জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্যে কৃষি, ব্যবসা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য উৎপাদনমুখী ও সেবামূলক কাজে বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং প্রকৌশল ও অন্যান্য কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমা প্রাপ্তদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পদ্ধতির বিকৃতি নিরসন এবং বিদেশে রপ্তানির জন্য দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন দরকার। বাংলাদেশের বর্তমান বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা কারিগরি শিল্পভিত্তিক বিষয়সমূহের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বর্তমানে এ শিক্ষাব্যবস্থার যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তা মোটামুটি নিম্নরূপ :
ক. শ্রম পরিচালকের অধীনস্থ পাঁচটি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে প্রতিবছর প্রায় একহাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এ কোর্সের মেয়াদ দু’ বছর। ভর্তির নিম্নতম যোগ্যতা ৮ম শ্রেণী পাস, কতিপয় ক্ষেত্রে ১০ম শ্রেণী পাস।
খ. ইন্ডাস্ট্রিয়াল এপ্রেনটিসশিপ স্কিমের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে একশত পঞ্চাশ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ প্রশিক্ষণের মেয়াদ ৩-৭ বছর। বর্তমানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
গ. শ্রম পরিচালকের অধীনে নারায়ণগঞ্জ নৌ-ডিজেল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রতিবছর ১১০ জন শিক্ষার্থী দু’বছর মেয়াদি কোর্সে ভর্তির ব্যবস্থা আছে।
ঘ. শিল্প পরিচালকের অধীনে পাঁচটি বয়নশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থীকে দু’বছর মেয়াদি কোর্সে ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
ঙ. কারিগরি শিক্ষা পরিচালকের অধীন ৩৫টি ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতি বছর দু’হাজার শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার ব্যবস্থা আছে। ভর্তির জন্য নিম্নতম যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাস এবং প্রশিক্ষণের মেয়াদ দু’বছর।
চ. কারিগরি শিক্ষা পরিচালকের অধীনে ১৩টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সান্ধ্যকালীন কার্যক্রমে বছরে প্রায় ১৭০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা আছে। শিক্ষার্থীদের ভর্তির নিম্নতম যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাস এবং প্রশিক্ষণের মেয়াদ দু’বছর।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ও মান উন্নয়ন : সরকার ও জনগণের সক্রিয় সহযোগিতায় আরো প্রচুর পরিমাণে বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। বিশেষ করে কৃষিকার্যে সহায়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিভিন্ন কুটিরশিল্প, বয়নশিল্প, চর্মশিল্প, ডেইরিশিল্প, ইত্যাদির মর্যাদা দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়াও দেশের পাট শিল্প চিনির কল, ইস্পাত কারখানা ইত্যাদিতে দক্ষ কারিগর হিসেবে কাজ করতে পারে এমন সহায়ক বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে নজর দেয়ার সময় এসেছে। দেশের পলিটেকনিক কলেজগুলোতে আরো নতুন নতুন বিষয়ে শিক্ষা প্রবর্তন করতে হবে। সরকারকে সর্বাত্মক সাহায্য করে এসব প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় মনোযোগ দিতে হবে।
পাস করা বৃত্তিমূলক শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ দিতে হবে। তবেই দেশ ও দশের মঙ্গল হকে। উন্নত দেশসমূহের মতো কোন ছাত্রের কোন বিষয়ে ঝোঁক আছে তা নির্ধারণ করে তাকে সে সুযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। আজ আমরা স্বাধীন দেশের অধিবাসী হিসেবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিদেশীদের হস্তক্ষেপ বা বাধা নেই। আমরা ইচ্ছা করলে দেশকে শিল্পায়নে সমৃদ্ধ করে পেশাজীবী সৃষ্টি করতে পারি। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার। বৃত্তিমূলক’ শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে হবে :
ক. বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করে তাকে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় যথোপযুক্ত স্থান দিতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষান্তরে হাতের কাজের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে যাতে প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীরা হাতের কাজে অভ্যস্ত হয় এবং তাদের মনে কায়িক শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জন্মে। মাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পারিপার্শ্বিক সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজন উপযোগী বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে হবে এবং ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
খ. দক্ষ ও অভিক্ষ শিক্ষকই বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রাণ। অন্য যে কোনো শিক্ষাক্রমের তুলনায় বৃত্তিমূলক শিক্ষার কার্যকারিতা এবং সাফল্য শিক্ষকের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল। বৃত্তিমূলক ‘শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ্য শিক্ষকের অত্যন্ত অভাব। বেতনের হার নিম্ন হওয়ায় যোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষক হতে চান না। কারণ শিল্প কারখানায় তারা অধিক বেতন এবং সুযোগ পেয়ে থাকেন। প্রকৃত যোগ্য এবং দক্ষ কারিগরদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে অন্তত শিল্প কারখানায় চাকরির সমতুল্য করতে হবে। পূর্ণকালীন শিক্ষকতার জন্য যোগ্য লোক পাওয়া না গেলে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ ব্যক্তিদের মেয়াদি চুক্তিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
গ. বর্তমানে দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষক প্রশিক্ষণের কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। অথচ এরূপ ব্যবস্থার আশু প্রয়োজন। এ কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে অন্তত দুটো বৃত্তিমূলক শিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন কার উচিত, যাতে প্রতিবছর যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানে নিয়োজিত হতে পারেন। যেহেতু এরূপ প্রশিক্ষণের আর প্রয়োজন রয়েছে তাই পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত যথেষ্ট সংখ্যক দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ করে কোনো একটি বা দুটি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে এ কোর্স চালু করা যেতে পারে।
ঘ. বৃত্তিমূলক শিক্ষক শিক্ষণের কোর্স ও কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ কমিটি ঠিক করবেন। এর মেয়াদ অন্তত এক বছরের হওয়া প্রয়োজন। পলিটেকনিকের ডিপ্লোমা কোর্স ছাড়াও বৃত্তিমূলক কোর্স থেকে উত্তীর্ণ প্রার্থী এবং দক্ষ কারিগরগণ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভর্তির যোগ্য বিবেচিত হবে। এ প্রশিক্ষণের কার্যক্রম নিম্নরূপ :
১. নির্ধারিত বৃত্তিমূলক বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ।
২. শিক্ষা সম্বন্ধীয় বিষয়সমূহ প্রশিক্ষণ ।
৩. শিল্প কারখানায় বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন।
ঙ. বৃত্তিমূলক শিক্ষা সমাপ্তির পর প্রার্থীরা যাতে শিল্প কারখানা এবং কারিগরি সংস্থাসমূহে উপযুক্ত চাকরি পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাকরি বিনিয়োগ কেন্দ্র স্থাপন করার প্রয়োজন রয়েছে।
চ. শিল্পে শিক্ষানবিশী কার্যক্রমকে ব্যাপক ও সুদৃঢ় ভিত্তিতে প্রস্তাবিত এবং প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ এটি দক্ষ কর্মী তৈরির উত্তম পন্থা এবং এর মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের শিল্প কারখানায় চাকরির পথ সুগম হয় ।
ছ. বিভিন্ন বৃত্তিমূলক বিষয়ে দেশে যথেষ্ট সংখ্যক বই বাংলা ভাষায় প্রকাশের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় বৃত্তিমূলক’ শিক্ষা প্রসারের সব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারে ইংরেজি ভাষায় যেসব বই রয়েছে সেগুলো বাংলা ভাষায় প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে এ ব্যাপারে ইউনেস্কো বা এ রকম অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। যেসব বৃত্তিমূলক বিষয়ে বিদেশী উপযুক্ত বই পাওয়া যায় না এসব বিষয়ের বই লেখার জন্য আমাদের দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রাপ্ত লোকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
জ. বৃত্তিমূলক শিক্ষার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য এবং হাতে-কলমে শিক্ষা আরও কার্যকর করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উপযুক্ত কারখানা গড়ে তুলে তাতে ‘শেখ ও উপার্জন কর’ ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয় বিবেচনা করা উচিত। এরূপ ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণদানের ব্যয়ের কিছুটা উৎপাদনে রূপান্তরিত হবে। আমাদের দেশের অগণিত ছাত্রছাত্রী শুধু আর্থিক অভাবের দরুন অতি অল্প বয়সেই লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। অল্প বয়সেই ‘শেখ ও উপার্জন কর’ ব্যবস্থার প্রবর্তন হলে এদের অনেকেই পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যতদূর সম্ভব শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন ।
উপসংহার : দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের ফলে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন কৌশল ও পদ্ধতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত অসম ও প্রতিকূল প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এ অসম প্রতিযোগিতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি ও শ্রমের মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমাদের অযুদান্ত জনসম্পদকে বৃত্তিমূলক এবং প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা উচিৎ।