মানুষের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি, আনন্দ–বেদনা, কল্পনা ও স্বপ্নের ভাষা হলো কাব্য। ভাষার সৌন্দর্য, ছন্দের মাধুর্য ও ভাবের গভীরতায় যে সাহিত্য মানুষের মনকে আলোড়িত করে, তাকে আমরা কাব্যসাহিত্য বলে জানি। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই মানুষ তার অনুভূতি প্রকাশের জন্য কবিতার আশ্রয় নিয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় কাব্যধারায় বাল্মীকির শোক থেকে জন্ম নেওয়া প্রথম শ্লোকের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বেদনা ও সৌন্দর্যের মিলনেই কাব্যের সৃষ্টি।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসেও কাব্যসাহিত্য এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় অধ্যায়। চর্যাপদ থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক যুগ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে আধুনিক কবিদের কাব্যচর্চা—এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলা কাব্যসাহিত্য শুধু ভাব ও রূপের বিবর্তনই ঘটায়নি, গড়ে তুলেছে জাতির মনন ও চেতনার ভীত। কাব্য কখনো সমাজের কথা বলে, কখনো প্রেম ও প্রকৃতির গান গায়, আবার কখনো বিদ্রোহ ও মানবতার আহ্বান জানায়।
এই রচনায় কাব্যসাহিত্যের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, কবি ও কবিতার স্বরূপ, গদ্য–পদ্যের পার্থক্য, কবিতা ও দর্শনের সম্পর্ক এবং সর্বোপরি বাংলা কাব্যসাহিত্যের ঐতিহাসিক বিকাশধারা সংক্ষিপ্ত অথচ সুসংহতভাবে আলোচিত হয়েছে। এর মাধ্যমে পাঠক কাব্যের সৌন্দর্য ও গুরুত্ব অনুধাবনের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ঐতিহ্যের গভীরতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।
Table of Contents
কাব্য সাহিত্য | ভাষা ও সাহিত্য | বাংলা রচনা সম্ভার
কাব্য সাহিত্য
ভূমিকা:
এরূপ প্রসিদ্ধি আছে যে, আদিকবি বাল্মীকির ক্রৌঞ্চমিথুন-বিয়োগজনিত শোকই শ্লোকরূপে উৎসারিত হয়েছিল। সহচরী-বিয়োগকাতর ক্রৌঞ্চের বেদনায় কবির চিত্তে গভীর শোকের সঞ্চার হয়। সেই বেদনা থেকেই সহসা ‘পরিপূর্ণ বাণীর সঙ্গীত’ অনুগ্রহণ করে অপূর্ব ছন্দে কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল—
“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগতঃ শাশ্বতী সমাঃ
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্॥”
কবির এ বেদনাবোধ স্বকীয় দুঃখসন্তপ্ত চিত্তের প্রকাশমাত্র নয়; এর মধ্যে তদগত চিত্তের আত্মপ্রকাশের আনন্দ-বেদনাও নিহিত রয়েছে। সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, কবির বেদনাবিদ্ধ হৃদয়ই কবিতার জন্মভূমি। অর্থাৎ সময়বিশেষে কোনো একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে কবির আনন্দ-বেদনা যখন প্রকাশের পথ পায়, তখনই কবিতার সৃষ্টি হয়। কবির কল্পনামাধুর্যে এ বেদনাই সুন্দর হয়ে ওঠে।
মোটকথা, বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দ কিংবা আপন মনের ভাবনা-বেদনা ও কল্পনাকে যে লেখক অনুভূতিস্নিগ্ধ ছন্দোবদ্ধ তনুশ্রী দান করতে পারেন, তাকেই আমরা কবি নামে বিশেষিত করি। কবি কে?—অনেকে বলেন, যিনি জগতের একখানি যথাযথ ও স্বাভাবিক চিত্রপট এঁকে দিতে পারেন, তিনিই যথার্থ কবি।
অর্থাৎ কবি জগতের ভালো-মন্দের যথাযথ চিত্র অঙ্কন করেন। যারা বাস্তব সাহিত্যপ্রিয় এবং যারা কবিকল্পনার দ্বারা প্রবঞ্চিত হতে চান না, তারা এরূপ মত পোষণ করে থাকেন। কিন্তু কাব্যাদর্শ বাস্তবাদর্শ থেকে ভিন্ন—এ কথা ভুললে চলবে না। কাব্যের জগৎ বাস্তব জগতের যথাযথ অনুলিপি নয়; বরং এটি এক প্রকার স্বপ্রতিষ্ঠ, স্বয়ঙ্কুশ ও অখণ্ড জগৎ। সুতরাং একজন কবির দৃষ্টি ও কল্পনাশক্তিই তার কাব্যসৃষ্টির মূল ভিত্তি।
কবিতা কাকে বলে :
এক কথায় কিংবা অল্প কথায় কবিতার সংজ্ঞা প্রদান করা বেশ কঠিন কাজ। অনেকে কবিতার নানা রকম সংজ্ঞা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। অপরিহার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বাণীবিন্যাসকে কবিতা বলে। এখানে ‘শব্দ’ বলতে ভাবকল্পনা ও অর্থব্যঞ্জনার বাহনকে বোঝায়।
পণ্ডিত কালিদাস বলেন, “বাগর্থিব সম্পৃক্তৌ শব্দার্থৌ”—অর্থাৎ শব্দ ও অর্থের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কই জ্ঞানের একমাত্র প্রকাশক। অসংখ্য শব্দ যখন কবির লেখনীর মুখে ভিড় করে, তন্মধ্যে একটিমাত্র যথাযথ শব্দই কবিতায় ব্যবহারযোগ্য অপরিহার্য শব্দ হয়ে ওঠে। আর এ জাতীয় শব্দ লেখকের কল্পনা বা অনুভূতিস্নিগ্ধ চেতনা থেকে স্বতঃউৎসারিত বলে ভাবপ্রকাশের পক্ষে এটি একান্ত উপযোগী। আবার এই শব্দকে রসাত্মক বাণীমূর্তি দান করার জন্য কবি বস্তুগত উপাদানের উপর কল্পনার দীপ্তি প্রতিফলিত করেন। সুতরাং দেখা যায় যে, কবির মনের ভাবনাকল্পনা যখন অনুভূতিরঞ্জিত, যথাবিহিত শব্দসম্ভারে বাস্তব সুষমামণ্ডিত চিত্রাত্মক ও ছন্দোময় রূপ লাভ করে, তখনই তা হয়ে ওঠে কবিতা।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
অন্তর হতে আহরি বচন,
আনন্দলোক করি বিরচন,
গীতরসধারা করি সিঞ্চন
সংসার ধূলিজালে।
রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি থেকে উপলব্ধি হয় যে, কবি নিজের অন্তর থেকে বচন, কথা বা শব্দসম্ভার সংগ্রহ করে আনন্দলোক সৃষ্টি করেন। সংসারের অভাব, অভিযোগ, দুঃখ-দৈন্য, কুশ্রীতা প্রভৃতির উপর গীতরস সিঞ্চন করে সেগুলোকে আরও উজ্জ্বল করে তোলেন।
নিচে কবিতার কতিপয় উল্লেখযোগ্য ও বিখ্যাত সংজ্ঞা দেওয়া হলো—
১. “Best words in the best order.” — Coleridge
২. “Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings.” — Wordsworth
৩. “Poetry is the nascent self-consciousness of man, not as an individual but as a sharer with others of a whole world of common emotion.” — Caudwell
৪. “শব্দার্থে সহিতো কাব্যং।”
৫. “কাব্যলক্ষ্মীর সঙ্গে আত্মার রতিসুখ-সম্ভোগকালে রস-মূর্ছিত মানবের দিব্যভাগবিধুর গদগদ ভাব।” — মোহিতলাল মজুমদার
মোটকথা, কবির কল্পনার বিভিন্ন ভাবসমূহ যখন রসময়, ছন্দময় হয়ে বাণীবদ্ধ রূপ লাভ করে, তখন তাকেই কবিতা বলা হয়।
কবিতার উদ্দেশ্য:
কবিতা নিরাভরণ নয়। নারী যেমন আকার-ইঙ্গিতে, সাজসজ্জায়, বিলাসে-প্রসাধনে নিজেকে মনোরমা করে তোলে, কবিতাও তেমনি শব্দে, সঙ্গীতে, উপমায়, চিত্রে ও অনুভূতির নিবিড়তায় নিজেকে প্রকাশ করে। নীতিপ্রচার, শিক্ষাদান এবং রাজনীতি বা সমাজনীতি প্রচার কাব্যের উদ্দেশ্য নয়। জীবনের সুখ-দুঃখ, পাপ-পুণ্য, ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ—প্রভৃতি যে কোনো বিষয়ই কাব্যের উপাদান বা অঙ্গ হিসেবে গৃহীত হতে পারে।
কিন্তু এরা যেন কাব্যাত্মার দেহমাত্র। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন—
“কাব্যের উদ্দেশ্য নীতিজ্ঞান নহে। কবিরা জগতের শিক্ষাদাতা; কিন্তু নীতি-ব্যাখ্যার দ্বারা তাঁহারা শিক্ষা দেন না। তাঁহারা সৌন্দর্যের চরমোৎকর্ষ সৃজনের দ্বারা জগতের চিত্তশুদ্ধি বিধান করেন।”
সুতরাং দেখা যায় যে, কাব্যের উদ্দেশ্য জগৎ ও জীবনের রহস্যকে সুন্দর করে, রসসিক্ত করে উপস্থাপন করা। এজন্য একজন কবির নিকট সৌন্দর্যই পরম সত্যরূপে পরিগণিত, এবং যা কল্পনায় তিনি সত্য বলে প্রত্যক্ষ করেন, তাই সুন্দর। এই সৌন্দর্য সৃষ্টিই কাব্যের উদ্দেশ্য।
গদ্য ও পদ্য উভয়ই সাহিত্যের বাহন। সাধারণত কবিতা পদ্যেই লেখা হয়। মূলত গদ্য ও পদ্যের মধ্যে কোনো ভিন্নতা আছে বলে অনেকে স্বীকার করতে চান না। Wordsworth তাঁর Lyrical Ballads-এর ভূমিকায় বলেছেন যে, গদ্য ও পদ্যের মধ্যে মূলত কোনো প্রভেদ নেই; এবং Shelley-ও গদ্য ও পদ্যের মধ্যে বিভেদকে অসমীচীন মনে করতেন।
অবশ্য দার্শনিক হেগেলের মতো আমরা বলতে চাই না যে, ছন্দই কবিতার অপরিহার্য অঙ্গ। ছন্দ না থাকলেও শুধু তাল বা লয় কাব্যদেহকে সৌন্দর্যে লীলায়িত করতে পারে। তবে এ কথা সত্য যে, সাহিত্যে গদ্য ও পদ্যের বিভেদ স্বীকার করা হয়েছে। ইংরেজি কবি Coleridge গদ্য ও পদ্যের পার্থক্য নির্ধারণ করতে গিয়ে বলেছেন—
“শব্দের সুনিয়ন্ত্রিত বিন্যাসই গদ্য এবং যথোপযোগী শব্দের অবশ্যম্ভাবী বিন্যাসই পদ্য।”
গদ্য মানুষের ভাবনাচিন্তার সুনির্বাচিত, যুক্তিনিষ্ঠ প্রকাশ; পদ্য ভাষার অতীত ব্যঞ্জনাত্মক প্রকাশ। গদ্য যা বলে, তা বলে; পদ্য যা বলে, তার চেয়ে বেশি বোঝায়। বর্ষার দিনে আকাশে সঞ্চরণশীল মেঘমালার সৌন্দর্য দেখে যদি বলা হয়—
“ঘন বরষায় মেঘ গর্জন করে”
— এটি গদ্য। এখানে মনের কথাটি সাধারণ ভাষাচিত্রে রূপ লাভ করেছে।
কিন্তু যদি বলা হয়—
“গগনে মেঘ গরজে ঘন বরষায়”
— এটি হয়ে গেল পদ্য। এখানে একটি সুরের মূর্ছনা রয়েছে, যা আমাদের মনকে উন্মনা করে তোলে।
কবি ও বৈজ্ঞানিকের পার্থক্য :
বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়— “কাব্য গড়ে, বিজ্ঞান ভাঙে।”
এই কথাটিতে কবি ও বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য সুনিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। কবি ও বৈজ্ঞানিক উভয়েই সত্যের উপাসক। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সাহায্যে বাস্তব সত্যের অনুসন্ধান করেন; আর কবি তার অনুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করেন।
তাই বলা যায়, বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টি তন্ময় দৃষ্টি, আর কবির দৃষ্টি দৃপ্ত মনের দৃষ্টি-ভবন। সত্য নিষ্ঠুর হলেও বৈজ্ঞানিক তাকে নির্বিকারভাবে গ্রহণ করেন; কবি সেখানে সত্যকে সৌন্দর্যের আবরণে গ্রহণ করেন। বৈজ্ঞানিকের সত্য যখন কবির ব্যক্তিচেতনায় রঙিন হয়ে ওঠে, তখন তা-ই আবার কাব্যের স্তরে উন্নীত হয়।
এ কারণেই Wordsworth বলেন—
“Poetry is the impassioned expression which is in the countenance of all science.”
কবিতা ও দর্শন :
কবিতা ও দর্শন উভয়েই বিশ্বজগতের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের প্রণালী সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনুভূতি ও ভাবাবেগই কবিতার উপজীব্য, আর দর্শন বিচারমূলক বিশ্লেষণের সাহায্যে জগৎ ও জীবনের বুদ্ধিগত স্বরূপ উদ্ধার করতে চায়। দার্শনিক ভাবেন, কবি অনুভব করেন। কবির মুখ্য উদ্দেশ্য হলো সৌন্দর্য; দার্শনিকের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের অন্তর্লীন সৌন্দর্যের ভাবগত অদ্বৈত সত্তার আবিষ্কার।
মোটকথা, লেখকের ভাবকল্পনা যেখানে অরূপ ও অমূর্ত সত্য নির্দেশ করে, সেখানে তিনি দার্শনিক। আবার তা-ই যখন সীমায়িত রূপ-রসে নিবেদিত হয়, তখন তিনি কবি। তবে কবিতায়ও দর্শন থাকে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবিতায় দর্শন ও কাব্যের মিলন স্বাভাবিক। তবে দার্শনিকতা কাব্যশ্রীমণ্ডিত হতে হবে—তা না হলে দর্শনের পীড়নে কবিতার অপমৃত্যু হবে। এ কারণেই কীটস্ বলেছেন—
Do not all charms fly
At the mere touch of cold philosophy?
মধ্যযুগের কাব্যসাহিত্য:
১২০০ থেকে ১৩৫০ অব্দ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকার পর মধ্যযুগে বাংলা কাব্যসাহিত্যে আসে বড় কবিরা। এ সময় রচিত হয় মঙ্গলকাব্য। এ যুগের অসাধারণ দীর্ঘকাব্য হলো বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। বড়ু চণ্ডীদাস বাংলা ভাষার প্রথম মহাকবি। মধ্যযুগ মঙ্গলকাব্যের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত। দেব-দেবীর মঙ্গলকামনায় এ কাব্যগুলো রচিত হয়েছে বলেই এদের নাম মঙ্গলকাব্য। প্রায় পাঁচশো বছর ধরে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্যগুলোর মধ্যে চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, শিবমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল উল্লেখযোগ্য।
মঙ্গলকাব্যের মধ্যে বিশেষভাবে বিখ্যাত হলো চণ্ডীমঙ্গল ও মনসামঙ্গল। চণ্ডীমঙ্গল রচনা করেছেন অনেক কবি। তাঁদের মধ্যে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবিদের সারিতে যাঁরা স্থান পেয়েছেন, তাঁরা হলেন কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী এবং রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। মনসামঙ্গলের দুজন শ্রেষ্ঠ কবি হলেন বিজয়গুপ্ত ও বংশীদাস।
চণ্ডীমঙ্গলে রয়েছে দুটি চমৎকার কাহিনি— একটি ব্যাধ কালকেতু-যুগ্মরার এবং অপরটি ধনপতি লহনার। মনসামঙ্গলের কাহিনি মূলত বেহুলা-লখিন্দরকে কেন্দ্র করে রচিত। সেকালের কাব্যের উদ্দেশ্য আজকের মতো ছিল না; তখন কাব্যের জন্য কাব্য লেখার প্রচলন ছিল না। ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যেই অধিকাংশ কবি কাব্য রচনা করতেন। তাই মধ্যযুগের সাহিত্য ছিল প্রধানত ধর্মভিত্তিক ও দেবতাকেন্দ্রিক। তবে দেবতার আড়ালে মানুষের জীবনচিত্রও ফুটে উঠেছে।
মধ্যযুগের আরও কতিপয় বিখ্যাত কবির নাম হলো— চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, ভারতচন্দ্র, আলাওল, কাজী দৌলত প্রমুখ। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কাব্যধারা হলো বৈষ্ণব পদাবলী। এ কাব্যের নায়ক-নায়িকা কৃষ্ণ ও রাধা। এ কবিতাগুলো তুলনাহীন আবেগে পরিপূর্ণ। বৈষ্ণব কবিতা বাংলা কাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। চণ্ডীদাসের একটি পদ—
সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম।
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো,
আকুল করিল মোর প্রাণ।
না জানি কতেক মধু শ্যাম নামে আছে গো,
বদন ছাড়িতে নাহি পারে।
জপিতে জপিতে নাম অবশ করিল গো,
কেমনে পাইব সই তারে।
চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাস কবিতা লিখেছেন খাঁটি বাংলা ভাষায়, সহজ ও সরল আবেগে। অন্যদিকে বিদ্যাপতি ও গোবিন্দদাস লিখেছেন ব্রজবুলি ভাষায়। জ্ঞানদাসের কবিতার কয়েকটি পংক্তি—
রূপলাগি আখি করে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কান্দে।
পরাণ পিরিতি লাগি থির নাহি বান্ধে।
বিদ্যাপতি ছিলেন মিথিলার রাজা শিবসিংহের রাজসভার মহাকবি। তাঁকে ছাড়া বৈষ্ণব কবিতার কথা ভাবাই যায় না। তাঁর কবিতায় মোহিত হয়ে রাজা তাঁকে ‘কবিকণ্ঠহার’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
মধ্যযুগে মুঘল কবিদের অবদান :
মধ্যযুগে মুসলমান কবিরাও বাংলা ভাষায় অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এ সময়কার প্রথম বাংলা ভাষার মুসলমান কবি হলেন শাহ মুহম্মদ সগীর। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ইউসুফ-জুলেখা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লায়লা-মজনুর প্রণয়কাব্য রচনা করেছেন বাহরাম খান। এ সময়কার আরেকজন বিখ্যাত কবি হলেন আব্দুল হাকিম। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ নূরনামা-য় তিনি লিখেছেন—
যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়,
নিজ দেশ ত্যাগি কেন বিদেশ না যায়।
এই কবিতাংশ পড়লে বোঝা যায়, তিনি কত গভীরভাবে বাঙালি চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন।
মধ্যযুগের আরেক বিখ্যাত কবি হলেন আলাওল। তিনি সপ্তদশ শতাব্দীর একজন উল্লেখযোগ্য কবি। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ পদ্মাবতী। এ কাব্যে তিনি সিংহলরাজের কন্যা অপরূপ সুন্দরী পদ্মাবতীর রূপসৌন্দর্যের অপূর্ব বর্ণনা করেছেন। আলাওলের ভাষায়—
পদ্মাবতী রূপ কি কহিমু মহারাজ,
তুলনা দিবারে নাহি ত্রিভুবন মাঝ।
আপাদলম্বিত কেশ, কস্তুরীর সৌরভ,
মহাঅন্ধকারময় সৃষ্টি পরাভব।
স্বর্গ হস্তে আনিতে যাইতে মনোরথ।
এমন সুন্দর উপমা ও বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল।
বাংলা কাব্যসাহিত্যে আধুনিকতা/আধুনিক বাংলা কাব্যসাহিত্য:
উনিশ শতকের প্রথমার্ধ জুড়ে গদ্যের রাজত্ব ছিল। সে সময়ে গদ্যই ছিল সাহিত্যের সম্রাট। ওই সময়ে একমাত্র কবি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। তিনি ছিলেন আধুনিক কালের মানুষ। তাঁর রচনার বিষয় ছিল বড়ই চমৎকার। তপসে মাছ থেকে শুরু করে ইংরেজদের ককটেল পার্টি—সবকিছুই ছিল তাঁর কবিতার বিষয়। তিনি এক ইংরেজ রমণীকে উপলক্ষ করে লিখেছেন—
বাংলা কাব্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ও তার পরবর্তীরা:
আকাশে সূর্য ওঠে প্রতিদিন, আমরা সূর্যের স্নেহ পাই সারাক্ষণ। সূর্য ছাড়া আমাদের চলে না। তেমনি আমাদের আছেন একজন, যিনি আমাদের প্রতিদিনের সূর্য। তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি আমাদের সারাক্ষণ আলো দিচ্ছেন। তাঁর কাব্যালোকে আমাদের ভাসিয়ে তুলছেন। তিনি বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় কবি।
তাঁর অবদানের ফলেই আমাদের কাব্যসাহিত্য বিশ্বদরবারে সুপরিচিতি লাভ করে। তাঁর কাব্যপ্রতিভা অতুলনীয়। তিনি তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে সযত্নে রচনা করেন গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ। এর জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর কবিতায় ও গানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পরিপূর্ণ ও পরিপুষ্ট হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বহুরূপে, বহুবর্ণে সাজিয়েছেন বাংলা ভাষা ও ছন্দকে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক তিনজন মহিলা কবিও বাংলা গীতিকাব্যে কোমলতা সঞ্চার করেছেন। এরা হলেন—সিরীন্দ্র মোহিনী দাসী, মানকুমারী বসু ও কামিনী রায়। আরেকজন বিখ্যাত কবি হলেন যতীন্দ্রমোহন বাগচী। তিনি বাঙালি জীবনের সুখ-দুঃখ ও বাংলার পল্লীপ্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনায় আন্তরিকতা পরিয়ে দিয়েছেন।
কবি কালিদাস রায় তাঁর কাব্যে বাংলার মাঠ-ঘাট ও পল্লীপ্রকৃতির মমতাময় রূপ তুলে ধরেছেন। বাংলার কাব্যে বিদ্রোহের ধারা ধরা পড়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। তাঁর অগ্নিঝরা কাব্যধারা বাংলার ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলে। পরাধীনতার শিকল ভেঙে স্বদেশ গড়া, সকল প্রকার অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ ও অবিচারের অবসান ঘটানোই ছিল তাঁর কাব্যের আহ্বান। যেমন—
“শিকল পড়া ছল মোদের এই শিকল পড়া ছল,
শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।”“লাথি মার ভাঙরে তালা
যত সব বন্দীশালা,
আগুন জ্বালা, আগুন।”
তিনি বিদ্রোহী কণ্ঠে তাঁর প্রতিবাদ জানাতেন, কাব্যে তা ফুটিয়ে তুলতেন। তাই তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে আখ্যায়িত করা হয়।
বাংলা কাব্যসাহিত্যে গ্রামবাংলা:
গ্রামবাংলা ও পল্লীপ্রকৃতি বাংলা কাব্যের একটি প্রধান উপজীব্য বিষয়। পল্লীর সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, প্রেম-বিরহ, সহজ-সরল জীবনচিত্র মূর্ত হয়ে উঠেছে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কাব্যে। নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, রঙিলা নায়ের মাঝি প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে বাংলার মানুষ ও প্রকৃতি বাঙময় হয়ে উঠেছে। এছাড়া কবি জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, আশরাফ সিদ্দিকী প্রমুখ কবিদের কবিতায় বাংলার গ্রামীণ চিত্র ফুটে উঠেছে।
আধুনিক কালের অন্যান্য কবিরা যেমন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যসাহিত্যে বিপুল বৈচিত্র্য দান করেছেন।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান আমলে বাংলা কবিতায় দুটো প্রতিপক্ষ ধারা সৃষ্টি হয়। একটি ধারা মুসলিম জাগরণ ও জাতীয়তাবাদী মনোভাবের স্ফুরণ ঘটায়, অন্যটি আধুনিক জীবনধর্মী কাব্য সৃষ্টিতে তৎপর থাকে। ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ কবির কবিতায় মুসলিম মানসের চিত্র ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্য:
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলা কাব্যসাহিত্যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা জাগে। মুক্তির আনন্দে নতুন চেতনা জন্মলাভ করে বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে। তারা তাঁদের কবিতায় স্বাধীনতার কথা, মুক্তির কথা, দেশের কথা ফুটিয়ে তোলেন অপূর্ব ভাব ও ছন্দে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেও অনেক কবি তাঁদের কবিতায় দেশাত্মবোধের কথা তুলে ধরেন।
বাংলা কাব্যে নিসর্গ চেতনা এবং উল্লেখযোগ্য কবি:
বাংলা কাব্যে নিসর্গচেতনা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মানুষ ও প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে কবিতা হয় না। যন্ত্রণাকাতর মানুষের জীবনকথা স্থান পায় বাংলা কাব্যসাহিত্যে। বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্যের কিংবদন্তি কবি শামসুর রাহমান এবং কবি আল মাহমুদ। শামসুর রাহমানের রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিভ্যবাসভূমে প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ রূপ ও রীতিতে, ভাব ও কল্পনায় স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর হয়ে আছে। আল মাহমুদ তাঁর কালের কলস, সোনালী কাবিন, লোক লোকান্তর প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে স্বাতন্ত্র্য মহিমায় উজ্জ্বল।
এছাড়াও কবি সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, সিকান্দার আবু জাফর, আশরাফ সিদ্দিকী, ওমর আলী, শহীদ কাদরী, জিয়া হায়দার, আব্দুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ কবি বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্যকে দিগন্তপ্রসারী ও সমৃদ্ধশালী করেছেন। কবি রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, মোহাম্মদ রফিক, আসাদ চৌধুরী প্রমুখ কবিরাও বাংলাদেশের আধুনিক কাব্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমান সময়ের কবিগণ রূপকল্পের ব্যবহারে যথেষ্ট অভিনবত্বের পরিচয় দেখিয়েছেন। তারা নতুন শব্দের ব্যঞ্জনা নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন এবং প্রকাশভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশেষ কুশলতা।
বর্তমান সময়ের কাব্যসাহিত্যে রাজনীতি, সামাজিক জীবনের সংঘাতময়তা, আধুনিক জীবনের নানা বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন কাব্যসাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছেন। এমনকি বাইরের কাব্যজগতের প্রভাবকে নিজেদের কাব্যসাহিত্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এতে করে বর্তমান কাব্যসাহিত্য গতানুগতিকতা-মুক্ত হয়ে আধুনিক ও সর্বজনীন কাব্যসাহিত্যে পরিণত হচ্ছে। বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার যুগেও কাব্যসাহিত্যের আবেদন ম্লান হয়ে যায়নি। আধুনিক কবিদের অভিনব শব্দ ও ছন্দ কাব্যসাহিত্যকে নতুন রূপে, নতুন আবেগে কাব্যরসিকদের আনন্দ দিচ্ছে।
উপসংহার:
কবিতা বা কাব্যসাহিত্য সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পকলা। একমাত্র কবিই শব্দের সাহায্যে আমাদের কাছে সঙ্গীতমূর্ছনা ও চিত্রাত্মক ভাব-কল্পনার রূপ প্রত্যক্ষ করে তোলেন। কবিতা শব্দের ব্যঞ্জনায়, ইঙ্গিতে, ভাবে ও সঙ্গীতমাধুর্যে অজ্ঞাতকে, অচেনাকে আমাদের গোচর করে। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন—
দ্বিধায় জড়িত পদে, কম্প্রবক্ষে নম্র নেত্রপাতে—
স্মিতহাস্যে নাহি চলো সসজ্জিত বাসর-সজ্জাতে
স্তব্ধ অর্ধরাতে।
তখন উর্বশীকে ছাপিয়ে আমাদের কাছে শয্যাসঙ্গিনী লজ্জারুণ নারীপ্রতিমা রূপময়ী হয়ে ওঠে। এ কারণেই কাব্য শ্রেষ্ঠ ললিতকলা বলে পরিগণিত।
বাংলা কাব্যসাহিত্যে এমনি সৃষ্টিশীল কবিতা রয়েছে, যা অপূর্ব ও মহিমাময়। এছাড়া বাংলা কাব্যসাহিত্য যথেষ্ট সম্প্রসারণশীল। সময়ের সঙ্গে হাতে হাত রেখে বাংলা কাব্যসাহিত্য সামনে এগিয়ে চলেছে।