একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা | শিক্ষাবিষয়ক | বাংলা রচনা সম্ভার , ভূমিকা : নতুন শতাব্দী মানে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ। সময়ের এ মাইলফলকটি অতিক্রম করে পৃথিবীর মানুষ তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন ন অভিজ্ঞতা আর চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ জাতীয় চ্যালেঞ্জের মাত্রা একটু বেশি। বিশেষ করে নতুন শতাব্দীতে বিশ্বায়নের প্রবল তোড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন দিশেহারা, তখন পরিবর্তনের দ্রুততার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত হোঁচট খেতে হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি জাতিই টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
Table of Contents
একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য্য, নিরক্ষরতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর বাণিজ্যিক বৈষম্য ও প্রতিবেশীর প্রতিনিয়ত আস্ফালনের মতো চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, নতুন শতাব্দীর এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। আর আমাদের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো নতুন শতাব্দীর আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত তথ্যপ্রযুক্তির চরম বিকাশের এ যুগে আমরা এর যোগ্য অংশীদার হতে পারিনি।
আধুনিক যে জ্ঞাননির্ভর সমাজ তা বিনির্মাণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। অথচ শিক্ষার ক্ষেত্রে চরম উন্নতি ও তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ছাড়া ছোট্ট এ দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকাই দায়। কেননা শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মানবপুঁজি গঠন করতে পারলেই দারিদ্র্যের অভিশাপ আর নির্ভরশীলতার আন্তর্জাতিক বেড়াজাল থেকে জাতিকে মুক্ত করা সম্ভব হবে। কেবল শিক্ষার মাধ্যমেই নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ও জনগণের জাতীয়তাবোধের বিকাশ সাধন করে বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ সম্ভব।
বাংলাদেশের সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ :
নতুন শতাব্দীতে পা রেখে বাংলাদেশ অনেক স্বপ্ন দেখলেও তাকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন, আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান উন্নতকরণ এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যেমন—
প্রথমত, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। মাথাপিছু আয় সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্নে। খাদ্য নিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানি আর স্যানিটেশন সুবিধা থেকে এ দেশের অধিকাংশ জনগণই বঞ্চিত।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের শতকরা ৩৫ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। যারা শিক্ষিত তাদের অধিকাংশই কেবল অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। আবার শিক্ষার যে নীতি, কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তা-ও হাজারো সমস্যা ও ত্রুটিতে ভরা। এমতাবস্থায় দেশের প্রতিটি মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাই জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয়ত, নতুন শতাব্দী হলো গণতন্ত্র আর উন্নয়নের। অথচ আজ পর্যন্ত আমরা এ দুটির কোনোটিই অর্জন করতে পারিনি। রাজনৈতিক অনৈক্য-বিশৃঙ্খলা আমাদের প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য এ মুহূর্তে রাজনৈতিক ঐক্য ও সংহতির কেনো বিকল্প নেই।
চতুর্থত, এ মুহূর্তে জাতি দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। আমরা উন্নয়ন আর সমৃদ্ধির পথে এক পা এগুলেও দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের কারণে পরক্ষণেই আমাদের এক পা পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। সন্ত্রাস এবং দুর্নীতিবিরোধী অনেক স্লোগান আর কর্মসূচির কথা শোনা গেলেও কোনোটিই কার্যকরভাবে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না ।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের সামনে এ মুহূর্তে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান ধরে রাখা। একদিকে প্রতিবেশী শক্তিধর রাষ্ট্রের বৈরী আচরণ, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত জাতিকে এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এমতাবস্থায় দেশের ভাবমূর্তি ধরে রেখে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ষষ্ঠত, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলা করে নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ এবং উন্নয়ন জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির চর্চা আর আধুনিকতার ঢাকঢোলে দেশীয় সংস্কৃতির এখন খুবই বেহাল অবস্থা ।
সপ্তমত, সবার জন্য সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার যে কঠিন কাজ তা-ও আমাদের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের ৬১টি জেলায় আর্সেনিকের বিস্তার, এইডসের বিস্তারসহ অন্যান্য মরণব্যাধির হাত থেকে জনগণকে রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ তো আমাদের সামনে রয়েছেই ।
একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার ভূমিকা :
একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তি আর বিশ্বায়নের চরম বিকাশের এ যুগে সকল প্রকার উন্নয়ন আর অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। যেমন-
প্রথমত, আমাদের সামনে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে সবার জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সর্বার্থে সবাইকে যথোপযুক্ত কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। কর্মসংস্থান আর অভ্যন্তরীণ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রের পাশাপাশি দেশের বাইরেও জনশক্তি রপ্তানির অপূর্ব সুযোগ রয়েছে আমাদের হাতে। আর সে সুযোগকে কাজে লাগানোর অন্যতম পূর্বশর্ত হলো শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করা।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিওর কানকুন সম্মেলনে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী শ্রমের অবাধ যাতায়াতের যে দাবি উত্থাপন করেছে এবং এতে ধনী দেশগুলো যে মনোভাব দেখিয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে জনশক্তি তথা শ্রমিক যদি শিক্ষিত ও দক্ষ হয় তাহলে এ ব্যাপারে তারা নমনীয় হতে রাজি। আমরা জানি, আমাদের দেশে বেকারত্ব থাকলেও ভালো ইংরেজি জানা দক্ষ লোকের চাকরির অভাব হয় না। বিশ্বব্যাপী সর্বত্রই তাদের কদর রয়েছে। সুতরাং দারিদ্র্য্য, বেকারত্ব, অতিরিক্ত জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি আর মুক্ত পুঁজির এ বিশ্বে টিকে থাকার উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো শতকরা ৪০ জন নিরক্ষর লোককে অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি দেশে সার্বিকভাবে নতুন শতকের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা। এজন্য একদিকে যেমন শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ দরকার, পাশাপাশি নকলমুক্ত তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মমুখী শিক্ষা প্রবর্তনের ব্যাপারে আরো বেশি মনোযোগী হওয়া আবশ্যক।
তৃতীয়ত, নতুন শতক হলো তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের শতক। বর্তমান বিশ্ব হলো ডিজিটাল বিশ্ব। তাই যে জাতি প্রযুক্তি বিশ্বে যত বেশি দাপটের সাথে অবস্থান করতে পারবে, সে জাতি তত বেশি উন্নতি ও শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। তাছাড়া বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্ট খোলামেলা বাজার ও প্রযুক্তি বিপ্লবের মাধ্যমে আসা অবারিত সুযোগকে গ্রহণ করতে হলে অবশ্যই তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার উন্নতি করতে হবে। কেননা তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ দক্ষ জনশক্তি না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, আবিষ্কার-উদ্ভাবন, কূটনীতি, রাজনীতি আর সংস্কৃতির কোনো ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। তাই নতুন শতাব্দীতে টিকে থাকার জন্য সর্বাগ্রে আমাদেরকে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রতি সর্বশেষ নজর দিতে হবে।
চতুর্থত, নতুন শতাব্দীতে আমাদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো গত শতাব্দীর সর্বশেষ দশকে আমাদের যে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছে তা অব্যাহত রেখে দেশে একটি স্থিতিশীল স্থা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করা । এক্ষেত্রে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ক্রমাগত সন্ত্রাস। গণতন্ত্রের এ দুটি শত্রুর হাত থেকে আমাদের রাজনীতিকে মুক্ত করতে পারলেই আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে সফল করতে পারব।
সেজন্য যে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ দরকার তার জন্য উপযুক্ত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া রাজনৈতিক সচেতনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের যোগ্যতাসম্পন্ন একটি উদ্যমী সুশীল সমাজও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সফল করার জন্য অত্যাবশ্যক, যা কেবল একটি সর্বজনীন মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমেই গড়ে তোলা সম্ভব ।
পঞ্চমত, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মুক্ত আকাশ আর মুক্তবাজারের যুগে নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখা। কেননা স্যাটেলাইটের ক্রমাগত আক্রমণে দেশীয় সংস্কৃতির যে ভগ্নদশা তা ঠেকাতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের যে আত্মপরিচয় সেখানেই সংকট দেখা দেবে। কিন্তু মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির এ যুগে ভিনদেশী সংস্কৃতিকে বাধা দেওয়ার একমাত্র উপায় দেশীয় সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করা।
এক্ষেত্রে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে বিদেশী সংস্কৃতির গ্রহণযোগ্য উপাদানগুলোর আত্তীকরণের মাধ্যমে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ করতে পারলে সেটা হবে সোনায় সোহাগা। কিন্তু এ কাজটি এত সহজ নয়। এজন্য চাই জাতীয় চেতনা ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিকশিত আলোকিত মানুষ। আর এ আলোকিত মানুষ গড়ার একমাত্র পথ হলো শিক্ষা। জাতিকে যদি শিক্ষিত করে নিজস্ব সংস্কৃতি সভ্যতা সম্পর্কে সচেতন করা না যায় তাহলে সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করা যাবে না।
শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ :
আমাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য শিক্ষাকে উন্নয়নের হাতিয়ার করতে চাইলে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে :
১. জনসংখ্যার বিশালত্ব ও ব্যাপক দারিদ্র্য্য পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
২. প্রাথমিক শিক্ষার পরপরই মাধ্যমিক শিক্ষাকে বিবেচনা করা দরকার। এক্ষেত্রে শিক্ষাসূচির আমূল পরিবর্তন কাম্য যা জ্ঞান, দক্ষতা ও মৌলিক উৎকর্ষকে উৎসাহিত করবে। এই পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ- তরুণীই অধিক পরিমাণে জ্ঞানকর্মী হিসেবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যায় জর্জরিত। ছাত্ররাজনীতি, সন্ত্রাস, শিক্ষকদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা ইত্যাদিই এ ধরনের সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রধান। ফলে শিক্ষা তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে অধিকতর অন্তর্ভুক্তি, বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক এনে বিষয়ভিত্তিক লেকচার প্রদান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরতদের বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুবিধা ইত্যাদি বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের উচ্চশিক্ষার সুনাম পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে।
নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি সৃজনশীল উচ্চশিক্ষিত কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার জন্য সিঙ্গাপুরের মতো Leaming to think and thinking to leam’—এই ধারার দিকে জোর দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক উন্নয়নের ওপরও জোর দিতে হবে।
৪ . জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষা বরাদ্দ আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয় । এ হার ২০০৮ সাল নাগাদ কমপক্ষে ৪ শতাংশ করা উচিত। আর এই বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় করতে হবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা উপকরণ প্রসারে ।
৫. পিতামাতার দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুই স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের উদ্দেশ্যে কাজে যেতে বাধ্য হচ্ছে। ঝরে পড়ার ক্ষেত্রেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। এসব দরিদ্র কর্মজীবী ছাত্রদের স্কুলের প্রতি আকৃষ্ট করা এবং তাদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করা উচিত। স্থানীয় পর্যায়ে স্কুল পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করা যেতে পারে এবং শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক ।
৬. বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক, আঞ্চলিক এবং নারী-পুরুষভেদ বিরাজ করছে। এই বৈষম্যের সমস্যা সমাধানের জন্য যেখানে স্কুল নেই, সেখানে নতুন নতুন স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।
৭. শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা রোধে ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করা এবং এ জন্য রাজনৈতিক দলসমূহের ঐকমত্য ও সদিচ্ছার বাস্তবায়ন একান্ত জরুরি।
৮. নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের জন্য অধিক হারে মহিলা শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান সরকারি পদক্ষেপকে আরো এগিয়ে নিতে যেতে হবে।
৯. তথ্যপ্রযুক্তির চলমান বিপ্লবের সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সংযুক্ত করার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। এদিক থেকে আমরা সিঙ্গাপুর থেকে অনেক শিক্ষা নিতে পারি । ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক নীতি সমর্থনের বিষয়টিও লক্ষ্য করা যেতে পারে।
উপসংহার :
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক ধাঁচে গড়া। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশে তাদের শাসন-শোষণ পাকাপোক্ত করার জন্য তাদের স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল করে শিক্ষাব্যবস্থার বিন্যাস করে । পাকিস্তান আমলেও শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নতি সাধিত হয়নি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন কমিশন গঠন করে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হলেও সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তাই একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম ।