ভাষার মৌলিক উপাদান হলো ধ্বনি, আর সেই ধ্বনির মধ্যে স্বরধ্বনি মানুষের ভাষা ব্যবহারের কেন্দ্রে অবস্থান করে। কথা বলা, গান গাওয়া, আবৃত্তি কিংবা বক্তৃতা—সব ক্ষেত্রেই স্বরধ্বনির ভূমিকা অপরিসীম। স্বরধ্বনি ছাড়া কোনো ভাষার ধ্বনিগত কাঠামো পূর্ণতা পায় না। ধ্বনিতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে স্বরধ্বনি উচ্চারণের পদ্ধতি, তার বৈচিত্র্য ও শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই পাঠে স্বরধ্বনির সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, উচ্চারণগত বৈশিষ্ট্য, জিভ ও ঠোঁটের ভূমিকা, অর্ধস্বরধ্বনি এবং যৌগিক স্বরধ্বনির মতো বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ফলে বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ ও ধ্বনিগত গঠন বুঝতে এই আলোচনা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
এই পাঠটি আমাদের “ভাষা ও শিক্ষা” সিরিজের, ধ্বনিতত্ত্ব বিভাগের, ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব পাঠ্যগুলোর একটি।
Table of Contents
স্বরধ্বনি

যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে আগত বাতাস মুখগহ্বরের মধ্যে কোথাও কোনো প্রকার বাধাপ্রাপ্ত হয় না, তাকে স্বরধ্বনি (vowel) বলা হয়। স্বরধ্বনি অন্য কোনো ধ্বনির সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজেই সম্পূর্ণ ও পরিস্ফুটভাবে উচ্চারিত হতে পারে। যেমন— অ, আ, ই, উ। আবার কিছু স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস বাধাহীনভাবে একসঙ্গে মুখ ও নাক দিয়ে বের হয়। যেমন— আঁ, এঁ, ইঁ, ওঁ ইত্যাদি।
সহজভাবে বলা যায়, স্বরধ্বনি হলো এমন ধ্বনি যা স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারিত হতে পারে এবং যার আশ্রয়ে অন্য ধ্বনি প্রকাশ পায়। এ কারণেই ভাষার ধ্বনিগত গঠনে স্বরধ্বনির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষাবিদগণ স্বরধ্বনির সংজ্ঞা নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস-তাড়িত বাতাস মুখবিবরের কোথাও কোনো বাধা পায় না এবং যা অন্য ধ্বনির সহায়তা ছাড়াই উচ্চারিত হয়, তাকেই স্বরধ্বনি বলা হয়।
আন্তর্জাতিক ধ্বনিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা সাতটি। বাংলা মান্য চলিত ভাষায়ও মূল স্বরধ্বনি সাতটি— অ, আ, ই, উ, এ, অ্যা ও ও। তবে কথা বলার সময় আমরা কেবল এই সাতটি স্বরধ্বনিই উচ্চারণ করি না; বরং এদের নানা রকম সূক্ষ্ম উচ্চারণবৈচিত্র্যও ব্যবহার করি। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এই সব বৈচিত্র্যপূর্ণ উচ্চারণ শেষ পর্যন্ত এই সাতটি মূল স্বরধ্বনিরই কোনো না কোনো রূপভেদ হিসেবে গণ্য করা যায়।
যদিও বাংলা ভাষায় স্বরধ্বনির প্রকৃত সংখ্যা সাতটি, তবু বাংলা বর্ণমালায় স্বরবর্ণের সংখ্যা এগারোটি। এই এগারোটি স্বরবর্ণ হলো— অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ। বর্ণ ও ধ্বনির এই সংখ্যাগত পার্থক্য বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বরধ্বনির উচ্চারণ
ভাষা মানুষের সামাজিক জীবনের ভাবপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। ভাষার মৌলিক উপাদান হলো অর্থবোধক ধ্বনি। ধ্বনি একটি বাচনিক প্রক্রিয়া—মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়ে শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অপরের কাছে অর্থবহ হয়ে পৌঁছে যায়। এই অর্থবহতার ক্ষেত্রে উচ্চারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উচ্চারণের শুদ্ধতা বজায় না থাকলে ভাষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। শুদ্ধ উচ্চারণ একদিকে যেমন ভাবের সঠিক প্রকাশ নিশ্চিত করে, তেমনি শব্দের অর্থবিভ্রান্তি ও বিকৃতি থেকেও ভাষাকে রক্ষা করে। তাই বিশুদ্ধ উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আধুনিক যুগে সংবাদ উপস্থাপনা, অনুষ্ঠান পরিচালনা, সংগীত, আবৃত্তি, নাট্যকলা প্রভৃতি উপস্থাপনা শিল্পে (performing arts) উচ্চারণ এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে গণমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচলিত প্রমিত বাংলা ভাষার উচ্চারণকেই প্রমিত উচ্চারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
অ-ধ্বনির উচ্চারণ
বাংলা ভাষায় ‘অ’ ধ্বনির ব্যবহার ও উচ্চারণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শব্দে অবস্থানভেদে ‘অ’ ধ্বনি দুইভাবে ব্যবহৃত হয়—
১. অ-ধ্বনির ব্যবহার
স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত অ : যেমন— অমর, অনেক
বিলীনভাবে ব্যবহৃত অ : যেমন— কর, বল
(ক্+অ+র্+অ, ব্+অ+ল্+অ)
২. অ-ধ্বনির উচ্চারণের প্রকার
অ-ধ্বনির উচ্চারণ দুই রকম—
বিবৃত (স্বাভাবিক) উচ্চারণ : অমল, অনেক, কত
সংবৃত (ও-ধ্বনির নিকটবর্তী) উচ্চারণ : অভ্যাস (ওভ্যাস), অমনি (ওমনি), মন (মোন)
ক. বিবৃত উচ্চারণ
- শব্দের আদিতে : অটল, অচল
- অ বা আ-যুক্ত ধ্বনির আগে : অমানিশা, অনাচার
- শব্দের মধ্যে ও অন্তে স্বরসঙ্গতির কারণে : কলম, যত, শ্রেয়
- ঋ, এ, ঐ, ঔ ধ্বনির পর : তৃণ, দেব, ধৈর্য, মৌন
- ই-ধ্বনির পরে : গঠিত, জনিত
খ. সংবৃত উচ্চারণ
- পরবর্তী স্বর সংবৃত হলে : অতি (ওতি), করুণ (কোরুণ)
- র-ফলাযুক্ত অ-ধ্বনি : প্রতিভা (প্রোতিভা), প্রচুর (প্রোচুর)
- বিশেষণ পদের অন্তে : প্রিয়তম (প্রিয়তমো), গুরুতর (গুরুতরো)
- ই বা উ-কারের পরে : প্রিয় (প্রিয়ো)
সংবৃত উচ্চারণ বিকৃত নয়; এটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য উচ্চারণ।
আ-ধ্বনির উচ্চারণ
বাংলা ভাষায় আ-ধ্বনি একটি বিবৃত স্বরধ্বনি। এর উচ্চারণ হ্রস্ব ও দীর্ঘ—উভয়ই হতে পারে। উচ্চারণে এটি ইংরেজি father বা calm শব্দের a-এর মতো।
- একাক্ষর শব্দে সাধারণত দীর্ঘ : যা, চা, মা, গান, ধান
- বহু অক্ষরের শব্দে কখনো হ্রস্ব : ভালো, দাতা
কিছু ক্ষেত্রে আ-ধ্বনির উচ্চারণ অ্যা হয়ে যায়—
- যুক্ত ব্যঞ্জন ‘জ্ঞ’-এর সঙ্গে : জ্ঞান (গ্যান), জ্ঞাপন
- য-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জনে : খ্যাতি, ধ্যান, ব্যাকরণ
ই, ঈ-ধ্বনির উচ্চারণ
বাংলায় ই ও ঈ ধ্বনির উচ্চারণে সাধারণত তেমন পার্থক্য দেখা যায় না।
- একাক্ষর শব্দে উভয়ের উচ্চারণ দীর্ঘ : দিন, দীন, শীত, কী
- আরবি ও ইংরেজি শব্দে পার্থক্য রক্ষিত : মিল, মীল (rare usage)
উ, ঊ-ধ্বনির উচ্চারণ
উ ও ঊ ধ্বনির উচ্চারণেও সাধারণত বিশেষ পার্থক্য নেই।
- হ্রস্ব : চুল, ভুল, মুক্ত
- দীর্ঘ (বিশেষ অবস্থায়) : তূলা, ধূলা, মূলা
ঋ-ধ্বনির উচ্চারণ
বাংলায় ঋ ধ্বনি সাধারণত রি/রী রূপে উচ্চারিত হয়—
- ঋণ → রীন
- ঋতু → রীতু
এটি মূলত র্ + ই ধ্বনির সমন্বয়।
কার-রূপে ব্যবহৃত হলে র-ফলা + ই-কারের মতো শোনায়—
- পিতৃ → পিত্রি
- মাতৃ → মাত্রি
- কৃষ্টি → ক্রিষ্টি
এ ও অ্যা-ধ্বনির উচ্চারণ
এ-ধ্বনির সংবৃত উচ্চারণ
- পদের শেষে : পথে, ঘাটে
- তৎসম শব্দের আদিতে : দেশ, প্রেম
- একাক্ষর সর্বনাম : কে, সে, যে
- হ বা যুক্তধ্বনির আগে : দেহ, কেহ
- ই বা উ-কারের পরে : দেখি, বেলুন
এ-ধ্বনির বিবৃত (অ্যা) উচ্চারণ
ইংরেজি cat, bat-এর a-এর মতো।
- শব্দের আদিতে : দেখ (দ্যাখ), একা (এ্যাকা)
- অব্যয় ও সর্বনাম : এত, এখন, কেন
- অনুস্বার/চন্দ্রবিন্দুর আগে : বেঁকা, সেঁতসেঁতে
- কিছু খাঁটি বাংলা শব্দে : খেমটা, ঢেপসা
- সংখ্যাবাচক শব্দে : এক, এগারো
- ক্রিয়ার আদেশ ও তুচ্ছার্থে : দেখ (দ্যাখ), ফেল (ফ্যাল)
ঐ-ধ্বনির উচ্চারণ
ঐ কোনো মৌলিক স্বরধ্বনি নয়; এটি একটি যৌগিক স্বরধ্বনি (ও + ই)।
- সাধারণ উচ্চারণ : ওই
- কারচিহ্ন : ৈ (কৈ, চৈ)
সাধারণত হ্রস্ব হলেও আবেগে দীর্ঘ হতে পারে—
আরে ঐ-তো ওরা যাচ্ছে!
ও-ধ্বনির উচ্চারণ
- একাক্ষর শব্দে দীর্ঘ : জোর, ভোর, রোগ
- অন্যান্য ক্ষেত্রে হ্রস্ব : সোনা, গোটা, পুরো, কারো
ঔ-ধ্বনির উচ্চারণ
ঔ একটি যৌগিক স্বরধ্বনি (ও + উ)।
কারচিহ্ন : ৗ (নৌ, চৌ)
কবিতায় কখনো দীর্ঘ উচ্চারণ হয়—
হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক
স্বরধ্বনির সঠিক উচ্চারণ ভাষার শুদ্ধতা, সৌন্দর্য ও বোধগম্যতার জন্য অপরিহার্য। প্রমিত উচ্চারণে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ভাষা ব্যবহারে স্পষ্টতা আসে এবং ভাবপ্রকাশ হয় সাবলীল ও প্রাঞ্জল। বাংলা ধ্বনিতত্ত্বে স্বরধ্বনির এই উচ্চারণগত বৈচিত্র্য ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত।
স্বরধ্বনি উচ্চারণে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হল :
(১) জিভের অবস্থান (tongue position);
(২) জিভের উচ্চতা (tongue height)
(৩) ঠোঁটের আকৃতি (lip-rounding)।
এছাড়া আরও একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হয়, তা হলো কোমল তালুর অবস্থান।
কোমল তালুর অবস্থান অনুযায়ী স্বরধ্বনিগুলোকে মৌখিক ও অনুনাসিক স্বর হিসেবে নির্দেশ করা হয়।
১। জিভের অবস্থা অনুযায়ী বাংলা স্বরধ্বনি:
স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিভের যে অংশ সক্রিয় থাকে, সেই অংশের ভূমিকা অনুযায়ী স্বরধ্বনি বিচার করা হয়। সে অনুযায়ী স্বরধ্বনিগুলো:
(ক) সম্মুখ (front)
(খ) মধ্য (central)
(গ) পশ্চাৎ (back) ধ্বনি হিসেবে গণ্য হয়।
ক. সম্মুখ স্বরধ্বনি :
জিভের সামনের অংশটি এগিয়ে আসায় যে স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়, সেগুলো সম্মুখ স্বরধ্বনি। বাংলা ‘ই, এ, অ্যা’ এ-জাতীয় স্বরধ্বনি।
খ. মধ্য স্বরধ্বনি :
জিভ সামনে বা পেছনে না সরে অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় থেকে যেসব স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়, সেগুলো হল মধ্য স্বরধ্বনি। বাংলা ‘আ’ ধ্বনি এ শ্রেণির।
গ. পশ্চাৎ স্বরধ্বনি :
পশ্চাৎ স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিভ পিছিয়ে যায় অর্থাৎ পশ্চাৎ অংশ সক্রিয় হয়। এ জাতীয় স্বরধ্বনিগুলো হল- অ, ও, উ।
২। জিভের উচ্চতা অনুযায়ী বাংলা স্বরধ্বনি:
জিভের উচ্চতা অনুযায়ী স্বরধ্বনিগুলোকে (ক) উচ্চ (high), (খ) নিম্ন (low), (গ) উচ্চ-মধ্য ( high-mid), (ঘ) নিম্ন-মধ্য (low-mid) স্বরধ্বনি হিসেবে নির্দেশ করা হয়।
ক. উচ্চ-স্বরধ্বনি :
যেমন— ই, উ। এ শ্রেণির স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ সবচেয়ে উপরে ওঠে।
খ. নিম্ন-স্বরধ্বনি :
যেমন— আ, এ। এ শ্রেণির স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ সবচেয়ে নিচে নামে।
গ. উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি :
যেমন- এ, ও। এ জাতীয় স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ নিম্ন স্বরধ্বনির তুলনায় উপরে এবং উচ্চ স্বরধ্বনির তুলনায় নিচে থাকে ।
ঘ. নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি:
যেমন- অ্যা, ও। এ জাতীয় স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভ উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনির তুলনায় নিচে এবং নিম্ন স্বরধ্বনি থেকে উপরে ওঠে। [আ] চিত্র : জিভের উচ্চতা অনুযায়ী স্বরধ্বনির উচ্চারণ।
৩। ঠোঁটের আকৃতি অনুযায়ী বাংলা স্বরধ্বনি
স্বরধ্বনি উচ্চারণে ওষ্ঠ বা ঠোঁটের অবস্থা অনুযায়ী স্বরধ্বনিকে বর্তুল (round) ও প্রসূত (spread) স্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেসব স্বরধ্বনির উচ্চারণে ঠোঁট গোল হয় সেসব স্বরধ্বনিকে বলা হয় বর্তুল স্বর। যেমন— অ, ও উ। অপরদিকে যেসব স্বরধ্বনির উচ্চারণে ঠোঁট গোল না হয়ে প্রসৃত বা বিস্তৃত হয় সেসব স্বরধ্বনিকে বলা হয় প্রসৃত স্বর। যেমন— ই, এ, অ্যা।
এছাড়া ঠোঁটের উন্মুক্তি অর্থাৎ স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময়ে আমরা কী পরিমাণ হাঁ করছি তা নির্ধারণ করে স্বরধ্বনিকে নিম্নলিখিত চার ভাগে ভাগ করা হয়:
ক. বিবৃত (open) স্বরধ্বনি :
এ স্বরধ্বনির উচ্চারণে ঠোঁট সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে। বাংলা ভাষায় এ-জাতীয় স্বর মাত্র একটি— আ।
খ. অর্ধবিবৃত (half-open) স্বরধ্বনি :
বিবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় : ঠোঁট কম খোলা রেখে উচ্চারিত স্বরধ্বনিগুলোকে এভাবে দেখানো হয়। যেমন— অ্যা, অ।
গ. অর্ধসংবৃত (half-close) স্বরধ্বনি :
সংবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় ঠোট বেশি খোলা কিন্তু অর্ধ-বিবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় কম খোলা থেকে অর্ধ-সংবৃত স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়। যেমন : এ, ও।
ঘ. সংবৃত (close) স্বরধ্বনি :
ঠোঁট সবচেয়ে কম খোলা থেকে উচ্চারিত স্বরধ্বনিগুলো এ জাতীয়। যেমন— ই, উ ।
স্বরধ্বনি উচ্চারণে আলজিভ ও কোমল তালুর ভূমিকা :
স্বরধ্বনি উচ্চারণে কোমল তালুর ভূমিকা অনুসারে স্বরধ্বনিগুলোকে মৌখিক ও অনুনাসিক এই দু ভাগে ভাগ করা হয়। এ-সম্পর্কে আমরা পূর্ববর্তী আলোচনায় জেনেছি। এ-পর্যায়ে শুধু কোমল তালুর ভূমিকা উল্লেখ করা হল। মৌখিক স্বরধ্বনি উচ্চারণে আলজিভ এবং কোমল তালু নিচে নেমে যায় এবং বাতাস মুখ ও নাক দিয়ে একই সঙ্গে বেরিয়ে যায়।
অর্ধ স্বরধ্বনি
বাংলা ভাষায় চারটি অর্ধস্বরধ্বনি (semi-vowel) রয়েছে। যেমন– বই, ঢেউ, যায় এবং যাও-এর ই, উ, য় (=স্) এবং ত্। উচ্চারণ প্রক্রিয়ার দিক থেকে অর্ধস্বরধ্বনি পূর্ণস্বরের মতো স্পষ্ট উচ্চারতি নয়, যেন অসম্পূর্ণ স্বরের মতো। যেমন : ‘বই’ শব্দের ‘ই’, ‘ঢেউ’ শব্দের ‘উ’, ‘যায়’ শব্দের ‘য়’, ‘যাও’ শব্দের ‘ও’।
এই উদাহরণগুলোতে বই-এর ব-এর অ পূর্ণ উচ্চারিত কিন্তু ‘ই’ পূর্ণ উচ্চারিত নয়। এর উচ্চারণ হলন্ত। ‘ঢেউ’-এর ‘এ’ পূর্ণ উচ্চারিত, ‘উ’ হলন্ত ‘যায়’-এর ‘আ’ পূর্ণ উচ্চারিত, ‘য়’ হলন্ত। ‘যাও’-এর ‘আ’ পূর্ণ উচ্চারিত, ‘ও’ হলন্ত। অর্ধ-স্বরধ্বনির সংজ্ঞার্থ এভাবে দেওয়া যেতে পারে— যে স্বরধ্বনি নিজে পূর্ণ সিলেবল গঠন করতে পারে না, কিন্তু সিলেবল গঠনে সহায়তা করে তাকে অর্ধ-স্বরধ্বনি বলে।
অর্ধস্বরধ্বনিগুলো পূর্ণস্বর অর্থাৎ ই, উ, এ, ও-র সঙ্গেও মিল আছে। অর্থাৎ ই[সম্মুখ, প্রসৃত, উচ্চ], ট্ [পশ্চাৎ, বতুল, উচ্চ], এ [সম্মুখ, প্রসৃত, উচ্চমধ্য] এবং ও [পশ্চাৎ, বর্তুল, উচ্চমধ্য] স্বর। নিম্নমধ্য এবং নিম্ন স্বরগুলোর অ্যা, অ, আ কোনো অর্ধস্বর নেই।
যৌগিক স্বরধ্বনি – যৌগিক স্বর বা দ্বি-স্বর বা দ্বৈতস্বর বা সন্ধিস্বর (diphthong)
স্বরধ্বনি [যৌগিক স্বর বা দ্বি-স্বর বা দ্বৈতস্বর বা সন্ধিস্বর (diphthong)] পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি থাকলে দ্রুত উচ্চারণের সময় তা একটি সংযুক্ত স্বরধ্বনিরূপে উচ্চারিত হয়, এরূপে একসঙ্গে উচ্চারিত দুটো মিলিত স্বরধ্বনিকে যৌগিক স্বর বা দ্বি-স্বর বা সন্ধিস্বর বা সন্ধ্যক্ষর বলে। যেমন— অ + ই অই্ (বই), অ + উ = অউ (বউ), অ + এ = অয়্ (বয়), অ + ও = অও (হও, লও) ইত্যাদি।
অথবা, ‘যদি পাশাপাশি অবস্থিত দুটো সমশ্রেণির অথবা অসমশ্রেণির স্বরধ্বনি নিশ্বাসের একই প্রয়াসে উচ্চারিত হয়ে আক্ষরিক ধ্বনি গঠন করে এবং দ্বিতীয় স্বরধ্বনির তুলনায় প্রথমটা দীর্ঘ ও স্পষ্ট হয়, তাহলে এই শ্রেণির আক্ষরিক স্বরধ্বনিকে দ্বি-স্বরধ্বনি বলে। ১ J’ + + অ্যাত্ (নেওটা, শেঁওড়া) বাংলায় সতেরোটি প্রকৃত দ্বিস্বর ধ্বনি রয়েছে।
লক্ষণীয় :
মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁর ‘ধ্বনিবিজ্ঞান ও বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলা ভাষায় ধ্বনিগত (phonetic) দিক থেকে একত্রিশটি (৩১টি) পর্যন্ত যৌগিক স্বরধ্বনি হতে পারে। এদের মধ্যে ১৯টি নিয়মিত (regular) এবং ১২টি অনিয়মিত (irregular)।’ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে বাংলায় দ্বিস্বর পঁচিশটি। পবিত্র সরকারের মতে, বাংলা যথার্থ যৌগিক স্বরের সংখ্যা সতেরোটি ।
স্বরধ্বনি, ধ্বনিতত্ত্ব | বাংলা ব্যাকরণ
