শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day । প্রতিবেদন রচনা

শ্রমিক দিবস রচনাঃ প্রতিবছর মে মাসের প্রথম তারিখে বিশ্বব্যাপী পালিত ঐতিহাসিক দিবসটি ‘শ্রমিক দিবস’ নামে পরিচিত। শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দুর্বার আন্দোলনের রক্তস্রোত স্মৃতি বিজড়িত এই মে দিবস। শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রতি অবিচারের অবসান ঘটাবার সুতিকাগার বলা হয় শ্রমিক দিবসকে।

শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day
শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day

শ্রমিক দিবস রচনা

ভূমিকা

শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে মে দিবস এক স্মরণীয় অধ্যায় । মেহনতি শ্রমিকের আত্মদানে প্রতিষ্ঠিত মে দিবস’ পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক দিবসে। প্রকৃতপক্ষে, মে দিবস বলতে বােঝায় শ্রমিকদের কাজের সময় হাস ও তাদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনমুখর একটি ঐতিহাসিক দিন।আগস্ট স্পাইজ শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম নেতা ।

তাঁরই আত্মদানে প্রতিষ্ঠিত ‘ মে দিবস ‘ পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক দিবসে । মে দিবস , আজ তাই হাজার হাজার শ্রমিকের পায়ে চলা মিছিলের কথা , আপসহীন সংগ্রামের কথা । মে দিবস দুনিয়ার শ্রমিকের এক হওয়ার ব্রত । আন্তর্জাতিক সংগ্রাম আর সৌভ্রাতৃত্বের দিন । মে দিবসের অর্থ শ্রমজীবী মানুষের উৎসবের দিন , জাগরণের গান , সংগ্রামে ঐক্য ও গভীর প্রেরণা । মে দিবস শোষণ মুক্তির অঙ্গীকার , ধনকুবেরের ত্রাস , দিন বদলের শপথ ।

শ্রমিক দিবসের ইতিহাস

আন্দোলনের পথ কখনই মসৃণ ছিল না । মসৃণ থাকে না। ছিল নানা ঘটনার ঘাতপ্রতিঘাতে , জুলুম , অত্যাচারে , প্রতিরোধে , ধর্মঘটে , মিছিলে , সংগ্রামী ঐক্যে রক্তলাঞ্ছিত । মে দিবস একদিনে এই আন্তর্জাতিক চেহারা পায় নি । এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস । রয়েছে অনেক রক্তঝরার কাহিনি ।

জন্মলগ্ন থেকেই শ্রমিকশ্রেণীর ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস । শ্রমিকশ্রেণীকে উদয়াস্ত কাজ করতে হবে । আঠারো ঘণ্টা , কুড়ি ঘণ্টা পর্যন্ত ছিল কাজের সময় সীমা । আলেকজান্ডার ট্রাকটেনবার্গ মে দিবসের ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন : মে দিবসের জন্মকাহিনী অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে কাজের ঘণ্টা কমাবার আন্দোলনের সঙ্গে ।

১৮০৬ সালে কারখানায় কুড়ি ঘণ্টা পর্যন্ত ছিল বাধ্যতামূলক কর্মপ্রহর। ১৮২০-১৮৪০ সাল পর্যন্ত দশ ঘণ্টা কাজের দাবিতে অনেক আন্দোলন ও ধর্মঘট হয়। ১৮৬২-১৮৬৩ সালে গড়ে ওঠে ট্রেড ইউনিয়নের রাজনৈতিক ভিত্তি। দাসপ্রথা ওঠে গেল। নিগ্রোরা হল শ্বেতাঙ্গদের বন্ধু। এই সময়ে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

মালিকরা কম মজুরিতে নারী শ্রমিক নিয়োগ করত । ১৮৬৫ সালে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের পর থেকেই সেখানকার শিল্পের বিকাশ ঘটে দ্রুত গতিতে । সেই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের প্রসারও ঘটে দ্রুত । ১৮৮১ সালে নভেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ আমেরিকান ফেডারেশ অব লেবার ‘ ।

১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর সেখানে চতুর্থ সম্মেলনে গৃহীত হয় এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত , বলা হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে সব শ্রমজীবী মানুষ আট ঘণ্টার বেশি কোনওভাবেই কাজ করবে না । ওই দিনটিতে তাই পাঁচ লক্ষ শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে ধর্মঘটে যোগ দেন । শাসকদল এই ঐক্যবদ্ধ বিশাল শ্রমিক সমাবেশ ও ধর্মঘট দেখে ভয়ে পিছিয়ে যায় । ঐতিহাসিক মে দিবসের জন্ম মে দিবসের মূল প্রতিপাদ্য শ্রমিকদের দাবি – দাওয়া আদায় । আর এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল দেড়শ বছর আগে অস্ট্রেলিয়াতে ।

শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day
শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day

বিশ্বের কতটি দেশে শ্রম দিবসে ছুটি থাকে?

বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পহেলা মে জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। মে দিবস, শ্রমিক দিবস বা বিশ্বশ্রমিকদিবস, যে নামেই ডাকা হোক না কেন, দিনটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান-সংহতি জানানোর দিন হিসেবেই পালিত হয়ে আসছে ১৯০৪ সাল থেকে। বাংলাদেশেও এই দিবসটি আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদ্যাপন করা হয় ।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘটনা

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো নগরীর লক্ষ লক্ষ শ্রমিক দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে সর্বাত্মক ধর্মঘট শুরু করে । ব্যাপক আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ৩ ও ৪ মে । কিন্তু আন্দোলনের কণ্ঠরোধ করার জন্য পুলিশ গুলি চালায় এবং ১০ জন শ্রমিক প্রাণ হারায় । সেই সঙ্গে বহু শ্রমিক আহত হয় । গ্রেফতার হয় অগণিত শ্রমিক ।

গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের মধ্যে ৬ জনকে পরে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় । জেলখানায় বন্দি অবস্থায় আত্মহনন করেন এক শ্রমিক নেতা । শ্রমিক আন্দোলনের এই গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বের সকল দেশেই মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয় মহান মে দিবস।

১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার—শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলি বর্ষণ শুরু করে।

ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লভিনে। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে।

মে দিবস উৎসবের তারিখ ঘোষণা

পরে ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ব জুড়ে পহেলা মে তারিখে মিছিলের শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সব সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

সেই সম্মেলনে বিশ্ব জুড়ে সব শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে ‘বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসে ১ তারিখে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকর হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসেবে বেছে নেয়। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে।

পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চিন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই পহেলা মে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেসব দেশে এমন কি এ উপলক্ষ্যে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে।

শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day
শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day

আমেরিকা ও কানাডাতে কখন শ্রমদিবস পালন করা হয়?

আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রমদিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোক্তা। হে মার্কেটের হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পহেলা মে তারিখে যে কোনো আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রমদিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

বাংলাদেশ শ্রমিক দিবস পালন

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই মে দিবস সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন দিনটি পালন করতে শোভাযাত্রা, শ্রমিক সমাবেশ, আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে থাকে। মে দিবসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করে।

বর্তমানে বাংলাদেশ শ্রমিকদের অবস্থা

বাংলাদেশ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়নের অন্তরালে থাকে শ্রমিক-মজুরদের অক্লান্ত পরিশ্রম, ব্যথা-বেদনা। কিন্তু সে অনুযায়ী শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না। যাদের ঘামে একটি একটি ইট সাজিয়ে বড় বড় ইমারতসদৃশ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া আবশ্যক। শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রমিক দিবস

দেশ বিভাগের পূর্বে নারায়ণগঞ্জে মে দিবস পালিত হয় ১৯৩৮ সালে । এরপর থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সীমিত পরিসরে মে দিবস পালিত হত । তবে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী লাভ করলে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত বিপুল উৎসাহ নিয়ে শ্রমিকগণ মে দিবস পালন করে ।

প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক সেদিন আদমজীতে লাল পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল সমাবেশ করেছিল । সামরিক শাসন ( ১৯৫৮ ) জারির পূর্ব পর্যন্ত বেশ বড় আকারে সমাবেশের মাধ্যমে মে দিবস অনুষ্ঠিত হত । ১৯৫৮ সালে দাবি ওঠে ১ মে দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন করা হোক । ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পর শ্রমিক আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা সূচিত হয় ।

আওয়ামীলীগ ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে জয় লাভের পর শ্রমিকদের বিরাট একটি অংশ বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করে । তখন মে দিবস এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয় ।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু থেকে মে দিবসকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেনা । এবং সেই সাথে ১ মে কে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করেন । এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মহান মে দিবস উপলক্ষে তৎকালীন সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ প্রদানের মধ্য দিয়ে মে দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day
শ্রমিক দিবস রচনা । Essay on Labor Day

উপসংহার

বাংলাদেশে মে দিবস উদযাপন বাংলাদেশে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয় এবং ওই দিন সরকারি ছুটির দিন থাকে । দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাদের বাণী দিয়ে থাকেন । ২০২১ সালের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ মালিক শ্রমিক নির্বিশেষ মুজিববর্ষে গড়বো দেশ।

২০২২ সালের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘ শ্রমিক – মালিক একতা , উন্নয়নের নিশ্চয়তা ’। ১৯৮৬ সালে ঐতিহাসিক মে দিবসের শতবর্ষ শেষ হয়েছে ।মে দিবস এখন শ্রমিকশ্রেণীর সামনে নতুন ঊষার স্বর্ণ দুয়ার। অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া দুর্লভ এক সম্পদ।

আরও পড়ুনঃ

মন্তব্য করুন