মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় – জয় গোস্বামী

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় – প্রকৃতপক্ষে ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ কবিতাটির মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে এক সার্থক ছোটোগল্পের আভাস। জয় গোস্বামীর অনেক কবিতাকেই এই শ্রেণিভুক্ত করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের অনেকগুলি কবিতায় এই রকম আখ্যানের আভাস আছে।

 

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় – জয় গোস্বামী
মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় – জয় গোস্বামী

 

জয় গোস্বামী (জন্ম: ১০ নভেম্বর ১৯৫৪) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত একজন আধুনিক বাঙ্গালী কবি। ভারতীয় পশ্চিম বাংলার এই কবি বাংলা ভাষার উত্তর-জীবনানন্দ পর্বের অন্যতম জনপ্রিয় কবি হিসাবে পরিগণিত। তার কবিতা চমৎকার চিত্রকল্পে, উপমা এবং উৎপ্রেক্ষায় ঋদ্ধ। তিনি দুবার আনন্দ পুরস্কার লাভ করেছেন। বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার অর্জন করেন। তার কবিতার একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি ‘‘অতল তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে / হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে’’’।

তার প্রথম কবিতার বই ‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে।এটি ছিল মাত্র আটটি কবিতার একটি ক্ষীণতনু কবিতা-সংকলন। মায়ের থেকে টাকা নিয়ে তিনি এই বইটির প্রকাশনা বাবদ মোট ১৪৫ টাকা ব্যয় হয়েছিল। মায়ের টাকাতেই ১৯৭৮-এ তিনি প্রকাশ করেছিলেন ২য় কাব্যগ্রন্থ প্রত্নজীব। অতঃপর কবি শঙ্খ ঘোষ তাকে প্রকাশক জুটিয়ে দেন এবং ১৯৮১-তে তার তৃতীয় কাব্য আলেয়া হ্রদ প্রকাশিত হয়।

 

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় – জয় গোস্বামী

বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো
বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো?
বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে
বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে
ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর
বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর
আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি
আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি

বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো
শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো
তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে
বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে
কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী
সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি
আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল
ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলো

বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে
সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে?
সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে?
আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে
দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো!
স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো
জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ
বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক।

রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে
মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে
আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে
মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে
আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি
আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি
তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই?
কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?

 

জয় গোস্বামী [ Joy Goswami ]
জয় গোস্বামী [ Joy Goswami ]

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় কবিতার বিস্তারিত ঃ

 

জয় গোস্বামীর ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ কবিতাটি আসলে প্রেমেরই কবিতা। সে কারণে মূলত ‘আজ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করো’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা হলেও ‘প্রেমের কবিতা’ নামক সংকলনেও কবিতাটি স্থান পায়। তবে আধুনিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় প্রেমের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। একান্ত মানবিক এই বোধ, এই জৈবিক স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা হয়তো এই প্রতিকূলতার মধ্যে নিহত হয় অকালেই। আলোচ্য কবিতাটিকেও বলা চলে সেইরকমই এক নিহত-প্রেমের কবিতা। এক প্রেমবঞ্চিতা নারীর স্বপ্নহীন প্রাত্যহিক দিনযাপনের স্থূলতার মাঝখানে এখানে শুধু প্রকাশিত হয়েছে অনিঃশেষ প্রেমেরই আর্তি।

স্বভাবতই ‘মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়’ কবিতাটিতে একটি প্রেমবঞ্চিতা নারীর তীব্র প্রেমের আকুতিটিই আত্মকথনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। আশ্চর্যভাবে লক্ষ করতে হয়, রবীন্দ্রনাথের ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতার সেই মালতী নামের প্রেমবঞ্চিতা মেয়েটির সঙ্গে আলোচ্য কবিতার নামহীনা মেয়েটির যেন আশ্চর্য মিল।

তবে মালতীর প্রতিশোধ স্বপ্ন যতটা উগ্ররূপে ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতায় প্রকাশিত, জয়ের কবিতায় সেই উগ্র প্রতিশোধস্পৃহা অনুপস্থিত। কেননা, বেণীমাধবের বাড়ি যাবার আক্ষরিক অর্থ তার কাছে আজ অবাত্তর হয়ে গেছে, ব্যক্তি বেণীমাধবেরও কোনো মূল্য আর নেই তার কাছে। শুধু নৈর্ব্যক্তিক এক প্রেমতৃষ্ণার প্রতীক হিসাবে তার মনের গভীরে আজ বেণীমাধবের উপস্থিতি, তোমার বাড়ি যাবো’ বলে ব্যাকুল উচ্চারণে সেই প্রেমতৃষ্ণার অভিব্যক্তি ঘটে মাত্র।

 

জয় গোস্বামী [ Joy Goswami ]
জয় গোস্বামী [ Joy Goswami ]

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয় কবিতা আবৃত্তি ঃ

 

 

আরও দেখুনঃ

মন্তব্য করুন