ভ্রমণের অভিজ্ঞতা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা ,

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

একটি প্রচীন রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষে কিছুক্ষণ কাটানোর অভিজ্ঞতা

সাহেদ আমার ছোট বেলার বন্ধু। কিছুটা বাউন্ডেলে স্বভাবের হলেও খুব মেধাবী ছাত্র। ছুটির দিন পেলেই হলো, কোথাও না কোথাও ঘুরতে বেরুবেই। এবং সঙ্গী হিসেবে আমাকে তার সঙ্গে রাখা চাই। বিষয় তেমন কিছু না। আমি একজন ভালো শ্রোতা। সে গল্প করে আর আমি মনোযোগ দিয়ে তার সব কথায় সায় দিই এবং শুনি। আমার নিজের যে ভালো লাগে না, তা কিন্তু নয়।

 

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা 

 

লেখাপড়া বাদেও অনেক বিষয়ে তার কাছ থেকে আমি জানতে পারি। ঘুরতে ঘুরতে এমন অবস্থা হয়েছে যে কাছাকাছি এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে সাহেদ আর আমি যাইনি। গেল দু মাস ধরে আমাদের কোথাও আর ঘোরা হয় না। হঠাৎ সেদিন সাহেদ এসে বলল, চল, আজ ময়নামতির প্রাসাদ দেখতে যাব। শুনে বিস্ময়ের অবধি নেই। মনে অবিশ্বাস আর সংশয়ের ছায়া দুলছে। বললাম, ইতিহাসে তো এমন কোন রাজা আর তার প্রাসাদের কথা শুনিনি।

এ কি জনশ্রুতি না কিংবদন্তী ? সাহেদ বলল, চল আমার সঙ্গে। গেলেই তো সব দেখতে পাবি। যথারীতি কিছু খাবার নিয়ে রওয়ানা হলাম সাইকেলে করে। ঘণ্টা-খানেকের মধ্যে এসে পৌঁছলাম। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সড়কের ঠিক পূর্বে ময়নামতি গ্রামের নিকটবর্তী শৈলশিরার উত্তরপ্রান্তের এক সুবৃহৎ টিলার নিচে দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুজন। সাহেদ আঙুল উঁচিয়ে আমাকে দেখালো, চল, ওই টিলার উপরেই ময়নামতির প্রাসাদ। তার কথায় আমি না হেসে পারলাম না। সাহেদ বলল, আরে বোকা এই টিলাটির নামই ময়নামতি প্রাসাদ টিলা। যাক, দুজনে এবার টিলায় উঠতে শুরু করলাম। লাল মাটির ভাঙা ভাঙা রাস্তা। প্রখর রোদের তাপ। মাঝে মাঝে গাছের ছায়ায় একটু বসে হাওয়া খেয়ে নিচ্ছি।

 

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা 

 

সাইকেল নিয়ে উঠতে গিয়ে দুজনেই হাঁপিয়ে গেছি। সিদ্ধান্ত নিলাম সাইকেল দুটি এখানে তালা বদ্ধ করে রেখে যাই। কিন্তু আমার সাইকেলে তালা নেই। কী বিপদ। সাইকেল নিয়ে টিলার উপরে ওঠা অসম্ভব। অগত্যা রেখেই রওয়ানা হলাম। ভাঙা-চোরা খাড়াই পথে আমরা উপরে উঠছি। কয়েক মিনিট হাঁটতেই আমরা এক টিলার উপরে এসে হাজির হলাম। কী চমৎকার দৃশ্য, অদূরেই ক্ষীণকায় গোমতী নদী বয়ে যাচ্ছে। অথচ বর্ষায় তার কী ভয়াল রূপ।

সাহেদ আমাকে বলল, জানিস গোমতীর আদি নাম কী ছিল? সাহেদের গল্প শুরু হলে আর থামে না। সব তথ্যসূত্র নিয়েই ও ঘুরতে আসে। রূপকথার গল্পের মতো বলতে শরু করলো সাহেদ। গোমতী নদীর প্রাচীন নাম ছিল ক্ষীরোদা নদী। এই টিলা ঘেঁষেই একসময় নদীটি প্রবাহিত হতো। এ স্থানেই চন্দ্রবংশের কিংবদন্তির রানী ময়নামতির নিবাস ছিল। গোমতী নদী একসময় ময়নামতি পাহাড়ের পূর্ব দিক ঘেষে প্রবাহিত হতো; এবং এ পাহাড়ের উত্তর ও দক্ষিণ পাদদেশ স্পর্শ করে যেত।

অতীতে মজে যাওয়া নদীর সে খাত এখনও পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে এ নদী তার গতি পরিবর্তন করে পূর্ব দিকে সরে গেছে। এর অবস্থাগত বৈশিষ্ট্য ও স্থানটিই চন্দ্রবংশের শেষ রাজধানী ছিল বলে ধারণায় উপনীত হতে সহায়তা করে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ইট-পাথর ছড়ানো বিশাল প্রাসাদটির মুখোমুখি এসে দাঁড়ালাম। সাহেদ আমাকে কাছে টেনে এনে তার পাশে দাঁড় করিয়ে বলল— ময়নামতি ছিলেন চন্দ্রবংশের শেষ রাজা গোবিন্দচন্দ্রর মা। এই স্থানই চন্দ্রবংশের শেষ রাজধানী ছিল।

 

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা 

 

একটা গাছের তলায় বসে পড়লাম দুজনে। খাবারের টিফিন কেরিয়ারটি খুলে খেতে খেতে সাহেদের মুখে ময়নামতির গল্প আর নানা জনশ্রুতি শুনতে শুনতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে এল। কিন্তু ততক্ষণে আমি যেন ময়নামতির রাজপ্রাসাদের দেউড়ি পার হয়ে জলসা ঘরের উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছি। ভেতরে বাজছে নৃত্যরতা বাইজির নূপুর, সপারিষদ রাজা সোল্লাসে মুজরানা ছুঁড়ে দিচ্ছেন মুঠো মুঠো করে। জানি না এ সবের বাস্তব অস্তিত্ব ছিল কতটুকু। তবে আমার স্মৃতিতে মধুর স্বপ্ন হয়ে যা বেঁচে রইলো তার মূল্য তো সোনা-দানা টাকা-কড়িতে মাপা যাবে না ।

আরও দেখুন:

“ভ্রমণের অভিজ্ঞতা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন