বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা , “প্রবাদের বিশ্বজনীনতায় বিস্মিত হতে হয়। বিশ্ব প্রবাদ সাহিত্য নিয়ে অনেক তুলনামূলক কাজ হয়েছে। এতে দেখা যায় যে, প্রবাদ চিন্তার বিষয় ও প্রবাদের অভ্যন্তরীণ ভাষা গাঁথুনি প্রায় এক। অনেক ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন লোকসংস্কৃতিতে এমন এমন প্রবাদ রয়েছে যা কিনা শুরু থেকেই প্রবাদ আকারেই বিদ্যমান। বস্তুত লোকমানুষ প্রবাদগুলো নিমার্ণ করে চলমান জীবনযাত্রার বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে।

বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

এ সমস্যাগুলোকে ঘিরে লোকমানুষ প্রবাদের মাধ্যমে তাত্ত্বিক রূপ দিয়ে থাকে; যেমন : উপমা, স্বরূপ, অভ্যাস ইত্যাদি। সব লোকসমাজেই ‘অভ্যাস’-কে নিয়ে প্রবাদ তৈরি করেছে। যেমন— আরবি ভাষায় অভ্যাসকে নিয়ে প্রবাদ আছে, ‘হাবশী কি গায়ের রং পরিবর্তন করতে পারে?’ বাংলায় যেমন আছে ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না’। আরবি প্রবাদে আছে, ‘কুকুরের লেজ শত রকমের ছাঁচে ফেলে সোজা করার চেষ্টা করলেও সোজা হয় না’; বাংলায় যেমন আছে, ‘কুকুরের লেজে ঘি মাখলেই সোজা হয় না’।

 

বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

আবার বাংলায় আছে “মানুষ অভ্যাসের দাস’ আর ইংরেজিতে আছে ‘Habit is the second nature’। একইভাবে ওলন্দাজ প্রবাদ, ‘ব্যাঙ সোনার পিড়িতে বসলেও, ডোবা দেখলে লাফ মারে’; দ্রাবিড়, ‘পিতল ঘষো আর মাজো, তার গন্ধ যায় না’, ফারসি, ‘রেশমের জামা পরালেও গাধা গাধাই থেকে যায়’; মারাঠি, কুকুরের লেজ কয়েক বছর নলে পুরে রাখলেও সোজা হয় না’। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, লোকসমাজে এর সমস্যাগুলো শনাক্ত করছে তাদের দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা থেকে।

 

বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

সহজবোধ্য ও স্মরণযোগ্য করে তোলার জন্য সমস্যা বর্ণনায় ব্যবহার করা হয়েছে দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার আলোকে রূপক, প্রতিমূর্তি, প্রতিকৃতি, প্রতিরূপ, আদল ইত্যাদি। এর ফলে একদিকে যেমন প্রবাদ হয়ে ওঠে সর্বজনগ্রহণযোগ্য, অপরদিকে উপভোগ্য। প্রবাদ দীর্ঘ সময় চলমান থাকা এবং গ্রহণযোগ্যতার এটাই মূল কথা। সকল সনাতন সমাজের প্রবাদের মধ্যে মোটামুটি মিল থাকার কারণও সে অভিন্ন অভিজ্ঞান। কুকুরের লেজ সব দেশেই বাঁকা থাকে। দীর্ঘকালের অভ্যাস বদলানো শক্ত, এবং এটা সব দেশের মানুষের বেলাই প্রযোজ্য।

 

বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

অতএব, বিশ্বের সকল সনাতন সংস্কৃতির মধ্যে প্রবাদের মিল থাকা খুবই স্বাভাবিক। এক লোকসংস্কৃতির প্রবাদ অপর ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে বা এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতি দ্বারা দীর্ঘ শাসনের ফলেও প্রবাদের মিল তৈরি হয়। যেমন ঘটেছে বাংলা প্রবাদ-রাজ্যে, পড়েছে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, ওলন্দাজ, ইংরেজি প্রবাদের প্রভাব।”

এজন্যই বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদের মধ্যে অনেক মিল পাওয়া যায়। দেশ ও ভাষায় ভিন্নতা থাকলেও কখনও ভাব ও ভাষাগত সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন : বাংলা ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। সংস্কৃত গরম দুধে হাত পুড়লে মূর্খেরা ফুঁ দিয়ে ঘোল পান করে। হিন্দি ভয় পাওয়া কুকুর বাতাসের শব্দেও চিৎকার করে। ইংরেজি পুড়ে যাওয়া শিশু আগুনকে ভয় পায়। সিংহলি জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে যাকে মারা হয়েছে সে জোনাকি দেখে ডরায় : ইতালীয় যাকে সাপে কেটেছে সে গিরগিটি দেখে ভয় পায় স্পেনীয় গরম জলে ঝলসানো বিড়াল ঠাণ্ডা জলেও ভয় পায়। হিব্রু যাকে সাপে কেটেছে সে দড়ি দেখে ভয় পায় ।

প্রবাদ-প্রবচনে গঠনবৈচিত্র্য রয়েছে। একই ভাব নিয়ে যেমন অনেক প্রবাদ-প্রবচন রচিত হতে দেখা যায়, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলে তা বিভিন্নভাবে কথিত হয়। এতে উচ্চারণ দোষ এবং অপরাপর ভুলভ্রান্তি বর্তমান থাকে। তাই বাংলা ভাষার প্রবাদ-প্রবচনগুলোকে সংগ্রহ” করে এর ব্যবহার ক্ষেত্রের মধ্যে নির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দিলে ভাল হয়। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। এর অর্থ— ‘প্রকৃতি বা স্বভাব মূলত অপরিবর্তনীয়’। এই একই ভাব নিয়ে রচিত অন্য প্রবাদের দৃষ্টান্ত :

১. ঘি দিয়ে ভাজ নিমের পাত, নিম ছাড়ে না আপন জাত।

২. আদা শুকালেও ঝাল যায় না।

৩. কয়লা ধুলে ময়লা যায় না।

৪. ইল্লৎ যায় না ধুলে, স্বভাব যায় না মলে।

৫. কুত্তা রাজা হলেও জুতা খায়।

৬. কাকের বাসায় কোকিলের ছা জাত-স্বভাবে করে রা।

৭. চোর যদি যায় সাধুর কাছে, স্বভাব যায় তার পাছে পাছে।

৮. চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি।

৯. আরের মন আর দিকে, চোরের মন বোঁচকার দিকে।

১০. শকুনের চোখ ভাগাড়ের দিকে।

আরও দেখুনঃ

“বিভিন্ন ভাষায় প্রবাদ | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন