বাংলা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের প্রচেষ্টা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

বাংলা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের প্রচেষ্টা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা , বাংলা ভাষা বাঙালিদের মাতৃভাষা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত ভারত স্বাধীন হওয়ায় বৃহত্তর বাংলাদেশ রাষ্ট্রগতভাবে দুটি ভিন্নদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। অতঃপর বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত ‘পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

বাংলা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের প্রচেষ্টা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

সে সময় থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় ভূষিত করার প্রয়াসে সংগ্রামী তৎপরতা শুরু হয় এবং বাংলা ভাষার উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে ‘বাংলা একাডেমী’ ও তদানীন্তন কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার, বাংলা ভাষার উন্নয়ন, এমনকী প্রয়োজনীয় পারিভাষিক শব্দ সৃষ্টির প্রয়াস গৃহীত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদায় ভূষিত হলে বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সর্বস্তরে চালু করার সরকারি নির্দেশ প্রদত্ত হয়।

 

বাংলা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের প্রচেষ্টা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

অফিস-আদালত- শিক্ষাঙ্গনসহ নানা ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের মাধ্যম থাকায় স্বাধীন দেশের জাতীয় উন্নতির ক্ষেত্রে তা পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। তাই সরকার কর্তৃক ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল পরিভাষা-সমস্যা। কারণ, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে, শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে যে ইংরেজি শব্দগুলো প্রচলিত, সেগুলোর যথোপযুক্ত বাংলা পরিভাষার অভাব পরিলক্ষিত হয়। সে কারণে পরিভাষা প্রণয়নের আশু প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

 

বাংলা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের প্রচেষ্টা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

ফলে বাংলা একাডেমী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ‘পরিভাষা’ প্রণয়নের প্রয়াস চলে। অবিভক্ত বাংলায় উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ইংরেজি পারিভাষিক শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ প্রণয়নের চেষ্টা শুরু হয়। বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পরিভাষা প্রণয়ন, প্রমিতকরণ ও পরিভাষাকোষ সংকলনের কাজে বাংলাদেশ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ইতোমধ্যেই ‘বৈজ্ঞানিক পরিভাষা’, ‘প্রশাসনিক পরিভাষা’সহ বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার যেমন : পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান; মৃৎবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি এবং গণিত, ভূবিদ্যা, অর্থনীতি, আইন, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন, পুরাতত্ত্ব, পল্লীউন্নয়ন, বাণিজ্য, সংগীত, নৃত্যকলা, সাহিত্য-সমালোচনা, ভাষাতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে পরিভাষা প্রণীত হয়েছে, যা বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলা একাডেমী থেকে এ পর্যন্ত ২৯টি পরিভাষাকোষ বের হয়েছে।

 

বাংলা পারিভাষিক শব্দ প্রণয়নের প্রচেষ্টা | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

এগুলো বিষয়-বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগছে। পরিভাষা প্রমিতকরণের একটি কাজ একাডেমীর পক্ষে করা সম্ভব কিনা এখন ভাবার সময় এসেছে। বাংলা পরিভাষা নির্মাণের সঙ্গে বাংলা প্রতিশব্দ নির্মাণকে এক করে দেখা হয়েছে। বিগত দু’শ বছরের জ্ঞানবিজ্ঞান সাধনার সঙ্গে বাংলা পরিভাষার সৃষ্টি-ইতিহাস সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। এইসব পরিভাষা মূলত প্রাতিশাব্দিক পরিভাষা, মৌল পরিভাষা নয় ।

জ্ঞানচর্চায় মৌলিকতা না এলে পরিভাষা নির্মাণেও মৌলিকতা আসার কথা নয়। বাংলাদেশের জ্ঞানসাধনার মৌলিক ধারা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ভাষায়ও মৌলিক পরিভাষা সৃষ্টি হবে। তখন পরিভাষার কঠিনতার তত্ত্বটি আপনা আপনিই বদলে যাবে।

মাতৃভাষায় কোনো প্রাদেশিক শব্দ নতুনভাবে তৈরি হলে, কিংবা শব্দটি বিশেষভাবে পরিচিত না হলে অথবা শব্দটি কোন শব্দের পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সে বিষয়ে বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকলে পারিভাষিক শব্দটির পাশে বন্ধনীর মধ্যে বিদেশি শব্দটি জুড়ে দিতে হবে। যেমন : পরম দূরত্ব (absolute space) বা পরম কাল (absolute. time) বলতে যা বোঝায় তার অর্থ স্পষ্ট নয়।

পরিভাষা প্রণয়ন বা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজস্ব ভাষার মৌলিকত্ব ও স্বাভাবিকত্ব বজায় রাখার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিভাষা অবশ্যই বাক্যে ব্যবহৃত অপরাপর শব্দের সঙ্গে যেন খাপ খেয়ে চলতে পারে, সে বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি ও গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।

বাংলায় পরিভাষা তৈরি হয় নি এমন ক্ষেত্রে বিদেশি পরিভাষাটি বাংলা কিংবা ইংরেজি অক্ষরে লেখাই উত্তম। যেমন ক. শ্বসনের ফলে প্রচুর পরিমাণ adenosine tri phosphate (ATP) উৎপন্ন হয়। খ. বৃক্কের যে অংশ থেকে ইউরেটার উৎপত্তি হয় সে অঞ্চলকে পেলভিস বলে।

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন