বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh । প্রতিবেদন রচনা

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা: পোশাক শিল্প বলতে মূলত তৈরি পোশাক শিল্পকেই বোঝায় । যাকে সাধারণত গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি ( Garments Industry ) বলা হয় । বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক প্রগতিতে পোশাক শিল্পের গুরুত্ব সীমাহীন ।সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে কর্ম পরিবেশ সুনিশ্চিত না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা সাময়িক সহস্থগিত করে ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh

ভূমিকা :

কৃষিভিত্তিক এ দেশটিতে পোশাক শিল্পের অবদানেই আজ কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে । এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান খাত । এর সাথে আজ দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির বিষয়টি জড়িয়ে গেছে ।

বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের সূচনা :

বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু খুব বেশিদিন আগে হয় নি । গত শতাব্দীর সত্তর দশকে পোশাক শিল্পের পত্তন হয় । তবে আশির দশকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে পোশাক শিল্প বিকাশ লাভ করে । ১৯৮৩ সালে মাত্র ৯২ টি ইউনিট নিয়ে পোশাক শিল্পের যাত্রা সূচিত হয় । ১৯৮৫ সালে মাত্র দুই বছরেই এ শিল্পের ইউনিট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১৫ টিতে ।

এরপর এ শিল্পটি দ্রুত বিকশিত হতে থাকে । বর্তমানে সারাদেশে সাড়ে চার হাজারেরও অধিক পোশাক প্রস্তুত ইউনিট রয়েছে । এ শিল্পের শতকরা ৭৫ ভাগই ঢাকায় অবস্থিত । তবে চট্টগ্রাম , খুলনা ও নারায়ণগঞ্জেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইউনিট রয়েছে ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh

বাংলাদেশে পোশাক শিল্প বিকাশের কারণ :

মূলত শ্রমশক্তির সহজলভ্যতা ও ষল্পমূল্যের কারণেই বাংলাদেশে পোশাক শিল্প দ্রুত বিকাশ লাভ করেছে । এদেশে রয়েছে বিপুল জনসংখ্যা এবং তাদের অধিকাংশই বেকার । বিশেষ করে দেশে অসংখ্য মহিলা কর্মহীন ।

ফলে তারা পোশাকশিল্পে স্বল্পমূল্যে শ্রম দেয় । এতে উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পায় । তাছাড়া এখানকার শ্রমিকদের দক্ষতাও উল্লেখযোগ্য । সবচেয়ে বড় কথা ,বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জিএসপি সুবিধা লাভ করায় এ শিল্পে গতি সঞ্চার হয় । এসব কারণে পোশাক শিল্প লাভজনক হয়ে উঠেছে ।

পোশাক শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব :

পোশাক শিল্প অল্প দিনের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে । বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ । বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে পোশাক শিল্প থেকে । আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদনে শিল্পখাতের অবদান ১৫.৯৭ ভাগ ।

আর শিল্পখাতের মোট উৎপাদনের ৭৩ ভাগই আসে পোশাক শিল্প থেকে । দেশের মোট রপ্তানি আয়ে গড়পড়তা ৭৬ ভাগই পোশাক শিল্পের অবদান । ‘০২ -০৩ অর্থবছরে ৩২৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ‘০৩ -০৪ অর্থবছরে ( জুলাই – মার্চ মেয়াদে ) এ খাত থেকে আয় হয়েছে ২৪৭৯.৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ।

মোট দেশজ উৎপাদনে পোশাক শিল্পের অবদান ৫.০০ ভাগ । অর্থনৈতিক সমীক্ষা ১৩ অনুযায়ী বর্তমানে তৈরি পোশাক থেকে দেশের রপ্তানি আয়ের শতকরা ৭৯.৬ % আসে । যা পোশাক শিল্পের জন্য একটি চমকপ্রদ খবর । তাছাড়া পোশাক শিল্পের সহায়ক শিল্পরূপে আরও নানাপ্রকার শিল্প – বাণিজ্য গড়ে উঠেছে ।

বিশেষ করে দেশে নিটওয়ার ও বস্ত্র ( ফেব্রিক্স ) শিল্পের চালিকাশক্তি হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প । তাছাড়া জীপার , বোতাম , এলাস্টিক , সুতা , হ্যাঙ্গারসহ আরো অনেক ধরনের সহায়ক শিল্প এ শিল্পের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে । দেশের পরিবহণ খাতও এ শিল্প থেকে উপকৃত হচ্ছে ।

পোশাক শিল্পের সার্বিক গুরুত্ব :

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত । এছাড়াও এ শিল্প বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছে । এ খাতকে কেন্দ্র করে একটি কর্মপ্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে , যা দেশের আর্থ – সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে । বেকারত্ব লাঘবে এ খাতের ভূমিকা অপরিসীম ।

পোশাক শিল্পে অন্তত ১৮ লাখ শ্রমিক কাজ করছে , যাদের শতকরা ৯০ ভাগই নারী । অসহায় – অসচ্ছল পরিবারের নারী – পুরুষ এ শিল্পে জড়িত হয়ে ন্যূনতম জীবনযাপনের অবলম্বনটুকু খুঁজে পেয়েছে । বিশেষ করে গরিব মেয়েরা নিজেদের জীবিকার সংস্থান করতে সক্ষম হয়েছে ।

তাদের অন্যের করুণা ও নির্যাতনভোগী হয়ে আর জীবন কাটাতে হচ্ছে না । এসব নারী ও পুরুষ কর্মসুযোগ না পেলে দেশের আর্থ – সামাজিক ক্ষেত্রে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh

পোশাক শিল্পের সংকট :

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দ্বিমুখি সংকটের শিকার হয়েছে । একদিকে আন্তর্জাতিক অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ , অর্থনৈতিক মন্দা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে বাজার সংকুচিত হয়েছে , অন্যদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ( WTO ) – এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০৫ সাল থেকে এসএফএন কার্যকর হয়েছে এবং কোটা ব্যবস্থা উঠে গেছে ।

এ দু’টি বাধা ছাড়াও আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যা , যা পোশাক শিল্পের জন্যে মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে । আমাদের শ্রমিকদের উৎপাদন মান উন্নত নয় । হরতাল , ধর্মঘটের কারণে প্রায়শ ঠিক সময়ে মালামাল আমদানিকারকদের কাছে পৌঁছানো যায় না ।

পরিবহণ , বিমান ও সমুদ্রবন্দরে ঘুষ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কারণে শিপম্যান্ট চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয় । ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে কোটা সুবিধা ভোগ করত । বর্তমানে তা নেই নতুন নিয়ম অনুযায়ী পোশাকের কাঁচামাল তথা ফেব্রিক্সসহ অন্যান্য সকল উপকরণ আর আমদানিকারকরা সরবরাহ করবে না ।

এগুলো স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে সরবরাহ করতে হবে , কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা কাঁচামাল উৎপাদন খুবই হতাশাজনক । এমতাবস্থায় বাংলাদেশকে চীন , ভারত , পাকিস্তান , মরিশাসসহ সাবসাহারা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর সাথে অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে ।

আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা ও মূল্যও কমে গেছে । পোশাকের সেলাই বা প্রস্তুতের মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে । এর মধ্যে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে গ্রার্মেন্টস শ্রমিকদের বিদ্রোহ ও সংঘাত— যা পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে ।

পোশাক শিল্পের বাণিজ্য :

দেশের রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদিত প্রায় সব পোশাক বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে । বাংলাদেশে মূলত ফরমায়েশী শর্তে বিদেশি গ্রাহকের পোশাক প্রস্তুত করা হয় । বাংলাদেশের পোশাক অন্তত ২৫ টি দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে ।

এদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার হলো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র । এছাড়া ব্রিটেন , ফ্রান্স , ইতালি , হল্যান্ড , কানাডা , বেলজিয়াম , জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ আমাদের তৈরি পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা । অস্ট্রেলিয়া , নিউজিল্যান্ড , পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করে থাকে ।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রচনা । Essay on Garment industry of Bangladesh

সংকট উত্তরণ ও নতুন সম্ভাবনা :

এই সংকটের মধ্যেও অনেকে পোশাক শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন । বাংলাদেশ যদি দ্রুত ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তুলতে পারে এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্পন্ন পোশাক রপ্তানি করতে পারে তাহলে এ শিল্পটি আগের চেয়ে আরও দ্রুত সমৃদ্ধি অর্জন করবে ।

২০০৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ২০ শতাংশ । তবে পোশাকের মূল্য হ্রাস পেয়েছে ব্যাপকভাবে । সরকার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে তোলার জন্য ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে ঋণদানের নির্দেশ দিয়েছে । গড়ে তোলা হয়েছে সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যার হাউজ ।

ইপিজেড এলাকায় বিদেশি বিনিয়োগে বস্ত্রকল স্থাপনে বিশেষ সুযোগ – সুবিধা দিয়েছে । ইতোমধ্যে জাপান , ইন্দোনেশিয়া , তাইওয়ান , চীন বস্ত্রকল স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে । এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে , বাংলাদেশে আরও অন্তত ২০০ বস্ত্রকলের প্রয়োজন রয়েছে যা শুধু বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে তোলা সম্ভব নয় ।

উপসংহার :

পোশাক শিল্প বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড । এর বিপর্যয় গোটা জাতির জন্যই বিপদ ডেকে আনবে । সে কারণে পোশাক শিল্পকে সম্পব্য বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষাকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে । এক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের একসাথে কাজ করতে হবে ।

আরও দেখুনঃ

 

মন্তব্য করুন