প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা , ‘প্র’ মানে ‘বিশিষ্ট’ এবং ‘বাদ’ বা ‘বচন’ মানে ‘কথা’ অর্থাৎ বিশিষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ কথা। “প্রবাদ ও প্রবচন শব্দ দুটির সংযুক্ত রূপ প্রবাদ-প্রবচন। লোকসংস্কৃতির পণ্ডিতদের অনেকে মনে করেন প্রবাদ ও প্রবচন ভিন্ন অভিব্যক্তি। আবার অনেকে মনে করেন এ দুটি প্রকাশ একই অর্থ প্রদানকারী। লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ প্রবাদ-প্রবচন। লোকসমাজে গভীর চিন্তা বা বিজ্ঞ কিছু প্রকাশ করার জন্য প্রবাদের বিকল্প নেই।

প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

একটি সমস্যা প্রকাশ করতে যেখানে অনেক কথা বলতে হয়, সেখানে একটি প্রবাদই যথেষ্ট। যারা এ বিদ্যায় সিদ্ধ তাঁরা লোকসমাজে আদৃত। দেন- দরবার-সালিশে মাতব্বরেরা অনেক সময় একটি জটিল সমস্যাকে খুব সহজেই উপস্থাপন করেন জুতসই প্রবাদের মাধ্যমে। অনেক প্রবাদ এমনই শক্তিশালী যে এগুলো বাংলাদেশের লোকসমাজে সর্বত্র প্রচলিত। মানুষের দীর্ঘদিনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ওই সমাজের কোনো সৃষ্টিশীল ব্যক্তি যে চৌকশ অভিব্যক্তি বাণীবদ্ধ করেন, তাই কালে কালে প্রবাদে পরিণত হয়ে যায়। এভাবেই তৈরি হয় প্রবাদ।

 

প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

এমনিভাবে সনাতন সমাজে প্রবাদই হয়ে ওঠে বিজ্ঞতার চাবিকাঠি। লোকমানুষের অভিজ্ঞতা, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙি সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে। প্রবাদ নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র পরিবেশ, কৃষিশিল্প, খাদ্যাভ্যাস, ঋতুপর্ব, বিয়ে-শাদী, পরিবার, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্ম, মানবচরিত্র, প্রেম-ভালবাসা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক ইত্যাদি। এমনকি উপহাস করতেও তৈরি হয়েছে প্রবাদ-প্রবচন। যেমন : পাগরি বানতে নামাজ শেষ ।”” সুতরাং প্রবাদ হল লোকপরম্পরাগত বিশেষ উক্তি বা কথন।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা-লব্ধ কোনো গভীর জীবনসত্য লোকপ্রিয় কোনো সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যে সংহত হয়ে প্রকাশিত হলে তাকে প্রবাদ-প্রবচন বলে। যেমন : অতি চালাকের গলায় দড়ি, কয়লা ধুলে ময়লা যায় না ইত্যাদি। ভাষাবিদ্‌গণ প্রবাদ-প্রবচন সম্পর্কে নানারকম অভিমত ও সংজ্ঞার্থ প্রদান করেছেন। যেমন :

১. অশোক মুখোপাধ্যায় বলেছেন— ‘অনেকদিন ধরে লোকমুখে প্রচলিত জনপ্রিয় উক্তি, যার মধ্যে সরলভাবে জীবনের কোন গভীরতর সত্য প্রকাশ পায় তাকে বলে প্রবাদ বা প্রবচন।

 

প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

২. লোকসাহিত্য বিশেষজ্ঞ ড. আশুতোষ ভট্টাচার্যের ভাষায় — “বিস্তৃততম জীবন অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ততম সাহিত্যিক প্রয়াসই হল ‘প্রবাদ’ বা ‘প্রবচন’।

৩. ড. সুশীল কুমার দে’র মতে, ‘বিশিষ্ট আকারে ও প্রকারে প্রকাশিত হইলেও ইহা (প্রবাদ) সাধারণভাবে প্রযোজ্য। কাহাকেও লক্ষ করা নয়, অথচ সকলকে লক্ষ করা ইহার উদ্দেশ্য। একজনের সহজ বুদ্ধিতে সহসা প্রতিফলিত _হইলেও ইহা বহুজনের সুলভ বুদ্ধির উপায় ও ক্ষিপ্র প্রয়োগের অত্র।

৪. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায়, ‘সুন্দরীর ললাট-তিলকের ন্যায় প্রবাদ বাক্যগুলি ভাষার সৌন্দর্য ফুটাইয়া তোলে। অতীতের মনস্তত্ত্ব এবং ইতিহাসও অনেক প্রবাদ বাক্যে পাওয়া যায়।

 

প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা

 

প্রবাদ ক্ষুদ্রতম রচনা; একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য থেকে ছন্দোবদ্ধ দুই চরণ পর্যন্ত এর অবয়বগত ব্যাপ্তি। তবে ক্ষুদ্র হলেও তা পূর্ণাঙ্গ ভাবদ্যোতক অর্থবহ হয়ে থাকে। প্রবাদে যেমন দীর্ঘ অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে, তেমনি এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ

পায় একটি জাতি বা সমাজের জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, চৈতন্য, ঐতিহ্য, শিক্ষা এবং লোকমনের বদ্ধমূল ধারণা। প্রসঙ্গত ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বিভিন্নমুখী ব্যক্তি ও সমাজ-জীবনের বহু-পরীক্ষিত উপদেশ ও নীতি প্রচার করাই ইহার লক্ষ্য— রূপক ও বক্রোক্তি প্রধানত ইহার অবলম্বন। ইহা যেমন ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের কর্তব্য নির্দেশক, তেমনি সম্পাদিত কার্যাবলিরও রূঢ় সমালোচক।’ জীবন, জগৎ ও সমাজ সম্পর্কে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত এই প্রবাদ লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা। প্রবাদ অতীতের বিষয় হয়েও সমকালকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে। ”

কবে, কখন, কীভাবে এ জাতীয় ভাবগর্ভ, অর্থবোধক, সুভাষিত বাণীমঞ্জরি কার দ্বারা রচিত হয়েছে দু-চারটি ব্যতীত (যেমন: চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী – কাশীরাম দাস। যৌবনে অন্যায় ব্যয়ে বয়সে কাঙালি মধুসূদন।) তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তবে এ-কথা বলা যায়, প্রাত্যহিক যেসব ঘটনা সাধারণ মানুষকে প্রতারিত বা প্রতিষ্ঠিত করে, সেসব ঘটনাজাত অভিজ্ঞতার শিক্ষা ব্যবহারযোগ্য ভাষায় সংক্ষিপ্ত, সরল, সুতীক্ষ্ণ আকারে দেখা দেয়। এগুলো তখন জীবনের নীতি-নিয়মের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে প্রবাদ-প্রবচন নামে আখ্যাত হয়ে কালান্তরে অনায়াসে উত্তরণ করে।

বস্তুত যে কোন প্রবাদই মানুষের ব্যবহারিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয়। ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট’, ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’, ‘জোর যার, মুলুক তার’ ইত্যাদি প্রবাদের গড়ন আঁটসাঁট; বাড়তি একটি শব্দও নেই। অল্প কথায় এত বেশি অর্থবহন ক্ষমতা প্রবাদ ছাড়া লোকসাহিত্যের অন্য কোন শাখার নেই।

প্রবাদ সম্পর্কে প্রাচ্য-পাশ্চাত্ত্য মনীষীদের দেওয়া সংজ্ঞার্থ থেকে এর যে বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে ওঠে তা হল : এক. প্রবাদে জাতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পরিণত বুদ্ধি (elder wisdom) এবং লোকমনে প্রবাহিত সত্যকথন প্রকাশিত হয়; দুই. প্রবাদের অবয়ব হলো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য; তিন. উপমা, বক্রোক্তি, বিরোধাভাস প্রভৃতি অলঙ্কারযোগে তা গঠিত হয়।

আরও দেখুন:

“প্রবাদ প্রবচন | নির্মিতি | ভাষা ও শিক্ষা”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন