নারী শিক্ষার গুরুত্ব, অথবা, নারী শিক্ষা, অথবা, নারী শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন | The importance of women’s education | প্রতিবেদন রচনা

নারী শিক্ষার গুরুত্ব, অথবা, নারী শিক্ষা, অথবা, নারী শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন [ The importance of women’s education ]

নারী শিক্ষার গুরুত্ব
নারী শিক্ষার গুরুত্ব

নারী শিক্ষার গুরুত্ব

ভূমিকা :

বহুদিন পূর্বের একটি প্রবন্ধে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আমাদের দেশের নারীর অনাসরতা নিয়ে। মন্তব্য করতে গিয়ে দুঃখের সাথে লিখেছেন,

“স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন বার্লিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপেন। স্বামী যখন কল্পনার সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমগুলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাল, ডাল ওজন করেন এবং বাধুনির গতি নির্ণয় করেন “

সমাজ জীবনের নারী :

বস্তুতপক্ষে, সমাজের বা দেশের উন্নতি সাধনের জন্য কেবল পুরুষের শিক্ষাদীপ্ত ও অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। সমাজের অপর অংশ নারীর অগ্রসরতার উপরেই সমাজের প্রকৃত মঙ্গল নির্ভর করে। সমাজ জীবনে নারীর প্রভাব কেবল তার সংখ্যাগত আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। নারী কেবল সন্তানের জন্মদাত্রী নয়, তার লালন-পালনকারীরও বটে। আমরা জানি যে, মানুষ তার পরিবেশের ফল। অশিক্ষিত মায়ের সান্নিধ্য সন্তান-সন্তুতির উপর যে প্রভাব বিস্তার করে, তা ফলপ্রসূ হতে পারে না। দৃঢ়চেতা নাগরিক ও কল্যাগভিসারী মানবরূপে সন্তানকে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন শিক্ষিতা মাতার।

নারী শিক্ষার গুরুত্ব, অথবা, নারী শিক্ষা, অথবা, নারী শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন
প্রতিবেদন রচনা [ বিরচন ]

নারীর অধিকার :

এ গণতান্ত্রিক যুগে পুরুষের মত নারী ও পরিপূর্ণরূপে নাগরিক অধিকার লাভ করেছে। রমণীরা যে যুগে দাসী ছিল এবং যে যুগে তাদের আত্মা নেই বলে সিদ্ধান্ত করা হয়েছিল, সে যুগ আর নেই। এ অধিকার ভোগ করার জন্যও নারীর পক্ষে শিক্ষালাভ করা প্রয়োজন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে উপযুক্ত শিক্ষাগ্রহণ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের মত অনুন্নত দেশে নারীদের অসহায় অবস্থা। অথচ তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে প্যারলে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

প্রাচীন যুগে নারী শিক্ষা :

অনেকে মনে করেন যে, নারী শিক্ষার ধুঁয়াটি নিতান্ত হাল আমলের সৃষ্টি। তা সত্য নয়। এ উপমহাদেশের প্রাচীন যুগেও নারী শিক্ষার প্রচলন ছিল। ইসলাম ধর্ম সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করে এবং তার সকল অধিকার দান করে। গুলবদন ও জেবুন্নিসার মত বিদূধী মুঘল রমণীর স্মৃতি ইতিহাস সগৌরবে বহন করছে। ইসলাম নির্দেশিত পর্দাপ্রথা যখন অবরোধ ব্যবস্থায় পরিণত হয়, তখন থেকে মুসলমান নারীর অধ্যয়নের পথ সংকুচিত হল। মনুসর সমাজ ব্যবস্থা থেকেই কিন্তু নারীর পথ দুর্গম হয়ে উঠে। পরে সহমরণ প্রথা প্রভৃতির চাপে তাদের অবস্থার আরও পতন ঘটে।

নারী শিক্ষার গুরুত্ব
নারী শিক্ষার গুরুত্ব

ইংরেজ আমলে নারী শিক্ষা :

ইংরেজ শাসনকালে শিক্ষা বিস্তারের জন্য যে আন্দোলন গড়ে উঠে, তার ফলে স্ত্রী শিক্ষার পুনর্বিস্তার ঘটে। খ্রিস্টান মিশনারি ও ইউরোপীয় কর্মচারীদের স্ত্রীগণ এক্ষেত্রে উদ্যোগী হন। রাজা রামমোহন রায়, রাজা রাধাকান্ত দেব, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা বৈদ্যনাথ রায়ের প্রচেষ্টাও এই প্রসঙ্গে স্মরণী। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার গৌড়বাড়িতে বাঙালি মেয়েদের জন্য প্রথম স্কুল স্থাপিত হয় এবং এতে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত বালিকারাই শিক্ষালাভ করত। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্যারীচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ সিকদার স্ত্রীলোকদের পাঠা ‘মাসিক পত্রিকা’ প্রকাশ করে নারীর বিদ্যাচর্চার নতুন সুযোগ করে দেন।

বাঙালি মুসলমান সমাজে শিক্ষা বিস্তারে নবাব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলীর ভূমিকা স্মরণযোগা। তাঁদের দৃষ্টান্তে উৎসাহিত হয়ে মুসলমান সমাজে স্ত্রী-শিক্ষার বিস্তার ঘটে। তবে এক্ষেত্রে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হাসেনের কৃতিত্বই সর্বাধিক। তিনি সমাজের ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে মুসলমান বালিকাদের শিক্ষার জন্য কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ স্থাপন করেন।

নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা :

জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনায় ও কর্মজীবনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর স্থান করে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমাজের ভারসাম্য ও স্থিতি নির্ভর করে নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সহযোগিতার উপর । উচ্চশিক্ষা, জ্ঞান বিজ্ঞান ও কর্মের ক্ষেত্রে নারীকে আসন দিতে হলে যে মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, সহশিক্ষা তার পথ নির্মাণ করবে।

উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর আত্মনিয়োগের ফলে ইউরোপে ও আমাদের দেশে কখনও কখনও যে বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি, তা নয়। কিন্তু এর জন্য নারী শিক্ষাকে দায়ী না করে ব্যক্তি ও তার পরিবেশকেই দায়ী করা উচিত। কিংবা সেই পুরানো কথাটাই বলতে হয়ঃ কাঁটা আছে বলে কি গোলাপের আদর কমে যাবে। বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার নিকট মস্তক অবনত না করে অর্থাৎ এরূপ বিচ্ছিন্ন ঘটনাকেই চরম সত্য বলে গ্রহণ না করে ধ্রুবলক্ষ্যে অগ্রসর হওয়াই প্রয়োজন।

উপসংহার :

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

একথা মনে রেখে আমাদের দেশে নারীকে উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে তার শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে নারী শিক্ষার প্রয়োজন অত্যধিক। দেশের অনগ্রসরতা দূর করার জন্য পুরুষের পাশাপাশি জনসংখ্যার অর্ধেক নারী জাতিকেও কাজে লাগাতে হবে। এজন্য শিক্ষা আশু প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আরও পড়ুন:

প্রতিবেদন রচনা

কবি কাহিনী (১৮৭৮) | কাব্যগ্রন্থ | কবিতা সূচি | পর্যায় : সূচনা (১৮৭৮ – ১৮৮১) | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“নারী শিক্ষার গুরুত্ব, অথবা, নারী শিক্ষা, অথবা, নারী শিক্ষা ও জাতীয় উন্নয়ন | The importance of women’s education | প্রতিবেদন রচনা”-এ 5-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন