কবি সুকুমার রায় এর কবিতা

সুকুমার রায় জন্মেছিলেন বাঙ্গালী নবজাগরণের স্বর্ণযুগে। সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালের ৩০শে অক্টোবর, কলকাতার এক ব্রাহ্ম পরিবারে। সুকুমার ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের উজ্বল রত্ন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ছেলে। সুকুমারের মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে। ১৮৮৭ সালে সুকুমার রায়ের জন্ম। সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায় তাঁর দুই ভাই। এ ছাড়াও তাঁর ছিল তিন বোন। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যনুরাগী, যা তাঁর মধ্যকার সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় বি.এসসি.(অনার্স) করার পর সুকুমার মুদ্রণবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯১১ সালে বিলেতে যান। ১৯১৩ সালে সুকুমার কলকাতাতে ফিরে আসেন।

 - কবি সুকুমার রায় এর কবিতাসুকুমার রায় চৌধুরী [ Sukumar Ray Chowdhury ]
সুকুমার রায় চৌধুরী [ Sukumar Ray Chowdhury ]
সুকুমার রায় একজন বাঙালি শিশুসাহিত্যিক ও ভারতীয় সাহিত্যে “ননসেন্স্ রাইমের” প্রবর্তক। সুকুমার রায় একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার ও নাট্যকার। তিনি জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সন্তান এবং তাঁর পুত্র খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। সুকুমার রায় এর লেখা কবিতার বই আবোল তাবোল, গল্প হযবরল, গল্প সংকলন পাগলা দাশু, এবং নাটক চলচ্চিত্তচঞ্চরী বিশ্বসাহিত্যে সর্বযুগের সেরা “ননসেন্স” ধরণের ব্যঙ্গাত্মক শিশুসাহিত্যের অন্যতম বলে মনে করা হয়, কেবল অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড ইত্যাদি কয়েকটি মুষ্টিমেয় ক্লাসিক-ই যাদের সমকক্ষ। মৃত্যুর আশি বছর পরও তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম শিশুসাহিত্যিকদের একজন।

সুকুমার রায় তার স্ত্রী সুপ্রভা রায়ের সাথে (১৯১৪) | Sukumar Ray with his wife Suprabha Ray (1914)
সুকুমার রায় তার স্ত্রী সুপ্রভা রায়ের সাথে (১৯১৪) | Sukumar Ray with his wife Suprabha Ray (1914)

Table of Contents

কবি সুকুমার রায় এর কবিতাঃ

ভাল ছেলের নালিশ – সুকুমার রায়

মাগো!
প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা
গুড় মাখিয়ে আরাম ক’রে বসে –
আমায় দেখে একটা দিল ,নয়কো তাও বড়টা,
দুইখানা সেই আপনি খেল ক’ষে!
তাইতে আমি কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে
কিল মেরেছি ‘হ্যাংলা ছেলে’ বলে-
অম্‌‌নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেচিয়ে
গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!

মাগো!
এম্‌‌নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে,
বল্‌ল, ‘এখন খেলতে আমার মানা’-
ঘন্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের উপরে
ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা।
তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে
ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো-
আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে
আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!

সুকুমার রায় তার বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়, মা বিধুমুখী এবং পাঁচ ভাইবোনের সাথে। [ Sukumar Ray with his father Upendrakishore Ray, mother Bidhumukhi and five siblings. ]
সুকুমার রায় তার বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়, মা বিধুমুখী এবং পাঁচ ভাইবোনের সাথে। [ Sukumar Ray with his father Upendrakishore Ray, mother Bidhumukhi and five siblings. ]

অতীতের ছবি – পর্ব ১ – সুকুমার রায়

ছিল এ ভারতে এমন দিন
মানুষের মন ছিল স্বাধীন ;
সহজ উদার সরল প্রাণে
বিস্ময়ে চাহিত জগত পানে।
আকাশে তখন তারকা চলে,
নদী যায় ভেসে, সাগর টলে,
বাতাস ছুটিছে আপন কাজে,
পৃথিবী সাজিছে নানান সাজে ;
ফুলে ফলে ছয় ঋতুর খেলা,
কত রূপ কত রঙের মেলা;
মুখরিত বন পাখির গানে,
অটঁল পাহাড় মগন ধ্যানে;
নীলকাশে গন মেঘের ঘটাঁ,
তাহে ইন্দ্রধনু বিজলী ছঁটা,
তাহে বারিধারা পড়িছে ঝরি-
দেখিত মানুষ নয়ন ভরি।
কোথায় চলেছে কিসের টানে
কোথা হতে আসে, কেহ না জানে।
ভাবিত মানব দিবস-যামী,
ইহারি মাঝারে জাগিয়া আমি,
কিছু নাহি বুঝি কিছু নাহি জানি,
দেখি দেখি আর অবাক মানি।
কেন চলি ফিরি কিসের লাগি
কখন ঘুমাই কখন জাগি,
কত কান্না হাসি দুখে ও সুখে
ক্ষুধা তৃষ্ণা কত বাজিছে বুকে।
জন্ম লভি জীব জীবন ধরে,
কোথায় মিলায় মরণ পরে?
ভবিতে ভাবিতে আকুল প্রাণে
ডুবিত মানব গভীর ধ্যানে।
অকূল রহস্য তিমিরতলে,
জ্ঞানজ্যোতিময় প্রদীপ জ্বলে,
সমাহিত চিতে যতন করি
অচঞ্চল শিখা সে আলো ধরি
দিব্য জ্ঞানময় নয়ন লভি,
হেরিল নতুন জগত ছবি।
অনাদি নিয়মে অনাদি স্রোতে
ভাসিয়া চলেছে অকুল পথে
প্রতি ধুলিকণা নিখিল টানে
এক হতে ধায় একেরি পানে,
চলেছে একেরি শাসন মানি,
লোকে লোকান্তরে একেরি বাণী
এক সে অমৃতে হয়েছে হারা
নিখিল জীবন-মরণ ধারা।
সে অমৃতজ্যোতি আকাশ ঘেরি,
অন্তরে বাহিরে অমৃত হেরি।
যাঁহা হতে জীব জনম লভে,
যাহা হতে ধরে জীবন সবে,
যাহার মাঝারে মরণ পরে
ফিরি পুন সবে প্রবেশ করে,
তাহার জানিবে যতন ধরি।
তিনি ব্রহ্ম তারে প্রনাম করি।
আনন্দেতে জীব জনম লভে
আনন্দে জীবিত রয়েছে সবে;
আনন্দে বিরাম লভিয়া প্রাণ
আনন্দের মাঝে করে প্রয়াণ।
শুন বিশ্বলোক শুনহ বাণী
অমৃতের পুত্র সকল প্রাণী,
দিব্যধামিবাসী শুনহ সবে-
জেনেছি তাহারে, যিনি এ ভবে
মহান পুরুষ নিখিল গতি,
তমসার পরে পরম জ্যোতি :
তেজোময় রূপে হেরিয়া তাঁরে
স্তব্ধ হয় মন, বচন হারে।
বামে ও দখিনে উপরে নীচে,
ভিতরে বাহিরে সমুখে পিছে,
কিবা জলেস্থলে আকাশ পরে
আধারে আলোকে চেতনে জড়ে:
আমার মাঝারে আমারে ঘেরি
এক ব্রহ্মময় প্রকাশ হেরি।
সে আলোকে চাহি আপন পানে
আপনারে মন স্বরূপ জানে।
আমি আমি করি দিবস- যামী,
না জানি কেমন কোথা সে আমি
অজর অমর অরূপ রূপ
নহি আমি এই জড়ের স্তুপ
দেহ নহে মোর চির-নিবাস
দেহের বিনাশে নাহি বিনাশ।
বিশ্ব আত্মা মাঝে হয়ে মগন
আপন স্বরূপ হেরিলে মন
না থাকে সন্দেহ না থাকে ভয়
শোক তাপ মোহে নিমেষে লয়,
জীবনে মরণে না রহে ছেদ,
ইহা পরলোকে না রহে ভেদ।
ব্রহ্মানন্দময় পরম ধাম,
হেথা আসি সবে লভে বিরাম;
পরম সম্পদ পরম গতি,
লভ তাঁরে জীব যতনে অতি।

 

অতীতের ছবি- পর্ব ২ – সুকুমার রায়

কালচক্রে হায় এমন দেশে
ঘোর দুঃখদিন আসিল শেষে।
দশদিকে হতে আঁধার আসি
ভারত আকাশ ফেলিল গ্রাসি।
কোথা সে প্রাচীন জ্ঞানের জ্যোতি,
সত্য অন্বেষণে গভীর মতি ;
কোথা ব্রহ্মজ্ঞান সাধন ধন,
কোথা ঋষিগণ ধ্যানে মগন;
কোথা ব্রহ্মচারী তাপস যত,
কোথা সে ব্রাহ্মণ সাধনা রত?
একে একে সবে মিলাল কোথা,
আর নাহি শুনি প্রাচীন কথা।
মহামূল্য নিধি ঠেলিয়া পায়
হেলায় মানুষ হারাল তায়।
আপন স্বরূপ ভুলিয়া মন
ক্ষুদ্রের সাধনে হল মগন।
ক্ষুদ্র চিন্তা মাঝে নিয়ত মজি,
ক্ষুদ্র স্বার্থ-সুখ জীবনে ভাজি;
ক্ষুদ্র তৃপ্তি লয়ে মূঢ়ের মত
ক্ষুদ্রের সেবায় হইল রত।
রচি নব নব বিধি-বিধান
নিগড়ে বাঁধিল মানব প্রাণ;
সহস্র নিয়ম নিষেধ শত ;
তাহে বদ্ধ নর জড়ের মত ;
লিখি দাসখত ললাটে তার
রুদ্ধ করি দিল মনের দ্বার।
জ্বলন্ত যাঁহার প্রকাশ ভাবে-
হায়রে তাঁহারে ভুলিল সবে;
কল্পনার পিছে ধাইল মন,
কল্পিত দেবতা হল সৃজন,
কল্পিত রূপের মূরতি গড়ি,
মিথ্যা পূজাচার রচন করি,
ব্যাখ্যা করি তার মহিমা শত,
মিথ্যা শাস্ত্রবাণী রচিল কত।
তাহে তৃপ্ত হয়ে অবোধ নরে
রহে উদাসীন মোহের ভরে।
না জাগে জিজ্ঞাসা অলস মনে,
দেখিয়া না দেখে পরম ধনে।
ব্রাহ্মণেরে লোকে দেবতা মানি
নির্বিচারে শুনে তাহারি বাণী।
পিতৃপুরুষের প্রসাদ বরে
বসি উচ্চাসনে গরব ভরে
পূজা-উপচার নিয়ত লভি
ভুলিল ব্রাহ্মণ নিজ পদবী।
কিসে নিত্যকালে এ ভারতভাবে
আপন শাসন অঁটুট রবে-
এই চিন্তা সদা করি বিচার
হল স্বার্থপর হৃদয় তার।
ভেদবুদ্ধিময় মানব মন
নব নব ভেদ করে সৃজন।
জাতিরে ভাঙিয়া শতধা করে,
তাহার উপরে সমাজ গড়ে;
নানা বর্ণ নানা শ্রেণীবিচার ,
নানা কুটবিধি হল প্রচার।
ভেদ বুদ্ধি কত জীবন মাঝে
অশনে বসেন সকল কাজে,
ধর্ম অধিকারে বিচার ভেদ
মানুষে মানুষে করে প্রভেদ।
ভেদ জনে জনে, নারী ও নরে,
জাতিতে জাতিতে বিচার ঘরে।
মিথ্যা অহংকারে মোহের বশে
জাতির একতা বাঁধন খসে:
হয়ে আত্মঘাতী ভারতভবে
আপন কল্যণ ভুলিল সবে।

 

 

অতীতের ছবি- পর্ব ৩ – সুকুমার রায়

এখনও গভীর তমসা রাতি,
ভারত ভবনে নিভিছে বাতি –
মানুষ না দেখি ভারতভূমে,
সবাই মগন গভীর ঘুমে।
কত জাতি আজ হেলার ভরে
হেথায় আসিয়া বসতি করে।
ভারতের বুকে নিশান গাথি
বসেছে সবলে আসন পাতি।
নিজ ধনমান নিজ বিভব
বিদেশীর হাতে সঁপিয়া সব,
ভারতের মুখে না ফুটে বাণী,
মৌন রহে দেশ শরম মানি।
– হেনকালে শুন ভেদি আঁধার
সুগম্ভীর বানী উঠিল কার-
“ভাব সেই এক ভাবহ তারে,
জলে স্থলে শুন্যে হেরিছ যারে
নিয়ত যাহার স্বরূপ ধ্যানে
দিব্য জ্ঞান জাগে মানব প্রাণে।
ছাড় তুচ্ছ পূজা জড় সাধন,
মিথ্যা দেবসেবা ছাড়া এখন,
বেদান্তের বাণী স্মরণ কর,
ব্রহ্মজ্ঞান-শিখা হৃদয়ে ধর
সত্য মিথ্যা দেখে করি বিচার
খুলি দাও যত মনের দ্বার ।
মানুষের মত স্বাধীন প্রাণ
নির্ভয়ে তাকাও জগত পানে-
দিকে দিকে দেখ ঘুচিছে রাতি,
দিকে দিকে জাগে কত না জাতি;
দিকে দিকে লোক সাধনারত
জ্ঞানের ভান্ডার খুলেছে কত।
নাহি কি তোমার জ্ঞানের খনি ?
বেদান্ত রতন মুকুটমণি?
অসারে মজে কি ভুলেছ তুমি-
ধর্মে গরীয়ান ভারতভুমি?”
-শুনি মৃতদেশ পরান পায়,
বিস্ময়ে মানুষ ফিরিয়া চায়।
দেখে দিব্যরূপ পুরুষ বরে
কান্তি তেজোময় নয়ন হরে,
গবল শরীর সুঠাম অতি,
ললাট প্রসর, নয়নে জ্যোতি,
গম্ভীর স্বভাব,বচন ধীর,
সত্যের সংগ্রামে অজেয় বীর;
অতুল প্রখর প্রতিভা ধরে
নানা শাস্ত্র ভাষা বিচার করে।
রামমোহনের১ জীবন স্মরি,
কৃতজ্ঞতা ভরে প্রনাম করি।
দেশের দুর্গতি সকলখানে
হেরিয়া বাজিল রাজার প্রাণে ।
কত অসহায় অবোধ নারী
সতীত্বের নামে সকল ছাড়ি,
কেহ স্ব-ইচছায়, কেহবা ভয়ে,
শাসনে তাড়নে পিষিত হয়ে,
পতির চিতায় পুড়িয়া মরে-
শুনি কাদে প্রাণ তাদের তরে ।
নারীদুঃখ নাশ করিল পণ,
ঘুচিল নারীর সহমরণ ।
নিষ্কাম করম- যোগীর মত
দেশের কল্যাণ সাধনে রত,
নানা শাস্ত্রবাণী করে চয়ন,
দেশ দেশান্তের ঋষিবচন;
পশ্চিমের নব জ্ঞানের বাণী
দেশের সমুখে ধরিল আনি।
কিরূপেতে পুন এ ভারতভবে
ব্রহ্মজ্ঞান কথা প্রচার হবে ,
নিয়ত যতন তাহারি তরে,
কত শ্রম কত প্রয়াস করে ;
তর্ক আলোচনা কত বিচার
কত গ্রন্থ রচি’ করে প্রচার;
-ক্রমে বিনাশিতে জড় ধরম
‘ব্রহ্ম সমাজে’র হল জনম ।
শুনে দেশবাসি নুতন কথা,
মূরতিবিহীন পুজার প্রথা
উপাসনা -গৃহ দেখে নতুন-
যেথায় স্বদেশী বিদেশী জন
শুদ্র দ্বিজ আদি মিলিয়া সবে
নির্বিচারে সদা আসন লাভে।
মহাপুরুষের বিপুল শ্রমে
দেশে যুগান্তর আসিল ক্রমে।
স্বদেশের তার আকুল প্রাণ
প্রবাসেতে রাজা করে প্রয়ান;
সেথায় সুদুর বিলাতে হায়
অকালেতে রাজা ত্যজিল কায়।
অসমাপ্ত কাজ রহিল পড়ে,
ফিরে যায় লোকে নিরাশা ভরে;
একে একে সব যেতেছে চলে-
ভাসে রামচন্দ্র২ নয়নজলে।
রাজার জীবন নিয়ত স্মরি’
উপাসনা গৃহে রহে সে পড়ি,
নিয়ম ধরিয়া পূজার কালে
নিষ্ঠাভাবে সেথা প্রদীপ জ্বালে।
একা বসি ভাবে রাজার কাজ
এমন দুর্দিনে কে লবে আজ।

 

অতীতের ছবি- পর্ব ৪ – সুকুমার রায়

ধনী যুবা এক শ্মশান ঘাটে
একা বসি তার রজনী কাটে।
অদূরে অন্তিম শয়নোপরি
দিদিমা তাহার আছেন পড়ি,
সম্মুখে পূর্ণিমা গগনতলে
পিছনে শ্মশানে আগুন জ্বলে,
তাহারি মাঝারে নদীর তীরে
হরিনাম ধ্বনি উঠিছে ধীরে।
একাকী যুবক বসিয়া কুলে
সহসা কি ভাবি আপনা ভুলে।
প্রসন্ন আকাশ চাঁদিম রাতি
ধরিল অপূর্ব নতুন ভাতি,
তুচ্ছ বোধ হল ধন – বিভব
বিলাস বাসনা অসার সব,
অজানা কি যেন সহসা স্মরি
পলকে পরান উঠিল ভরি।
আর কি সে মন বিরাম মানে?
গভীর পিপাসা জাগিল প্রাণে।
কোথা শান্তি পাবে ব্যাকুল তৃষা
শুধায় সবারে না পায় দিশা।
-সহসা একদা তাহার ঘরে
ছিন্নপত্র এক উড়িয়া পড়ে ;
কি যেন বচন লিখিত তায়
অর্থ তার যুবা ভাবি না পায়।
বিদ্যাবাগীশের নিকটে তবে
যুবা সে বাণীর মরম লভে-
“যাহা কিছু এই জগততলে
অনিত্যের স্রোতে ভাসিয়া চলে
রহ্মে আচ্ছাদিত জানিবে তায়-”
শুনিয়া যুবক প্রবোধ পায়।
শুনি মহাবাণী চমক লাগে,
আরো জানিব রে বাসনা জাগে
ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পিপাসু মন
গভীর সাধনে হল মগন:
যত ডোবে আরো ডুবিতে চায়
ডুবি নব নব রতন পায়া।
হেনকালে হল অশনিপাত
যুবকের পিতা দ্বারকানাথ,
অতুল সম্পদ ধন বিভব
ঋণের পাথারে ডুবায়ে সব
কিছু না বুঝিতে জানিতে কেহ
অকালে সহসা ত্যজিল দেহ।
আত্মীয় -স্বজন কহিল সবে,
“যে উপায়ে হোক বাঁচিতে হবে-
কর অস্বীকার ঋণের দায়
নহিলে তোমার সকলি যায়।”
নাহি টলে তায় যুবার মন,
পিতৃঋণ শোধ করিল পণ,
হয়ে সর্বত্যাগী ফকির দীন
ছাড়ি দিল সব শোধিতে ঋণ।
উত্তমর্ণজনে অবাক মানি
কহে শ্রদ্ধাভারে অভয় বাণী,
“বিষয় বিভব থাকুক তব,
মোরা তাহা হতে কিছু না লব।
সাধুতা তোমার তুলনাহীন;
সাধ্যমত তুমি শোধিও ঋণ।”
বরষের পর বরষ যায়,
যুবক এখন প্রবীণ -প্রায়।
সংসারে বাসনা -বিগত মন,
ঋষি কল্পরুপ ধ্যানে মগ্ন,
ব্রহ্ম-ধ্যান -জ্ঞানে পুরিত প্রান ,
ব্রহ্মানন্দ রস করিছে পান;
বচনেতে যেন অমৃত ঝরে-
নমি নমি তাঁরে ভকতি ভরে।
ব্রাহ্মসমাজে আসন হতে
দীপ্ত অগ্নিয় বচন স্রোতে
ব্রহ্মজ্ঞান ধারা বহিয়া যায়,
কত শত লোকে শুনিতে ধায়।
“ব্রহ্মে কর প্রীতি নিয়ত সবে,
প্রিয়কার্য় তাঁর সাধহ ভবে।
হের তারে নিজ হৃদয় মাঝে,
সেথা ব্রজ্যেতি নিয়ত রাজে।
জ্ঞান সমুজ্জল বিমল প্রাণে ,
যে জানে তাহারে ধ্রুব সে জানে ।
জানিবার পথ নাহিক আর,
নহে শাসত্র বাণী প্রমান তাঁর ।
বহু তর্ক বহু বিচার বলে
বহু জপ তপ সাধন ফলে
বহু তত্ত্বকথা আলোড়ি চিতে
নাহি পায় সেই বচনাতীতে।”
ব্রহ্ম সমাজের অসাড় প্রাণে ,
মহর্ষির৩ বানী চেতনা আনে।
দলে দলে লোক সেথায় ছোটে
ঊৎসাহের স্রোতে আসিয়া জোটে।
মত্ত অনুরাগে কেশব৪ ধায়,
প্রতিভার জ্যোতি নয়নে ভায়;
আকুল আগ্রহে পরান খুলি
ঝাঁপ দিল স্রোতে আপনা ভুলি।
হেরি মহর্ষির পুলক বাড়ে
“ব্রহ্মনন্দ” নাম দিলেন তারে ।
লভি নব প্রানে সমাজ কায়
নব নব ভাবে বিকাশ পায় ;
ধর্ম গ্রন্থ নব,নব সাধন,
ব্রহ্ম উপাসনা বিধি নূতন
ধর্মপ্রান কত নারী ও নরে
তাহে নিমগন পুলক ভরে ।

 

 

অতীতের ছবি- পর্ব ৫ – সুকুমার রায়

সমাজে সুদিন এল আবার,
ক্রমে প্রসারিল জীবন তার।
কেশব আপন প্রতিভা বলে
যতনে গঠিল যুবকদলে।
নগরে নগরে হল প্রচার-
“ধর্ম রাজ্যে নাহি জাতিবিচার;
নাহি ভেদ হেথা নারী ও নরে,
ভক্তি আছে যার সে যায় ত’রে।
জাতিবর্ণ- ভেদ কুরীতি যত
ভাঙি দাও চিরদিনের মত।
দেশ দেশান্তরে ধাঊক মন,
সর্বধর্মবাণী কর চয়ন;
ধর্মে ধর্মে নাহি বিরোধ রবে,
মহা সমম্বয় গঠিত হবে।”
পশিল সে বাণী দেশের প্রাণে,
মুগ্ধ নরনারী অবাক মানে ।
নগরে নগরে তুফান উঠে,
ঘরে ঘরে কত বাঁধন টুটে;
ব্রহ্ম নামে সবে ছুটিয়া চলে,
প্রাণ হতে প্রাণে আগুন জ্বলে।
আসিল গোঁসাই৫ ব্যাকুল হয়ে
প্রেমে ভরপূর ভকতি লয়ে।
আসিল প্রতাপ৬ স্বভাব ধীর,
গম্ভীর বচন জ্ঞানে গভীর।
স্বল্পভাষী সাধু অঘোরনাথ৭
যোগমগ্ন মন দিবসরাত।
গৌরগোবিন্দের৮ সাধক প্রাণ
হিন্দুশাস্ত্রে তাঁর অতুল জ্ঞান।
কান্তিচন্দ্র৯ সদা সেবায় রত
সেবাধর্ম তাঁর জীবন-ব্রত।
ত্রৈলোক্যনাথের১০ সরস গান
নব নব ভাবে মাতায় প্রাণ।
আরো কত সাধু ধরমমতি
বঙ্গচন্দ্র১১ আদি প্রচার-ব্রতী
একসাথে মিলি প্রেমের ভরে
প্রেমপরিবার গঠন করে।
কাল কিবা খাবে কেহ না জানে,
আকুল উৎসাহ সবার প্রাণে ।
নূতন মন্দির নব সমাজ
নব ভাবে কত নূতন কাজ।
দিনে দিনে নব প্রেরণা পায়,
উৎসাহের স্রোত বাড়িয়া যায়।
সমাজ-চালনা বিধি-বিচার
কেশবের হাতে সকল ভার;
কেশবপ্রেরণা সবার মূলে
তাঁর নামে সবে আপনা ভুলে।
ধন্য ব্রহ্মানন্দ যাঁহার বাণী
শিরে ধরে লোকে প্রমাণ মানি।
যাঁহার সাধনা আজিও হেরি
রয়েছে সমাজ জীবন ঘেরি ;
যাঁহার মূরতি স্মরণ করি,
যাঁহার জীবন হৃদয়ে ধরি,
শত শত লোক প্রেরণা পায়-
আজি ভক্তিভরে প্রণমি তাঁয়।
আবার বহিল নূতন ধারা,
সমাজের প্রাণে বাজিল সাড়া;
ভাসি বহুজনে সে নব স্রোতে
বাহির হাইল নূতন পথে।
মিলি অনুরাগে যতন ভরে
এই “সাধারণ” সমাজ গড়ে।
ওদিকে কেশব নূতন বলে
বাঁধিল আবার আপন দলে।
নব ভাবে “নববিধান” গড়ি,
নূতন সংহিতা রচনা করি,
ভগ্নদেহ লয়ে অবশপ্রায়,
খাটিতে খাটিতে ত্যজিল কায়।

 

 

অতীতের ছবি- পর্ব ৬ – সুকুমার রায়

ধরি নব পথ নূতন ধারা
নবীন প্রেরণে আসিল যারা,
আজি তাঁহাদের চরণ ধরি
ভক্তিভরে সবে স্মরণ করি।
শাস্ত্রী শবনাথ সকল ফেলি
বিষয় বাসনা চরণে ঠেলি
বহু নির্যাতন বহিয়া শিরে,
অনুরাগে ভাসি নয়ন নীরে,
সর্বত্যাগী হয়ে ব্যাকুল প্রাণে
ছুটে আসে ওই কিসের টানে,
দেখ ওই চলে পাগলমত
ভক্তশ্রেষ্ট বীর বিনয়নত,
বিজয় গোঁসাই সরল প্রাণ-
হেরি আজি তাঁই প্রেম বয়ান।
সাধু রামতনু১২ জ্ঞানে প্রবীণ,
শিশুর মতন চির নবীন।
শিবচন্দ্র দেব সুধীর মন,
কর্মনিষ্ঠাময় সাধু জীবন ।
নগেন্দ্রনাথের১৩ যুকতি বানে
কূট তর্ক যত নিমেষে হানে ।
আনন্দমোহন১৪ মুরতি যার।
উমেশচন্দ্রের১৫ জীবণ মন ,
নীরব সাধনে সদা মগন।
দুর্গামোহনের১৬ জীবনগত
সমাজের সেবা দানের ব্রত।
দ্বারকানাথের১৭ স্মরন হয়
ন্যায়ধর্মে বীর অকুতোভয় ।
পূর্ব বঙ্গে হোথা সাধক কত
নবধর্ম বানী প্রচারে কত।
সংসারে নিলিপ্ত ভাবুক প্রাণ
স্বার্থক প্রচারে কালীনারা’ণ১৮
কত নাম কব কত যে জ্ঞানী
কত ভক্ত সাধু যোগী ও ধ্যানী;
কত মধুময় প্রেমিক মন
আড়ম্বহীন সেবকজন ;
আসিল হেথায় আকাশ ভরে
সবার যতনে সমাজ গড়ে।
এই যে মন্দির হেরিছ যার
ইটকাঠ ময় স্থুল আকার ;
ইহারি মাঝারে কত যেস্মৃতি,
কত আকিঞ্চন সমাজ প্রীতি,
ব্যাকুল ভাবনা দিবস রাত
বিনিদ্র সাধনে জীবন পাত ।
বহু কর্মময় এই সমাজ
সে সব কাহিনী না কব আজ,
আজিকে কেবল স্মরণে আনি
ব্রাহ্মসমাজের মহান বাণী ।
যে বাণী শুনুনু রাজার মুখে,
মহর্ষি যাহারে ধরিল বুকে,
কেশব যে বাণী প্রচার কারে-
স্মরি আজ তাহা ভকতি ভরে।
রক্তাক্ষরে লিখা যে বাণী রটে
এই সমাজের জীবনপটে-
“স্বাধীন মানবহৃদয়তলে
বিবেকের শিখা নিয়ত জ্বলে।
গুরুর আদেশ সাধুর বাণী
ইহার উপরে কারে না মানি?”
স্বাধীন মানে এই সমাজ
মুক্ত ধর্মলাভে ইহার কাজ।
হেথায় সকল বিরোধ গুচি
রবে নানা মত নানান্ রুচি
কাহারো রচিত বিধি বিধান
রুধিবে না হেথা কাহারো প্রাণ।
প্রতি জীবনের বিবেক ভাতি
সবার জীবনে জ্বলিবে বাতি।
নর নারী হেথা মিলিয়া সবে
সম অধিকারে আসন লাভে।
প্রেমেতে বিশাল জ্ঞানে গভীর
চরিত্রে সংযত করমে বীর ;
ঈশ্বরে ভক্তি মানবে প্রীতি,
হেথা মানুষের জীবন নীতি।
ফুরাল কি সব হেথায় আসি ?
আসিবে না প্রেম জড়তা নাশি?
জাগিবে না প্রাণ ব্যাকুল হয়ে,
নব নব বাণী জীবনে লয়ে ?
জ্বলিবে না নব সাধন শিখা ?
নব ইতিহাস হবে না লিখা ?
চিররুদ্ধ রবে পুজার দ্বার ?
আসিবে না নব পুজারী আর?
কোথাও আশার আলো কি নাহি?
শুধাই সবার বদন চাহি।

 

অন্ধ মেয়ে – সুকুমার রায়

গভীর কালো মেঘের পরে রঙিন ধনু বাঁকা,
রঙের তুলি বুলিয়ে মেঘে খিলান যেন আঁকা!
গবুজ ঘাসে রোদের পাশে আলোর কেরামতি
রঙিন্ বেশে রঙিন্ ফুলে রঙিন্ প্রজাপতি!

অন্ধ মেয়ে দেখ্ছে না তা – নাইবা যদি দেখে-
শীতল মিঠা বাদল হাওয়া যায় যে তারে ডেকে!
শুনছে সে যে পাখির ডাকে হরয কোলাকুলি
মিষ্ট ঘাসের গন্ধে তারও প্রাণ গিয়েছে ভুলি!
দুঃখ সুখের ছন্দে ভরা জগৎ তারও আছে,
তারও আধার জগৎখানি মধুর তারি কাছে।।

 

অবাক কাণ্ড – সুকুমার রায়

শুন্‌ছ দাদা ! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে,
সে নাকি রোজ খাবার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে ?
শুন্‌ছি নাকি খিদেও পায় সারা দিন না খেলে ?
চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে ?
চল্‌তে গেলে ঠ্যাং নাকি তার ভূঁয়ের পরে ঠেকে ?
কান দিয়ে সব শোনে নাকি ? চোখ দিয়ে সব দেখে ?
শোয় নাকি সে মুণ্ডটাকে শিয়র পানে দিয়ে ?
হয় কি না হয় সত্যি মিথ্যা চল্ না দেখি গিয়ে ?

 

অবুঝ – সুকুমার রায়

চুপ করে থাক্‌, তর্ক করার বদ্‌অভ্যাসটি ভাল না,
এক্কেবারেই হয় না ওতে বুদ্ধিশক্তির চালনা ।
দেখ্‌ ত দেখি আজও আমার মনের তেজটি নেভেনি-
এইবার শোন্‌ বলছি এখন- কি বলছিলেম ভেবেনি !
বলছিলেম কি, আমি একটা বই লিখেছি কবিতার,
উঁচু রকম পদ্যে লেখা আগাগোড়াই সবি তার ।
তাইতে আছে “দশমুখে চায়, হজম করে দশোদর,
শ্মশানঘাটে শষ্পানি খায় শশব্যস্ত শশধর ।”
এই কথাটার অর্থ যে কি, ভাবছে না কেউ মোটেও-
বুঝছে না কেউ লাভ হবে কি, অর্থ যদি জোটেও ।
এরই মধ্যে হাই তুলিস্‌ যে ? পুঁতে ফেল্‌ব এখনি,
ঘুঘু দেখেই নাচতে শুরু, ফাঁদ ত বাবা দেখনি !
কি বললি তুই ? সাতান্নবার শুনেছিস্‌ ঐ কথাটা ?
এমন মিথ্যে কইতে পারিস্‌ লক্ষ্মীছাড়া বখাটা !
আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধ্যি নেই কো পেরোবার
হিসেব দেব, বলেছি এই চোদ্দবার কি তেরোবার ।
সাতান্ন তুই গুনতে পারিস্‌ ? মিথ্যেবাদি গুনে যা-
ও শ্যামাদাস ! পালাস্‌ কেন ? রাগ করিনি, শুনে যা ।

 

 

অসম্ভব নয় ! – সুকুমার রায়

এক যে ছিল সাহেব, তাহার
গুণের মধ্যে নাকের বাহার ।
তার যে গাধা বাহন, সেটা
যেমন পেটুক তেমনি ঢ্যাঁটা ।
ডাইনে বললে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে ।
চল্‌‌তে চল্‌‌তে থেকে থেকে
খানায় খন্দে পড়ে বেঁকে ।
ব্যাপার দেখে এম্নিতরো
সাহেব বললে, “সবুর করো-
মামদোবাজি আমার কাছে ?
এ রোগেরও ওষুধ আছে ।”
এই না ব’লে ভীষণ ক্ষেপে
গাধার পিঠে বস্‌ল চেপে
মুলোর ঝুঁটি ঝুলিয়ে নাকে ।
আর কি গাধা ঝিমিয়ে থাকে ?
মুলোর গন্ধে টগবগিয়ে
দৌড়ে চলে লম্ফ দিয়ে-
যতই চলে ধরব ব’লে
ততই মুলো এগিয়ে চলে!
খাবার লোভে উদাস প্রাণে
কেবল ছোটে মুলোর টানে-
ডাইনে বাঁয়ে মুলোর তালে
ফেরেন গাধা নাকের চালে ।

 

আকাশের গায়ে – সুকুমার রায়

আকাশের গায়ে কিবা রামধনু খেলে,

দেখে চেয়ে কত লোক সব কাজ ফেলে;
তাই দেখে খুঁৎ-ধরা বুড়ো কয় চটে,
দেখছ কি, এই রং পাকা নয় মোটে।।

 

আজব খেলা – সুকুমার রায়

সোনার মেঘে আল্‌তা ঢেলে সিঁদুর মেখে গায়

সকাল সাঝেঁ সূর্যি মামা নিত্যি আসে যায়।
নিত্যি খেলে রঙের খেলা আকাশ ভ’রে ভ’রে
আপন ছবি আপনি মুছে আকে নতুন করে।
ভোরের ছবি মিলিয়ে দিল দিনের আলো জ্বেলে
সাঁঝের আঁকা রঙিন ছবি রাতের কালি ঢেলে।
আবার আঁকে আবার মোছে দিনের পরে দিন
আপন সাথে আপন খেলা চলে বিরামহীন।
ফরায় না কি সোনার খেলা ? রঙের নাহি পার?
কেউ কি জানে কাহার সাথে এমন খেলা তার?
সেই খেলা, যে ধারার বুকে আলোর গানে গানে
উঠ্‌ছে জেগে – সেই কথা কি সূর্যি মামা জানে?

 

আড়ি – সুকুমার রায়

কিসে কিসে ভাব নেই ? ভক্ষক ও ভক্ষ্যে-
বাঘে ছাগে মিল হলে আর নেই রক্ষে ।
শেয়ালের সাড়া পেলে কুকুরেরা তৈরি,
সাপে আর নেউলে ত চিরকাল বৈরী !
আদা আর কাঁচকলা মেলে কোনদিন্‌ সে ?
কোকিলের ডাক শুনে কাক জ্বলে হিংসেয় ।
তেলে দেওয়া বেগুনের ঝগড়াটা দেখনি ?
ছ্যাঁক্‌ ছ্যাঁক্‌ রাগ যেন খেতে আসে এখনি ।
তার চেয়ে বেশি আড়ি আমি পারি কহিতে-
তোমাদের কারো কারো কেতাবের সহিতে ।

 

 

আদুরে পুতুল – সুকুমার রায়

যাদুরে আমার আদুরে গোপাল, নাকটি নাদুস থোপ্‌না গাল,
ঝিকিমিকি চোখ মিট্‌মিটি চায়, ঠোঁট দুটি তায় টাট্‌কা লাল ।
মোমের পুতুল ঘুমিয়ে থাকুক্‌ দাঁত মেলে আর চুল খুলে-
টিনের পুতুল চীনের পুতুল কেউ কি এমন তুলতুলে ?
গোব্‌দা গড়ন এমনি ধরন আব্‌দারে কেউ ঠোঁট ফুলোয় ?
মখমলি রং মিষ্টি নরম- দেখ্‌ছ কেমন হাত বুলোয় !
বল্‌বি কি বল্‌ হাব্‌লা পাগল আবোল তাবোল কান ঘেঁষে,
ফোক্‌লা গদাই যা বলবি তাই ছাপিয়ে পাঠাই “সন্দেশে”

 

আনন্দ – সুকুমার রায়

যে আনন্দ ফুলের বাসে,
যে আনন্দ পাখির গানে,
যে আনন্দ অরুণ আলোয়,
যে আনন্দ শিশুর প্রাণে,
যে আনন্দ বাতাস বহে,
যে আনন্দ সাগরজলে,
যে আনন্দ ধুলির কণায়,
যে আনন্দ তৃণের দলে,
যে আনন্দ আকাশ ভরা ,
যে আনন্দ তারায় তারায়,
যে আনন্দ সকল সুখে,
যে আনন্দ রক্তধারায়
সে আনন্দ মধুর হয়ে
তোমার প্রাণে পড়ুক ঝরি,
সে আনন্দ আলোর মত
থাকুক তব জীবন ভরি।

 

আবোল তাবোল – ১ – সুকুমার রায়

আয়রে ভোলা খেয়াল-খোলা
স্বপনদোলা নাচিয়ে আয়,
আয়রে পাগল আবোল তাবোল
মত্ত মাদল বাজিয়ে আয়।
আয় যেখানে ক্ষ্যাপার গানে
নাইকো মানে নাইকো সুর।
আয়রে যেথায় উধাও হাওয়ায়
মন ভেসে যায় কোন সুদূর।
আয় ক্ষ্যাপা-মন ঘুচিয়ে বাঁধন
জাগিয়ে নাচন তাধিন্‌ ধিন্‌,
আয় বেয়াড়া সৃষ্টিছাড়া
নিয়মহারা হিসাবহীন।
আজগুবি চাল বেঠিক বেতাল
মাতবি মাতাল রঙ্গেতে–
আয়রে তবে ভুলের ভবে
অসম্ভবের ছন্দেতে।।

 

আবোল তাবোল – ২ – সুকুমার রায়

মেঘ মুলুকে ঝাপ‌্সা রাতে,

রামধনুকের আবছায়াতে,
তাল বেতালে খেয়াল সুরে,
তান ধরেছি কন্ঠ পুরে।
হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,
নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা।
হেথায় রঙিন্ আকাশতলে
স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে,
সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,
আকাশ কুসুম আপনি ফোটে,
রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন
চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ।
আজকে দাদা যাবার আগে
বল্‌ব যা মোর চিত্তে লাগে-
নাই বা তাহার অর্থ হোক্না
ইবা বুঝুক বেবাক্ লোক।
আপনাকে আজ আপন হতে
ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে।
ছুট‌লে কথা থামায় কে?
আজকে ঠেকায় আমায় কে?
আজকে আমার মনের মাঝে
ধাঁই ধপাধপ তব্‌লা বাজে-
রাম-খটাখট ঘ্যাচাং ঘ্যাঁচ্
কথায় কাটে কথায় প্যাঁচ্ ।
আলোয় ঢাকা অন্ধকার,
ঘন্টা বাজে গন্ধে তার।
গোপন প্রাণে স্বপন দূত,
মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভুত!
হ্যাংলা হাতী চ্যাং দোলা,
শূন্যে তাদের ঠ্যাং তোলা!
মক্ষিরাণী পক্ষীরাজ-
দস্যি ছেলে লক্ষ্মী আজ!
আদিম কালের চাঁদিম হিম
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম।

 

আবোল তাবোল – ৩ – সুকুমার রায়

এক যে ছিল রাজা- (থুড়ি,
রাজা নয় সে ডাইনি বুড়ি) !
তার যে ছিল ময়ূর- (না না,
ময়ূর কিসের ? ছাগল ছানা) ।
উঠানে তার থাক্‌ত পোঁতা-
-(বাড়িই নেই, তার উঠান কোথা) ?
শুনেছি তাত পিশতুতো ভাই-
-(ভাই নয়ত, মামা-গোঁসাই ) ।
বল্‌ত সে তার শিষ্যটিরে-
-(জন্ম-বোবা বলবে কিরে) ।
যা হোক, তারা তিনটি প্রানী-
-(পাঁচটি তারা, সবাই জানি !)
থও না বাপু খ্যাঁচাখেচি
-(আচ্ছা বল, চুপ করেছি) ।।
তারপরে যেই সন্ধ্যাবেলা,
যেম্নি না তার ওষুধ গেলা,
অম্‌নি তেড়ে জটায় ধরা-
-(কোথায় জটা ? টাক যে ভরা !)
হোক্‌ না টেকো তোর তাতে কি ?
গোমরামুখো মুখ্যু ঢেঁকি !
ধরব ঠেসে টুটির পরে
পিট্‌ব তোমার মুণ্ডু ধরে ।
এখন বাপু পালাও কোথা ?
গল্প বলা সহজ কথা ?

 

আয়রে আলো আয় – সুকুমার রায়

পুব গগনে রাত পোহাল,
ভোরের কোণে লাজুক আলো
নয়ন মেলে চায় ।
আকাশতলে ঝলক জ্বলে,
মেঘের শিশু খেলার ছলে
আলোক মাখে গায় ।।
সোনার আলো, রঙিন্‌ আলো,
স্বপ্নে আঁকা নবীন আলো-
আয়রে আলো আয় ।
আয়রে নেমে আঁধার পরে,
পাষাণ কালো ধৌত ক’রে
আলোর ঝরণায় ।।
ঘুম ভাঙান পাখির তানে
জাগ্‌রে আলো আকুল গানে
আকূল নীলিমায় ।
আলসভরা আঁখির কোণে,
দুঃখ ভয়ে আঁধার মনে,
আয়রে আলো আয় ।।

 

আলোছায়া – সুকুমার রায়

হোক্‌না কেন যতই কালো
এমন ছায়া নাইরে নাই-
লাগ্‌লে পরে রোদের আলো
পালায় না যে আপ্‌নি ভাই !..
শুষ্কমুখে আঁধার ধোঁয়া
কঠিন হেন কোথায় বল্‌,
লাগ্‌লে যাতে হাসির ছোঁয়া
আপ্‌নি গলে হয় না জল ।

 

আশ্চর্য ! – সুকুমার রায়

নিরীহ কলম, নিরীহ কালি,

নিরীহ কাগজে লিখিল গালি –
“বাঁদর বেকুব আজব হাঁদা
বকাট্ ফাজিল অকাট্ গাধা।”
আবার লিখিল কলম ধরি
বচন মিষ্টি, যতন করি –
“শান্ত মানিক শিষ্ট সাধু
বাছারে, ধনরে, লক্ষ্মী যাদু।”
মনের কথাটি ছিল যে মনে,
রটিয়া উঠিল খাতার কোণে,
আঁচড়ে আঁকিতে আখর ক’টি
কেহ খুশী, কেহ উঠিল চটি!
রকম রকম কালির টানে
কারো হাসি কারো অশ্রু আনে,
মারে না, ধরে না, হাঁকে না বুলি
লোক হাসে কাঁদে কি দেখি ভুলি?
সাদায় কালোয়া কি খেলা জানে?
ভাবিয়া ভাবিয়া না পাই মানে।

 

আহ্লাদী – সুকুমার রায়

হাসছি মোরা হাসছি দেখ, হাসছি মোরা আহ্লাদী,
তিনজনেতে জট্‌লা ক’রে ফোক্‌লা হাসির পাল্লা দি ।
হাসতে হাসতে আসছে দাদা, হাসছি আমি, হাসছে ভাই,
হাসছি কেন কেউ জানে না, পাচ্ছে হাসি হাসছি তাই ।
ভাবছি মনে, হাসছি কেন ? থাকব হাসি ত্যাগ ক’রে,
ভাবতে গিয়ে ফিকফিকিয়ে ফেল্‌ছি হাসি ফ্যাক্‌ ক’রে ।
পাচ্ছে হাসি চাপতে গিয়ে, পাচ্ছে হাসি চোখ বুজে,
পাচ্ছে হাসি চিম্‌টি কেটে নাকের ভিতর নোখ্‌ গুঁজে ।
হাসছি দেখে চাঁদের কলা জোলার মাকু জেলের দাঁড়
নৌকা ফানুস পিঁপড়ে মানুষ রেলের গাড়ী তেলের ভাঁড় ।
পড়তে গিয়ে ফেলছি হেসে ‘ক খ গ’ আর শ্লেট দেখে-
উঠ্‌ছে হাসি ভস্‌ভসিয়ে সোডার মতন পেট থেকে ।

 

একুশে আইন – সুকুমার রায়

শিবঠাকুরের আপন দেশে ,
আইন কানুন সর্বনেশে!
কেউ যদি যায় পিছলে প’ড়ে,
প্যায়দা এসে পাক্‌‌ড়ে ধরে ,
কাজির কাছে হয় বিচার-
একুশ টাকা দন্ড তার।।
সেথায় সন্ধে ছটার আগে
হাঁচতে হলে টিকিট লাগে
হাঁচলে পরে বিন্ টিকিটে
দম‌্দমাদম্ লাগায় পিঠে ,
কোটাল এসে নস্যি ঝাড়ে-
একুশ দফা হাচিয়ে মারে।।
কারুর যদি দাতটি নড়ে,
চার্‌টি টাকা মাশুল ধরে ,
কারুর যদি গোঁফ গজায় ,
একশো আনা ট্যাক্সো চায়-
খুঁচিয়ে পিঠে গুঁজিয়ে ঘাড়,
সেলাম ঠোকায় একুশ বার।।
চলতে গিয়ে কেউ যদি চায়
এদিক্ ওদিক্ ডাইনে বাঁয়,
রাজার কাছে খবর ছোটে,
পল্টনেরা লাফিয়ে ওঠে ,
দুপুরে রোদে ঘামিয়ে তায়-
একুশ হাতা জল গেলায়।।
যে সব লোকে পদ্য লেখে,
তাদের ধরে খাঁচায় রেখে,
কানের কাছে নানান্ সুরে
নামতা শোনায় একশো উড়ে,
সামনে রেখে মুদীর খাতা-
হিসেব কষায় একুশ পাতা।।
হঠাৎ সেথায় রাত দুপুরে
নাক ডাকালে ঘুমের ঘোরে,
অম্‌‌নি তেড়ে মাথায় ঘষে,
গোবর গুলে বেলের কষে,
একুশটি পাক ঘুরিয়ে তাকে-
একুশ ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখে।।

 

 

ও বাবা ! – সুকুমার রায়

পড়তে বসে মুখের পরে কাগজ খানি থুয়ে
রমেশ ভায়া ঘুমোয় পড়ে আরাম ক’রে শুয়ে।
শুনছ নাকি ঘড়র্ ঘড়র্ নাক ডাকার ধুম?
সখ যে বড় বেজায় দেখি- দিনের বেলায় ঘুম!

বাতাস পোরা এই যে থলি দেখ্‌ছ আমার হাতে,
দুড়ম করে পিট্‌লে পরে শব্দ হবে তাতে।
রমেশ ভায়া আঁতকে উঠে পড়বে কুপোকাৎ
লাগাও তবে -ধুম ধাড়াক্কা! ক্যাবাৎ! ক্যাবাৎ!

ও বাবারে! এ কেরে ভাই! মারবে নাকি চাটি?
আমি ভাবছি রমেশ বুঝি! সব করেছে মাটি!
আবার দেখ চোখ পাকিয়ে আস্‌ছে আমায় তেড়ে,
আর কেন ভাই? দৌড়ে পালাই, প্রানের আশা ছেড়ে!

 

কত বড় – সুকুমার রায়

ছোট্ট সে একরতি ইঁদুরের ছানা,
ফোটে নাই চোখ তার, একেবারে কানা।
ভাঙা এক দেরাজের ঝুলমাখা কোণে
মার বুকে শুয়ে শুয়ে মার কথা শোনে।

যেই তার চোখ ফোটে সেই দেখে চেয়ে-
দেরাজের ভারি কাঠ চারিদিক ছেয়ে।
চেয়ে বলে মেলি তার গোল গোল আঁখি-
“ওরে বাবা! পৃথিবীটা এত বড় নাকি?”

 

কলিকাতা কোথা রে – সুকুমার রায়

গিরিধি আরামপুরী, দেহ মন চিৎপাত,
খেয়ে শুয়ে হু হু করে কেটে যায় দিনরাত;
হৈ চৈ হাঙ্গামা হুড়োতাড়া হেথা নাই;
মাস বার তারিখের কোন কিছু ল্যাঠা নেই;
খিদে পেলে তেড়ে খাও, ঘুম পেলে ঘুমিও-
মোট কথা, কি আরাম, বুঝলে না তুমিও !
ভুলেই গেছিনু কোথা এই ধরা মাঝেতে
আছে যে শহর এক কলকাতা নামেতে-
হেন কালে চেয়ে দেখি চিঠি এক সমুখে,
চায়েতে অমুক দিন ভোজ দেয় অমুকে ।
‘কোথায়? কোথায়?’ বলে মন ওঠে লাফিয়ে
তাড়াতাড়ি চিঠিখানা তেড়ে ধরি চাপিয়ে,
ঠিকানাটা চেয়ে দেখি নীচু পানে ওধারে
লেখা আছে ‘কলিকাতা’ – সে আবার কোথারে !
স্মৃতি কয় ‘কলিকাতা ‘ রোস দেখি; তাই ত ,
কোথায় শুনেছি যেন , মনে ঠিক নাই ত,
বেগতিক শুধালেম সাধুরাম ধোপারে ;
সে কহিল, হলে হবে উশ্রীর ওপারে।
ওপারের জেলেবুড়ো মাথা নেড়ে কয় সে ,
‘হেন নাম শুনি নাই আমার এ বয়সে ।’
তারপরে পুছিলাম সরকারী মজুরে
তামাম মুলুক সে ত বাৎলায় ‘হুজুরে’
বেঙাবাদ বরাকর , ইদিকে পচম্বা ,
উদিকে পরেশনাথ ,পাড়ি দাও লম্বা ;
সব তার সড়গড় নেই কোন ভুল তায় –
‘কুলিকাতা কাঁহা’ বলি সেও মাথা চুলকায় !
অবশেষে নিরুপায় মাথা যায় ঘুলিয়ে ‘
‘টাইম টেবিল’ খুলি দেখি চোখ বুলয়ে ।
সেথায় পাটনা পুরী গয়া গোমো মাল্‌দ
বজবজ দমদম হাওড়া ও শ্যালদ –
ইত্যাদি কত নাম চেয়ে দেখি সামনেই
তার মাঝে কোন খানে কলিকাতা নাম নেই !!
-সব ফাঁকি বুজ্‌রুকী রসিকতা -চেষ্টা !
উদ্দেশে ‘শালা ‘ বলি গাল দিনু শেষটা।-
সহসা স্মৃতিতে যেন লাগিল কি ফুৎকার
উদিল কুমড়া হেন চাঁদপানা মুখ কার!
আশে পাশে ঢিপি ঢুপি পাহাড়ে পুঞ্জ,
মুখ চাঁচা ময়দান, মাঝে কিবা কুঞ্জ !
সে শোভা স্মরণে ঝরে নয়নের ঝরনা ;
গৃহিনীরে কহি ‘প্রিয়ে !মারা যাই ধর না ।
তার পরে দেখি ঘরে অতি ঘোর অনাচার –
রাখে না কো কেউ কোন তারিখের সমাচার !
তখনি আনিয়া পাঁজি দেখা গেল গণিয়া,
চায়ের সময় এল একেবারে ঘনিয়া !
হায়রে সময় নেই, মন কাদে হতাশে-
কোথায় চায়ের মেলা! মুখশশী কোথা সে !
স্বপন শূকায়ে যায় আধারিয়া নয়নে ,
কবিতায় গলি তাই গাহি শোক শয়নে।

 

কহ ভাই কহ রে – সুকুমার রায়

কহ ভাই কহ রে, অ্যাঁকা চোরা শহরে,
বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না?
লেখা আছে কাগজে আলু খেলে মগজে
ঘিলু যায় ভেস্তিয়ে বুদ্ধি গজায় না।

 

কাঁদুনে – সুকুমার রায়

ছিঁচ্ কাঁদুনে মিচ্‌কে যারা শস্তা কেঁদে নাম কেনে,
ঘ্যাঙায় শুধু ঘ্যার্ন ঘ্যার্ন ঘ্যান্ঘ্যানে আর প্যান্‌প‌্যানে-
কুঁকিয়ে কাঁদে খিদের সময়, ফুঁপিয়ে কাঁদে ধম্‌কালে,
কিম্বা হঠাৎ লাগলে ব্যথা, কিম্বা ভয়ে চমকালে;
অল্পে হাসে অল্পে কাঁদে কান্না থামায় অল্পেতেই ,
মায়ের আদর দুধের বোতল কিম্বা দিদির গল্পেতেই –
তারেই বলি মিথ্যে কাঁদন; আসল কান্না শুন্‌বে কে?
অবাক হবে থম্‌কে রবে সেই কাঁদনের গুণ দেখে!
নন্দঘোষের পাশের বাড়ী বুথ্ সাহেবের বাচ্চাটার
কান্না খানা শুনলে বলি কান্না বটে সাচ্চা তার ।
কাঁদ্‌বে না সে যখন তখন, রাখ্‌বে কেবল রাগ পুষে,
কাঁদ্‌বে যখন খেয়াল হবে খুন-কাঁদুনে রাক্ষুসে!
নাইক কারণ নাইক বিচার মাঝরাতে কি ভোরবেলা,
হঠাৎ শুনি অর্থবিহিন আকাশ-ফাটন জোর গলা।
হাঁক্‌ড়ে ছোটে কান্না, যেমন জোয়ার বেগে নদীর বান,
বাপ মা বসেন হতাশ হয়ে, শব্দ শুনে বধির কান।
বাস্‌রে সে কি লোহার গলা? এক মিনিটও শান্তি নেই?
কাঁদন ঝরে শ্রাবণ ধারে, ক্ষান্ত দেবার নামটি নেই!
ঝুম্ ঝুমি দাও, পুতুল নাচাও, মিষ্টি খাওয়াও একশোবার,
বাতাস কর, চাপড়ে ধর, ফুটবে নাকো হাস্য তার।
কান্নাভরে উল্টে পড়ে কান্না ঝরে নাক দিয়ে,
গিল্‌তে চাহে দালানবাড়ী হাঁ খানি তার হাঁক্ দিয়ে।
ভুত- ভাগান শব্দে লোকে ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ে –
কান্নাশুনে ধন্যি বলি বুথ্ সাহেবের বাচ্চারে।

 

কানা-খোঁড়া সংবাদ – সুকুমার রায়

পুরাতন কালে ছিল দুই রাজা,
নাম ধাম নাহি জানা,
একজন তার খোড়া অতিশয়,
অপর ভূপতি কানা।
মন ছিল খোলা, অতি আলো ভোলা
ধরমেতে ছিল মতি,
পর ধনে সদা ছিল দোঁহাকার
বিরাগ বিকট অতি।
প্রতাপের কিছু নাহি ছিল ত্রুটি
মেজাজ রাজারি মত,
শুনেছি কেবল, বুদ্ধিটা নাকি
নাহি ছিল সরু তত,
ভাই ভাই মত ছিল দুই রাজা,
না ছিল ঝগড়াঝাঁটি,
হেনকালে আসি তিন হাত জমি
সকল করিল মাটি।
তিন হাত জমি হেন ছিল, তাহা
কেহ নাহি জানে কার,
কহে খোঁড়া রায় “এক চক্ষু যার
এ জমি হইবে তার”।’
শুনি কানা রাজা ক্রোধ করি কয়
“আরে অভাগার পুত্র,
এ জমি তোমারি- দেখ না এখনি
খুলিয়া কাগজ পত্র”।
নক্সা রেখেছে এক বছর
বাক্সে বাঁধিয়া আঁটি,
কীট কুটমতি কাটিয়া কাটিয়া
করিয়াছে তারে মাটি ;
কাজেই তর্ক না মিটিল হায়
বিরোধ বাধিল ভারি,
হইল য্দ্দু হদ্দ মতন
চৌদ্দ বছর ধরি।
মরিল সৈন্য, ভাঙিল অস্ত্র,
রক্ত চলিল বহি,
তিন হাত জমি তেমনি রহিল,
কারও হার জিত নাহি
তবে খোঁড়া রাজা কহে, হায় হায়,
তর্ক নাহিক মিটে,
ঘোরতর রণে অতি অকারণে
মরণ সবার ঘটে”
বলিতে বলিতে চঁটাৎ করিয়া
হঠাৎ মাথায় তার
অদ্ভুত এক বুদ্ধি আসিল
অতীব চমৎকার।
কহিল তখন খোঁড়া মহারাজ,
শুন মোর কানা ভাই,
তুচ্ছ কারণে রক্ত ঢালিয়া
কখনও সুযশ নাই।
তার চেয়ে জমি দান করে ফেল
আপদ শান্তি হবে।”
কানা রাজা কহে, খাসা কথা ভাই,
কারে দিই কহ তবে।”
কহেন খঞ্জ, ” আমার রাজ্যে
আছে তিন মহাবীর-
একটি পেটুক, অপর অলস,
তৃতীয় কুস্তিগীর।
তোমার মুলুক কে আছে এমন
এদের হারাতে পারে?-
সবার সমুখে তিন হাত জমি
বকশিস দিব তারে।
কানা রাজা কহে ভীমের দোসর
আছে ত মল্ল মম,
ফালাহারে পটু, পঁচাশি পেটুক
অলস কুমড়া সম।
দেখা যাবে কার বাহাদুরি বেশি
আসুক তোমার লোক;
যে জিতিবে সেই পাবে এই জমি-
খোড়া বলে, তাই হোক।
পড়িল নোটিস ময়দান মাঝে
আলিশান সভা হবে,
তামাসা দেখিতে চারিদিক হতে
ছুটিয়া আসিল সবে।
ভয়ানক ভিড়ে ভরে পথঘাট,
লোকে হল লোকাকার,
মহা কোলাহল দাড়াবার ঠাই
কোনোখানে নাহি আর।
তারপর ক্রমে রাজার হুকুমে
গোলমাল গেল থেমে,
দুইদিক হতে দুই পালোয়ান
আসরে আসিল নেমে।
লম্ফে ঝম্ফে যুঝিল মল্ল
গজ-কচ্ছপ হেন,
রুষিয়া মুষ্টি হানিল দোহায়-
বজ্র পড়িল যেন!
গুঁতাইল কত ভোঁতাইল নাসা
উপাড়িল গোফ দাড়ি,
যতেক দন্ত করিল অন্ত
ভীষণ চাপটি মারি
তারপরে দোঁহে দোঁহারে ধরিয়া
ছুঁড়িল এমনি জোরে,
গোলার মতন গেল গো উড়িয়া
দুই বীর বেগভরে।
কিহল তাদের কেহ নাহি জানে
নানা কথা কয় লোকে,
আজও কেহ তার পায়নি খবর,
কেহই দেখেনি চোখে।
যাহোক এদিকে, কুস্তির শেষে
এল পেটুকের পালা,
যেন অতিকায় ফুটবল দুটি,
অথবা ঢাকাই জালা।
ওজনেতে তারা কেহ নহে কম,
ভোজনেতে ততোধিক,
বপু সুবিপুল, ভুড়ি বিভীষন-
ভারি সাতমন ঠিক।
অবাক দেখিছে সভার সকলে
আজব কান্ড ভারি-
ধামা ধামা লুচি নিমেষে ফুরায়
দই ওঠে হাঁড়ি হাঁড়ি!
দাড়ি পাল্লায় মাপিয়া সকলে
দেখে আহারের পরে ,
দুজনেই ঠিক বেড়েছে ওজনে
সাড়ে তিন মন করে।
কানা রাজা বলে একি হল জ্বালা,
আক্কেল নাই কারো ,
কেহ কি বোঝেনা সোজা কথা এই,
হয় জেতো নয় হারো।”
তার পর এল কুঁড়ে দুই জন
ঝাকার উপর চড়ে,
সভামাঝে দোহে শুয়ে চিৎপাত
চুপ চাপ রহে পড়ে।
হাত নাহি নাড়ে, চোখ নাহি মেলে,
কথা নাই কারো মুখে,
দিন দুই তিন রহিল পড়িয়া,
নাসা গীত গাহি সুখে।
জঠরে যখন জ্বলিল আগুন,
পরান কণ্ঠাগত,
তখন কেবল মেলিয়া আনন
থাকিল মড়ার মত।
দয়া করে তবে সহৃদয় কেহ
নিকটে আসিয়া ছুটি
মুখের নিকটে ধরিল তাদের
চাটিম কদলি দুটি।
খঞ্জের লোকে কহিল কষ্টে,
“ছাড়িয়া দে নারে ভাই”
কানার ভৃত্য রহিল হা করে
মুখে তার কথা নাই ।
তখন সকলে কাষ্ঠ আনিয়া
তায় কেরোসিন ঢালি,
কুড়েদের গায়ে চাপাইয়া রোষে
দেশলাই দিল জ্বালি।
খোঁড়ার প্রজাটি বাপরে বলিয়া
লাফ দিয়া তাড়াতাড়ি
কম্পিত পদে চম্পট দিল
একেবারে সভা ছাড়ি।
দুয়ো বলি সবে দেয় করতালি
পিছু পিছু ডাকে “ফেউ”?
কানার অলস বলে কি আপদ
ঘুমুতে দিবিনা কেঊ?
শুনে সবে বলে “ধন্য ধন্য
কুঁড়ে-কুল চুড়ামণি!”
ছুটিয়া তাহারে বাহির করিল
আগুন হইতে টানি।
কানার লোকের গুণপনা দেখে
কানা রাজা খুসী ভারি,
জমিতে দিলেই আরও দিল কত,
টাকাকড়ি ঘরবাড়ি।

 

কিছু চাই? – সুকুমার রায়

কারোর কিছু চাই গো চাই?
এই যে খোকা, কি নেবে ভাই ?
জলছবি আর লাট্টু লাটাই
কেক বিস্কুট লাল দেশলাই
খেলনা বাঁশি কিংবা ঘুড়ি
লেড্‌ পেনসিল রবার ছুরি ?
এসব আমার কিছুই নাই,
কারোর কিছু চাই গো চাই ?
কারোর কিছু চাই গো চাই ?
বৌমা কি চাও শুনতে পাই ?
ছিটের কাপড় চিকন লেস্‌
ফ্যান্সি জিনিস ছুঁচের কেস্‌
আল্‌তা সিঁদুর কুন্তলীন
কাঁচের চুড়ি বোতাম পিন্‌ ?
আমার কাছে ওসব নাই,
কারোর কিছু চাই গো চাই ?

কারোর কিছু চাই গো চাই ?
আপনি কি চান কর্তামশাই ?
পকেট বই কি খেলার তাস
চুলের কলপ জুতোর ব্রাশ্‌
কলম কালি গঁদের তুলি
নস্যি চুরুট সুর্তি গুলি ?
ওসব আমার কিছুই নাই,
কারোর কিছু চাই গো চাই ?

 

কিম্ভূত! – সুকুমার রায়

বিদ্‌ঘুটে জানোয়ার কিমাকার কিম্ভূত,
সারাদিন ধ’রে তার শুনি শুধু খুঁতখুঁত ৷
মাঠপারে ঘাটপারে কেঁদে মরে খালি সে,
ঘ্যান্‌ ঘ্যান্ আব্‌দারে ঘন ঘন নালিশে ৷
এটা চাই সেটা চাই কত তার বায়না—
কি যে চায় তাও ছাই বোঝা কিছু যায় না ৷
কোকিলের মত তার কন্ঠেতে সুর চাই,
গলা শুনে আপনার, বলে, ‘উঁহুঁ, দূর ছাই !’
আকাশেতে উড়ে যেতে পাখিদের মানা নেই ৷
তাই দেখে মরে কেঁদে–তার কেন ডানা নেই ৷
হাতিটার কি বাহার দাঁতে আর শুণ্ডে—
ও–রকম জুড়ে তার দিতে হবে মুণ্ডে !
ক্যাঙ্গারুর লাফ দেখে হয় তার হিংসে—
ঠ্যাং চাই আজ থেকে ঢ্যাংঢেঙে চিম্‌সে !
সিংহের কেশরের মত তার তেজ কই ?
পিছে খাসা গোসাপের খাঁজকাটা লেজ কই ?
একলা সে সব হ’লে মেটে তার প্যাখ্‌না ;
যারে পায় তারে বলে, ‘মোর দশা দেখ্‌না !’

কেঁদে কেঁদে শেষটায়—আষাঢ়ের বাইশে
হ’ল বিনা চেষ্টায় চেয়েছে যা তাই সে ৷
ভুলে গিয়ে কাঁদাকাটি আহলাদে আবেশে
চুপি চুপি একলাটি ব’সে ব’সে ভাবে সে—
লাফ দিয়ে হুশ্‌ করে হাতি কভু নাচে কি ?
কলাগাছ খেলে পরে ক্যঙ্গারুটা বাঁচে কি ?
ভোঁতামুখে কুহুডাক শুনে লোকে কবে কি ?
এই দেহে শুঁড়ো নাক খাপছাড়া হবে কি ?
বুড়ো হাতি ওড়ে ব’লে কেউ যদি গালি দেয় ?
কান টেনে ল্যাজ্‌ ম’লে ‘দুয়ো’ বলে তালি দেয় ?
কেউ যদি তেড়ে মেড়ে বলে তার সামনেই—
‘কোথাকার তুই কেরে, নাম নেই ধাম নেই ?’
জবাব কি দেবে ছাই, আছে কিছু বল্‌বার ?
কাঁচুমাচু ব’সে তাই, মনে শুধু তোল্‌পাড়—
‘নই ঘোড়া, নই হাতি, নই সাপ বিচ্ছু,
মৌমাছি প্রজাপতি নই আমি কিচ্ছু ৷
মাছ ব্যাং গাছপাতা জলমাটি ঢেউ নই,
নই জুতা, নই ছাতা, আমি তবে কেউ নই !’

 

কেন সব কুকুরগুলো – সুকুমার রায়

কেন সব কুকুরগুলো খামখা চ্যাঁচায় রাতে ?
কেন বল দাঁতের পোকা থাকেনা ফোক্‌লা দাঁতে ?
পৃথিবীর চ্যাপ্টা মাথা, কেন সে কাদের দোষে?-
এস ভাই চিন্তা করি দুজনে ছায়ায় বসে ।

 

 

খোকা ঘুমায় – সুকুমার রায়

কোন্‌খানে কোন্‌ সুদূর দেশে, কোন্‌ মায়ের বুকে,
কাদের খোকা মিষ্টি এমন ঘুমায় মনের সুখে?
অজানা কোন্‌ দেশে সেথা কোন্‌খানে তার ঘর?
কোন্‌ সমুদ্র, কত নদী, কত দেশের পর?
কেমন সুরে, কি ব’লে মা ঘুমপাড়ানি গানে
খোকার চোখে নিত্যি সেথা ঘুমটি ডেকে আনে?
ঘুমপাড়ানি মাসীপিসী তাদেরও কি থাকে?
“ঘুমটি দিয়ে যাওগো” ব’লে মা কি তাদের ডাকে?
শেয়াল আসে বেগুন খেতে, বর্গি আসে দেশে?
ঘুমের সাথে মিষ্টি মধুর মায়ের সুরটি মেশে?
খোকা জানে মায়ের মুখটি সবার চেয়ে ভালো,
সবার মিষ্টি মায়ের হাসি, মায়ের চোখের আলো।
স্বপন মাঝে ছায়ার মত মায়ের মুখটি ভাসে,
তাইতে খোকা ঘুমের ঘোরে আপন মনে হাসে।

 

 

খোকার ভাবনা – সুকুমার রায়

মোমের পুতুল লোমের পুতুল আগ্‌লে ধ’রে হাতে
তবুও কেন হাব্‌লা ছেলের মন ওঠে না তাতে?
একলা জেগে একমনেতে চুপ্‌টি ক’রে ব’সে,
আন্‌মনা সে কিসের তরে আঙুলখানি চোষে?
নাইকো হাসি নাইকো খেলা নাইকো মুখে কথা,
আজ সকালে হাব্‌লাবাবুর মন গিয়েছে কোথা?
ভাব্‌ছে বুঝি দুধের বোতল আস্‌ছে নাকো কেন?
কিংবা ভাবে মায়ের কিসে হচ্ছে দেরী হেন।
ভাব্‌ছে এবার দুধ খাবে না কেবল খাবে মুড়ি,
দাদার সাথে কোমন বেঁধে করবে হুড়োহুড়ি,
ফেল্‌বে ছুঁড়ে চামচটাকে পাশের বাড়ির চালে,
না হয় তেড়ে কামড়ে দেবে দুষ্টু ছেলের গালে।
কিংবা ভাবে একটা কিছু ঠুক্‌তে যদি পেতো—
পুতুলটাকে করত ঠুকে এক্কেবারে থেঁতো।

 

গন্ধ বিচার – সুকুমার রায়

সিংহাসনে বস্‌ল রাজা বাজল কাঁসর ঘন্টা,
ছট্‌ফটিয়ে উঠল কেঁপে মন্ত্রীবুড়োর মনটা ৷
বল্‌লে রাজা, মন্ত্রী তোমার জামায় কেন গন্ধ ?
মন্ত্রী বলে, এসেন্স দিছি—গন্ধ তো নয় মন্দ !
রাজা বলেন, মন্দ ভালো দেখুক শুঁকে বদ্যি,
বদ্যি বলে, আমার নাকে বেজায় হল সর্দি ৷
রাজা হাঁকেন, বোলাও তবে রাম নারায়ণ পাত্র,
পাত্র বলে, নস্যি নিলাম এক্ষুনি এইমাত্র ৷
নস্যি দিয়ে বন্ধ যে নাক গন্ধ কোথায় ঢুকবে ?
রাজা বলেন, কোটাল তবে এগিয়ে এস, শুঁকবে ৷
কোটাল বলে, পান খেয়েছি মশলা তাতে কর্পূর,
গন্ধে তারি মুণ্ড আমার এক্কেবারে ভরপুর ৷
রাজা বলেন, আসুক তবে শের পালোয়ান ভীমসিং,
ভীম বলে, আজ কচ্ছে আমার সমস্ত গা ঝিম্ ঝিম্ ৷
রাত্রে আমার বোখার হল বলছি হুজুর ঠিক বাৎ,
ব’লেই শুল রাজসভাতে চক্ষু বুজে চিৎপাত ৷

রাজার শালা চন্দ্রকেতু তারেই ধ’রে শেষটা,
বল্‌ল রাজা, তুমিই না হয় কর না ভাই চেষ্টা ৷
চন্দ্র বলেন, মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ,
গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কি আহলাদ ?
ছিল হাজির বৃদ্ধ নাজির বয়সটি তার নব্বই,
ভাবল মনে, ভয় কেন আর একদিন তো মরবই ৷
সাহস ক’রে বল্‌লে বুড়ো, মিথ্যে সবাই বক্‌ছিস,
শুঁকতে পারি হুকুম পেলে এবং পেলে বক্‌শিস ৷
রাজা বলেন, হাজার টাকা ইনাম পাবে সদ্য,
তাই না শুনে উৎসাহেতে উঠল বুড়ো মদ্দ ৷
জামার পরে নাক ঠেকিয়ে—শুঁকল কত গন্ধ,
রইল অটল দেখল লোকে বিস্ময়ে বাক্ বন্ধ ৷
রাজ্যে হল জয়–জয়কার বাজল কাঁসর ঢক্কা,
বাপরে কি তেজ বুড়োর হাড়ে পায় না সে যে অক্কা ?

 

গ্রীষ্ম (ঐ এল বৈশাখ) – সুকুমার রায়

ঐ এল বৈশাখ, ঐ নামে গ্রীষ্ম,
খাইখাই রবে যেন ভয়ে কাঁপে বিশ্ব !
চোখে যেন দেখি তার ধুলিময় অঙ্গ,
বিকট কুটিলজটে ভ্রুকুটির ভঙ্গ,
রোদে রাঙা দুই আঁখি শুকায়েছে কোটরে,
ক্ষুধার আগুন যেন জ্বলে তার জঠরে !
মনে হয় বুঝি তার নিঃশ্বাস মাত্রে
তেড়ে আসে পালাজ্বর পৃথিবীর গাত্রে !
ভয় লাগে হয় বুঝি ত্রিভুবন ভস্ম-
ওরে ভাই ভয় নাই পাকে ফল শস্য !
তপ্ত ভীষণ চুলা জ্বালি নিজ বক্ষে
পৃথিবী বসেছে পাকে, চেয়ে দেখ চক্ষে,-
আম পাকে, জাম পাকে, ফল পাকে কত যে,
বুদ্ধি যে পাকে কত ছেলেদের মগজে !

 

গ্রীষ্ম (সর্বনেশে গ্রীষ্ম) – সুকুমার রায়

সর্বনেশে গ্রীষ্ম এসে বর্ষশেষে রুদ্রবেশে
আপন ঝোঁকে বিষম রোখে আগুন ফোঁকে ধরার চোখে।
তাপিয়ে গগন কাঁপিয়ে ভুবন মাত্‌ল তপন নাচল পবন।
রৌদ্র ঝলে আকাশতলে অগ্নি জ্বলে জলে স্থলে।
ফেল্‌ছে আকাশ তপ্ত নিশাস ছুটছে বাতাস ঝলসিয়ে ঘাস,
ফুলের বিতান শুকনো শ্মশান যায় বুঝি প্রাণ হায় ভগবান।
দারুণ তৃষায় ফিরছে সবায় জল নাহি পায় হায় কি উপায়,
তাপের চোটে কথা না ফোটে হাঁপিয়ে ওঠে ঘর্ম ছোটে।
বৈশাখী ঝড় বাধায় রগড় করে ধড়্‌ফড়্ ধরার পাঁজর,
দশ দিক হয় ঘোর ধুলিময় জাগে মহাভয় হেরি সে প্রলয়।
করি তোলপাড় বাগান বাদাড় ওঠে বারবার ঘন হুংকার,
শুনি নিয়তই থাকি থাকি ওই হাঁকে হৈ হৈ মাভৈ মাভৈঃ।

 

চলে হন্ হন্ – সুকুমার রায়

চলে হন্ হন্ ছোটে পন্ পন্
ঘোরে বন্ বন্ কাজে ঠন্ ঠন্
বায়ু শন্ শন্ শীতে কন্ কন্
কাশি খন্ খন্ ফোঁড়া টন্ টন্
মাছি ভন্ ভন্ থালা ঝন্ ঝন্

 

 

ছবি ও গল্প – সুকুমার রায়

ছবির টানে গল্প লিখি নেইক এতে ফাঁকি
যেমন ধারা কথায় শুনি হুবহু তাই আঁকি ।

পরীক্ষাতে গোল্লা পেয়ে
হাবু ফেরেন বাড়ি

চক্ষু দুটি ছানাবড়া
মুখখানি তার হাঁড়ি

রাগে আগুন হলেন বাবা
সকল কথা শুনে

আচ্ছা ক’রে পিটিয়ে তারে
দিলেন তুলো ধুনে

মারের চোটে চেঁচিয়ে বাড়ি
মাথায় ক’রে তোলে

শুনে মায়ের বুক ফেটে যায়
‘হায় কি হল’ ব’লে

পিসী ভাসেন চোখের জলে
কুট্‌নো কোটা ফেলে

আহ্লাদেতে পাশের বাড়ি
আটখানা হয় ছেলে ।

 

ছুটি (ঘুচবে জ্বালা) – সুকুমার রায়

ঘুচবে জ্বালা পুঁথির পালা ভাবছি সারাক্ষণ-
পোড়া স্কুলের পড়ার পরে আর কি বসে মন ?
দশটা থেকেই নষ্ট খেলা, ঘণ্টা হতেই শুরু
প্রাণটা করে ‘পালাই পালাই’ মনটা উড়ু উড়ু—
পড়ার কথা খাতায়, পাতায়, মাথায় নাহি ঢোকে!
মন চলে না- মুখ চলে যায় আবোলতাবোল ব’কে!
কানটা ঘোরে কোন্‌ মুলুকে হুঁশ থাকে না তার,
এ কান দিয়ে ঢুকলে কথা, ও কান দিয়ে পার।
চোখ থাকে না আর কিছুতেই, কেবল দেখে ঘড়ি;
বোর্ডে আঁকা অঙ্ক ঠেকে আঁচড়কাটা খড়ি।
কল্পনাটা স্বপ্নে চ’ড়ে ছুটছে মাঠে ঘাটে—
আর কি রে মন বাঁধন মানে? ফিরতে কি চায় পাঠে?
পড়ার চাপে ছট্‌ফটিয়ে আর কিরে দিন চলে ?
ঝুপ্‌ ক’রে মন ঝাঁপ দিয়ে পড়্‌ ছুটির বন্যাজলে ।

 

ছুটি (ছুটি ছুটি ছুটি) – সুকুমার রায়

ছুটি! ছুটি! ছুটি!
মনের খুশি রয়না মনে হেসেই লুটোপুটি।
ঘুচল এবার পড়ার তাড়া অঙ্ক কাটাকুটি
দেখ্‌ব না আর পন্ডিতের ঐ রক্ত আঁখি দুটি।
আর যাব না স্কুলের পানে নিত্য গুটি গুটি
এখন থেকে কেবল খেলা কেবল ছুটোছুটি।
পাড়ার লোকের ঘুম ছুটিয়ে আয়রে সবাই জুটি
গ্রীষ্মকালের দুপুর রোদে গাছের ডালে উঠি
আয়রে সবাই হল্লা ক’রে হরেক মজা লুটি
একদিন নয় দুই দিন নয় দুই দুই মাস ছুটি।

 

হনহন পনপন – সুকুমার রায়

চলে হনহন
ছোটে পনপন

ঘোরে বনবন
কাজে ঠনঠন

বায়ু শনশন
শীতে কনকন

কাশি খনখন
ফোঁড়া টনটন

মাছি ভনভন
থালা ঝন ঝন।

 

জালা-কুঁজো সংবাদ – সুকুমার রায়

পেটমোটা জালা কয়, “হেসে আমি মরিরে
কুঁজো তোর হেন গলা এতটুকু শরীরে!”
কুঁজো কয়, “কথা কস্ আপনাকে না চিনে,
ভুঁড়িখানা দেখে তোর কেঁদে আর বাঁচিনে।”
জালা কয়, “সাগরের মাপে গড়া বপুখান,
ডুবুরিরা কত তোলে তবু জল অফুরান।”
কুঁজো কয়, “ভালো কথা ! তবে যদি দৈবে,
ভুঁড়ি যায় ভেস্তিয়ে, জল কোথা রইবে?”
“নিজ কথা ভুলে যাস?” জালা কয় গর্জে,
“ঘাড়ে ধরে হেঁট ক’রে জল নেয় তোর যে।”
কুঁজো কয়, “নিজ পায়ে তবু খাড়া রই তো-
বিঁড়ে বিনা কুপোকাৎ, তেজ তোর ঐতো।”

 

 

জীবনের হিসাব – সুকুমার রায়

বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাই চড়ি শখের বোটে
মাঝিরে কন, “বলতে পারিস সূর্য কেন ওঠে?
চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?”
বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফেলফেলিয়ে হাসে,
বাবু বলেন, “সারা জীবন মরলিরে তুই খাটি,
জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি!”

খানিক বাদে কহেন বাবু, “বলত দেখি ভেবে
নদীর ধারা কেমনে আসে পাহাড় হতে নেবে?
বলত কেন লবন পোরা সাগর ভরা পানি?”
মাঝি সে কয়, “আরে মশাই অত কি আর জানি?”
বাবু বলেন, “এই বয়সে জানিসনেও তা কি?
জীবনটা তোর নেহাত খেলো, অষ্ট আনাই ফাঁকি!”

আবার ভেবে কহেন বাবু, “বলত ওরে বুড়ো,
কেন এমন নীল দেখা যায় আকাশের ঐ চূড়ো?
বলত দেখি সূর্য চাঁদে গ্রহন লাগে কেন?”
বৃদ্ধ বলেন, “আমায় কেন লজ্জা দিছেন হেন?”
বাবু বলেন, “বলব কি আর বলব তোরে কি, তা,-
দেখছি এখন জীবনটা তোর বারো আনাই বৃথা।”

খানিক বাদে ঝড় উঠেছে ঢেউ উঠেছে ফুলে,
বাবু দেখেন নৌকাখানি ডুবল বুঝি দুলে।
মাঝিরে কন, “একি আপদ ওরে ও ভাই মাঝি,
ডুবল নাকি নৌকো এবার? মরব নাকি আজি?”
মাঝি শুধায়, “সাতার জানো?” মাথা নারেন বাবু,
মূর্খ মাঝি বলে, “মশাই এখন কেন কাবু?
বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসেব করো পিছে,
তোমার দেখি জীবন খানা ষোল আনাই মিছে।”

 

 

টিক্‌ টিক্‌ টং – সুকুমার রায়

টিক্‌ টিক্‌ চলে ঘড়ি, টিক্‌ টিক্‌ টিক্‌,
একটা ইঁদুর এল সে সময়ে ঠিক।
ঘড়ি দেখে একলাফে তাহাতে চড়িল,
টং করে অমনি ঘড়ি বাজিয়া উঠিল।
অমনি ইঁদুরভায়া ল্যাজ গুটাইয়া,
ঘড়ির উপর থেকে পড়ে লাফাইয়া।
ছুটিয়া পালায়ে গেল আর না আসিল,
টিক্‌ টিক্‌ টিক্‌ ঘড়ি চলিতে লাগিল।।

 

টুকরো ছড়া – সুকুমার রায়

তিন বুড়ো পন্ডিত টাকচুড়ো নগরে
চ’ড়ে এক গামলায় পাড়ি দেয় সাগরে।
গাম‌্‌লাতে ছেঁদা আগে কেউ দেখনি,
গানখানি তাই মোর থেমে গেল এখনি।।

ম্যাও ম্যাও হুলোদাদা, তোমার যে দেখা নাই?
গেছিলাম রাজপুরী রানীমার সাথে ভাই!
“তাই নাকি? বেশ বেশ, কি দেখেছ সেখানে?”
দেখেছি ইদুর এক রানীমার উঠানে।।”

গাধাটার বুদ্ধি দেখ!- চাঁট মেরে সে নিজের গালে,
কে মেরেছে দেখবে বলে চড়তে গেছে ঘরের চালে।

ছোট ছোট ছেলেগুলো কিসে হয় তৈরি,
-কিসে হয় তৈরি,
কাদা আর কয়লা ধুলো মাটি ময়লা,
এই দিয়ে ছেলেগুলো তৈরি।
ছোট ছোট মেয়ে গুলি কিসে হয় তৈরি।
কিসে হয় তৈরি?
ক্ষীর ননী চিনি আর ভাল যাহা দুনিয়ার
মেয়েগুলি তাই দিয়ে তৈরি।।

রং হল চিঁড়েতন সব গেল ঘুলিয়ে,
গাধা যায় মামাবাড়ি টাকে হাত বুলিয়ে।
বেড়াল মরে বিষম খেয়ে, চাঁদের ধরল মাথা
হঠাৎ দেখি ঘর বাড়ি সব ময়দা দিয়ে গাঁথা।।

 

 

ট্যাঁশ গরু – সুকুমার রায়

ট্যাঁশ গরু গরু নয়, আসলেতে পাখি সে ;
যার খুশি দেখে এস হারুদের আফিসে ।
চোখ দুটি ঢুলু ঢুলু, মুখখানা মস্ত,
ফিট্‌ফাট্‌ কালোচুলে টেরিখানা চোস্ত ।
তিন-বাঁকা শিং তার, ল্যাজখানি প্যাঁচান-
একটুকু ছোও যদি, বাপ্‌রে কি চ্যাঁচান !
লট্‌খটে হাড়গোড় খট্‌খট্‌ ন’ড়ে যায়,
ধম্‌কালে ল্যাগ্‌ব্যাগ্‌ চমকিয়ে প’ড়ে যায় ।
বর্ণিতে রূপ গুণ সাধ্য কি কবিতার,
চেহারার কি বাহার- ঐ দেখ ছবি তার ।
ট্যাঁশ গরু খাবি খায় ঠ্যাস্‌ দিয়ে দেয়ালে,
মাঝে মাঝে কেঁদে ফেলে না জানি কি খেয়ালে ;
মাঝে মাঝে তেড়ে ওঠে, মাঝে মাঝে রেগে যায়,
মাঝে মাঝে কুপোকাৎ দাঁতে দাঁত লেগে যায় ।
খায় না সে দানাপানি- ঘাস পাতা বিচালি
খায় না সে ছোলা ছাতু ময়দা কি পিঠালি ;
রুচি নাই আমিষেতে, রুচি নাই পায়সে
সাবানের সুপ আর মোমবাতি খায় সে ।
আর কিছু খেলে তার কাশি ওঠে খক্‌খক্‌,
সারা গায়ে ঘিন্‌ ঘিন্‌, ঠ্যাং কাঁপে ঠক্‌ঠক্‌ ।
একদিন খেয়েছিল ন্যাক্‌ড়ার ফালি সে-
তিন মাস আধমরা শুয়েছিল বালিশে ।
কারো যদি শখ্‌ থাকে ট্যাঁশ গরু কিন্‌তে,
সস্তায় দিতে পারি, দেখ ভেবে চিন্তে ।

 

 

ডানপিটে – সুকুমার রায়

বাপ্‌রে কি ডানপিটে ছেলে!-
কোন দিন ফাঁসি যাবে নয় যাবে জেলে।
একটা সে ভুত সেজে আঠা মেখে মুখে,
ঠাঁই ঠাই শিশি ভাঙে শ্লেট দিয়ে ঠুকে।
অন্যটা হামা দিয়ে আলমারি চড়ে,
খাট থেকে রাগ ক’রে দুম্‌দাম্ পড়ে।

বাপরে কি ডানপিটে ছেলে!-
শিলনোড়া খেতে চায় দুধভাত ফেলে!
একটার দাঁত নেই, জিভ দিয়ে ঘষে,
একমনে মোমবাতি দেশলাই চোষে!
আরজন ঘরময় নীল কালি গুলে,
কপ্ কপ্ মাছি ধরে মুখে দেয় তুলে!

বাপরে কি ডানপিটে ছেলে!-
খুন হ’ত টম্ চাচা ওই রুটি খেলে!
সন্দেহে শুঁকে বুড়ো মুখে নাহি তোলে,
রেগে তাই দুই ভাই ফোঁস্ ফোঁস্ ফোলে!
নেড়াচুল খাড়া হয়ে রাঙা হয় রাগে,
বাপ্ বাপ্ ব’লে চাচা লাফ দিয়ে ভাগে।

 

ঢপ ঢপ ঢাক ঢোল – সুকুমার রায়

ঢপ্ ঢপ্ ঢাক ঢোল ভপ্ ভপ্ বাঁশি
ঝন্ ঝন্ করতাল্ ঠন্ ঠন্ কাঁসি।
ধুমধাম বাপ্ বাপ্ ভয়ে ভ্যাবাচ্যাকা
বাবুদের ছেলেটার দাঁত গেছে দেখা।।

 

তেজিয়ান – সুকুমার রায়

চলে খচ্‌খচ্‌ রাগে গজ্‌গজ্‌ জুতা মচ্‌মচ্‌ তানে,
ভুরু কট্‌মট্‌ ছড়ি ফট্‌ফট্‌ লাথি চট্‌পট্‌ হানে ।
দেখে বাঘ-রাগ লোকে ‘ভাগ্‌ ভাগ্‌’ করে আগভাগ থেকে,
বয়ে লাফ ঝাঁপ বলে ‘বাপ্‌ বাপ্‌’ সরে হাবভাব দেখে ।
লাথি চার চার খেয়ে মার্জার ছোটে যার যার ঘরে,
মহা উৎপাত ক’রে হুটপাট্‌ চলে ফুটপাথ্‌ পরে ।
ঝাড়ুবর্দার হারুসর্দার ফেরে ঘরদ্বার ঝেড়ে,
তারি বালতিএ- দেখে ফাল্‌ দিয়ে আসে পালটিয়ে তেড়ে
রেগে লালমুখে হেঁকে গাল রুখে মারে তাল ঠুকে দাপে
মারে ঠন্‌ ঠন্‌ হাড়ে টন্‌ টন্‌ মাথা ঝন ঝন কাঁপে
পায়ে কাল্‌সিটে কেন বালতিতে মেরে চাল্‌ দিতে গেলে ?
বুঝি ঠাং যায় খোঁড়া ল্যাংচায় দেখে ভ্যাংচায় ছেলে ।

 

দিনের হিসাব – সুকুমার রায়

ভোর না হতে পাখিরা জোটে গানের চোটে ঘুমটি ছোটে-
চোখ্‌টি খোলো, গাত্র তোলো আরে মোলো সকাল হলো।
হায় কি দশা পড়্‌তে বসা অঙ্ক কষা, কলম ঘষা।
দশটা হলে হট্টগোলে দৌড়ে চলে বই বগলে!
স্কুলের পড়া বিষম তাড়া, কানটি নাড়া বেঞ্চে দাঁড়া
মরে কি বাঁচে! সমুখে পাছে বেত্র নাচে নাকের কাচে।।
খেলতে যে চায় খেল্‌বে কি ছাই বৈকেলে হায় সময় কি পায়?
খেলাটি ক্রমে যেম্‌নি জমে দখিনে বামে সন্ধ্যা নামে;
ভাঙ্‌ল মেলা সাধের খেলা- আবার ঠেলা সন্ধ্যাবেলা-
মুখ্‌টি হাঁড়ি তাড়াতাড়ি দিচ্ছে পাড়ি যে যার বাড়ি।
ঘুমের ঝোঁকে ঝাপ্‌সা চোখে ক্ষীণ আলোকে অঙ্ক টোকে ;
ছুটি পাবার সুযোগ আবার আয় রবিবার হপ্তা কাবার!

 

দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায় – সুকুমার রায়

দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায়
নাচলে লোকের স্বস্তি কোথায়?
এম্নি দশাই তার কপালে লেখে।
কথার পাকে মানুষ মেরে
মাকড়জীবী ঐ যে ফেরে,
গড় করি তার অনেক তফাৎ থেকে।

 

নদী – সুকুমার রায়

হে পর্বত, যত নদী করি নিরীক্ষণ
তোমাতেই করে তারা জনম গ্রহণ।
ছোট বড় ঢেউ সব তাদের উপরে
কল্ কল্ শব্দ করি সদা ক্রীড়া করে,
সেই নদী বেকে চুরে যায় দেশে দেশে,
সাগরেতে পড়ে গিয়া সকলের শেষে।
পথে যেতে যেতে নদী দেখে কত শোভা,
কি সুন্দর সেই সব কিবা মনোলোভা।
কোথাও কোকিলে দেখে বসি সাথী সনে,
কি সুন্দর কুহু গান গায় নিজ মনে।
কোথাও ময়ূর দেখে পাখা প্রসারিয়া
বনধারে দলে দলে আছে দাড়াইয়া!
নদীতীরে কত লোক শ্রান্তি নাশ করে,
কত শত পক্ষী আসি তথা বিচারে।
দেখিতে দেখিতে নদী মহাবেগে ধায়
কভুও সে পশ্চাতেতে ফিরে নাহি চায়।

 

 

নন্দগুপি – সুকুমার রায়

হঠাৎ কেন দুপুর রোদে চাদর দিয়ে মুড়ি,
চোরের মতন নন্দগোপাল চল্‌ছে গুড়ি গুড়ি ?
লুকিয়ে বুঝি মুখোশখানা রাখছে চুপি চুপি ?
আজকে রাতে অন্ধকারে টেরটা পাবেন গুপি !
আয়না হাতে দাঁড়িয়ে গুপি হাসছে কেন খালি ?
বিকট রকম পোশাক করে মাখ্‌ছে মুখে কালি !
এমনি করে লম্ফ দিয়ে ভেংচি যখন দেবে
নন্দ কেমন আঁৎকে যাবে- হাসছে সে তাই ভেবে ।

আঁধার রাতে পাতার ফাঁকে ভূতের মতন কেরে ?
ফন্দি এঁটে নন্দগোপাল মুখোশ মুখে ফেরে !
কোথায় গুপি, আসুক না সে ইদিক্‌ পানে ঘুরে-
নন্দদাদার হুঙ্কারে তার প্রাণটি যাবে উড়ে ।

হেথায় কেরে মূর্তি ভীষণ মুখটি ভরা গোঁফে ?
চিমটে হাতে জংলা গুপি বেড়ায় ঝাড়ে ঝোপে !
নন্দ যখন বাড়ির পথে আসবে গাছের আড়ে,
“মার্‌ মার্‌ মার্‌ কাট্‌রে” বলে পড়বে তাহার ঘাড়ে ।

নন্দ চলেন এক পা দু পা আস্তে ধীরে গতি,
টিপটিপিয়ে চলেন গুপি সাবধানেতে অতি-
মোড়ের মুখে ঝোপের কাছে মার্‌তে গিয়ে উঁকি
দুই সেয়ানে এক্কেবারে হঠাৎ মুখোমুখি !
নন্দ তখন ফন্দি ফাঁদন কোথায় গেল ভুলি
কোথায় গেল গুপির মুখে মার্‌ মার্‌ মার্‌ বুলি ।
নন্দ পড়েন দাঁতকপাটি মুখোশ টুখোশ ছেড়ে
গুপির গায়ে জ্বরটি এল কম্প দিয়ে তেড়ে ।

গ্রামের লোকে দৌড়ে তখন বদ্যি আনে ডেকে,
কেউ বা নাচে কেউ বা কাঁদে রকম সকম দেখে ।
নন্দগুপির মন্দ কপাল এম্‌নি হল শেষে,
দেখ্‌লে তাদের লুটোপুটি সবাই মরে হেসে !

 

 

নাচন – সুকুমার রায়

নাচ্ছি মোরা মনের সাধে গাচ্ছি তেড়ে গান
হুলো মেনী যে যার গলার কালোয়াতীর তান।
নাচ্ছি দেখে চাঁদা মামা হাস্‌ছে ভরে গাল
চোখটি ঠেরে ঠাট্টা করে দেখ্‌না বুড়োর চাল।

 

 

নারদ! নারদ! – সুকুমার রায়

“হ্যাঁরে হ্যাঁরে তুই নাকি কাল সাদাকে বলেছিলি লাল ?
(আর) সেদিন নাকি রাত্রি জুড়ে নাক ডেকেছিস বিশ্রী সুরে ?
(আর) তোদের পোষা বেড়ালগুলো শুন্‌‌ছি নাকি বেজায় হুলো ?
(আর) এই যে শুনি তোদের বাড়ি কেউ নাকি রাখেনা দাড়ি ?
ক্যান্‌ রে ব্যাটা ইসটুপিড ? ঠেঙিয়ে তোরে করব ঢিট্‌ !”
“চোপরাও তুম্‌ স্পিকটি নট্‌ মারব রেগে পটাপট্‌-
ফের যদি ট্যারাবি চোখ, কিম্বা আবার করবি রোখ,
কিম্বা যদি অমনি ক’রে মিথ্যেমিথ্যি চ্যাঁচাস্‌ জোরে-
আই ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি- জানিস আমি স্যান্ডো করি ?”
“ফের লাফাচ্ছিস্‌ ! অলরাইট্‌ কামেন্‌ ফাইট্‌ ! কামেন্‌ ফাইট্‌ !”
“ঘুঘু দেখেছ, ফাঁদ দেখনি, টেরটা পাবে আজ এখনি !
আজকে যদি থাকত মামা পিটিয়ে তোমায় কর্‌ত ধামা ।”
“আরে ! আরে ! মারবি নাকি ? দাঁড়া একটা পুলিশ ডাকি !”
“হাঁহাঁহাঁহাঁ ! রাগ করো না, করতে চাও কি তাই বল না !”
“হাঁ হাঁ তাতো সত্যি বটেই আমি তো আর চটিনি মোটেই !
মিথ্যে কেন লড়তে যাবি ? ভেরি-ভেরি সরি, মশলা খাবি ?”
“শেকহ্যান্ড’ আর ‘দাদা’ বল সব শোধ বোধ ঘরে চল ।”
“ডোন্ট পরোয়া অল্‌ রাইট্‌ হাউ ডুয়ুডু গুড্‌ নাইট্‌ ।”

 

 

নিরুপায় – সুকুমার রায়

বসি বছরের পয়লা তারিখে
মানের খাতায় রাখিলাম লিখে-
“সহজ উদরে ধরিবে যেটুক্‌,
সেইটুকু খাব হব না পেটুক ।”
মাস দুই যেতে খাতা খুলে দেখি,
এরি মাঝে মন লিখিয়াছে একি !
লিখিয়াছে, “যদি নেমন্তন্নে
কেঁদে ওঠে প্রাণ লুচির জন্যে,
উচিত কি হবে কাঁদান তাহারে ?
কিম্বা যখন বিপুল আহারে,
তেড়ে দেয় পাতে পোলাও কালিয়া
পায়েস অথবা রাবড়ি ঢালিয়া-
তখন কি করি, আমি নিরুপায় !
তাড়াতে না পারি, বলি আয় আয়,
ঢুকে আয় মুখে দুয়ার ঠেলিয়া
উদার রয়েছি উদর মেলিয়া !”

 

নিঃস্বার্থ – সুকুমার রায়

গোপ্‌লাটা কি হিংসুটে মা ! খাবার দিলেম ভাগ করে,
বললে নাকো মুখেও কিছু, ফেল্লে ছুঁড়ে রাগ করে ।
জ্যাঠাইমা যে মেঠাই দিলেন, “দুই ভায়েতে খাও” ব’লে—
দশটি ছিল, একটি তাহার চাখতে নিলেম ফাও বলে ।
আর যে ন’টি, ভাগ করে তায়, তিন্‌টে দিলেম গোপ্‌লাকে—
তবুও কেবল হ্যাংলা ছেলে আমার ভাগেই চোখ রাখে ।
বুঝিয়ে বলি, “কাঁদিস কেন ? তুই যে নেহাত কনিষ্ঠ—
বয়স বুঝে সাম্‌লে খাবি, তা নইলে হয় অনিষ্ট ।
তিনটি বছর তফাৎ মোদের, জ্যায়দা হিসাব গুন্‌তি তাই,
মোদ্দা আমার ছয়খানি হয়, তিন বছরে তিন্‌টি পাই ।”
তাও মানে না, কেবল কাঁদে— স্বার্থপরের শয়তানী—
শেষটা আমায় মেঠাইগুলো খেতেই হল সবখানি ।

 

নূতন বৎসর – সুকুমার রায়

‘নূতন বছর ! নূতন বছর !’ সবাই হাঁকে সকাল সাঁঝে
আজকে আমার সূর্যি মামার মুখটি জাগে মনের মাঝে ।
মুস্কিলাসান করলে মামা, উস্কিয়ে তার আগুনখানি,
ইস্কুলেতে লাগ্‌ল তালা, থাম্‌ল সাধের পড়ার ঘানি ।
এক্‌জামিনের বিষম ঠেলা চুক্‌ল রে ভাই ঘুচ্ল জ্বালা,
নূতন সালের নূতন তালে হোক্‌ তবে আস ‘হকির’ পালা ।
কোন্‌খানে কোন্‌ মেজের কোণে, কলম কানে, চশমা নাকে,
বিরামহারা কোন্‌ বেচারা দেখেন কাগজ, ভয় কি তাঁকে ?
অঙ্কে দিবেন হকির গোলা, শঙ্কা ত নাই তাহার তরে,
তঙ্কা হাজার মিলুক তাঁহার, ডঙ্কা মেরে চলুন ঘরে ।
দিনেক যদি জোটেন খেলায় সাঁঝের বেলায় মাঠের মাঝে,
‘গোল্লা’ পেয়ে ঝোল্লা ভরে আবার না হয় যাবেন কাজে !
আয় তবে আয়, নবীন বরষ ! মলয় বায়ের দোলায় দুলে,
আয় সঘনে গগন বেয়ে, পাগলা ঝড়ের পালটি তুলে ।
আয় বাংলার বিপুল মাঠে শ্যামল ধানের ঢেউ খেলিয়ে,
আয়রে সুখের ছুটির দিনে আম-কাঁটালের খবর নিয়ে !
আয় দুলিয়ে তালের পাখা, আয় বিছিয়ে শীতল ছায়া,
পাখির নীড়ে চাঁদের হাটে আয় জাগিয়ে মায়ের মায়া ।
তাতুক না মাঠ, ফাটুক না কাঠ, ছুটুক না ঘাম নদীর মত,
জয় হে তোমার, নূতন বছর ! তোমার যে গুণ, গাইব কত ?
পুরান বছর মলিন মুখে যায় সকলের বালাই নিয়ে,
ঘুচ্‌ল কি ভাই মনের কালি সেই বুড়োকে বিদায় দিয়ে ?
নূতন সালে নূতন বলে, নূতন আশায়, নুতন সাজে,
আয় দয়ালের নাম লয়ে ভাই, যাই সকলে যে যার কাজে !

 

পালোয়ান – সুকুমার রায়

খেলার ছলে ষষ্ঠিচরণ হাতী লোফেন যখন তখন,
দেহের ওজন উনিশটি মণ, শক্ত যেন লোহার গঠন ।
একদিন এক গুণ্ডা তাকে বাঁশ বাগিয়ে মার্‌ল বেগে—
ভাঙল সে বাঁশ শোলার মত মট্‌ করে তার কনুই লেগে ।
এইত সেদিন রাস্তা দিয়ে চল্‌তে গিয়ে দৈব বশে,
উপর থেকে প্রকাণ্ড ইট পড়্‌ল তাহার মাথায় খ’সে ।
মুণ্ডুতে তার যেম্‌নি ঠেকা অম্‌নি সে ইঁট এক নিমেষে
গুঁড়িয়ে হ’ল ধুলোর মত, ষষ্ঠি চলেন মুচকি হেসে।
ষষ্ঠি যখন ধ্মক হাঁকে কাঁপতে থাকে দালান বাড়ী,
ফুঁয়ের জোরে পথের মোড়ে উল্টে পড়ে গরুর গাড়ী ।
ধুম্‌সো কাঠের তক্তা ছেঁড়ে মোচড় মেরে মুহূর্তেকে,
একশ জালা জল ঢালে রোজ স্নানের সময় পুকুর থেকে ।
সকাল বেলার জলপানি তার তিনটি ধামা পেস্তা মেওয়া,
সঙ্গেতে তার চৌদ্দ হাঁড়ি দৈ কি মালাই মুড়কি দেওয়া ।
দুপুর হ’লে খাবার আসে কাতার দিয়ে ডেক্‌চি ভ’রে,
বরফ দেওয়া উনিশ কুঁজো সরবতে তার তৃষ্ণা হরে ।
বিকাল বেলা খায়না কিছু গণ্ডা দশেক মণ্ডা ছাড়া,
সন্ধা হ’লে লাগায় তেড়ে দিস্তা দিস্তা লুচির তাড়া ।
রাত্রে সে তার হাত পা টেপায় দশটি চেলা মজুত থাকে,
দুম্‌দুমাদুম্‌ সবাই মিলে মুগুর দিয়ে পেটায় তাকে ।
বল্‌লে বেশি ভাব্‌বে শেষে এসব কথা ফেনিয়ে বলা—
দেখবে যদি আপন চোখে যাওনা কেন বেনিয়াটোলা ।

 

ফস্‌‌কে গেল – সুকুমার রায়

দেখ্‌ বাবাজি দেখ্‌‌বি নাকি দেখ্‌‌রে খেলা দেখ্‌ চালাকি,
ভোজের বাজি ভেল্কি ফাঁকি পড়্‌ পড়্‌ পড়্‌ পড়্‌‌বি পাখি- ধপ্‌ !

লাফ দিয়ে তাই তালটি ঠুকে তাক ক’রে যাই তীর ধনুকে,
ছাড়্‌ব সটান উর্ধ্বমুখে হুশ্‌ ক’রে তোর লাগবে বুকে- খপ্‌ !

গুড়্‌ গুড়্‌ গুড়্‌ গুড়িয়ে হামা খাপ্‌ পেতেছেন গোষ্ঠো মামা
এগিয়ে আছেন বাগিয়ে ধামা এইবার বাণ চিড়িয়া নামা- চট্‌ !

এই যা ! গেল ফস্কে ফেঁসে- হেঁই মামা তুই ক্ষেপলি শেষে ?
ঘ্যাঁচ্‌ ক’রে তোর পাঁজর ঘেঁষে লাগ্‌ল কি বাণ ছট্‌‌কে এসে- ফট্‌ ?

 

 

বড়াই – সুকুমার রায়

গাছের গোড়ায় গর্ত করে ব্যাং বেঁধেছেন বাসা,
মনের সুখে গাল ফুলিয়ে গান ধরেছেন খাসা।
রাজার হাতি হাওদা -পিঠে হেলে দুলে আসে-
বাপরে ব’লে ব্যাং বাবাজি গর্তে ঢোকেন ত্রাসে!
রাজার হাতি মেজাজ ভারি হাজার রকম চাল ;
হঠাৎ রেগে মটাং করে ভাঙল গাছের ডাল।
গাছের মাথায় চড়াই পাখি অবাক হ’য়ে কয়-
বাসরে বাস! হাতির গায়ে এমন জোরও হয়!
মুখ বাড়িয়ে ব্যাং বলে, ভাই তাইত তোরে বলি-
“আমরা, অর্থাৎ চার-পেয়েরা, এন্মি ভাবেই চলি”।।

 

বদ্যি বুড়ো – সুকুমার রায়

শুন্‌ছ দাদা! ঐ যে হোথায় বদ্যি বুড়ো থাকে ,
সে নাকি রোজ খাবার সময় হাত দিয়ে ভাত মাখে?
শুন্‌ছি নাকি খিদেও পায় সারাদিন না খেলে ?
চক্ষু নাকি আপনি বোজে ঘুমটি তেমন পেলে ?
চলতে গেলে ঠ্যাং নাকি তার ভুয়েঁর পরে ঠেকে?
কান দিয়ে সব শোনে নাকি? চোখ দিয়ে সব দেখে?
শোয় নাকি সে মুন্ডুটাকে শিয়র পানে দিয়ে?
হয় না কি হয় সত্যি মিথ্যা চল না দেখি গিয়ে!

 

বন্দনা – সুকুমার রায়

নমি সত্য সনাতন নিত্য ধনে,
নমি ভক্তিভরে নমি কায়েমনে।
নমি বিশ্বচরাচর লোকপতে
নমি সর্বজনাশ্রয় সর্বগতে।
নমি সৃষ্টি-বিধারণ শক্তিধরে,
নমি প্রাণপ্রবাহিত জীব জড়ে।
তব জ্যোতিবিভাসিত বিশ্বপটে
মহাশুন্যতলে তব নাম রটে।
কত সিন্ধুতরঙ্গিত ছন্দ ভরে
কত স্তব্ধ হিমাচল ধ্যান করে।
কত সৌরভ সঞ্চিত পুষ্পদলে
কত সূর্য বিলুন্ঠিত পাদতলে।
কত বন্দনঝঙ্কৃত ভক্তচিতে
নমি বিশ্ব বরাভয় মৃত্যুজিতে।

 

বর্ষ গেল বর্ষ এল – সুকুমার রায়

বর্ষ গেল বর্ষ এল গ্রীষ্ম এলেন বাড়ি-
পৃথ্বী এলেন চক্র দিয়ে এক বছরের পাড়ি ।
সত্যিকারের এই পৃথিবীর বয়স কেবা জানে,
লক্ষ হাজার বছর ধরে চল্‌ছে একই টানে ।
আপন তালে আকাশ পথে আপনি চলে বেগে,
গ্রীষ্মকালের তপ্তরোদে বর্ষাকালের মেঘে,
শরৎকালের কান্নাহাসি হাল্কা বাদল হাওয়া,
কুয়াশা-ঘেরা পর্দা ফেলে হিমের আসা যাওয়া-
শীতের শেষে রিক্ত বেশে শূন্য করে ঝুলি,
তার প্রতিশোধ ফুলে ফলে বসন্তে লয় তুলি ।
না জানি কোন নেশার ঝোঁকে যুগযুগান্ত ধরে,
ছয়টি ঋতু দ্বারে দ্বারে পাগল হয়ে ঘোরে !
না জানি কোন ঘূর্ণীপাকে দিনের পর দিন,
এমন ক’রে ঘোরায় তারে নিদ্রাবিরামহীন !
কাঁটায় কাঁটায় নিয়ম রাখে লক্ষযুগের প্রথা,
না জানি তার চাল চলনের হিসাব রাখে কোথা !

 

 

বর্ষ শেষ – সুকুমার রায়

শুন রে আজব কথা, শুন বলি ভাইরে-
বছরের আয়ু দেখ বেশিদিন নাই রে ।
ফেলে দিয়ে পুরাতন জীর্ণ এ খোলসে
নূতন বরষ আসে, কোথা হতে বল সে !
কবে যে দিয়েছে চাবি জগতের যন্ত্রে,
সেই দমে আজও চলে না জানি কি মন্ত্রে !
পাকে পাকে দিনরাত ফিরে আসে বার বার,
ফিরে আসে মাস ঋতু- এ কেমন কারবার ।
কোথা আসে কোথা যায় নাহি কোন উদ্দেশ,
হেসে খেলে ভেসে যায় কত দূর দূর দেশ ।
রবি যায় শশী যায় গ্রহ তারা সব যায়,
বিনা কাঁটা কম্পাসে বিনা কল কব্জায় ।
ঘুরপাকে ঘুরে চলে, চলে কত ছন্দে,
তালে তালে হেলে দুলে চলে রে আনন্দে ।

 

বর্ষার কবিতা – সুকুমার রায়

কাগজ কলম লয়ে বসিয়াছি সদ্য,
আষাঢ়ে লিখিতে হবে বরষার পদ্য ।
কি যে লিখি কি যে লিখি ভাবিয়া না পাই রে,
হতাশে বসিয়া তাই চেয়ে থাকি বাইরে ।
সারাদিন ঘনঘটা কালো মেঘ আকাশে,
ভিজে ভিজে পৃথিবীর মুখখানা ফ্যাকাশে ।
বিনা কাজে ঘরে বাঁধা কেটে যায় বেলাটা,
মাটি হল ছেলেদের ফুটবল খেলাটা ।
আপিসের বাবুদের মুখে নাই ফুর্তি,
ছাতা কাঁধে জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি ।
কোনখানে হাঁটু জল, কোথা ঘন কর্দম-
চলিতে পিছল পথে পড়ে লোকে হর্‌দম ।
ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদ্‌গদ্‌,
গান করে সারারাত অতিশয় বদ্‌খদ্‌ ।

 

 

 

বলব কি ভাই– সুকুমার রায়

বল্‌ব কি ভাই হুগ্‌লি গেলুম
বলছি তোমায় চুপি চুপি-
দেখ্‌তে পেলাম তিনটে শুয়োর
মাথায় তাদের নেইকো টুপি।।

 

 

বাবু– সুকুমার রায়

অতি খাসা মিহি সূতি
ফিনফিনে জামা ধুতি,
চরণে লপেটা জুতি জরিদার ।
এ হাতে সোনার ঘড়ি,
ও হাতে বাঁকান ছড়ি,
আতরের ছড়াছড়ি চারিধার ।
চক্‌চকে চুল ছাঁটা
তায় তোফা টেরিকাটা-
সোনার চশমা আঁটা নাসিকায় ।
ঠোঁট দুটি এঁকে বেঁকে
ধোঁয়া ছাড়ে থেকে থেকে,
হালচাল দেখে দেখে হাসি পায় ।

ঘোষেদের ছোট মেয়ে
পিক্‌ ফেলে পান খেয়ে,
নিচু পানে নাহি চায় হায়রে ।
সেই পিক থ্যাপ ক’রে
লেগেছে চাদর ভরে
দেখে বাবু কেঁদে মরে যায়রে ।
ওদিকে ছ্যাকরাগাড়ি
ছুটে চলে তাড়াতাড়ি
ছিট্‌কিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ঘোলাজল ।
সহসা সে জল লাগে
জামার পিছন বাগে,
বাবু করে মহারাগে কোলাহল ।।

 

বাবুরাম সাপুড়ে– সুকুমার রায়

বাবুরাম সাপুড়ে,
কোথা যাস্‌ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা,
দুটো সাপ রেখে যা—
যে সাপের চোখ্‌ নেই,
শিং নেই নোখ্‌ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস্‌ফাঁস্‌,
মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত,
খায় শুধু দুধ ভাত—
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আনত?
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা
ক’রে দেই ঠাণ্ডা।

 

বিবিধ – সুকুমার রায়


করে তাড়াহুড়ো বিষম চোট্‌
কিনেছি হ্যাট্‌ পরেছি কোট্‌,
পেয়েছি passage এসেছে boat,
বেঁধেছি তল্পি তুলেছি মোট্‌,
বলেছে সবাই, “তা হলে ওঠ্‌,
আসান্‌ এবার বিলেতে ছোট্‌।”
তাই সভা হবে, বিদায় ভোট্‌,
কাঁদ কাঁদ ভাবে ফুলিয়ে ঠোট্‌
হেথায় সকলে করিবে জোট্‌
(প্রোগ্রামটুকু করিও Note)।

প্রোগ্রাম-
শুক্র সন্ধ্যা সঠিক সাত-
আহার, আমোদ, উল্কাপাত।


আসছে কাল, শনিবার
অপরাহ্ণ সাড়ে চার,
আসিয়া মোদের বাড়ি,
কৃতার্থ করিলে সবে
টুলুপুষু খুশি হবে।


(হুবহু) নকল করি
লেখাটি আমার
সভায় (বাহবা) নিল
লজ্জা নাহি তার।
ধনীরা (খামখা) কেন
ধন লয়ে যায়।
যে ধন (বিলাবি) যেন
দুখী জনে পায়।


লর্ড কার্জন অতি দুর্জন বঙ্গগগন শনি
কূট নিঠুর চক্রী চতুর উগ্র গরল ফণী। …


আমরা দিশি পাগলার দল,
দেশের জন্য ভেবে ভেবে হয়েছি পাগল,
(যদিও) দেখতে খারাপ, টিকবে কম, দামটা একটু বেশি
(তাহোক) এতে দেশেরই মঙ্গল।


আজকে আমার প্রদীপখানি ম্লান হয়েছে আঁধার মাঝে
আজকে আমার প্রাণের সুরে ক্ষণে ক্ষণে বেসুর বাজে
আজকে আমার আশার বাণী মৌন আছে সংশয়েতে
…[অসমাপ্ত]


সৃষ্টি যখন সদ্য কাঁচা, অনেকখানি ফাঁকা
বিশ্বকর্মা নিলেন ছুটি একটি বছর ছাঁকা।
ঘুম জমে না, পায় না ক্ষিদে, শরীর কেমন করে,
ডাক্তারেরা দিলেন হুকুম বিশ্রামেরি তরে।
আইন মাফিক নোটিশ নোটিশ দিয়ে অগ্রহায়ণ মাসে
গেলেন তিনি মর্তলোকে স্বাস্থ্য লাভের আশে।


বৃষ্টি বেগ ভরে রাস্তা গেল ডুবিয়ে
ছাতা কাঁধে, জুতা হাতে, নোংরা ঘোলা কালো,
হাঁটু জল ঠেলি চলে যত লোকে।
রাস্তাতে চলা দুষ্কর মুস্কিল বড়
অতি পিচ্ছিল, অতি পিচ্ছিল, অতি পিচ্ছিল, বিচ্ছিরি রাস্তা,
ধরণী মহা-দুর্গম কর্দম-গ্রস্তা
যাওয়া দুষ্কর মুস্কিল রে ইস্কুলে,
সর্দি জ্বর, বৃদ্ধি বড়, নিত্যি লোকে বদ্যি ডেকে
তিক্ত বড়ি খায়।

 

বিষম ভোজ – সুকুমার রায়

“অবাক কান্ড!” বল্‌লে পিসী, “এক চাঙাড়ি মেঠাই এল-
এই ছিল সব খাটের তলায়, এক নিমিষে কোথায় গেল?”
সত্যি বটে বললে খুড়ী, “আনলো দু’সের মিঠাই কিনে-
হঠাৎ কোথায় উপসে গেল? ভেল্কিবাজি দুপুর দিনে?”
“দাঁড়াও দেখি” বল্‌লে দাদা, “কর্‌ছি আমি এর কিনারা-
কোথায় গেল পটলা ট্যাঁপা – পাচ্ছিনে যে তাদের সাড়া?”
পর্দাঘেরা আড়াল দেওয়া বারান্দাটার ঐ কোণেতে
চল্‌ছে কি সব ফিস্ ফ্সি্ ফিস্ শুনলে দাদা কানটি পেতে।
পটলা ট্যাঁপা ব্যস্ত দুজন ট্প্‌টপাটপ্ মিঠাই ভোজে,
হঠাৎ দেখে কার দুটো হাত এগিয়ে তাদের কানটি খোঁজে।
কানের উপর প্যাঁচ্ ঘুরাতেই দু চোখ বেয়ে অশ্রু ছোটে,
গিলবে কি ছাই মুখের মিঠাই ,কান বুঝি যায় টানের চোটে।
পটল বাবুর হোম্‌রা গলা মিল্‌ল ট্যাঁপার চিকন সুরে
জাগ্‌ল করুন রাগরাগিণী বিকট তানে আকাশ জুড়ে।

 

 

বুঝবার ভুল – সুকুমার রায়

এমনি পড়ায় মন বসেছে, পড়ার নেশায় টিফিন ভোলে ।
সাম্‌নে গিয়ে উৎসাহ দেই মিষ্টি দুটো বাক্য বলে ।

পড়ছ বুঝি ? বেশ বেশ বেশ ! এক মনেতে পড়লে পরে
“লক্ষ্মীছেলে – সোনার ছেলে” বলে সবাই আদর করে ।

এ আবার কি ? চিত্র নাকি ? বাঁদর পাজি লক্ষ্মীছাড়া-
আমায় নিয়ে রংতামাসা ! পিটিয়ে তোমায় কর্‌ছি খাড়া ।

 

 

বেজায় খুশি – সুকুমার রায়

বাহবা বাবুলাল ! গেলে যে হেসে !
বগলে কাতুকুতু কে দিল এসে ?
এদিকে মিটিমিটি দেখ কি চেয়ে ?
হাসি যে ফেটে পড়ে দু’গাল বেয়ে !
হাসে যে রাঙা ঠোঁট দন্ত মেলে
চোখের কোণে কোণে বিজলী খেলে ।
হাসির রসে গ’লে ঝরে যে লালা
কেন এ খি-খি-খি-খি হাসির পালা ?
যে দেখে সেই হাসে হাহাহা হাহা
বাহবা বাবুলাল বাহবা বাহা !

 

বেজায় রাগ – সুকুমার রায়

ও হাড়্‌গিলে, হাড়্‌গিলে ভাই, খাপ্পা বড্ড আজ !
ঝগড়া কি আর সাজে তোমার ? এই কি তোমার যোগ্য কাজ ?
হোম্‌রা চোম্‌রা মান্য তোমরা বিদ্যেবুদ্ধি মর্যাদায়
ওদের সঙ্গে তর্ক করছ- নাই কি কোন লজ্জা তায় ?
জান্‌ছ নাকি বলছে ওরা ? “কিচির মিচির কিচ্চিরি,”
অর্থাৎ কিনা, তোমার নাকি চেহারাটা বিচ্ছিরি !
বল্‌ছে আচ্ছা বলুক, তাতে ওদেরই তো মুখ ব্যথা,
ঠ্যাঁটা লোকের শাস্তি যত, ওরাই শেষে ভুগবে তা ।
ওরা তোমায় খোঁড়া বল্‌ছে ? বেয়াদব তো খুব দেখি !
তোমার পায়ে বাতের কষ্ট- ওরা সেসব বুঝবে কি ?
তাই বলে কি নাচবে রাগে ? উঠ্‌বে চটে চট্‌ ক’রে ?
মিথ্যে আরো ত্যাক্ত হবে ওদের সাথে টক্করে ।
ঐ শোন কি বলছে আবার, কচ্ছে কত বক্তৃতা-
বলছে তোমার ন্যাড়া মাথায় ঘোল ঢালবে- সত্যি তা ?
চড়াই পাখির বড়াই দেখ তোমায় দিচ্ছে টিট্‌কিরি-
বল্‌ছে, তোমার মিষ্টি গলায় গান ধরতে গিট্‌কিরি ।
বল্‌ছে, তোমার কাঁথাটাকে ‘রিফুকর্ম’ করবে কি ?
খোঁড়া ঠ্যাঙে নামবে জলে ? আর কোলা ব্যাঙ করবে কি ?
আর চ’টো না, আর শুনো না, ঠ্যাঁটা মুখের টিপ্পনি,
ওদের কথায় কান দিতে নেই, স’রে পড় এক্ষনি ।

 

বেশ বলেছ – সুকুমার রায়

এসব কথা শুন্‌‌লে তোদের লাগবে মনে ধাঁধা,
কেউ বা বুঝে পুরোপুরি, কেউ বা বুঝে আধা ।
কারে বা কই কিসের কথা কই যে দফে দফে,
গাছের ‘পরে কাঁঠাল দেখে তেল মেখ না গোঁফে ।
একটি একটি কথায় যেন সদ্য দাগে কামান,
মন-বসনের ময়লা ধুতে তত্ত্বকথাই সমান ।
বেশ বলেছ, ঢের বলেছ, ঐখেনে দাও দাঁড়ি,
হাঁটের মাঝে ভাঙবে কেন বিদ্যে বোঝাই হাঁড়ি !

 

বোম্বাগড়ের রাজা – সুকুমার রায়

কেউ কি জান সদাই কেন বোম্বাগড়ের রাজা-
ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে আমসত্ত্ব ভাজা?
রানীর মাথায় অষ্টপ্রহর কেন বালিশ বাঁধা?
পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকে কেন রানীর দাদা?
কেন সেথায় সর্দি হলে ডিগবাজি খায় লোকে?
জোছ‌্না রাতে সবাই কেন আলতা মাথায় চোখে?
ওস্তাদেরা লেপ মুড়ি দেয় কেন মাথায় ঘাড়ে?
টাকের পরে পন্ডিতেরা ডাকের টিকিট মারে।
রাত্রে কেন ট্যাঁক্‌ঘড়িটা ডুবিয়ে রাখে ঘিয়ে।
কেন রাজার বিছ্‌না পাতে শিরীষ কাগজ দিয়ে?
সভায় কেন চেঁচায় রাজা “হুক্কা হুয়া” বলে?
মন্ত্রী কেন কলসী বাজায় বসে রাজার কোলে?

সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি?
কুমড়ো নিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসী?
রাজার খুড়ো নাচেন কেন হুঁকোর মালা পরে?
এমন কেন ঘটছে তা কেউ বলতে পার মোরে?

 

ভারি মজা – সুকুমার রায়

এই নেয়েছ, ভাত খেয়েছ, ঘণ্টাখানেক হবে—
আবার কেন হঠাৎ হেন নামলে এখন টবে?
এক্‌লা ঘরে ফুর্তি ভরে লুকিয়ে দুপুরবেলা,
স্নানের ছলে ঠাণ্ডা জলে জল-ছপ্‌ছপ্‌ খেলা।
জল ছিটিয়ে, টব পিটিয়ে, ভাবছ, “আমোদ ভারি,—
কেউ কাছে নাই, যা খুশি তাই করতে এখন পারি।”
চুপ্‌ চুপ্‌ চুপ্‌— ঐ দুপ্‌ দুপ্‌! ঐ জেগেছে মাসি,
আসছে ধেয়ে, শুনতে পেয়ে দুষ্টু মেয়ের হাসি।

 

ভাল ছেলের নালিশ – সুকুমার রায়

মাগো!
প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা
গুড় মাখিয়ে আরাম ক’রে বসে –
আমায় দেখে একটা দিল ,নয়কো তাও বড়টা,
দুইখানা সেই আপনি খেল ক’ষে!
তাইতে আমি কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে
কিল মেরেছি ‘হ্যাংলা ছেলে’ বলে-
অম্‌‌নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেচিয়ে
গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!

মাগো!
এম্‌‌নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে,
বল্‌ল, ‘এখন খেলতে আমার মানা’-
ঘন্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের উপরে
ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা।
তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে
ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো-
আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে
আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!

 

 

ভালরে ভাল – সুকুমার রায়

দাদা গো ! দেখ্‌‌ছি ভেবে অনেক দূর-
এই দুনিয়ার সকল ভাল,
আসল ভাল নকল ভাল,
সস্তা ভাল দামীও ভাল,
তুমিও ভাল আমিও ভাল,
হেথায় গানের ছন্দ ভাল,
হেথায় ফুলের গন্ধ ভাল,
মেঘ-মাখানো আকাশ ভাল,
ঢেউ-জাগানো বাতাস ভাল,
গ্রীষ্ম ভাল বর্ষা ভাল,
ময়লা ভাল ফরসা ভাল,
পোলাও ভাল কোর্মা ভাল,
মাছপটোলের দোলমা ভাল,
কাঁচাও ভাল পাকাও ভাল,
সোজাও ভাল বাঁকাও ভাল,
কাঁসিও ভাল ঢাক্‌ও ভাল,
টিকিও ভাল টাকও ভাল,
ঠেলার গাড়ী ঠেল্‌‌তে ভাল,
খাস্তা লুচি বেলতে ভাল,
গিট্‌‌কিরি গান শুনতে ভাল,
শিমুল তুলো ধুন্‌‌তে ভাল,
ঠাণ্ডা জলে নাইতে ভাল,
কিন্তু সবার চাইতে ভাল-
-পাউরুটি আর ঝোলা গুড় ।

 

ভুতুড়ে খেলা – সুকুমার রায়

পরশু রাতে পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে,

পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছ্‌নাতে।
কচ্ছে খেলা মায়ের কোলে হাত-পা নেড়ে উল্লাসে,
আহ্লাদেতে ধুপধুপিয়ে কচ্ছে কেমন হল্লা সে।
শুনতে পেলাম ভুতের মায়ের মুচকি হাসি কট্‌কটে-
দেখছে নেড়ে ঝুন্‌‌টি ধ’রে বাচ্চা কেমন চট্‌পটে।
উঠছে তাদের হাসির হানা কাষ্ঠ সুরে ডাক ছেড়ে,
খ্যাঁশ্ খ্যাঁশানি শব্দে যেন করাত দিয়ে কাঠ চেরে!
যেমন খুশি মারছে ঘুঁষি, দিচ্ছে কষে কানমলা,
আদর ক’রে আছাড় মেরে শূন্যে ঝোলে চ্যাং দোলা।
বলছে আবার, “আয় রে আমার নোংরামুখো সুঁটকো রে,
দেখ না ফিরে প্যাখ্‌না ধরে হুতোম-হাসি মুখ করে!
ওরে আমার বাঁদর-নাচন আদর-গেলা কোঁত্কা রে,
অন্ধবনের গন্ধ-গোকুল, ওরে আমার হোঁত্কা রে!
ওরে আমার বাদলা রোদে জষ্ঠি মাসের বিষ্টি রে,
ওরে আমার হামান-ছেঁড়া জষ্ঠিমধুর মিষ্টি রে।
ওরে আমার রান্না হাঁড়ির কান্না হাসির ফোড়নদার,
ওরে আমার জোছ্‌না হাওয়ার স্বপ্নঘোড়ার চড়নদার।
ওরে আমার গোবরাগণেশ ময়দাঠাসা নাদুস্ রে,
ছিঁচকাঁদুনে ফোক্‌লা মানিক, ফের যদি তুই কাঁদিস রে-”
এই না বলে যেই মেরেছে কাদার চাপটি ফট্ ক’রে,
কোথায়-বা কি, ভুতের ফাঁকি- মিলিয়ে গেল চট্ ক’রে!

 

 

মনের মতন – সুকুমার রায়

কান্না হাসির পোঁটলা বেঁধে, বর্ষভরা পুঁজি,
বৃদ্ধ বছর উধাও হ’ল ভূতের মুলুক খুঁজি ।
নূতন বছর এগিয়ে এসে হাত পাতে ঐ দ্বারে,
বল্‌ দেখি মন মনের মতন কি দিবি তুই তারে ?
আর কি দিব ?- মুখের হাসি, ভরসাভরা প্রাণ,
সুখের মাঝে দুখের মাঝে আনন্দময় গান ।

 

মন্ডা ক্লাবের কয়েকটি আমন্ত্রণপত্র – সুকুমার রায়


সম্পাদক বেয়াকুব
কোথা যে দিয়েছে ডুব-
এদিকেতে হায় হায়
ক্লাবটি তো যায় যায়।

তাই বলি সোমবারে
মদগৃহে গড়পারে
দিলে সবে পদধূলি
ক্লাবটিরে ঠেলে তুলি।

রকমারি পুঁথি কত
নিজ নিজ রুচিমত
আনিবেন সাথে সবে
কিছু কিছু পাঠ হবে

করযোড়ে বারবার
নিবেদিছে সুকুমার।


কেউ বলেছে খাবো খাবো,
কেউ বলেছে খাই
সবাই মিলে গোল তুলেছে-
আমি তো আর নাই।

ছোটকু বলে, রইনু চুপে
ক’মাস ধরে কাহিল রূপে!
জংলি বলে “রামছাগলের
মাংস খেতে চাই।”

যতই বলি “সবুর কর” –
কেউ শোনে না কালা,
জীবন বলে কোমর বেধে,
কোথায় লুচির থালা?

খোদন বলে রেগেমেগে
ভীষণ রোষে বিষম লেগে-
বিষ্যুতে কাল গড়পারেতে
হাজির যেন পাই।


শনিবার ১৭ ই
সাড়ে পাঁচ বেলা,
গড়পারে হৈ হৈ
সরবতী মেলা।

অতএব ঘড়ি ধরে
সাবকাশ হয়ে
আসিবেন দয়া করে
হাসিমুখে লয়ে।

সরবৎ সদালাপ
সঙ্গীত – ভীতি
ফাঁকি দিলে নাহি মাপ,
জেনে রাখ-ইতি।


আমি,অর্থাৎ সেক্রেটারি,
মাসতিনেক কল‌কেতা ছাড়ি
যেই গিয়েছি অন্য দেশে
অমনি কি সব গেছে ফেঁসে।

বদলে গেছে ক্লাবের হাওয়া,
কাজের মধ্যে কেবল খাওয়া!
চিন্তা নেইক গভীর বিষয়
আমার প্রাণে এসব কি সয়?

এখন থেকে সম্‌‌ঝে রাখ
এ সমস্ত চলবে নাকো,
আমি আবার এইছি ঘুরে
তান ধরেছি সাবেক সুরে।

শুনবে এস সুপ্রবন্ধ
গিরিজার বিবেকানন্দ,
মঙ্গলবার আমার বাসায়।
(আর থেক না ভোজের আশায়)

 

মহাভারত: আদিপর্ব – সুকুমার রায়

কুরুকুলে পিতামহ ভীষ্মমহাশয়
ভুবন বিজয়ী বীর, শুন পরিচয়-
শান্তনু রাজার পুত্র নাম সত্যব্রত
জগতে সার্থক নাম সত্যে অনুরত।
স্বয়ং জননী গঙ্গা বর দিলা তাঁরে-
নিজ ইচ্ছা বিনা বীর না মরে সংসারে।
বুদ্বিভ্রংশ ঘটে হায় শান্তনু রাজার,
বিবাহের লাগি বুড়া করে আবদার।
মৎস্যরাজকন্যা আছে নামে সত্যবতী,
তারে দেখি শান্তনুর লুপ্ত হল মতি।
মৎস্যরাজ কহে, ‘রাজা, কর অবধান,
কিসের আশায় কহ করি কন্যাদান?
সত্যব্রত জ্যেষ্ঠ সেই রাজ্য অধিকারী,
আমার নাতিরা হবে তার আজ্ঞাচারি,
রাজমাতা কভু নাহি হবে সত্যবতী,
তেঁই এ বিবাহ- কথা অনুচিত অতি।’
ভগ্ন মনে হস্তিনায় ফিরিল শান্তনু
অনাহারে অনিদ্রয় জীর্ন তার তনু।
মন্ত্রী মুখে সত্যব্রত শুনি সব কথা
মৎস্যরাজপুরে গিয়া কহিল বারতা-
রাজ্যে মম সাধ নাহি, করি অঙ্গীকার
জন্মিলে তোমার নাতি রাজ্য হবে তার।’
রাজা কহে, ‘সাধুতুমি, সত্য তব বাণী,
তোমার সন্তান হতে তবু ভয় মানি।
কে জানে ভবিষ্যকথা, দৈবগতিধারা-
প্রতিবাদী হয় যদি রাজ্যলাভে তারা?’
সত্যব্রত কহে, ‘শুন প্রতিজ্ঞা আমার,
বংশ না রহিবে মম পৃথিবী মাঝার।
সাক্ষী রহ চন্দ্র সূর্য লোকে লোকান্তরে
এই জন্মে সত্যব্রত বিবাহ না করে।’
শুনিয়া অদ্ভুত বাণী ধন্য কহে লোকে,
স্বর্গ হতে পুষ্পধারা ঝরিল পলকে।
সেই হতে সত্যব্রত খ্যাত চরাচরে
ভীষণ প্রতিজ্ঞাবলে ভীষ্ম নাম ধরে।
ঘুচিল সকল বাধা, আনন্দিত চিতে
সত্যবতী রাণী হয় হস্তিনাপুরীতে।
ক্রমে হলে বর্ষ গত শান্তনুর ঘরে
জন্ম নিল নব শিশু, সবে সমাদরে।
রাখিল বিচিত্রবীর্য নামটি তাহার
শান্তনু মরিল তারে দিয়া রাজ্যভার।

অকালে বিচিত্রবীর্য মুদিলেন আঁখি
পাণ্ডু আর ধৃতরাষ্ট্র দুই পুত্র রাখি।।
হস্তিরায় চন্দ্রবংশ কুরুরাজকুল
রাজত্ব করেন সুখে বিক্রমে অতুল।
সেই কুলে জন্মি তবু দৈববশে হায়
অন্ধ বলি ধৃতরাস্ট্র রাজ্য নাহি পায়।
কনিষ্ঠ তাহার পাণ্ডু, রাজত্ব সে করে,
পাঁচটি সন্তান তার দেবতার বরে।
জ্যেষ্ঠপুত্র যুধিষ্ঠির ধীর শান্ত মন
‘সাক্ষাৎ ধর্মের পুত্র’ কহে সর্বজন।
দ্বিতীয় সে মহাবলী ভীম নাম ধরে,
পবন সমান তেজ পবনের বরে।
তৃতীয় অর্জুন বীর, ইন্দ্রের কৃপায়
রুপেগুণে শৌর্যেবীর্যে অতুল ধরায়।
এই তিন সহোদর কুন্তীর কুমার,
বিমাতা আছেন মাদ্রী দুই পুত্র তাঁর-
নকুল ও সহদেব সুজন সুশীল
এক সাথে পাঁচজনে বাড়ে তিল তিল।
অন্ধরাজ ধৃতরাষ্ট্র শতপুত্র তার,
অভিমানী দুর্যোধন জ্যেষ্ঠ সবাকার।
পাণ্ডবেরা পাঁচ ভাই নষ্ট হয় কিসে,
এই চিন্তা করে দুষ্ট জ্বলি হিংসাবিষে।
হেনকালে সর্বজনে ভাসাইয়া শোকে
মাদ্রীসহ পান্ডরাজা যায় পরলোকে।
‘পান্ডু গেল’, মনে মনে ভাবে দুর্যোধন,
এই বারে যুধিষ্ঠির পাবে সিংহাসন!
ইচ্ছা হয় এই দণ্ডে গিয়া তারে মারি-
ভীমের ভয়েতে কিছু করিতে না পারি।
আমার কৌশলে পাকে ভীম যদি মরে
অনায়াসে যুধিষ্ঠিরে মারি তারপরে।’
কুচক্র করিয়া তবে দুষ্ট দুর্যোধন
নদীতীরে উৎসবের করে আয়োজন-
একশত পাঁচ ভাই মিলি একসাথে
আমোদ আহ্লাদে ভোজে মহানন্দে মাতে।
হেন ফাঁকে দুর্যোধন পরম যতনে
বিষের মিষ্টান্ন দেয় ভীমের বদনে।
অচেতন হল ভীম বিষের নেশায়,
সুযোগ বুঝিয়া দুষ্ট ধরিল তাহায়,
গোপনে নদীর জলে দিল ভাসাইয়া,
কেহ না জানিল কিছু উৎসবে মাতিয়া।।

এদিকে নদীর জলে ডুবিয়া অতল তলে
ভীমের অবশ দেহে, কেমনে জানে না কেহ,
কোথায় ঠেকিল শেষে বাসুকী নাগের দেশে।
ভীমের বিশাল চাপে নাগের বসতি কাঁপে
দেহ ভারে কত মরে, কত পলাইল ডরে ,
কত নাগ দলে বলে ভীমেরে মারিতে চলে
দংশিয়া ভীমের গায় মহাবিষ ঢালে তায়।
অদ্ভুত ঘটিল তাহে ভীম চক্ষু মেলি চাহে ,
বিষে হয় বিষক্ষয় মুহুর্তে চেতনা হয়,
দেখে ভীম চারিপাশে নাগেরা ঘেরিয়া আসে
দেখিয়া ভীষণ রাগে ধরি শত শত নাগে
চূর্ণ করে বাহুবলে, মহাভয়ে নাগে দলে
ছুটে যায় হাহাকরে বাসুকী রাজার দ্বারে।
বাসুকী কহেন, ‘শোন আর ভয় নাহি কোন,
তুষি তারে সুবচনে আন হেথা সযতনে।’
রাজার আদেশে তবে আবার ফিরিয়া সবে
করে গিয়া নিবেদন বাসুকীর নিমন্ত্রণ !
শুনি ভীম কুতুহলে রাজার পুরীতে চলে ,
সেথায় ভরিয়া প্রাণ, করিয়া অমৃত পান
বিষের যাতনা আর কিছু না রহিল তার ,
মহাঘুমে ভরপুর সব ক্লান্তি হল দুর
তখন বাসুকী তারে স্নেহভরে বারে বারে
আশিস করিয়া তায় পাঠাইল হস্তিনায় ।
সেথা ভাই চারিজনে আছে শোকাকুল মনে
কুন্তীর নয়নজল ঝরে সেথা অবিরল ,
মগন গভীর দুখে ফিরে সবে ম্লান মুখে ।
হেন কালে হারানিধি সহসা মিলালো বিধি
বিষাদ হইল দুর জাগিল হস্তিনাপুর ,
উলসিত কলরবে আনন্দে মাতিল সবে।।

 

মাসি গো মাসি – সুকুমার রায়

মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্-
হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা
কাগের বাসায় বগের ডিম্ ।।

 

মূর্খ মাছি – সুকুমার রায়

মাকড়সা
সান্‌-বাঁধা মোর আঙিনাতে
জাল বুনেছি কালকে রাতে,
ঝুল ঝেড়ে সব সাফ করেছি বাসা।
আয় না মাছি আমার ঘরে,
আরাম পাবি বসলে পরে,
ফরাশ পাতা দেখবি কেমন খাসা!

মাছি
থাক্‌ থাক্‌ থাক্‌ আর বলে না,
আন্‌কথাতে মন গলে না-
ব্যবসা তোমার সবার আছে জানা।
ঢুক্‌লে তোমার জালের ঘেরে
কেউ কোনদিন আর কি ফেরে?
বাপ্‌রে! সেথায় ঢুক্‌তে মোদের মানা।

মাকড়সা
হাওয়ায় দোলে জালের দোলা
চারদিকে তার জান্‌লা খোলা
আপ্‌নি ঘুমে চোখ যে আসে জুড়ে!
আয় না হেথা হাত পা ধুয়ে
পাখ্‌না মুড়ে থাক্‌ না শুয়ে-
ভন্‌ ভন্‌ ভন্‌ মরবি কেন উড়ে?

মাছি
কাজ নেই মোর দোলায় দুলে,
কোথায় তোমার কথায় ভুলে
প্রাণটা নিয়ে টান্‌ পড়ে ভাই শেষে।
তোমার ঘরে ঘুম যদি পায়
সে ঘুম কভু ভাঙবে না হায়-
সে ঘুম নাকি এমন সর্বনেশে!

মাকড়সা
মিথ্যে কেন ভাবিস্‌ মনে?
দেখ্‌না এসে ঘরের কোণে
ভাঁড়ার ভরা খাবার আছে কত!
দে-টাপাটপ ফেলবি মুখে
নাচ্‌বি গাবি থাক্‌বি সুখে
ভাবনা ভুলে বাদ্‌শা-রাজার মতো।

মাছি
লোভ দেখালেই ভুলবে ভবি,
ভাবছ আমায় তেমনি লোভী!
মিথ্যে দাদা ভোলাও কেন খালি,
করব কি ছাই ভাড়ার দেখে?
প্রণাম করি আড়াল থেকে-
আজকে তোমার সেই গুড়ে ভাই বালি।

মাকড়সা
নধর কালো বদন ভরে
রূপ যে কত উপচে পড়ে!
অবাক দেখি মুকুটমালা শিরে!
হাজার চোখে মানিক জ্বলে!
ইন্দ্রধনু পাখার তলে!
ছয় পা ফেলে আয় না দেখি ধীরে।

মাছি
মন ফুর্‌ফুর্‌ ফুর্তি নাচে-
একটুখানি যাই না কাছে!
যাই যাই যাই- বাপ্‌রে একি বাঁধা।
ও দাদা ভাই রক্ষে কর!
ফাঁদ পাতা এ কেমন তরো।
পড়ে হাত পা হল বাঁধা।

দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায়
দুষ্টুলোকের মিষ্টি কথায়
নাচলে লোকের স্বস্তি কোথায়?
এমনি দশাই তার কপালে লেখা।
কথার পাকে মানুষ মেরে
মাকড়জীবী ঐ যে ফেরে,
গড় করি তার অনেক তফাৎ থেকে।

 

 

মেঘ – সুকুমার রায়

সাগর যেথা লুটিয়ে পড়ে নতুন মেঘের দেশে-
আকাশ-ধোয়া নীল যেখানে সাগর জলে মেশে ।
মেঘের শিশু ঘুমায় সেথা আকাশ-দোলায় শুয়ে-
ভোরের রবি জাগায় তারে সোনার কাঠি ছুঁয়ে ।
সন্ধ্যা সকাল মেঘের মেলা- কুলকিনারা ছাড়ি
রং বেরঙের পাল তুলে দেয় দেশবিদেশে পাড়ি ।
মাথায় জটা, মেঘের ঘটা আকাশ বেয়ে ওঠে,
জোছনা রাতে চাঁদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছোটে ।
কোন্‌ অকুলের সন্ধানেতে কোন্‌ পথে যায় ভেসে-
পথহারা কোন্‌ গ্রামের পরে নাম-জানা-নেই-দেশে ।
ঘূর্ণীপথের ঘোরের নেশা দিক্‌বিদিকে লাগে,
আগল ভাঙা পাগল হাওয়া বাদল রাতে জাগে ;
ঝড়ের মুখে স্বপন ছুটে আঁধার আসে ঘিরে !
মেঘের প্রাণে চমক হানে আকাশ চিরে চিরে !
বুকের মাঝে শঙ্খ বাজে- দুন্দুভি দেয় সাড়া !
মেঘের মরণ ঘনিয়ে নামে মত্ত বাদল ধারা ।

 

 

মেঘের খেয়াল – সুকুমার রায়

আকাশের ময়দানে বাতাসের ভরে,
ছোট বড় সাদা কালো কত মেঘ চরে।
কচি কচি থোপা থোপা মেঘেদের ছানা
হেসে খেলে ভেসে যায় মেলে কচি ডানা।
কোথা হতে কোথা যায় কোন্‌ তালে চলে,
বাতাসের কানে কানে কত কথা বলে।
বুড়ো বুড়ো ধাড়ি মেঘ ঢিপি হয়ে উঠে-
শুয়ে ব’সে সভা করে সারাদিন জুটে।
কি যে ভাবে চুপ্‌চাপ, কোন ধ্যানে থাকে,
আকাশের গায়ে গায়ে কত ছবি আঁকে।
কত আঁকে কত মোছে, কত মায়া করে,
পলে পলে কত রং কত রূপ ধরে।
জটাধারী বুনো মেঘ ফোঁস ফোঁস ফোলে,
গুরুগুরু ডাক ছেড়ে কত ঝড় তোলে।
ঝিলিকের ঝিকিমিকি চোখ করে কানা,
হড়্‌ হড়্‌ কড়্‌ কড়্‌ দশদিকে হানা।
ঝুল্‌ কালো চারিধার, আলো যায় ঘুচে,
আকাশের যত নীল সব দেয় মুছে।

 

রামগরুড়ের ছানা – সুকুমার রায়

রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা,
হাসির কথা শুনলে বলে,
“হাস্‌ব না-না না-না” ।
সদাই মরে ত্রাসে- ঐ বুঝি কেউ হাসে !
এক চোখে তাই মিট্‌মিটিয়ে
তাকায় আশে পাশে ।
ঘুম নাহি তার চোখে আপনি ব’কে ব’কে
আপনারে কয়, “হাসিস্‌ যদি
মারব কিন্তু তোকে !”
যায় না বনের কাছে, কিম্বা গাছে গাছে,
দখিন হাওয়ার সুড়্‌সুড়িতে
হাসিয়ে ফেলে পাছে !
সোয়াস্তি নেই মনে- মেঘের কোণে কোণে
হাসির বাস্প উঠছে ফেঁপে
কান পেতে তাই শোনে ।
ঝোপের ধারে ধারে রাতের অন্ধকারে
জোনাক্‌ জ্বলে আলোর তালে
হাসির ঠারে ঠারে ।
হাসতে হাসতে যারা হচ্ছে কেবল সারা
রামগরুড়ের লাগ্‌ছে ব্যথা
বুঝছে না কি তারা ?
রামগরুড়ের বাসা ধমক দিয়ে ঠাসা,
হাসির হাওয়া বন্ধ সেথায়
নিষেধ সেথায় হাসা ।

 

লক্ষ্মী – সুকুমার রায়

হাত-পা-ভাঙা নোংরা পুতুল মুখটি ধুলোয় মাখা,
গাল দুটি তার খাবলা-মতন চোখ দুটি তা কোথায় বা তার চুল বিনুনি কোথায় বা তার মাথা,
আধখানি তার ছিন্ন জামা, গায় দিয়েছে কাঁথা।

পুতুলের মা ব্যস্ত কেবল তার সেবাতেই রত
খাওয়ান শোয়ান আদর করেন ঘুম ডেকে দেন কত।

বলতে গেলাম, “বিশ্রী পুতুল” অম্‌নি বলেন রেগে—
“লক্ষ্মী পুতুল, জ্বর হয়েছে তাইত এখন জেগে।”

দ্বিগুণ জোরে চাপড়ে দিল ‘আয় আয় আয়’ ব’লে—
নোংরা পুতুল লক্ষ্মী হ’য়ে পড়ল ঘুমে ঢলে!

 

লড়াই-ক্ষ্যাপা – সুকুমার রায়

ওই আমাদের পাগলা জগাই, নিত্যি হেথায় আসে ;
আপন মনে গুন্‌ গুনিয়ে মুচকি হাসি হাসে ।
চলতে গিয়ে হঠাৎ যেন ধ্মক লেগে থামে,
তড়াক্‌ করে লাফ দিয়ে যায় ডাইনে থেকে বামে ।
ভীষণ রোখে হাত গুটিয়ে সামলে নিয়ে কোঁচা ;
“এইয়ো” বলে ক্ষ্যাপার মতো শূন্যে মারে খোঁচা ।
চেঁচিয়ে বলে, “ফাঁদ পেতেছ ? জগাই কি তায় পড়ে ?
সাত জার্মান, জগাই একা, তবুও জগাই লড়ে ।”
উৎসাহেতে গরম হয়ে তিড়িংবিড়িং নাচে,
কখনও যায় সামনে তেড়ে, কখনও যায় পাছে ।
এলোপাতাড়ি ছাতার বাড়ি ধুপুস্‌ধাপুস্‌ কত !
চক্ষু বুজে কায়দা খেলায় চর্কিবাজির মত ।
লাফের চোটে হাঁফিয়ে ওঠে গায়েতে ঘাম ঝরে,
দুড়ুম ক’রে মাটির পরে লম্বা হয়ে পড়ে ।
হাত পা ছুঁড়ে চেঁচায় খালি চোখটি ক’রে ঘোলা,
“জগাই মলো হঠাৎ খেয়ে কামানের এক গোলা” !
এই না বলে মিনিট খানেক ছট্‌ফটিয়ে খুব,
মড়ার মত শক্ত হয়ে এক্কেবারে চুপ ।
তার পরেতে সটান্‌ ব’সে চুলকে খানিক মাথা,
পকেট থেকে বার করে তার হিসেব লেখার খাতা ।
লিখলে তাতে, “শোন্‌‌রে জগাই, ভীষণ লড়াই হলো
পাঁচ ব্যাটাকে খতম ক’রে জগাই দাদা মলো ।”

 

লোভী ছেলে – সুকুমার রায়

কি ভেবে যে আপন মনে
হাসি আসে ঠোঁটের কোণে,-
আধ আধ ঝাপসা বুলি
কোন কথা কয়না খুলি ।
বসে বসে একলা নিজে
লোভী ছেলে ভাবেন কি যে-
শুধু শুধু চামচ চেটে
মনে মনে সাধ কি মেটে ?
একটুখানি মিষ্টি দিয়ে
রাখ আমায় চুপ করিয়ে,
নইলে পরে চেঁচিয়ে জোরে
তুলব বাড়ি মাথায় ক’রে ।

 

শব্দকল্পদ্রুম – সুকুমার রায়

ঠাস্‌ ঠাস্‌ দ্রুম দ্রাম,শুনে লাগে খটকা–
ফুল ফোটে? তাই বল! আমি ভাবি পট্‌কা!
শাঁই শাঁই পন্‌ পন্‌, ভয়ে কান বন্ধ–
ওই বুঝি ছুটে যায় সে-ফুলের গন্ধ?
হুড়মুড় ধুপধাপ–ওকি শুনি ভাইরে!
দেখ্‌ছনা হিম পড়ে– যেও নাকো বাইরে।
চুপ চুপ ঐ শোন্‌! ঝুপ ঝাপ্‌ ঝপা-স!
চাঁদ বুঝি ডুবে গেল? গব্‌ গব্‌ গবা-স!
খ্যাঁশ্‌ খ্যাঁশ্‌ ঘ্যাঁচ্‌ ঘ্যাঁচ্‌ , রাত কাটে ঐরে!
দুড়দাড় চুরমার–ঘুম ভাঙে কই রে!
ঘর্ঘর ভন্‌ ভন্‌ ঘোরে কত চিন্তা!
কত মন নাচ শোন্‌–ধেই ধেই ধিন্‌তা!
ঠুংঠাং ঢংঢং, কত ব্যথা বাজেরে–
ফট্‌ ফট্‌ বুক ফাটে তাই মাঝে মাঝে রে!
হৈ হৈ মার্ মার্ “বাপ্‌ বাপ্‌” চিৎকার–
মালকোঁচা মারে বুঝি? সরে পড়্ এইবার।

 

 

শিশুর দেহ – সুকুমার রায়

চশমা-আঁটা পণ্ডিতে কয় শিশুর দেহ দেখে-
“হাড়ের পরে মাংস দিয়ে, চামড়া দিয়ে ঢেকে,
শিরার মাঝে রক্ত দিয়ে, ফুসফুসেতে বায়ু,
বাঁধল দেহ সুঠাম করে পেশী এবং স্নায়ু।”
কবি বলেন, “শিশুর মুখে হেরি তরুণ রবি,
উৎসারিত আনন্দে তার জাগে জগৎ ছবি।
হাসিতে তার চাঁদের আলো, পাখির কলকল,
অশ্রুকণা ফুলের দলে শিশির ঢলঢল।”
মা বলেন, “এই দুরুদুরু মোর বুকেরই বাণী,
তারি গভীর ছন্দে গড়া শিশুর দেহখানি।
শিশুর প্রাণে চঞ্চলতা আমার অশ্রুহাসি,
আমার মাঝে লুকিয়েছিল এই আনন্দরাশি।
গোপনে কোন্‌ স্বপ্নে ছিল অজানা কোন আশা,
শিশুর দেহে মূর্তি নিল আমার ভালবাসা।”

 

 

শুনেছ কি বলে গেল – সুকুমার রায়

শুনেছ কি বলে গেল সীতানাথ বন্দ্যো?
আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ ?
টকটক থাকে নাকো হ’লে পরে বৃষ্টি-
তখনও দেখেছি চেটে একেবারে মিষ্টি ।

 

শোন শোন গল্প শোন – সুকুমার রায়

শোন শোন গল্প শোন, ‘এক যে ছিল গুরু’
এই আমার গল্প হল শুরু।
যদু আর বংশীধর যমজ ভাই তারা-
এই আমার গল্প হল সারা।

 

শ্রাবণে – সুকুমার রায়

জল ঝরে জল ঝরে সারাদিন সারারাত-
অফুরান্‌ নামতায় বাদলের ধারাপাত ।
আকাশের মুখ ঢাকা, ধোঁয়ামাখা চারিধার,
পৃথিবীর ছাত পিটে ঝামাঝম্‌ বারিধার ।
স্নান করে গাছপালা প্রাণখোলা বরষায়,
নদীনালা ঘোলাজল ভরে ওঠে ভরসায় ।
উৎসব ঘনঘোর উন্মাদ শ্রাবণের
শেষ নাই শেষ নাই বরষার প্লাবনের ।
জলেজলে জলময় দশদিক্‌ টলমল্‌,
অবিরাম একই গান, ঢালো জল ঢালো জল ।
ধুয়ে যায় যত তাপ জর্জর গ্রীষ্মের,
ধুয়ে যায় রৌদ্রের স্মৃতিটুকু বিশ্বের ।
শুধু যেন বাজে কোথা নিঃঝুম ধুক্‌ধুক্‌,
ধরণীর আশাভয় ধরণীর সুখদুখ ।

 

 

শ্রীগোবিন্দ-কথা – সুকুমার রায়

আমি অর্থাৎ শ্রীগোবিন্দ মানুষটি নই বাঁকা!
যা বলি তা ভেবেই বলি, কথায় নেইক ফাঁকা।
এখনকার সব সাহেবসুবো, সবাই আমায় চেনে
দেখ্তে চাও ত দিতে পারি সাটিফিকেট এনে।
ভাগ্য আমায় দেয়নি বটে করতে বি-এ পাশ,
তাই বলে কি সময় কাটাই কেটে ঘোড়ার ঘাস?
লোকে যে কয় বিদ্যে আমার ‘কথামালা’ই শেষ—
এর মধ্যে সত্যি কথা নেইক বিন্দুলেশ।
ওদের পাড়ার লাইব্রেরিতে কেতাব আছে যত
কেউ পড়েছে তন্নতন্ন করে আমায় মতো?
আমি অর্থাৎ শ্রীগোবিন্দ এমনি পড়ার যম
পড়াশুনো নয়ক আমার কারুর চেয়ে কম।
কতকটা এই দেখেশিখে কতক পড়েশুনে,
কতক হয়ত স্বাভাবিকী প্রতিভারই গুণে
উন্নতিটা করছি যেমন আশ্চর্য তা ভারি,
নিজের মুখে সব কথা তার বলতে কি আর পারি?
বলে গেছেন চন্ডীপতি কিংবা অন্য কেউ
“আকাশ জুড়ে মেঘের বাসা, সাগরভরা ঢেউ,
জীবনটাও তেমনি ঠাসা কেবল বিনা কাজে—
যেদিক দিয়ে খরচ করি সেই খরচই বাজে!”
আমি অর্থাৎ শ্রীগোবিন্দ চলতে ফিরতে শুতে
জীবনটাকে হাঁকাই নেকো মনের রথে জুতে।

হাইড্রোজেনের দুই বাবাজি অক্সিজেনের এক
নৃত্য কবেন গলাগলি কান্ডখানা দেখ্,
আহ্লাদেতে এক্‌সা হলে গলে হলেন জল
এই সুযোগে সুবোধ শিশু “শ্রীগোবিন্দ” বল্।

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন