‘আশা’ কবিতা সিকান্দার আবু জাফরের একটি উল্লেখযোগ্য রচনা, যা মানবিকতা, আশাবাদ ও সৎ পরিশ্রমের মূল্যকে উদযাপন করে। কবি এখানে এমন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট, যারা দারিদ্র্য, ক্লিষ্টতা বা জীবনসংগ্রামের মধ্যেও দীনতা বা দুরাশা ছাড়াই সুখী জীবনযাপন করে। জীর্ণ বেড়ার ঘরে বসবাস করেও তারা মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রাখে, প্রতিবেশীকে সাহায্য করে এবং ছোট ছোট আনন্দে তুষ্ট থাকে। কবি নিজেকে এই মানবিক ও সহানুভূতিশীল মানুষের মাঝে হারাতে চান। এটি একটি আশা ও অনুপ্রেরণার কবিতা, যা প্রকৃত সুখ এবং নৈতিকতার গুরুত্ব শেখায়।
Table of Contents
আশা কবিতার মূলভাব ও ব্যাখ্যা
আশা কবিতার কবি পরিচিতি:
সিকান্দার আবু জাফর (১৯ মার্চ ১৯১৮/১৯১৯ – ৫ আগস্ট ১৯৭৫) ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাঙালি কবি, সঙ্গীত রচয়িতা, নাট্যকার ও সাংবাদিক। তিনি ভারতের বাঙালি সাহিত্যপত্রিকা ‘সমকাল’ সম্পাদনার জন্য বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। জন্মগ্রহণ করেন খুলনা জেলার তেতুলিয়া গ্রামে। শিক্ষাজীবন শুরু করেন তালা বি.দে. ইন্সটিটিউশন থেকে এবং পরে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়ন করেন। কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; দেশ বিভাগের পর ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং রেডিও পাকিস্তান, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল প্রভৃতি পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন।
তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর লেখা ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে’ গান স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্রসন্ন প্রহর’, ‘বৈরী বৃষ্টিতে’, ‘তিমিরান্তক’, ‘লগ্ন’, ‘মালব কৌশিক’। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
আশা কবিতা – সিকানদার আবু জাফর
আমি সেই জগতে হারিয়ে যেতে চাই,
যেথায় গভীর-নিশুত রাতে
জীর্ণ বেড়ার ঘরে
নির্ভাবনায় মানুষেরা ঘুমিয়ে থাকে ভাই ॥
যেথায় লোকে সোনা-রূপায়
পাহাড় জমায় না,
বিত্ত-সুখের দুর্ভাবনায়
আয়ু কমায় না;
যেথায় লোকে তুচ্ছ নিয়ে
তুষ্ট থাকে ভাই ॥
সারাদিনের পরিশ্রমেও
পায় না যারা খুঁজে
একটি দিনের আহার্য-সঞ্চয়,
তবু যাদের মনের কোণে
নেই দুরাশা গ্লানি,
নেই দীনতা, নেই কোনো সংশয়।
যেথায় মানুষ মানুষেরে
বাসতে পারে ভালো
প্রতিবেশীর আঁধার ঘরে
জ্বালতে পারে আলো,
সেই জগতের কান্না-হাসির
অন্তরালে ভাই
আমি হারিয়ে যেতে চাই ॥
আশা কবিতার মূলভাব
‘আশা’ কবিতাটি সিকান্দার আবু জাফরের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, আশাবাদ এবং প্রকৃত মানসিক সমৃদ্ধির সন্ধানকে কেন্দ্র করে গড়া। কবি এখানে সেই মানুষদের প্রতি আকর্ষিত, যারা দারিদ্র্য, ক্লিষ্টতা বা জীবনসংগ্রামের মধ্যে থেকেও দীনতা, দুরাশা বা ঘৃণা ছাড়াই মানবিক ও মমতাশীল জীবন যাপন করে। তিনি এমন মানুষের সাথে সান্নিধ্য পেতে চান, যাদের মধ্যে মনুষ্যত্বের আলো জ্বলে, যারা প্রতিবেশীর দুঃখে আনন্দ খুঁজতে জানে এবং নিজের দৈনন্দিন সংগ্রামে তবু জীবনকে পূর্ণতা দিতে সক্ষম।
কবিতায় দেখা যায়, মানুষ ক্রমশ ভৌতিক সুখ ও ধনসম্পদ অর্জনে মনোযোগী হলেও, প্রকৃত সুখ এবং মানবিক সমৃদ্ধি ধনী হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। জীর্ণ বেড়ার ঘরে বসবাস করেও যারা শান্ত, আত্মকেন্দ্রিক নয়, ছোট ছোট আনন্দে সন্তুষ্ট থাকে এবং প্রতিবেশীকে সাহায্য করে, তারাই প্রকৃত মানবিক গুণের অধিকারী। কবি এই মানবিকতার মধ্যেই নিজেকে হারিয়ে দিতে চান।
আশা কবিতার ব্যাখ্যা
কবিতার শুরুতে কবি এমন একটি জগতের কথা বলেন যেখানে মানুষের মন শান্ত, তাদের জীবন সরল ও আনন্দময়। এখানে ধন-সম্পদ বা বৈভবের কোনো প্রভাব নেই। মানুষ সুখী হয় তাদের অন্তরের মনের বিশুদ্ধতা, পরিশ্রমের মর্যাদা এবং একে অপরের প্রতি মানবিকতা থেকে।
কবি মানুষের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের পুনঃমূল্যায়ন করেছেন। যেখানে মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে, প্রতিবেশীর দুঃখে আনন্দ খুঁজে পায়, সেই জগতই প্রকৃত সুখের স্থান। তিনি মনে করেন, বিত্তের পাহাড় বা ধন-সম্পদ মানুষের জীবনের প্রকৃত মান বৃদ্ধি করতে পারে না। প্রকৃত সুখ এবং মানবিক গুণাবলীর পরিচয় পাওয়া যায় সারল্য, পরিশ্রম, সহানুভূতি এবং ভালোবাসা দ্বারা।
কবিতার শেষ অংশে কবি নিজেকে এই মনুষ্যত্বের আলো জ্বালানো মানুষদের মাঝে হারিয়ে দিতে চান। এটি একটি আশা ও অনুপ্রেরণার কবিতা, যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সত্যিকারের মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং নৈতিক শক্তি দিয়েই জীবনে পূর্ণতা আসে।
আশা কবিতা বিস্তারিত ঃ
‘আশা’ কবিতার মূল বার্তা হলো— সারল্য, সহানুভূতি ও মানবিকতা সবচেয়ে মূল্যবান, আর প্রকৃত সুখ এবং মানসিক শান্তি বিত্ত বা সামাজিক মর্যাদায় সীমাবদ্ধ নয়। সিকান্দার আবু জাফর আমাদের দেখিয়েছেন কিভাবে দারিদ্র্য এবং জীবনসংগ্রামের মধ্যে থেকেও মানুষের মন এবং আচরণে আশার সঞ্চার হতে পারে, যা জীবনের নৈতিক ও মানসিক সমৃদ্ধির পথ নির্দেশ করে।
