অভিধান কী ও কেন ? | বাংলা অভিধানের ধারণা, ইতিহাস ও গুরুত্ব

আজকের আলোচনার বিষয় — “অভিধান কী ও কেন”। এই পাঠটি ভাষা ও শিক্ষা বিভাগের বাংলা অভিধান বিষয়ভুক্ত একটি মৌলিক ও প্রয়োজনীয় অধ্যায়। অভিধান কেবল একটি “শব্দের বই” নয়, এটি একটি জাতির ভাষাবিজ্ঞান, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও সভ্যতার প্রতিফলন।

 

অভিধান কী ও কেন ?

 

অভিধান কী?

‘অভিধান’ শব্দটি সংস্কৃত উৎসজাত — “অভি” অর্থ ‘দিকে’ বা ‘সম্পর্কে’, আর “ধান” অর্থ ‘ধারণ করা’।
অর্থাৎ, অভিধান হলো এমন একটি গ্রন্থ যেখানে শব্দ ও তার অর্থ, রূপ, উচ্চারণ, ব্যুৎপত্তি, এবং প্রয়োগ সুসংগঠিতভাবে সংরক্ষিত থাকে।

ইংরেজি Dictionary শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হলো “অভিধান”।
তবে অর্থের দিক থেকে dictionary যেখানে শব্দের ভাণ্ডার নির্দেশ করে, “অভিধান” শব্দটি মূলত শব্দের অর্থ-নির্দেশক বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

একটি অভিধানে সাধারণত থাকে —

  • শব্দের সঠিক বানান ও উচ্চারণ,
  • তার অর্থ ও ব্যুৎপত্তি,
  • ব্যাকরণগত পরিচয় (পদভেদ, লিঙ্গ, বচন, কারক ইত্যাদি),
  • প্রয়োগ ও উদাহরণ,
  • এবং কখনও কখনও শব্দের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

 

অভিধানের ইতিহাস ও বিবর্তন

মানবসভ্যতার ইতিহাসে শব্দ-সংকলনের প্রয়োজন থেকেই অভিধানের জন্ম।
প্রাচীন গ্রীকদের কাছে শব্দভাণ্ডারকে বলা হতো “লেক্সিকন” (Lexicon), আর রোমানরা ব্যবহার করতেন “ডিকশনারি” (Dictionary) শব্দটি।
ভারতীয় উপমহাদেশে সংস্কৃত ভাষাতেই প্রথম “কোষ” রচনার প্রচলন হয়, যেমন — অমরকোষ, ত্রিকাণ্ডকোষ, মধ্যকোষ প্রভৃতি।

সংস্কৃত পণ্ডিতেরা তাঁদের গ্রন্থভাষ্যে শব্দের উৎপত্তি, ব্যুৎপত্তি, প্রয়োগ ও রূপান্তর বিশ্লেষণ করতেন — যা আধুনিক অভিধানের প্রাথমিক রূপ।

বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এর ধারা দীর্ঘকালব্যাপী —

  • মধ্যযুগে কবি ও সাহিত্যিকেরা “আভিধানিক পর্যায়” নামে শব্দতালিকা তৈরি করতেন, যেখানে সমার্থক, বিপরীতার্থক ও প্রতিশব্দ সংরক্ষিত থাকত।
  • ঊনবিংশ শতকে বাংলা গদ্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা অভিধান রচনারও সূচনা ঘটে।
  • এই ধারার প্রথম উল্লেখযোগ্য সংকলন রামলোচন ভট্টাচার্যের ‘বাংলা শব্দার্থকোষ’ (১৮১৭), পরে রামমোহন রায়ের অনুবাদ ও সংকলনমূলক প্রচেষ্টা,
  • এবং বিশ শতকে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের “বাংলা ভাষার অভিধান” বাংলা অভিধান রচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

 

অভিধানের প্রকারভেদ

অভিধান এখন আর কেবল শব্দের তালিকা নয়, বরং জ্ঞানের বিস্তৃত ক্ষেত্র। ব্যবহার ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে অভিধানকে কয়েকভাবে ভাগ করা যায় —

১️⃣ সাধারণ অভিধান (General Dictionary):
সাধারণ শব্দের অর্থ, বানান ও প্রয়োগ নির্দেশ করে।
যেমন: সমার্থক-প্রতিশব্দকোষ, ছাত্র-অভিধান ইত্যাদি।

২️⃣ বিশেষ অভিধান (Specialized Dictionary):
নির্দিষ্ট বিষয় বা শাস্ত্রভিত্তিক শব্দসম্ভার যেমন — বৈজ্ঞানিক, আইন, সাহিত্য বা চিকিৎসাবিদ্যার অভিধান।

৩️⃣ দ্বিভাষিক অভিধান (Bilingual Dictionary):
এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় শব্দার্থ অনুবাদ করে — যেমন বাংলা-ইংরেজি অভিধান

৪️⃣ বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপেডিক অভিধান (Encyclopedic Dictionary):
শব্দের পাশাপাশি ব্যক্তি, স্থান, ইতিহাস, সাহিত্য, পৌরাণিক চরিত্র, ও সাংস্কৃতিক তথ্যও সংযোজিত থাকে।
এগুলো মূলত অভিধান ও এনসাইক্লোপিডিয়ার মধ্যবর্তী রূপ।

অভিধানের প্রয়োজনীয়তা

অভিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার ও শব্দের সঠিক অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান।
তবে আধুনিক যুগে এর কার্যকারিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

অভিধানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

  • শব্দের অর্থ, বানান, উচ্চারণব্যাকরণিক পরিচয় জানতে সহায়তা করে।
  • ভাষার সমৃদ্ধি ও শুদ্ধতা রক্ষা করে।
  • লেখক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য অপরিহার্য তথ্যভাণ্ডার
  • সমাজের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন, বিবর্তন ও ইতিহাস সংরক্ষণ করে।
  • আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভাষান্তর ও অনুবাদ কর্মে সহায়ক।
  • আধুনিক অভিধানে প্রায়শই যুক্ত থাকে পরিশিষ্ট তথ্য — যেমন
    • বিদেশি শব্দের তালিকা ও অর্থ,
    • দেশ, শহর, নদী, ও রাষ্ট্রের নাম,
    • বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি,
    • সাহিত্যকর্ম, পৌরাণিক চরিত্র,
    • পরিমাপ, মুদ্রা ও সময় গণনার পদ্ধতি ইত্যাদি।

 

 

শব্দ ও অর্থের সম্পর্ক

চোমস্কির মতে —

“অভিধান হলো একগুচ্ছ শব্দভুক্তির সমষ্টি, যেখানে প্রতিটি শব্দের দুটি দিক রয়েছে —
(১) ধ্বনিরূপ বা উচ্চারণের কাঠামো,
(২) অর্থ বা অর্থবাহী বৈশিষ্ট্যের সমষ্টি।”

অর্থাৎ, অভিধান শুধু অর্থের ব্যাখ্যা নয়, বরং ভাষার মানচিত্র, যা ধ্বনি, রূপ, ভাব ও প্রয়োগ — সবকিছুর সুশৃঙ্খল সংরক্ষণ করে।

এক অর্থে শব্দ একা বোবা, কিন্তু বাক্যে ব্যবহৃত হলে তা জীবন্ত হয়ে ওঠে। অভিধান সেই শব্দকে অর্থ ও প্রেক্ষাপটের আলোয় প্রতিষ্ঠিত করে।

আধুনিক অভিধান : কেবল শব্দকোষ নয়, জ্ঞানকোষও

বর্তমান যুগে অভিধানের অর্থ ও পরিসর অনেক গভীর ও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে।
আধুনিক অভিধান কেবল শব্দার্থ নয়, বরং সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস, প্রযুক্তি ও ভাষাবিজ্ঞানের দলিল।

একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক অভিধানে সাধারণত থাকে —

  • শব্দের মূল ও গঠনপ্রকৃতি,
  • প্রত্যয় ও রূপান্তর,
  • প্রাচীন ও আধুনিক ব্যবহার,
  • অপ্রচলিত শব্দের বিলুপ্তিকাল,
  • ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট,
  • এবং প্রয়োজনে প্রমাণ-সহ ব্যবহারিক উদাহরণ।

ফলে আধুনিক অভিধান এখন আর শুধু শব্দার্থের বই নয়; এটি ভাষার প্রতীক, প্রতিম ও প্রতিত্বের জ্ঞানভাণ্ডার।

অভিধান ভাষার অস্তিত্ব, বিবর্তন ও চেতনার জীবন্ত নিদর্শন। এটি কেবল শব্দ ও অর্থের ভাণ্ডার নয়, বরং একটি জাতির বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। ভাষা যেমন সভ্যতার পরিচয় দেয়, তেমনি অভিধান সেই ভাষার জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিক অনুভূতির সংরক্ষণাগার। তাই অভিধান কেবল শিক্ষার্থীর নয়, সমগ্র সমাজের জ্ঞানের বিশ্বস্ত অভিভাবক। এবং বলা চলে —

“যে জাতির অভিধান সমৃদ্ধ, তার ভাষা ও সংস্কৃতিও তত গভীর।”

Leave a Comment